গদ্দিনিশীন রাহবারে ফুরফুরা

মা বাবার দুআ

হযরত পীর সাহেব হুজুর (রহ.) তাঁর আব্বা-আম্মার প্রাণ খোলা দুআ পেয়েছিলেন। তাঁর আব্বা হযরত মাও, আব্দুল হাই সিদ্দিকী (রা.) প্রায় জলছাতেই ছেলের জন্য দুআ করতেন, মানুষের কাছে দুআ চাইতেন। তিনি কাঁদতেন আর বলতেন আল্লাহ তার হায়াত কিসমত বড় করুন। পাকশীতে তিনি বললেন আমি তোমাকে আল্লাহর সোপর্দ করলাম। ছেলেকে তার মা রাগ করে কিছু বললে তিনি বলতেন আমার মরা হাজা ছেলে, খবরদার বদ দুআ করোনা। হজ্জ্বের সফরে রাসূলেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের দরবারে তিনি ছেলেকে ইলমে লাদুনীর সবকে বসিয়ে খাসভাবে দুআ করেছিলেন। তিনি যখন ছেলের ওয়াজ শুনতেন তখন আবেগ আতিশয্যে তাঁর চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়তো। তিনি ছেলের প্রশংসা করে বলতেন আনসার মিয়ার দিলটা ভাল। তিনি ছেলেকে অত্যন্ত স্নেহ করতেন। ছেলের দাড়িতে হাত দিয়ে আদর করেছেন। চুল লম্বা হলে চুল ধরে নেরে বলতেন, পীর সাহেবের ছেলের মাথায় এত বড় লম্বা চুল কেন? ছেলের ঘরে পর পর চারটা মেয়ে হওয়ায় তিনি তাকে সান্তনা দিয়ে বললেন মেয়ে হওয়া সুন্নতগো বাবা। তোমার দাদারও অনেক মেয়ে ছিল।

দাদার মত ওলি

বড় হুজুর হযরত আব্দুল হাই সিদ্দিকী (রহ.)-এর আহলিয়া কয়েকটি ছেলে মারা যাওয়ায় কাঁদছিলেন। বড় হুজুর (রহ.) তাকে সান্তনা দিয়ে বললেন, কচির মা! তুমি কেঁদোনি। আমি দুআ করছি আল্লাহপাক তোমাকে এমন ছেলে দিন, যে তার দাদা তোমার শ্বশুরের মত ওলি হয়ে দুনিয়ায় আসবে। এর কিছুকাল পরেই মরহুম হুজুর জন্মগ্রহণ করেন। হযরত বড় হুজুর আব্দুল হাই সিদ্দিকী (রহ.) একদিন স্বপ্ন দেখেন যে, মুজাদ্দেদে জামান আবুবকর (রহ.) পালকি চড়ে যাচ্ছেন আর বলছেন, তোমার ছেলে দেখতে গিয়েছিলাম গো বাবা। উল্লেখ্য তখন পর্যন্ত বড় হুজুর (রহ.) এর কোন পুত্র সন্তান জীবিত থাকতেন না। শৈশবেই তাঁর ছয় জন সন্তান মারা যান। এমতাবস্থায় এই স্বপ্ন অত্যন্ত গুরুত্ববহ। এই ঘটনার পরই বড় হুজুর (রহ.)