গদ্দিনিশীন রাহবারে ফুরফুরা

রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের প্রতি ঐক্যের আহবান হযরত বড় হুজুর (রহ.) নিজেদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠার আহবান জানিয়ে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আমি আপনাদেরকে হুঁশিয়ার করছি-আপনারা সচেতন হউন নিজেদের ভবিষ্যত সম্বন্ধে। হিন্দুস্থান আর পাকিস্তান উভয় রাষ্ট্রই কায়েম হয়েছিল একতার বলে। এর উন্নতি কি দলাদলিতে হবে? একতার বলে কায়েমকৃত রাজ্যে যদি দলাদলি, বিভেদের কঠিন প্রাচীর গড়ে তোলেন, তবে রাজ্যের উন্নতির আশা করা আকাশ-কুসুম অবাস্তবতার স্বপ্ন দেখা মাত্র! যেথা স্বার্থ সেথা দল। যেথা দল সেথা বিভেদ, যেথা বিভেদ সেথা অবনতি। ব্যক্তিগত আত্মকেন্দ্রিক স্বার্থ বাদ দিয়ে সামগ্রিক উন্নতির দিকে লক্ষ্য দিন। আল্লাহর মেহেরবানীতে জয় সুনিশ্চিত। আলো আর অন্ধকার-পাশাপাশি দুটো হতে পারে না। সূর্য ডুবে যাক, আলো থাকুক অথবা সূর্য উঠুক অন্ধকার থাকুক এটা যেমন অসম্ভব, তেমনি অসম্ভব দলগত স্বার্থগত আত্মকেন্দ্রিক মনোভাব নিয়ে সামগ্রিক উন্নতির কামনা করা। যদি দেশের উন্নতি কামনা করেন, জনগণের হিতাকাংখী হন, তবে এত দল ও মতের প্রশ্নও প্রশ্রয় দেন কেন ? হিন্দুস্থানেরও যে অবস্থা, এখানেও (বাংলাদেশেও) সে অবস্থা । সমস্ত স্বার্থগত, দলগতহীন মনোভাব ত্যাগ করে সুসংবদ্ধ হয়ে দেশ ও দশের উন্নতি সাধনের তরে কঠিন দীপ্ত অগ্নি শপথ গ্রহণ করুন। টেপ রেকর্ড থেকে , দিওয়ান মুহম্মদ ইব্রাহীম তর্কবাগীশ, পৃঃ ২৯১-২৯২

দোয়াললীন ও যোয়াললীন সমস্যার সমাধান

হযরত পীর সাহেব (রহ.)এর সময়ে নামাজের মধ্যে সূরা ফাতেহায়,দোয়াললীন না যোয়াললীন পড়তে হবে এ নিয়ে মুসলমানদের মধ্যে ব্যাপক মতবিরোধ সৃষ্টি হয়। এমনকি বিভিন্ন স্থানে যোয়াললীন ও দোয়াললীন পন্থীদের বাহাস, তর্কবিতর্ক, ঝগড়াঝাটি এমনকি মারামারি পর্যন্ত হতে থাকে। হুজুর (রহ.) এ সমস্যার ফায়সালা দিয়ে বললেন, যোয়াললীন ও দোয়াললীন সম্পর্কে মতভেদ আছে। তৎসম্বন্ধে আমার মত এই যে-মক্কা শরীফ ও মদীনা শরীফের মোহাক্কেক আলেমগণ যেরূপ দোয়াললীন পড়েন-আমিও তদ্রুপ পড়ি। ض কে ط দ্বারা পড়িলে নামাজে ফতুরী আসিবে। কিন্তু যে ব্যক্তির চেষ্টা করা সত্ত্বেও মাখরাজ আদায় হয় না তাহার জন্য মাফ।(অসিয়ত ও নছীহত, মাওলানা ইব্রাহীম সিদ্দিকী ছাহেব, ১৩৮৫,পৃঃ ৪) হযরত পীর বড় হুজুর (রহ.) বুঝতে পেরেছিলেন যে-মুসলমানদের একতা যদি নষ্ট হয়ে যায়, তবে তারা কমজোর হয়ে পড়বে এবং অচিরেই ধ্বংস হয়ে যাবে। মুসলমানদের এই অবশ্যম্ভাবী করুন পরিণতির কথা চিন্তা করে হুজুরের প্রাণ কেঁদে উঠতো। আর তাইতো তিনি মুসলমানদের ভেতর ইত্তেফাক ও ইত্তেহাদ অটুট রাখার জন্য সারা জীবন অক্লান্ত পরিশ্রম করে গিয়েছেন।

আজাদী আন্দোলন ও হযরত আব্দুল হাই সিদ্দিকী (রহ.)

