গদ্দিনিশীন রাহবারে ফুরফুরা

সৃষ্টির প্রতি দয়া

যিনি সত্যিকারের আল্লাহ প্রেমিক, আল্লাহরপাকের সৃষ্টির প্রতি তাঁর অকৃত্রিম দরদ ভালবাসা থাকবে। হুজুরেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহর সৃষ্ট বোবা জীবজন্তুর প্রতিও ভাল ব্যবহার করতে হুকুম করেছেন। একটি পিপাসার্ত কুকুরকে পানি পান করানোর উছীলায় আল্লাহপাক এক বেশ্যা মহিলাকে ক্ষমা করে দিয়েছিলেন। অপর এক মহিলা একটি বিড়ালকে বেঁধে রেখে খেতে না দিয়ে মেরে ফেলেছিল। তাই তাকে জাহান্নামে যেতে হয়েছে। এসব ঘটনা বর্ণনা করে হুজুরেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কেরাম (রা.) কে সৃষ্টির প্রতি দয়া প্রদর্শন করতে উৎসাহিত করতেন। সৃষ্টির প্রতি ফুরফুরার মরহুম হযরত পীর সাহেবের দয়া-মায়া মমতা ছিল সত্যিই অতুলনীয়। একদিনের ঘটনা। হুজুর শুয়ে আছেন। তাঁর সামনে একটি পাত্রে মিষ্টি রাখা হয়েছে। পিপঁড়ের আক্রমণ থেকে বাঁচানোর জন্যে মিষ্টির পাত্রটি পানির পাত্রের মধ্যে রাখা আছে। পানির পাত্রের চার দিকে পিপঁড়ের ভীড় ক্রমশই বাড়ছে। হঠাৎ একটি পিপঁড়ে পানির মধ্যে পড়ে গেল। হুজুর ঐ দিকেই তাকিয়ে ছিলেন। পিপঁড়েটা পড়ে যেতেই তিনি তাড়াতাড়ি উঠে পানি থেকে সযত্নে পিঁপড়েটি তুলে শুকনো জায়গায় ছেড়ে দিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন আয় আল্লাহতায়ালা! আপনার একটা ক্ষুদ্র জীবকে বাঁচিয়ে দিলাম। এর উছীলায় আপনি আমাকে জাহান্নাম থেকে বাঁচিয়ে দিবেন? আরেকবারের ঘটনা। দুটো কুকুরের প্রত্যেকটির ৩/৪ টা করে বাচ্চা হল। কিন্তু কয়েকদিন পরেই একটা কুকুর মায়া গেল। ঐ এতিম ৩/৪টা বাচ্চা নিয়ে হুজুর খুব চিন্তায় পড়ে গেলেন। অসহায় এতিম ঐ কুকুরের বাচ্চাগুলোর জন্যে তাঁর মন কেঁদে উঠলো। তিনি নিজেই ফিডারে করে বাচ্চা গুলোকে দুধ খাওয়াতে শুরু করলেন। এভাবে কয়েকদিন কেটে গেল। একদিন যে কুকুরটি বেঁচে ছিল সেটি নিজের বাচ্চাগুলোকে রেখে কোথায় যেন একটু গিয়েছিল। সুযোগ বুঝে হুজুর এতিম বাচ্চাগুলোকে ঐ বাচ্চাগুলোর সাথে রেখে এলেন। তারপর দূরে দাঁড়িয়ে দোয়া করতে লাগলেন যেন এতিম বাচ্চাগুলোকেও কুকুরটি আপন বাচ্চার মত লালন পালন করে। সাধারণত দেখা যায়, এক কুকুর অপর কুকুরের বাচ্চার লালন পালন করে না। কিন্তু আল্লাহর কি কুদরত! দেখা গেল কুকুরটি ফিরে এসেই সব বাচ্চাগুলোকেই কোলে তুলে নিল এবং দুধ খেতে দিল। কুকুরটির এত দুধ হত যে, সবগুলো বাচ্চাই পেট পুরে দুধ খেতে পারতো। হুজুরের সেবাযতেœ সবগুলো কুকুরের বাচ্চাই বেঁচে গেল এবং বড় হয়ে উঠলো।