-এর ঘরে জন্মগ্রহণ করেন মরহুম পীর হযরত মাওলানা আবুল আনসার মোঃ আবদুল কাহহার সিদ্দিকী সাহেব। তাঁর চেহারা ও দৈহিক গড়ন হুবহু মুজাদ্দেদে জামানের অনুরূপ। হযরত বড় হুজুর (রহ.) তাঁর জীবনের শেষ হজ্জে আরাফাতের ময়দানে জবলে রহমত পাহাড়ের উপর দাঁড়িয়ে মাগরেববাদ বহু ভক্ত, মুরিদ এবং দেশ বিদেশের হাজিদের সামনে ফুরফুরার মরহুম হুজুর অর্থাৎ তার বড় ছেলে মাওলানা আবুল আনসার মোঃ আবদুল কাহ্হার সিদ্দিকী সাহেবের বুকে হাত রেখে বলেছিলেন, আমি দোওয়া করি, আল্লাহ তোমাকে তোমার দাদা মুজাদ্দেদে জামান (রহ.)-এর মত ওলি করে দিন। এই ঘটনা শোনাতে গিয়ে বিনয়ের সঙ্গে ফুরফুরার মরহুম পীর সাহেব হুজুর বলতেন, দাদার মত ওলি তো আর হতে পারবো না, তাঁর কাজটুকু করে যাই; ঐ কাজের ওলি আর কি। মাগুরার হাজি সাহেব নামে খ্যাত মুজাদ্দেদে জামানের প্রবীণ খলিফা খোন্দকার আব্দুল হামিদ (রহ.) বর্তমান পীর সাহেবকে কিশোর বয়সে দেখলেই বলে উঠতেন, আমার পীর। আর কাঁদতে থাকতেন। কারণ তাঁর সঙ্গে হাজি সাহেবের পীর মুজাদ্দেদে জামান (রহ.) এর চেহারা, আদল, আদব, আখলাকের ছিল হুবহু মিল। পশ্চিমবঙ্গের কুরআনী খেদমতের অগ্রদূত উস্তাদুল হুফ্ফাজ হযরত আব্দুল লতিফ (রহ.) যিনি বড় হাফেজ সাহেব নামে সুপরিচিত ছিলেন, মরহুম পীর সাহেবকে কোলে করে আদর করে বলতেন, আপনি আমার পীর, আমার ইসলাম, আপনি আমার ঈমান। মুজাদ্দেদে জামান (রহ.) এর বিশিষ্ট খলিফা প্রখ্যাত আলেম হযরত মাওলানা দরগাহপুরী (রহ.) একবার মদীনা শরীফে পীর সাহেব হুজুরকে আদর করে বললেন, তুমি তো তোমার দাদার মত দেখতে। মুজাদ্দেদে জামান হযরত মাওলানা আবুবকর সিদ্দিকী (রহ.) এর বিশিষ্ট খলিফা হযরত মাওলানা হাতেম আলী (রহ.) শৈলপুর মাদ্রাসার এক মাহফিলে পীর সাহেব হুজুরকে স্টেজে নিয়ে গিয়ে বললেন, আমার পীরকে দেখতে হলে এনাকে দেখুন।

