গদ্দিনিশীন রাহবারে ফুরফুরা
হুজুরের সার্বক্ষণিক সঙ্গীদের সকলেই একটি মন্তব্য করেন যা উল্লেখ করা দরকার। সেটি হচ্ছে, ঠাকুর গাঁ থেকে আসার পর হতে শেষ দিন পর্যন্ত হুজুরের প্রাত্যহিক ব্যক্তিগত কাজ বাধাগ্রস্ত হলেও তিনি প্রতিদিন এবং প্রায় প্রত্যেক বেলায় ঘর, মেহমান, খাদেম, আগত মুরীদ সকলের খুঁটিনাটি প্রয়োজনের খোঁজখবর নিয়েছেন এবং নির্দেশনা দিয়েছেন। যেমন ঘরে কাজের মেয়েদের জন্য প্রত্যেক বিকেলে নাস্তা কিনে দেওয়া, তাদের ঈদের কাপড় কেনার জন্য নিজে বাজারে গিয়ে ইশারায় কাপড় দেখাতে বলে তা ক্রয় করা, খাদেমরা খেয়েছে কিনা, মেহমানদের জন্য কি কি রান্না করা হলো, তাদের কোনো অসুবিধা হচ্ছে কিনা ইত্যাদি, ইত্যাদি। পাকশী মসজিদ নির্মানের জন্য যার দোকান থেকে রড সিমেন্ট বাকিতে কেনা হয়েছে তার বাকি টাকা শোধ করা ইত্যাদি। প্রায় প্রত্যেক রোজার বিকেলে হুজুর ইফতার কেনার তাকিদ দিয়েছেন, এমনকি কয়েকদিন নিজে গাড়ি করে গিয়ে ইফতার কিনে এনে আগত মেহমানদেরকে ইফতার খাইয়েছেন। তাঁর অসুস্থতা এতোটা উদ্বেগজনক যে তাঁকে হাসপাতালে রাখা প্রয়োজন, কিন্তু তিনি হাসপাতালে থাকতে মোটেই রাজি হননি। উপরন্তু সকল দায়িত্ব সূচারুরূপে পালন করে গেছেন। এ কারণে কেউ কেউ যে বিরক্ত হন নাই তাও নয়। এমনকি খাদেম রজব আলী একদিন বলেই ফেলেন যে, আপনার যে অবস্থা এতো কিছু চিন্তা করবেন না, অন্তত ওষুধগুলো তো খাবেন। হুজুর তখন উত্তর দিয়েছিলেন, ওষুধ দিলেই আমাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারবে? আমাকে মরতে দেবে না?
এভাবেই চলছিল। ইতোমধ্যে পোস্তগোলা বালুর মাঠের ওয়াজ মাহফিলের তারিখ এসে গেলো। এই মাহফিলটি ঢাকার অন্যতম বড় জলসা। প্রতি বছর হুজুর এখানে প্রধান অতিথি হয়ে থাকেন। লক্ষ লক্ষ মানুষ এতে যোগদান করেন। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই উক্ত মাহফিলে ১৭ ই ডিসেম্বর হুজুর আবেগ প্রবণভাবে উচ্চৈ:স্বরে ওয়াজ করেন। পরদিন ১৮ ই ডিসেম্বর থেকে তাঁর অবস্থার কিছুটা অবনতি হয়। পায়ের নিচের দিকে বহুবছর ধরেই রস জমতো। নিয়মিত ওষুধ খেয়ে নিয়ন্ত্রণে রাখা হতো। কিন্তু ১৮ ই ডিসেম্বর হাতেও রস দেখা গেলো। ডিসেম্বরের ১৮ তারিখ দিন শেষে যে রাত এলো সে রাতে হুজুরের খুক খুক কাশি শুরু হলো। শুতে চেষ্টা করতেই কাশি বাড়ছিল। ফলে সারা রাত প্রায় বসেই কাটিয়ে দিলেন। সকলেই স্বাভাবিকভাবেই উদ্বিগ্ন।
