দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকায় বলা হয়েছে
আজাদী সংগ্রামকালে ফুরফুরার মরহুম পীর আব্দুল হাই সিদ্দিকী সাহেব পিতার ন্যায় বিরাট অবদান রেখেছিলেন। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগ পর্যন্ত ফুরফুরার অনুসারী লাখ লাখ মুরিদ নিয়ে মুসলমানদের স্বতন্ত্র আবাসভূমি পাকিস্তানের জন্য তিনি অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন।(দৈনিক সংগ্রাম, ঢাকা, ১৯শে মে, ১৯৭৭ সন)
হযরত বড় হুজুরের অন্তরঙ্গ সফর সাথী ও খলিফা মাওলানা আমিনুল্লাহ এনায়েতপুরী (পোঃ শাজিয়ালী, যশোর) সাহেব পাকিস্তান আন্দোলনে হযরতের ভূমিকা বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন
হুকুমতে ইসলাম তথা আল্লাহর জমিনে আল্লাহর আইন কায়েম করার ইরাদায় ফুরফুরার হযরত পীর সাহেব যখন মুসলিম লীগকে প্রত্যক্ষ সমর্থন দিলেন, বাংলার ঘরে ঘরে মুসলিম লীগের বিজয়ের সূচনা তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেল। সুষ্ঠু রূপে নির্বাচনের কাজ তরান্বিত করার জন্য তিনি প্রতিটি জেলায় কর্মীনিয়োগ করেন। আমীরে শরিয়ত হযরত পীর সাহেবের রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ও বাগ্মীতায় সকলেই ছিলেন গভীর শ্রদ্ধাশীল। ১৯৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের আওয়ামী লীগের মন্ত্রী যশোরের জনাব মশিয়ুর রহমান সাহেব হযরত পীর সাহেব সম্পর্কে আলাপ চারিতার এক পর্যায়ে বলেছিলেন, আমরাও রাজনীতি করি আর হযরত পীর সাহেব হুজুরও রাজনীতি করেছিলেন। কিন্তু তাঁর মতো একাগ্রতা, দৃঢ়তা, মতামতের তড়িৎ সিদ্ধান্ত, দৃঢ় প্রত্যয় ও আত্মবিশ্বাস আর কারো দেখিনি। সেই সময় আমরা মুসলিম লীগের কর্মী ছিলাম। হুজুর আমাকে যশোরের ও জনাব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান সাহেবকে ফরিদপুর মুসলিম লীগের নির্বাচনী দায়িত্ব দিয়েছিলেন। তিনি আমাদেরকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। অনেক সময় মাথায় ও পিঠে হাত বুলিয়ে স্নেহ করতেন। দ্বিধাহীন কণ্ঠে একথা আমাদেরকে স্বীকার করতেই হবে যে বঙ্গবন্ধুসহ আমাদের রাজনীতির হাতে খড়ি হয়েছিল হুজুরের আপাত্যস্নেহে ও অনুপ্রেরণার ফলে। আর তিনিই ছিলেন আমাদের রাজনীতির ওস্তাদ।
খুলনা তথা বাংলার কৃতী সন্তান জনাব খান আব্দুস সবুর সাহেব ১৯৬৪ সালে যশোর সার্কিট হাউসে বলেছিলেন, আলেম ওলামা অনেকেই রাজনীতি করেন, কিন্তু ফুরফুরার হযরত পীর সাহেবের ন্যায় গভীর প্রজ্ঞার রাজনীতিবিদ আলেম আমার নজরে পড়ে নাই। আমরা সকলেই তাঁর প্রতি অনেক সময় নির্ভরশীল হয়ে থাকতাম।
আমীরে শরিয়ত হযরত পীর সাহেব যখন প্রত্যক্ষ ও প্রকাশ্যে মুসলিম লীগকে শুধু মাত্র সমর্থন-ই নয়, তার বিভিন্ন কর্মকান্ডে অংশ নিলেন, তখন কিছু সংখ্যক কংগ্রেসী নেতা ও তাদের সমর্থকগণ প্রচার শুরু করলেন যে, মিঃ জ্বিন্নাহ শিয়া, তাই মুসলিম লীগ নয়, শিয়া লীগ। শিয়া লীগ বর্জন করো। আর ফুরফুরার পীর সাহেব ভুল পথে চলেছেন, তিনি অর্থের মোহে বিভ্রান্ত হয়েছেন-ইত্যাকার বিদ্বেষী প্রচার ব্যাপক হারে বাংলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করতে লাগল। এই অহেতুক মিথ্যা অপপ্রচারের জবাব দান প্রসঙ্গে হযরত পীর সাহেব বলেন