ইসায়ী ১৭৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে অস্তমিত হয় আমাদের স্বাধীনতার সূর্য। পরাধীনতার জিঞ্জিরে আবদ্ধ হবার পর এ দেশবাসী অথর্ব হয়ে বসে থাকেনি। এরা দেশের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের জন্য আন্দোলন শুরু করে। আজাদীর স্বপক্ষে সর্ব প্রথম অস্ত্র হাতে তুলে নেন মীর কাশেম আলী খান। শুরু হয় এক দীর্ঘ জীবন পণ লড়াই। শহীদী খুনের কালিতে রচিত হয় লক্ষ লক্ষ শহীদের নজীরবিহীন আত্মত্যাগের এক রক্তাক্ত ইতিহাস। মীর কাশেমের পর ইংরেজের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান মহীশূরের হায়দার আলী এবং তাঁর পুত্র টিপু সুলতান। তাঁদের পাশাপাশি ময়দানে নেমে পড়েন শ্রদ্ধেয় আলেম সমাজ এবং পীর আউলিয়াগণ। টিপু সুলতানের শাহাদাতের পর হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ মোহাদ্দিছে দেহলভী (রহ.) এবং তার পুত্র শাহ আব্দুল আজীজ (রহ.)-এর চিন্তাধারার আলোকে হযরত সৈয়দ আহমদ বেরেলভী (রহ.)-এর নেতৃত্বে গড়ে ওঠে এক অপ্রতিরোধ্য মোজাহিদ আন্দোলন। তাঁর খোলাফাদের মাধ্যমে এ আন্দোলন সমগ্র উপমহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। ইসায়ী ১৮৩১ সালের ৫ই মে, বালাকোটের ময়দানে সৈয়দ আহমদ বৈরেলভী (রহ.)-এর শাহাদাতের পর মোজাহিদ আন্দোলন কিছুটা স্তিমিত হয়ে পরলেও একেবারে থেমে যায়নি। তাঁর খোলাফারা এ আন্দোলনকে আরো বহুদূর এগিয়ে নিয়ে যান। দেখতে দেখতে চলে আসে ইসায়ী ১৮৫৭ সাল। শুরু হয় সিপাহী বিপ্লব। বৃটিশ বিরোধী সশস্ত্র সংগ্রাম এই বিপ্লবের মাধ্যমে যেন চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এই বিপ্লবও ব্যর্থ হল। সিপাহী বিপ্লব ব্যর্থ করে দেবার পর ইংরেজরা মরিয়া হয়ে ওঠে। তারা মুসলমানদের উপর শুরু করে দেয় অমানুষিক নির্যাতন। ছোট শিশু, বৃদ্ধ, অসহায় নারী, পীর-ফকীর থেকে শুরু করে বড় বড় আলেম পর্যন্ত কাউকেই তারা ছেড়ে দেয়নি। নিরপরাধ হাজার হাজার আলেম, পীর, আউলিয়ায়ে কেরামকে তারা ফাঁসি দিতে থাকে। পলাশীর পূর্বে যে বাঙ্গালী মুসলমান সারা পৃথিবীর অন্যতম উন্নত জাতি হিসেবে পরিগণিত হত-মাত্র একশত বছরের ব্যবধানে ইংরেজরা তাঁদেরকে একটি সর্বহারা সম্প্রদায়ে পরিণত করলো। সিপাহী বিপ্লবের পর এদেশের মুসলমানরা সশস্ত্র সংগ্রামের প্রতি অনাগ্রহী হয়ে পড়েন এবং তখন থেকেই শুরু হয় নিয়মতান্ত্রিকভাবে আজাদী হাসিলের প্রচেষ্টা। আজাদী আন্দোলনের এ পর্যায়ে বেশ কয়েকটি সংগঠন গড়ে ওঠে। তন্মধ্যে জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দ-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আজাদী আন্দোলনে এ সংগঠনের অবদান চিরদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। হযরত পীর আব্দুল হাই সিদ্দিকী (রহ.)