ডিসেম্বরের ঊনিশ তারিখ ভোরে নূরু ভাই ছটফট করছেন, কী যে হবে, কী যে করি, কাকে ডাকি, কাকে বলি এ ধরনের অস্থিরতা নিয়ে। ভোরেই মোহাম্মদপুর থেকে তারিক ভাই এসে বললেন, হুজুরকে এই মুহূর্তে হাসপাতালে নেয়া ছাড়া আমাদের কাছে কোনো পথ খোলা নেই। কিন্তু মুশকিল হলো, হুজুরকে রাজি করানো রীতিমতো অসম্ভব। ঠিক হলো তারিক ভাই হুজুরকে বুঝিয়ে বলবেন। সেজন্য হুজুরের শোবার ঘরের উদ্দেশ্যে রওনা হতেই দেখা গেলো হুজুর ধীরে ধীরে বাইরে আসছেন। এসে মার্কাজ অফিসের বারান্দার শেষ প্রান্তে রোদে চেয়ারে বসলেন। প্রায় তখনই হুজুরের মেজ ভাই অর্থাৎ সকলের কাছে মেঝ হুজুর বলে পরিচিত হযরত মাওলানা আবু ইব্রাহিম মো. ওবায়দুল্লাহ সিদ্দিকী, যিনি হুজুরকে দেখবার উদ্দেশ্যে কয়েকদিন পূর্বে এসেছেন, তিনিও হুজুরের কাছে গেলেন। ভাইকে দেখে হুজুর চেয়ারে বসতে বললেন, কিন্তু তিনি কখনো বড় ভাই ও তাঁর পীর এর সামনে বসতে চাইতেন না, এ বারেও দাঁড়িয়েই রইলেন। হুজুরের বারংবার অনুরোধে খুব বিনয়ের সঙ্গে বসতেই হলো। তখন হুজুর আবেগপ্রবণ হয়ে তাঁর মেজ ভাইকে কিছু কথা বলেছিলেন। সবকিছু স্পষ্ট বুঝা যাচ্ছিল না। তবে বিষয়গুলো যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ তা অনুমান করতে কারো কষ্ট হয়নি। এক বার বোঝা গেলো, হুজুর বললেন, বাচ্চারা, কচিরা রইলো। মেজ হুজুর তখন বলেছিলেন, দাদা হুজুর যা কিছু করে গেছেন, আব্বা হুজুর তার চেয়ে অনেক বাড়িয়েছেন, আব্বা হুজুর যা রেখে গেছেন, আপনি তার চেয়েও অনেক বাড়িয়েছেন। আপনি দোয়া করুন, ছেলেরাও আল্লাহ চাহে তো অনেক কাজ করবে ইনশা-আল্লাহ। বলতে বলতে মেজ হুজুরের কণ্ঠ ধরে আসছিলো। ইতোমধ্যে হুজুরের একমাত্র পৌত্র অর্থাৎ মেশকাত সাহেবের ছেলে আবরার দাদার কাছে এলো। তাকে আদর করলেন। একজন মুরীদ এসে তাঁকে বায়োকেমিক ওষুধ খাওয়ার অনুরোধ করাতে হুজুর খেলেন, কিন্তু পরক্ষণেই বললেন, বাবাজি এতে কি কোনো কাজ হয়? এরই ফাঁকে তারিক ভাই মেজ হুজুরের উপস্থিতিতে হুজুরকে বললেন, বর্তমান অবস্থায় হাসপাতালে না গেলে বাসাতে অবশ্যই একটি ইঞ্জেকশন নিতে হবে যেন শরীরে যে রস জমছে তা নেমে যায়, এতে কাশিটাও কমে যাবে, সুস্থ লাগবে ইনশাআল্লাহ। কিন্তু হুজুর তখন রাজি হন নাই। কিছুক্ষণ পরে সেখানে এসে পৌঁছলেন হুজুরের বড় সাহেবজাদা মেশকাত সাহেব। তাঁকে ইশারা এবং সংক্ষিপ্ত কথায় হুজুর কিছু বলার পরে তিনি নিশ্চিত হবার জন্য জিজ্ঞাসা করলেন, হজ্জে যাবার ব্যবস্থা নিষেধ করে দিবো? হুজুর হ্যাঁ বলাতে তিনি পুনরায় জিজ্ঞাসা করেন, কারা যাবে না? হুজুর যা বলেন তার সারমর্ম হচ্ছে হুজুর এবং তাঁর পরিবারের সকলেই থেকে যাবেন, কেবল তাঁর চতুর্থ জামাতা সপরিবারে এবং অন্যান্য সকল মুরীদগণ হজ্জে যাবেন। হযরত মেশকাত হুজুর দ্রুত হজ্জ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে ফোন করে সে বিষয়ে নিশ্চিত করেন এবং হুজুরকে তা অবহিত করেন।
