গদ্দিনিশীন রাহবারে ফুরফুরা

গদ্দিনিশীন পীর মুহিউস সুন্নাহ আবুল আনসার মুহাম্মদ আব্দুল কাহহার সিদ্দিকী (রহ.) মুহিউস সুন্নাহ হযরত আবুল আনসার মোহাম্মদ আব্দুল কাহহার সিদ্দিকী আল কুরাইশী (রহ.) ছিলেন সমকালীন উপমহাদেশের সর্বজন শ্রদ্ধেয় প্রখ্যাত আলেমে দ্বীন, হাক্কানী পীর, বিখ্যাত ওয়ায়েজ, সমাজ সংস্কারক এবং জাতির একজন প্রধান আধ্যাত্মিক নেতা। তাঁর সুস্পষ্ট ও শরীয়তসম্মত বক্তব্য, শিরক ও বিদ’আত বিরোধী অবস্থান এবং সত্যের পক্ষে মজবুত ও আপোষহীন দৃঢ় প্রত্যয়ের জন্য তাঁকে বলা হয় শেরে ফুরফুরা বা ফুরফুরার বাঘ। মুজাদ্দেদে জামান আমীরুশ শরীয়ত ফুরফুরার বিশ্ববিখ্যাত পীর হযরত আবুবকর সিদ্দিকী (রহ:)-এর নাতি, তাঁর স্থলাভিষিক্ত ও তাঁর সকল প্রতিষ্ঠানের মোতওয়ালদী। পরতাপে কাইউমে জামান, হাকীমুল ইনসান হযরত আবু নসর মো: আব্দুল হাই সিদ্দিকী (রহ:)-এর জ্যেষ্ঠ পুত্র এবং তাঁর কায়েম মোকাম। তিনি ছিলেন কুরাইশ বংশীয় ও ইসলামের প্রথম খলিফা হযরত আবুবকর সিদ্দিক (রা:)-এর ৪১তম বংশধর। পিতার ইন্তেকালের পর ঐতিহ্যবাহী দরবারে ফুরফুরার পীর হিসেবে ১৯৭৭ সনের মে মাসে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত প্রায় ত্রিশ বছর যাবৎ এই গুরুদায়িত্ব তিনি অত্যন্ত সফলতার সাথে পালন করে গিয়েছেন। মরহুম পীর সাহেব ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হুগলী জেলার জাঙ্গীপাড়া থানার অন্তর্গত বিশ্ববিখ্যাত ফুরফুরায় ১৯৪০ সালে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর আম্মা ছিলেন ধৈর্য, অতিথি সেবা, ইবাদাত-বন্দেগী, তাকওয়া-পরহেজগারি, পর্দা-পুশিদার দিক দিয়ে স্থানীয় নারী সমাজের শ্রদ্ধার পাত্রী; বর্ধমান জেলার কেতুগ্রাম থানার অন্তর্গত আনাখোনা গ্রামের সম্ভ্রান্ত বংশীয় পরহেজগার ও তাহাজ্জুদ গুজার জনাব হাফেজ মৌলভী মোহাম্মদ আজফার হোসেন সাহেবের তৃতীয়া কন্যা। ফুরফুরার পীর হযরত মাওলানা আবুল আনসার মোহাম্মদ আব্দুল কাহহার সিদ্দিকী (রহ) সম্পর্কে আবেগ সংবরণ করে কিছু বলা বা লেখা খুবই কঠিন ব্যাপার। নিজের মুরীদ, যাদের তিনি পীর ছিলেন, তারা তো তাঁকে সম্মান করে বলেই মুরীদ হয়েছে কিন্তু মুরীদ ছাড়াও বহু গণ্যমান্য আলেম, সমাজ নেতা, পাশ্চাত্য শিক্ষিত মানুষ তাঁর প্রতি আকৃষ্ট, সম্মানের চোখে দেখেন। এর কারণ কেবল এই নয় যে, তিনি ভালো আলেম, শরীয়ত ও মারেফাতের জ্ঞানে জ্ঞানী ছিলেন এবং তা মেনে চলতেন, বরং এজন্যও যে, তিনি অত্যন্ত সমাজ সচেতন ছিলেন, সমাজের শিক্ষাব্যবস্থা, অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, নৈতিক মূল্যবোধের গুরুত্ব, নেতৃবৃন্দের উদারতা, পারস্পরিক ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা ইত্যাদি বহুবিধ বিষয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি ও কর্মপদ্ধতি ছিল উচ্চমানের। কারণ, তাঁর বংশগত ঐতিহ্য ছিল অসাধারন। উপমহাদেশে গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, শায়খুল ইসলাম, ফুরফুরার পীর আব্দুল হাই সিদ্দিকী (রহ:) এর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধান ও সাহচর্যে তার মনন ও মেধা বিকশিত হয়েছিল।