অসহায় ও এতিমদের প্রতি দয়া

অসহায় ও এতিমদের সাথে ভাল ব্যবহার করতে ইসলাম বিশেষভাবে তাকীদ দিয়েছে। হুজুরেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন যে ব্যক্তি এতিমদের ভরণ-পোষণের ভার গ্রহণ করে, আল্লাহপাক তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। তিনি আরও বলেছেন যখন কোন ব্যক্তি এতিমের মাথায় আদবের সাথে হাত বুলায়, তখন আল্লাহপাক সেই ব্যক্তিকে এতিমের মাথার প্রত্যেকটি চুলের পরিবর্তে একটি করে নেকী দান করেন। ফুরফুরার হযরত পীর সাহেব (রহ.) এতিমদের অত্যধিক মুহাব্বাত করতেন। তাদের দেখা শোনা করতেন। নিজ তহবিল থেকে অনেক এতিমের ভরণ-পোষণের ব্যবস্থা করতেন। গরীব ও এতিম মেয়েদের নিজ খরচে বিয়ের বন্দোবস্ত করে দিতেন। মাদ্রাসার এতিম গরীব ছাত্ররা ভাল খানা পায় না। তাই কয়েকদিন পর পর হযরত পীর সাহেব (রহ.) তাদের জন্যে নিজ তহবিল হতে খরচ দিয়ে উন্নত খানার ব্যবস্থা করে দিতেন। হযরত পীর সাহেবের প্রতিষ্ঠিত ছাত্র ও যুব সংগঠন হিলফুল ফুযুলের প্রাক্তন কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ডাঃ এ, কে, এম, মাহমুদ রুমীর আব্বা ইন্তেকাল করলে হুজুর (রহ.) ওকে কাছে ডেকে সান্তনা দিলেন এবং বললেন বাবা! দুঃখ করো না-আজ থেকে আমি তোমার বাপ হলাম। সেই দিন থেকে মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত-আপন পিতার মত হুজুর (রহ.) রুমীর ব্যক্তিগত ও পারিবারিক প্রতিটি বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ খবর নিয়ে এসেছেন। এতিমদের প্রতি হযরত পীর সাহেবের এ অকৃত্রিম দরদ ও হৃদয় নিংড়ানো ভালবাসার বাস্তব রূপায়ন ঘটেছে বাংলা ভারতের বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য এতিমখানা, লিল্লাহ বোর্ডিং ও এতিম পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে। সাদাসিধে চালচলন মেশকাত শরীফের হাদীছে আছে, হুজুরেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন যে ব্যক্তি দুনিয়াতে জাঁকজমকপূর্ণ (অহঙ্কার বা গরিমা প্রকাশক) পোশাক পরিধান করবে, আল্লাহপাক কেয়ামতের দিন তাকে লাঞ্ছনার পোশাক পরিধান করাবেন। মেরকাতে আছে গরিমাসূচক পোশাক পরিধান করা নিষিদ্ধ। পুরুষানুক্রমে ফুরফুরার পীর সাহেব (রহ.) বিশাল জমিদারী ভোগ করেছেন। এত বড় জমিদার হওয়া সত্ত্বেও তাঁর চালচলনে কোন আড়ম্বর ছিলনা। তাঁর পোশাক আশাকে জাঁক জমকের চিহ্নও খুঁজে পাওয়া যেত না। প্রায়ই দেখা যেত তিনি মজলিসে বসে আছেন পরনে বহু পুরনো কয়েক জায়গায় ছেড়া একটা সুন্নতী জামা। এ ছেড়া পোশাক নিয়েই তিনি জলছায়, যেতেন, হাজার হাজার, লাখ লাখ মানুষের সামনে ওয়াজ করতেন। কয়েকটি তালি না লাগিয়ে কোন পোশাক ব্যবহারই তিনি ত্যাগ করতেন না। এমনকি তিনি পরিবারের সদস্যদেরকে হুকুম দিয়ে রেখেছিলেন কেউ কয়েকটি তালি লাগানোর আগে কোন পোশাক ব্যবহার পরিহার না করে। নতুন বানানো হলে পুরনোগুলো হুজুর (রহ.) গরীবদেরকে দান করে দিতেন। ১৯৯০ সনের আগস্ট মাস। ঢাকার মীরপুর ১৩ নং সেকশনের এক মসজিদে ফুরফুরার পীর সাহেবের মাহফিল। হুজুরের জন্যে একটি চেয়ারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। চেয়ারটিতে একটি রওজা শরীফের নকশাঙ্কিত জায়নামাজ বিছানো। হুজুর (রহ.) রাত পোনে ৯টার দিকে তাশরীফ আনলেন। চেয়ারে বসার আগে জায়নামাজটি যত্ন করে উঠিয়ে রাখলেন। খালি চেয়ারে বসে বললেন আপনারা হয়তো ভাবছেন কেন জায়নামাজটি উঠিয়ে রাখলাম! যে জায়নামাজে রওজা শরীফের নকশা অংকিত আছে-সে জায়নামাজের উপর কি আমি বসতে পারি, এতে যে রওজার বেইজ্জতি হবে!