-এর পিতা মোজাদ্দেদে জামান হযরত মাওলানা আবুবকর সিদ্দিকী (রহ.) ছিলেন বঙ্গীয় প্রাদেশিক জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দ এর সভাপতি। বৃদ্ধ পিতার প্রধান সহকারী হিসেবে যুবক আব্দুল হাই সিদ্দিকী (রহ.)পিতার সাথে জমিয়তে ওলামার বিভিন্ন সভা ও অধিবেশনে যোগদান করতেন।ইসায়ী ১৯২৬ সালে আল্লামা সোলায়মান নদভী সাহেবের সভাপতিত্বে কলকাতা মহানগরীতে জমিয়তের ৭ম অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এই ইতিহাস বিখ্যাত অধিবেশনে জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দ ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতার প্রস্তাব করে। এই প্রস্তাব কংগ্রেসের দুবছর এবং মুসলিম লীগের বার বছর আগে গৃহীত হয়। এই অধিবেশনকে সাফল্য মন্ডিত করতে বৃদ্ধ পিতার পাশে থেকে হযরত আব্দুল হাই সিদ্দিকী (রহ.) অক্লান্ত পরিশ্রম করেন এবং নির্ধারিত দিনে উপস্থিত থেকে অধিবেশনের রওনক বৃদ্ধি করেন। ইসায়ী ১৯৩০ সালে জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দ কংগ্রেসকে সমর্থন করে আইন অমান্য আন্দোলনের কর্মসূচি প্রস্তুত করে এবং বিলাতি পণ্যদ্রব্য বর্জন ও গোল টেবিল বৈঠক পরিত্যাগের প্রস্তাব গ্রহণ করে। বঙ্গীয় প্রাদেশিক জমিয়তের সভাপতি বড় হুজুর (রহ.)-এর পিতা মোজাদ্দেদে জামান (রহ.) জমিয়তের এই নীতির ঘোর প্রতিবাদ করেন। কিন্তু জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দের অন্যান্য নেতৃবর্গ এই নীতি পরিবর্তন করতে রাজী হলেন না। তাই তিনি জমিয়তে ওলামায়ে হিন্দ থেকে সরে এসে জমিয়তে ওলামায়ে বাংলা ও আসাম গঠন করলেন। তিনি ছিলেন এই সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। মুসলমানদের সর্ববিধ উন্নতিকল্পে বাংলা-আসাম তথা সারা ভারতের কোটি কোটি মুরিদকে নিয়ে তিনি মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত মুসলিম লীগ সমর্থন করে গেছেন। পিতা মোজাদ্দেদে জামান (রহ.)