এর কিছুক্ষণ পরে তিনি ঘরে যান। সারাদিন ইঞ্জেকশন না গ্রহণ করায় সকলে অনিশ্চয়তার মধ্যে বেশ অস্থিরতায় কাটালেন। সন্ধ্যার কিছু পূর্বে হুজুর ইঞ্জেকশন নিতে রাজি হলেন। দ্রুত তাঁকে দুহাতে দুটি ইঞ্জেকশন দেওয়া হলো। কিছুক্ষণ পর পেশাবের বেগ হওয়াতে সকলে স্বস্তির নি:শ্বাস ফেললেন যে, ধীরে ধীরে অবস্থার উন্নতি হবে ইনশাআল্লাহ। রাত বারোটার নাগাদ হুজুর কিছুটা সুস্থ হলেন। তখন আরো একটি ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়, কিন্তু রাতের পরবর্তী অংশে আশানুরূপ উন্নতি হয় নাই। সকালে অর্থাৎ ২০ ডিসেম্বর সকালে হুজুরকে আরো একটি ইঞ্জেকশন দেওয়া হলো। বলা বাহুল্য এই চিকিৎসার ব্যবস্থাপত্র দেন হুজুরের প্রিয়ভাজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, ডায়াবেটিক হাসপাতালের মিরপুর শাখার ডিরেক্টর, ডক্টর আব্দুল ওয়াদুদ। হুজুরের প্রতি তাঁর দরদ অপরিসীম। তাঁর ব্যবস্থাপনায় ইত:পূর্বে হুজুরকে বারডেমে নেওয়া হয়েছিলো এবং কয়েক বছর পূর্বে মাদ্রাজেও নেওয়া হয়েছিল। যাই হোক, ২০ শে ডিসেম্বর সকালে ইঞ্জেকশন দেবার পর নূরু ভাই হুজুরকে বলেন যে, বাইরে সুন্দর রোদ উঠেছে, একটু বসলে ভালো লাগবে। হুজুর ধীরে ধীরে হেঁটে বাইরে এসে চেয়ারে বসলেন। এর পরের ঘটনা খুব দ্রুত ঘটে যায়। নূরু ভাই এর জবানিতে শুনা যাক
হুজুর বাইরের রোদে চেয়ারে বসার পর, আমার কেমন যেন মনে টান দিলো ঘরটা সাফ করি, কারণ গত রাতে কয়েকবার মেঝেতে পেশাব পড়ে গেছে। ফিনাইল এনে সমস্ত ঘর আমি ধুয়ে মুছে পাক সাফ করে দিলাম। এতে প্রায় দুই ঘণ্টা লাগে। সময় যখন প্রায় সাড়ে দশটা তখনও হুজুর বাইরে বসে। ইতোমধ্যে জাতীয় শরীআহ কাউন্সিলের মিটিং এর উদ্দেশ্যে আগত আলেমগণের অনেকে হুজুরের কাছে এসে তাঁর সঙ্গে মোসাফাহা করেন এবং হুজুরও প্রত্যেকবার মোসাফাহাকারীর চেহারার দিকে তাকাচ্ছিলেন। সাড়ে দশটার পর পরই হুজুর চেয়ার থেকে উঠতে চেষ্টা করলেন, কিন্তু পারলেন না। খাদেম আবুল হাশেম বলেন : চেয়ারের হাতলে ভর দিয়ে হুজুর নিজেই উঠতেন এবং উঠবার সময় কখনো ধরতে দিতেন না, কিন্তু ঐ দিন উঠতে না-পেরে ধরতে দিলেন। আবুল হাশেম একদিকে এবং হারুন ভাই একদিকে দাঁড়িয়ে ধরে হুজুরকে বসা থেকে উঠতে সাহায্য করেন