শিক্ষা জীবন

শায়খুল ইসলাম হযরত আব্দুল হাই সিদ্দিকী (রহ.) তাঁর এই জ্যেষ্ঠ পুত্রকে যোগ্য আলেম ও দরবারে ফুরফুরার ভবিষ্যত উত্তরসূরি হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে ছোটবেলা হতেই উপযুক্ত শিক্ষা-দীক্ষার ব্যবস্থা করেন। ফুরফুরা মাদ্রাসাতেই তাঁর প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়। তৎকালীন সিলেবাস অনুযায়ী মোমতাজুল মুহাদ্দেসীন ক্লাস পর্যন্ত বিভিন্ন কেতাব যেমন-তাফসীরে জালালাইন, তাফসীরে কাশশাফ, তাফসীরে বায়জাভী, সিহাহ্ সিত্তা-সহ সকল কিতাব তৎকালীন শীর্ষস্থানীয় আলেম ও মোহাদ্দেসদের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে শিক্ষা গ্রহণ করেন। কুরআন, হাদীস, ফিক্হ, আকাইদ, মানতিক, ফালসাফা, ইতিহাস ও কাব্য সাহিত্যে তিনি বিশেষ বুৎপত্তিলাভ করেন। মাদ্রাসার সিলেবাস সমাপ্ত করে তিনি পিতার সান্নিধ্যে থেকে শরীয়তে ইসলাম, তাসাউফ ইত্যাদি বিষয়ে প্রত্যক্ষ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। মরহুম পীর সাহেব (রহ.)-এর শিক্ষাজীবন সম্পর্কে মুফতীয়ে আজম মাও. আবু ইব্রাহীম মুহাম্মদ ওবায়দুল্লাহ সিদ্দিকী লিখেছেন আমার মরহুম বড় ভাই সাহেব ফুরফুরার গদ্দিনশীন পীর হযরত মাওলানা আবুল আনসার মোহাম্মদ আব্দুল কাহ্হার সিদ্দিকী আল কুরাইশী (রহ.)-এর শিক্ষাজীবন কেটেছে তৎকালীণ বাংলা ভারতের প্রখ্যাত ওলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে। স্থানীয় মাদ্রাসার মকতব সেকশনে তাঁর শিক্ষাজীবন শুরু হয়। মাওলানা আব্দুল হক সাহেবসহ বেশ কয়েকজন যোগ্য শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে তিনি উর্দু, ফার্সি ও আরবি কায়দা, আমপারা, বর্ণ পরিচয়, ধারাপাত, উর্দু পাহেলি, কুরআন শরীফ নজরানাসহ তৎকালীন সিলেবাস অনুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষা সম্পাদন করেন। দোঁক মাদ্রাসায় সালে আউয়াল, সালে দোম, শোম, চাহারাম, পাহ্চমসহ সালে শশম পর্যন্ত পড়ালেখা করেন। এ সময় তিনি বাকুরাতুল আদব, উর্দু পহেলি ও দুসরি, তাজবিদুল কুরআন, মিজান ও মুনশাইব রওজাতুল আদব, আজীজুন নুহাত নাহু, উর্দু তেসরি, ফার্সি দুসরি, আরবি আদব, কিতাবুল মুনসেফ, উর্দু চৌথি, হেদায়াতুন নাহু, কায়লবী আদবের কেতাব, ফিকাহ মালাবুদ্দামিনহু, ফিকাহ নুরুল ইজাহ, গোলেস্তা, ফার্সি সাহিত্য, নাহুর কিতাব কাফিয়া, সরফের কিতাব সাফিয়া, ফিকাহ কুদুরী, উসুলে শাশি, তারিখে হাবীবে এলাহা