-এর ইন্তেকালের পর তাঁর স্থলাভিসিক্ত হিসেবে বড় হুজুর (রহ.) জমিয়তে ওলামায়ে বাংলা ও আসাম এর স্থায়ী সভাপতি নির্বাচিত হন। পিতার নীতি অনুসরণ করে তিনিও আজাদী হাসিলের আন্দোলনে মুসলিম লীগকে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছিলেন। যদিও তিনি মুসলিম লীগের সদস্য ছিলেন না, কিন্তু লীগের উপরে তাঁর এমনই প্রভাব ছিল যে, নির্বাচনের সময় তাঁর সাথে পরামর্শ করে এবং তাঁরই মনোনীত ব্যক্তিকে সদস্য পদে প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দেয়া হত। (মাসিক মদীনা, মে ১৯৯৩, সংখ্যা, পৃঃ ২৭) বাংলার বিখ্যাত রাজনীতিবিদ হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাহেবের কাছে কোন নির্বাচন প্রার্থী মুসলিম লীগের নমিনেশন প্রাপ্তির জন্যে গেলে তিনি তাকে বলে পাঠাতেন ফুরফুরার পীর সাহেবের কাছে যাও। হুজুর নমিনেশন দিলেই আমার দেয়া হবে।আর হুজুর না দিলে আমি দিতে পারবো না। (অমর এক জীবন কথা) অধ্যাপক মুহাম্মদ হামিদুল ইসলাম সাহেব মাওলানা আব্দুল হাই সিদ্দিকী (রহ.) প্রবন্ধে লিখেছেন, ফুরফুরা শরীফের ঐতিহ্যবাহী সিদ্দিকী পরিবারের সন্তান হওয়ার কারণে মাওলানা আব্দুল হাই সিদ্দিকী জন্মগত ভাবেই সুষ্ঠ রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অধিকারী ছিলেন। রাজনৈতিকভাবে তিনি তদানীন্তন ভারতীয় মুসলিম উম্মাহর স্বার্থে প্রতিষ্ঠিত একমাত্র সক্রিয় রাজনৈতিক সংগঠন মুসলিম লীগ এর সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। উপমহাদেশে মুসলিম জাতির স্বাধীনতা তথা আল্লাহতা আলার জমিনে তাঁরই মনোনীত একমাত্র জীবন বিধান ইসলাম প্রতিষ্ঠার উদগ্র আকাঙ্খা নিয়ে সর্বান্তঃকরণে তিনি মুসলিম লীগ এর পক্ষে কাজ করেন। তৎকালীন মুসলিম লীগ কর্মকর্তাগণ, যেমন-কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জ্বিন্নাহ, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, শেরে বাংলা আবুল কাসেম মুহাঃ ফজলুল হক এবং লীগের সদস্য ও কর্মীদের মধ্যে ডক্টর মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, আলহাজ্ব খান বাহাদুর আহসানুল্লাহ আই.সি.এস. ও প্রফেসর হযরত মাওলানা মুহাঃ আব্দুল খালেক প্রমুখ সুধীবৃন্দ লীগের যে কোন বিষয়ে মাওলানা আব্দুল হাই সিদ্দিকীর সাথে পরামর্শ করতেন। তাঁরা সকলেই তাঁকে অত্যন্ত মুহব্বত করতেন। এমনকি নিখিল ভারত মুসলিম লীগ নেতা কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জ্বিন্নাহ যে কোন সময় কলকাতা এলে ফুরফুরা শরীফে এসে মাওলানা আব্দুল হাই সিদ্দিকীর সাথে দেখা না করে ফিরে যেতেন না।…..কায়েদে আজম মুহাম্মদ আলী জ্বিন্নাহ যখনই হযরত পীর সাহেব (রহ.)