মুসলিম লীগ তথা আমার বিরুদ্ধে এই সমস্ত অপপ্রচার যখন ব্যাপক হারে চলতে থাকে, ঠিক তখনই কলকাতার মোহাম্মদ আলী পার্কে আয়োজিত এক জনসভায় প্রথমেই আমি ঘোষণা দিলাম, জ্বিন্নাহর মতে আমি নই, আমার মতে জ্বিন্নাহ। মুসলিম লীগ নয়, শিয়া লীগ, ফুরফুরার পীর সাহেব শিয়া দল সমর্থন করে ভুল পথে ভ্রান্ত মতে চলছেন ইত্যাদি বর্ণনা দিয়ে যারা জনসাধারণকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টায় মেতে উঠেছেন, আপনারা জেনে রাখুন, মিঃ জ্বিন্নাহর মত আমি গ্রহণ করিনি, বরং আমার মত মিঃ জ্বিন্নাহ সহ মুসলিম লীগের সমস্ত নেতা ও কর্মীগণ গ্রহণ করেছেন। আপনারা মুসলিম লীগ, কংগ্রেস অথবা অন্য যে কোন দলে যে কোন শ্রেণীর সদস্য হয়েছেন অথবা হবার চেষ্টা করছেন। কিন্তু আমি ফুরফুরার পীর মুসলিম লীগ অথবা অন্য কোন রাজনৈতিক দলের দুআনার সদস্যও নই। মুসলমান হিসেবে আমার ঈমানের তাগীদে আমি মুসলিম লীগ সমর্থন করি। মিঃ জ্বিন্নাহসহ বিভিন্ন নেতৃবর্গ এই মর্মে আমার নিকট ওয়াদাবদ্ধ-মুসলমানের স্বাধীন স্বতন্ত্র আবাস ভূমি পাকিস্তান যদি হাসিল হয়, তাহলে সেটা হবে হুকুমাতে ইসলাম অর্থাৎ ইসলামী রাষ্ট্র। অধুনা বিশ্বের কোথাও কোন রাষ্ট্রে হুকুমাতে ইসলাম কায়েম নেই। সমস্ত রাষ্ট্রগুলো চলছে মনগড়া ভৌতিক আইনে। সমগ্র বিশ্বে কোথাও যা নেই সেই হুকুমাতে ইসলাম বা আল্লাহর দীন ও প্রভুত্ব কায়েম হবে হাসিলকৃত আজাদী জমিন পাকিস্তানে-এর থেকে আনন্দের বিষয় আর কি হতে পারে? তাই অতি আনন্দের সঙ্গে আমি মুসলিম লীগ সমর্থন করি।ও বাংলার প্রতিটি মুসলমানের প্রতি আমার জোর তাগীদ রইল তারাও যেন মুসলিম লীগকে সমর্থন সহ সম্ভাব্য সকল রকম সহযোগিতা করেন। আল্লাহর দীন বা প্রভূত্ব এই জমিনে যাতে কায়েম না হয় তার জন্য এর বিরোধী দল বিভিন্ন ভ্রান্ত অমূলক বক্তৃতায় আপনাদেরকে বিভ্রান্ত করার অপচেষ্টায় মেতে উঠেছেন। বাংলার মুসলমান সাবধান হউন! মুসলিম লীগ বিরোধীদের ভ্রান্তমূলক অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হয়ে হুকুমাতে ইসলাম কায়েমের জন্য মুসলিম লীগের পতাকা তলে সমবেত হউন ও মুসলিম লীগের মনোনীত প্রার্থীকে ভোট দিয়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সাহায্য করুন। আপনারা যারা আজ আমার বিরুদ্ধে চলছেন, এই কিছুদিন পূর্বেই আমি ছিলাম তাদের নিকট অতি শ্রদ্ধেয়, জ্ঞানী ও বিচক্ষণ ব্যক্তি। স্বার্থ আপনাদেরকে দিশেহারা করে দিয়েছে। অন্ধ স্বার্থের কষাঘাতে সত্য আপনাদের নিকট পরাভূত। জেনে রাখবেন ,ইসলামী রাষ্ট্র তথা আল্লাহর দীন বা প্রভূত্ব কায়েমের জন্য, পাকিস্তান হাসিলের জন্য প্রয়োজন হলে আমার জীবনের শেষ রক্ত বিন্দু পর্যন্ত দিতে প্রস্তুত।