ইত্যাদিসহ তাজবীদ ও তার্জমাসহ কুরআন শরীফ অধ্যয়ন করেন। তাছাড়া সমমানের বাংলা, ইংরেজি, গণিত, ভূগোল ইত্যাদি বিষয়ও অধ্যয়ন করেন। এ সময় তাঁর শিক্ষকগণের মধ্যে মাস্টার রহিম বক্স পন্ডিত সাহেব, মাওলানা আব্দুল হাফিজ সাহেব, মাওলানা আব্দুল মতিন সাহেব, মাওলানা আবুবকর সাহেব, মাওলানা বশিরুল্লাহ সাহেব, মাস্টার আব্দুর রাজ্জাক সাহেব প্রমুখ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আলেমে আউয়াল, আলেমে দোম, ফাজেলে আউয়াল, ফাজেলে দোম ও মোমতাজুল মোহাদ্দেসীন ক্লাসের বিভিন্ন কেতাব, যেমন আরবি আদব, সাহিত্য আল মুকতারাত, আল মুনতাখাবাত, মাকামাতে হারিরি, আল মুখতায়াত, আল মুতানাব্বি, সাবা মুআল্লাকা, ফারায়েজের কেতাব, বালাগাতের কেতাব, তারিখে ইসলাম, ফিকাহ হেদায়া, শরহে বেকায়া, মানতেকের কেতাব মাইবুজি, সুল্লামুল উলুম, উসুলে ফেকাহ, নূরুল আনোয়ার, মুসালিমুস সুবুত, হেকমাতের কেতাব হেদায়াতুল হেকমত, তাফসীরে জালালাইন, তাফসীরে কাস্সাফ, মেশকাত শরীফ, বুখারী শরীফ, মুসলিম শরীফ, নাসায়ী শরীফ, ইবনে মাজা শরীফ, তিরমিযী শরীফ, আবু দাঊদ শরীফ ইত্যাদি তিনি মাওলানা বশিরুল্লাহ সাহেব (প্রাইভেট শিক্ষক), মাওলানা মোস্তফা সাহেব (সুপারইনটেন্ডন্ট, ফুরফুরা সিনিয়ার আলীয়া মাদ্রাসা), মাওলানা খলিলুল্লাহ সাহেব (শিক্ষক, কলিকাতা আলীয়া মাদ্রাসা), মাওলানা আবু সালমা সফি সাহেব (শিক্ষক, কলিকাতা আলীয়া মাদ্রাসা), মাওলানা আশরাফ সাহেব, মাওলানা আব্দুল গণি সাহেব (সুপারইনটেন্ডন্ট, ফুরফুরা মাদ্রাসা) প্রমুখ স্বনামধন্য আলেম ও শিক্ষকবৃন্দের নিকট অধ্যয়ন করেন। মাওলানা বশিরুল্লাহ সাহেব ফুলটাইম গৃহশিক্ষক হিসেবে সকল বিষয়ে হুজুর (রহ.) কে বিশেষভাবে শিক্ষা প্রদানের দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। বাংলা, ইংরেজি, গণিত, ভূগোল ইত্যাদি জেনারেল বিষয়গুলো মাস্টার রহিমবক্স পন্ডিত ও মাস্টার আব্দুর রাজ্জাক সাহেবদ্বয়ের কাছে শিক্ষাপ্রাপ্ত হন। আমাদের আব্বা হুজুর পরতাপে কাইয়ুম শায়খুল ইসলাম হযরত মাওলানা আবু নসর মো. আব্দুল হাই সিদ্দিকী (রহ.) ছোট বেলা থেকেই তাঁর যোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে বড় ভাই সাহেবকে গড়ে তুলেছিলেন। নিজের সরাসরি তত্ত্বাবধানে যোগ্য শিক্ষকমন্ডলী ও ওলামায়ে কেরামের দরস-তালিমের মাধ্যমে তিনি বড় ভাই সাহেবকে যোগ্য আলেম হিসেবে গড়ে তোলেন। সবচেয়ে বড় জিনিস হচ্ছে আল্লাহর ওলীদের সোহবত ও তাওয়াজ্জুহ হতে আমার বড় ভাই সাহেব ইলমে লাদুন্নির ফায়েজ পেয়েছিলেন। যেমনভাবে মুজাদ্দেদে জামান (রহ.) তাঁর বড় ছেলে শায়খুল ইসলাম বড় হুজুর (রহ.) কে, মেজ হুজুর (রহ.) কে, আল্লামা রুহুল আমীন (রহ.) কে ইলমে লাদুন্নীর ফায়েজ দিয়েছিলেন তেমনি আমার বড় ভাই সাহেবও ইলমে লাদুন্নীর ফায়েজ পেয়েছিলেন।