এর সাথে সাক্ষাৎ করতেন, তখন কথা বলার প্রাক্কালে অতীব মহব্বতের সাথে সালাম করার পরই প্রাণভরে তাঁকে অত্যন্ত শ্রদ্ধার সাথে সম্বোধন করতেন। (মাসিক মদীনা, ২৯ বর্ষ, ২য় সংখ্যা, পৃঃ ২৭) ইসায়ী ১৯৪৩ সালে (বাংলা ১৩৫০ সনের ২২ শে ফাল্গুন, সোমবার) ফুরফুরার ইসালে ছওয়াব মাহফিলে জমিয়তে ওলামায়ে বাংলা ও আসামের এক বিশেষ অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত অধিবেশনে মুসলিম লীগের বেশ কয়েকজন নেতৃবৃন্দের শরিয়ত বিরোধী কার্যকলাপ এবং শিয়া সম্প্রদায়ভুক্ত জ্বিন্নাহ সাহেবের নেতৃত্বের প্রতি অনাস্থা দেখিয়ে আল্লামা রুহুল আমীন (রহ.) মুসলিম লীগের সাথে সমস্ত প্রকার সম্পর্ক ছেদের প্রস্তাব করেন এবং হযরত বড় হুজুর (রহ.)-এর অনুপস্থিতিতে তাঁর পক্ষে তাঁর মেঝ ভাইয়ের স্বাক্ষর নিয়ে এই প্রস্তাব পাশ করিয়ে নেন। সেই সাথে তিনি ঘোষণা করেন মুসলিম লীগের সাথে আমাদের কোন সম্পর্ক নাই।বড় হুজুর (রহ.) যখন এই সংবাদ পেলেন তখন গর্জে উঠলেন। তিনি এই সিদ্ধান্ত বাতিল করে দিয়ে ঘোষণা করলেন হ্যাঁ গা, আমরা জিন্নাহর বা ঐ নেতাদের দল করি ? না মুসলমানদের দল করি? আমরা মুসলমান, আর মুসলমানদের দল হল মুসলিম লীগ। মুসলমান হয়ে মুসলমানদের দল মুসলিম লীগ ত্যাগ করা কোন প্রকারেই সম্ভব হবে না। তাঁর এই ঘোষণায় জমিয়তে ওলামা দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়লো। আলেমদের এক অংশ বড় হুজুর (রহ.)-এর পক্ষে রইলেন। অবশিষ্টরা আল্লামা রুহুল আমীন (রহ.)-এর পিছনে থেকে জোরেসোরে মুসলিম লীগের বিরোধিতা শুরু করলেন। এদিকে আবার জ্বিন্নাহ সাহেবের সাথে মতান্তরের ফলে শেরেবাংলা এ.কে. ফজলুল হক সাহেব মুসলিম লীগ থেকে পদত্যাগ করে কৃষক শ্রমিক প্রজা পার্টি নামে পৃথক দল গঠন করলেন। একদিকে রুহুল আমীন (রহ.)-এর নেতৃত্বাধীন জমিয়তে ওলামা এবং অপর দিকে শেরেবাংলার বিরোধীতার ফলে মুসলিম লীগ এক মহা সংকটময় অবস্থায় পতিত হয়। এই চরম বিপর্যয়ের মুখে মুসলিম লীগের হাল ধরলেন ফুরফুরার বড় হুজুর (রহ.)। তাঁর স্বপক্ষীয় জমিয়তে ওলামার হাজার হাজার আলেম এবং লক্ষ লক্ষ মুরিদদেরকে নিয়ে তিনি বাংলা ভারতের আনাচে-কানাচে মুসলিম লীগের পক্ষে প্রচার কার্য চালানোর জন্য ময়দানে নেমে পড়লেন। হযরত পীর সাহেব (রহ.)এর আপ্রাণ প্রচেষ্টায় মুসলিম লীগ আবারও জনপ্রিয়তার শীর্ষে আরোহন করলো। জুলফিকার আহমদ কিসমতী সাহেব বাংলাদেশের সংগ্রামী ওলামা পীর মাশায়েখ গ্রন্থের ৬৫-৬৬ পৃষ্ঠায় লিখেছেন মূলত বাংলা-আসামে মুসলিম লীগের যে জনপ্রিয়তা ছিল, তার অধিক কৃতিত্ব একমাত্র ফুরফুরার পীর সাহেবেরই। তিনি এদেশের বাঙ্গালী মুসলমানের মনে পাকিস্তানের জন্যে যে ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিলেন, তা চিরদিন একদিকে যেমন ইতিহাসে অম্লান হয়ে থাকবে, তেমনি বাংলার আলেম সমাজও তার থেকে আজীবন প্রেরণা লাভ করবে। পাকিস্তান আন্দোলনে ফুরফুরার পীর সাহেবের … ও তাঁর লক্ষ লক্ষ মুরীদের অপরিসীম ত্যাগ রয়েছে। মুসলিম লীগের নেতৃবৃন্দের অনেকেরই আমল-আখলাক ঠিক ছিল না। এ ব্যাপারে হযরত পীর সাহেব (রহ.)-এর ঘোরতর আপত্তি ছিল। তিনি তাঁদের সংশোধনের জন্য তাগীদ করতেন এবং তাঁদের হেদায়েতের জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া চাইতেন। তিনি মনে করতেন-একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন মুসলমানদের শুধুমাত্র তখনই বাস্তবায়িত হবে, যখন তাদের মধ্যে জাতীয় ঐক্য-সংহতি স্থাপিত হবে। হযরত পীর সাহেব (রহ.) বুঝতে পেরেছিলেন যে, শুধুমাত্র মুসলিম লীগের মাধ্যমেই এই লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব। তাই তিনি মুসলমানদের বৃহত্তর স্বার্থে সামান্য কয়েকজন নেতার দোষত্রুটির অজুহাতে মুসলিম লীগ ত্যাগ করা সমীচীন মনে করেননি। হযরত পীর সাহেব (রহ.)-এর গৃহীত এই পদক্ষেপ হতে তাঁর রাজনৈতিক দূরদর্শিতা সম্পর্কে কিছুটা অনুমান করা যায়। আল্লামা রুহুল আমীন (রহ.) এবং তাঁর সঙ্গী সাথীরা পরে তাঁদের ভুল বুঝতে পেরে হযরত বড় হুজুর (রহ.)-এর কাছে এসে ক্ষমা চেয়েছিলেন। বড় হুজুর (রহ.) তাঁদেরকে ক্ষমা করে দেন। শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হক সাহেব মুসলিম লীগ ত্যাগ করে নতুন দল গঠন করার পর একদিন বড় হুজুর (রহ.)-এর খেদমতে হাজির হন। বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনার এক পর্যায়ে বড় হুজুর (রহ.) পাকিস্তান আন্দোলনে মুসলিম লীগের ভূমিকা সম্পর্কে বিশদ ব্যাখ্যা করে শেরেবাংলাকে বুঝাতে চেষ্টা করলেন এবং মুসলিম লীগে ফিরে আসার আহবান জানালেন। শেরেবাংলা এ. কে ফজলুল হক সাহেব নিজের ভুল স্বীকার করে বললেন হুজুর! এখন আমি কি করি? আমি একটা দলে ঢুকে পড়েছি, এখন এ দল থেকে কি করে বেরিয়ে আসি ? হযরত পীর সাহেব (রহ.) তাঁকে পরামর্শ দিয়ে বললেন, আগামীকাল আমি পেপারে এলান করে দিব-ফুরফুরার পীর সাহেবের নির্দেশ হক সাহেব, আপনি যেখানেই থাকুন মুসলিম লীগে যোগ দিন। আপনি তখন পীরের নির্দেশ পালনার্থে মুসলিম লীগে যোগ দেবেন। শেরেবাংলা হুজুরের এই প্রস্তাবে রাজী হয়ে বিদায় আরজ করলেন। পরদিন পত্রিকায় হযরত পীর সাহেবের নির্দেশে বিজ্ঞপ্তি ছাপা হয়। কিন্তু নতুন দলের সহকর্মীদের বিরোধীতার কারণে হক সাহেবের আর মুসলিম লীগে যোগ দেয়া হয়নি। পরে তিনি হুজুরের কাছে এ ব্যাপারে মাফ চেয়েছিলেন। হযরত পীর সাহেব (রহ.)