এবং ধীরে ধীরে ঘরে নিয়ে আসেন। হুজুর ঘরে ঢুকে খাটের মাঝখানে বসে পা ঝুলিয়ে দেন। পশ্চিম দিক মুখ করে বসে ছিলেন। ইশারায় খাদেমকে কিছু দিতে বললেন। জনাব রজব আলী জিজ্ঞেস করলেন খাবার আনবো? ইশারায় নিষেধ করলেন। আবুল হাশেম একটা ওষুধের বোতল দেখালো এবং জিজ্ঞেস করলো এটা দেবো? সম্মতি জানালেন। রজব আলী বললেন, ও হাশেম খালি পেটে ওষুধ দিও না। এতে হুজুর রাগ করে রজব আলীকে থামতে বলেন এবং আবুল হাশেম ওষুধ দেন। হুজুর ওষুধ খেয়ে এক মগ পানিও খেয়েছিলেন, কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই বমি হয়ে গেলো। হুজুর তখন যেন সোজা হয়ে বসতেও পারছিলেন না। আবুল হাশেম তৎক্ষনাৎ হুজুরকে ধরে ফেলেন এবং পাশে দাঁড়ানো হারুন ভাই হুজুরের দুই পা ধরে তাঁকে শোয়াতে সাহায্য করেন। আমি (নূরু ভাই) তখন হাত ধুয়ে ঘরে ঢুকতে যাচ্ছি এমন সময় কানে আওয়াজ পেলাম আল্লাহ্। ঘরে ঢুকে বুঝলাম হুজুর আরো দুবার বললেন আল্লাহ, আল্লাহ্। কিন্তু কোনো আওয়াজ হয় নাই, কেবল জিহ্বার নাড়াচাড়া দেখে তা বুঝতে পারলাম, কারণ জীবনে এভাবে হুজুরকে আল্লাহ বলতে আমি বহুবার দেখেছি । ইতোমধ্যে বড় ভাইজান (হযরত মেশকাত হুজুর) এসে গেছেন। সকলে দুয়া কালাম পড়তে শুরু করলেন। উপস্থিত মাওলানা রইসুল ইসলাম জাহাঙ্গীর সাহেব সূরা ইয়াসিন তিলাওয়াত করতে থাকলেন। খাদেম রিফাতও তখন হুজুরের কাছে উপস্থিত ছিল। হুজুর নিশ্চল হয়ে গেলেন। সকলে দ্রুত হুজুরকে হাসপাতালে নেবার জন্য ব্যস্ত হলাম। প্রথমে মিরপুর ডায়াবেটিক হাসপাতালে ডা. আব্দুল ওয়াদুদ সাহেবের কাছে নিতেই তিনি সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নিতে বললেন। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে নেয়া হলে কর্তব্যরত ডাক্তার সাহেব পরীক্ষা করে জানালেন হুজুর ইন্তেকাল করেছেন।
আমাদের প্রাণপ্রিয় পীর ও মুর্শিদ, লক্ষ লক্ষ মুসলমানের রাহবার, আমীরুল ইত্তেহাদ, আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন পীর, শিরককারী ও বিদআতীদের আতঙ্ক, শেরে ফুরফুরা হযরত মাও. আবুল আনসার মো. আব্দুল কাহ্হার সিদ্দিকী সাহেব মাওলার সান্নিধ্যে চলে গেছেন। ইন্নাল্লিাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তখন সময় সকাল সাড়ে এগারটা।
পরে দারুস্ সালামে ফিরে এলেন সকলে। চারদিকে শোকের মাতম পড়ে গেল। অল্প সময়ের মাঝেই টেলিফোনের মাধ্যমে সারা দেশে খবর পৌঁছে গেল। দলমত নির্বিশেষে হাজার হাজার শোকার্ত মানুষের ঢল নামলো দারুস্ সালাম অভিমুখে।