এই ভাষণের পর কংগ্রেসীদের প্রচার প্রচারণা দুরূহ হয়ে পড়ল। বিভিন্ন স্থানে কংগ্রেসী কর্মীগণ লাঞ্ছিত ও ধীকৃত হতে লাগল। অতঃপর হযরত পীর সাহেব মুসলিম লীগের প্রার্থী মনোনয়ন দান শুরু করলেন। তার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত। তাঁর মতামত মুসলিম লীগের সমস্ত নেতৃবর্গই বিনা দ্বিধায় মেনে নিতেন। কিন্তু সমস্যা হলো যশোরের নড়াইল কেন্দ্রের মনোনয়ন নিয়ে। উক্ত কেন্দ্রে কংগ্রেসের অতি প্রভাবশালী নেতা যশোর তথা বাংলা ভারতের অতি প্রসিদ্ধ ও যশোরের মুসলিম রাজনৈতিক জাগরণের অগ্রনেতা জনাব সৈয়দ নওশের সাহেবের সঙ্গে ভোট প্রতিদ্বন্দ্বিতায় হযরত পীর সাহেব মনোনয়ন দিলেন মওলবী আব্দুল আউয়াল নামীয় জনৈক অপ্রসিদ্ধ এক ব্যক্তিকে। এই মনোনয়নে হযরত পীর সাহেবের সঙ্গে এক মত হতে পারছিলেন না জনাব হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী সাহেব। তিনি বললেন হুজুর, আপনার সব মনোনয়ন বিনা দ্বিধায় মেনে নিচ্ছি, ব্যতিক্রম শুধু এইটাতে। কেননা জনাব সৈয়দ নওশের আলী সাহেব বাংলার অতি সুপ্রসিদ্ধ ব্যক্তি। বাংলার লোকেরা তাঁকে দ্বিতীয় সোহরাওয়ার্দী বলে থাকে। কাজেই তাঁর মোকাবিলায় তাঁর-ই মতো আর একজনকে না দিলে ঐ কেন্দ্র হতে অবশ্যই আমরা একটি সদস্য হারাবো। জবাবে মৃদু হেসে হযরত পীর সাহেব (রহ.) বললেন
শুনুন, যশোরের মুসলিম রাজনীতির জনক, বাংলার দ্বিতীয় সোহরাওয়ার্দী অতিপ্রসিদ্ধ সৈয়দ নওশের আলীকে ভোট প্রতিদ্বন্দীতায় আদনা আব্দুর আউয়াল দ্বারা পরাজিত যদি না করতে পারি, তাহলে আমি ফুরফুরার পীর সাহেব কী জন্য? যান, আপনাকে চিন্তা করতে হবে না, যা করার ইনশাআল্লাহ আমি করব।
অতঃপর হযরত পীর সাহেব উক্ত কেন্দ্রে ব্যক্তিগত প্রচারক পাঠিয়ে ঘোষণা করলেন যে, ভোট আদান প্রদানে টাকা পয়সাতো দূরের কথা, এক খিলি পান খাওয়াও হারাম। প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনায় জানা যায় অঞ্চলের ভোটারেরা বাড়ি হতে সঙ্গে চিড়ামুড়ি নিয়ে ভোট কেন্দ্রে ভোট দিতে এসে অনেকে জিজ্ঞাসা করছিল-ফুরফুরার পীর সাহেবের বাক্স কোনটি? নির্বাচনের ফলাফলে দেখা গেলো, জনাব মওলবী আব্দুল আউয়াল সাহেব বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছেন, আর জনাব সৈয়দ নওশের আলী সাহেবের জামানতের টাকা হয়েছে বাজেয়াপ্ত।
জনাব সৈয়দ নওশের আলী সাহেবকে ভোট প্রতিদ্বন্দীতায় পরাজিত করা ছিল অসম্ভব ও আশ্চর্য্যরে ব্যাপার, যা নাকি আমরা জানতে পারছি পরবর্তী ঘটনায়। নির্বাচনের পর মুসলিম লীগের বিজয়ী সদস্যদেরকে জনাব মোহাম্মদ আলী জ্বিন্নাহ সাহেব দিল্লীতে অনুষ্ঠিত এক অধিবেশনে আহবান করেছিলেন। বিশেষ ট্রেন যোগে মুসলিম লীগ সদস্যগণ যখন দিল্লী যাচ্ছিলেন সেই সময় প্রতি স্টেশনে হাজার হাজার জনতা তাদেরকে মুবারকবাদ জানাতে এসে আবেগ ও বিস্ময় ভরা কণ্ঠে বার বার বলছিল, সেই লোকটাকে দেখাও যিনি সৈয়দ নওশের সাহেবকে পরাস্ত করেছেন।