কে তিনি এত শ্রদ্ধা করতেন যে শেষ বয়সে অসুস্থাবস্থায় হুজুরকে অনুরোধ করে হাসপাতালে নিয়ে গিয়ে তাঁর হাতে শেষ তওবা পড়ে ইন্তেকাল করেন। শেরেবাংলা এ. কে. ফজলুল হক, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীসহ মুসলিম লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবর্গ যখন তাঁর দরবারে আসতেন তখন তাঁরা হুজুরকে এতই আদব করতেন যে তাঁর সামনে একেবারে জড়োসড়ো হয়ে সাধারণ লোকের মত মাটিতে বসে পড়তেন। শেরেবাংলাকে হযরত পীর সাহেব (রহ.) যেদিন মুসলিম লীগে ফিরে আসার আহবান জানালেন সেদিনেরই ঘটনা। শেরেবাংলা দরবার হতে বিদায় নিয়ে চলে যাবার কিছুক্ষণ পরই কংগ্রেস নেতা মাওলানা আবুল কালাম আজাদ দরবারে এলেন। তাঁকে দেখেই হুজুর (রহ.) বললেন আসেন মাওলানা সাহেব ! এইতো কিছুক্ষণ আগেই হক সাহেব বিদায় নিয়ে গেলেন।আপনার সাথে কি দেখা হয়েছে ? তো আলোচনার এক পর্যায়ে হযরত পীর সাহেব (রহ.) মাওলানা আজাদ সাহেবকে বললেন বলুনতো দেখি-আপনি যে কংগ্রেসে যোগ দিলেন, আপনার উলিল আমর কে ? শুনুন, আমার উলিল আমার দুজন। প্রথম জন হলেন আমার ওয়ালেদ সাহেব হুজুর মোজাদ্দেদে জামান হযরত মাওলানা আবু বকর সিদ্দিকী (রহ.), আর দ্বিতীয় জন হলেন হাকীমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী (রহ.)। তাঁরা দুজনেই মুসলিম লীগ সমর্থন করে গেছেন। তাই আমি মুসলিম লীগ সমর্থন করছি। কিন্তু আপনি যে কংগ্রেসে যোগ দিলেন আপনার পিছনে কার সমর্থন আছে ? মাওলানা আজাদ সাহেব হুজুরের একথার সুদত্তর তো দিলেনই না, বরং রেগে গিয়ে বললেন হুজুর, আপনি মুসলিম লীগ ত্যাগ করুন। নইলে আমার হাতে যে ১২টা পেপার আছে, তার সবগুলোতে ফুরফুরার বিরুদ্ধে এমনভাবে লিখবো ফুরফুরার নাম নিশানা ডুবিয়ে ছাড়বো। জবাবে মরহুম বড় হুজুর গর্জে উঠে বললেন, মাওলানা সাহেব! থাকতে পারে আপনার হাতে ১২টা পেপার, কিন্তু শুনে রাখেন-আমার পিছনে আছেন স্বয়ং আল্লাহ। (মরহুম বড় হুজুর (রহ.) এর নিজ মুখ থেকে শোনা বর্ণনা অবলম্বনে হযরত মাওলানা আবুল বাশার জিহাদী সাহেব কর্তৃক সংকলিত, সাপ্তাহিক মানবতা, ৫ম বর্ষ, ১১শ সংখ্যা)। মুসলিম লীগকে সমর্থন করতে গিয়ে হযরত পীর সাহেব (রহ.) এমন হাজারো হুমকীর মোকাবিলা করেছেন। মুসলিম লীগের সেই ঘোর দুর্দিনে তিনি যদি লীগের পাশে এসে না দাঁড়াতেন, তাহলে হয়তো মুসলমানদের আজাদীর স্বপ্ন শুধু স্বপ্নই থেকে যেত-বাস্তব রূপ লাভ করতো না কোনদিন!