পাশের বেডের সঙ্গী

মহব্বত অনেক রকম আছে। ভালোবাসা বহু ধরনের হয়। স্বার্থের ভালবাসা, বন্ধুত্বের ভালবাসা, সামাজিকতার ভালবাসা, সন্তানের ভালবাসা, মায়ের ভালোবাসা। সন্তানের জন্য মাতা-পিতার ভালবাসা, বাপ-মায়ের জন্য সন্তানের ভালবাসা নিঃস্বার্থ ও অকৃত্রিম। পিতা-মাতা সন্তানকে যত ভালবাসে তার সঙ্গে অন্য কারো ভালবাসার তুলনা হতে পারে না। কথায় বলে মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি! বাস্তবে তা কখনও হতে পারে না। কিছু মানুষ বলে থাকেন, মুজাদ্দেদে জামান দাদা হুজুর (রহ.)-এর মতবাদ এই ছিল, ঐ ছিলো, তিনি ওটা করতেন, এটা করতেন। দাদার নীতি, দাদার নীতি, দাদা দাদা করে একেবারে অস্থির। দাদার জন্য প্রেম আর ধরে না। মাসির দরদ আর কি! ভাবখানা যেন উনাদেরই দাদা, মরহুম পীর সাহেবের দাদা নন। দাদার মতবাদ কেবল তারাই যেন জানেন, ফুরফুরার মরহুম পীর সাহেব যেন কিছুই জানতেন না। অথচ মুজাদ্দেদে জামান (রহ.) হচ্ছেন ফুরফুরায় মরহুম পীর সাহেবের আপন দাদা। আর অবাক ব্যাপার এই যে, মোজাদ্দেদে জামান হযরত আবু বকর সিদ্দিকী (রহ.) তাঁর সমস্ত সম্পত্তি ও প্রতিষ্ঠানের মুতাওয়াল্লি নির্বাচন করেন মরহুম পীর সাহেবকে ইনার জন্মেরও প্রায় কুড়ি বছর পূর্বে। সেই ডীড বা দলিল আজো আছে। কেবল তাই নয় মুজাদ্দেদে জামান (রহ.)-এর দীর্ঘদিন কোন পুত্র সন্তান জন্ম হয়নি। সেই কারণে তিনি আল্লাহর কাবা ঘরের গেলাফ ধরে সন্তানের জন্য দোয়া চেয়ে যে সন্তান লাভ করেছিলেন তিনি হচ্ছেন মরহুম হুজুরের পিতা ফুরফুরার পূর্বতন পীর হযরত বড় হুজুর আব্দুল হাই সিদ্দিকী (রহ.)। মুজাদ্দেদে জামান (রহ.) নিজের তত্ত্বাবধানে তালিম তাওয়াজ্জুহ দিয়ে বড় হুজুরকে (রহ.) যোগ্য করে গড়ে তুলেছিলেন। তিনি বড় হুজুর (রহ.)-কে তাঁর স্থলাভিসিক্ত করে যান এবং সেই দায়িত্ব বড় হুজুর (রহ.) সুচারুরূপে প্রতিপালন করে গেছেন। একইভাবে বড় হুজুর (রহ.) এর বেশ কয়েকজন পুত্র সন্তান একে একে শৈশবে ইন্তেকাল করেন। আল্লাহর অশেষ দয়া যে পরবর্তীতে আল্লাহ তাঁকে এক পুত্র সন্তান দান করেন যিনি আদত, আখলাক, এমনকি আদলে অর্থাৎ দৈহিক গড়নে হুবহু মুজাদ্দেদে জামান (রহ.)-এর অনুরূপ। হযরত বড় হুজুর (রহ.) বলতেন, এই ছেলে আমার জায়গায় কাজ করবে বলেই না আল্লাহ একে আমার ঘরে পাঠিয়েছেন এবং সেই কারণে অতি যত্নের সঙ্গে বড় হুজুর (রহ.) তাঁর এই সন্তানকে তালিম তাওয়াজ্জুহ দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন। এতক্ষণ যার কথা লিখলাম এই সন্তানই হচ্ছেন হযরত আবুল আনসার মোহাম্মদ আব্দুল কাহহার সিদ্দিকী আল কুরাইশী। যিনি ছিলেন ফুরফুরার গদ্দীনশীন পীর। বিদায়ের আগে প্রায় এক লক্ষ মুরিদকে সামনে রেখে পাকশী ইসালে সওয়াব মাহফিলে মরহুম বড় হুজুর (রহ.) ঘোষণা করেছিলেন, আমার পিতা মোজাদ্দেদে জামান (রহ.) যেমন আমাকে তাঁর গদ্দীনশীন করে গড়ে তুলেছিলেন, আমিও তোমাদের বড় ভাই আবুল আনসারকে সেইভাবে তৈরি করে গেলাম। আমার অবর্তমানে সেই আমার জায়গায় কাজ করব। অর্থাৎ ফুরফুরার মরহুম পীর সাহেব কে, কোথা থেকে এসেছেন, কী দায়িত্ব নিয়ে ছিলেন, তাঁর সে দাযিত্ব কিভাবে তাঁর ঘাড়ে এলো সবই আমাদের কাছে স্পষ্ট পরিষ্কার হয়ে গেলো। আপনারা জানেন, খলিফা যারা হয়েছেন তাঁরাও ফুরফুরার পীর সাহেবের তালিম লাভ করেছেন। খেলাফত লাভের আগে তারা মুরিদ হয়ে জিকির আযকার করতেন। পীরের হুকুম প্রতিপালন করতেন। পিতার মতই সম্মান শ্রদ্ধা করতেন, ভালবাসতেন। তবে কথা হচ্ছে পিতার মতই ভালবাসা, পিতার ভালবাসা নয়। এই দুটো হুবহু এক হতে পারে না। খলিফা যারা হয়েছেন তারা ফুরফুরায় জন্মও নেননি, চিরদিন তাঁরা ফুরফুরায় থাকেননি, কিছুদিন কি কয়েক বছর পীরের সোহবত লাভ করেছেন, অতঃপর খেলাফত পেয়ে নিজের গ্রাম বা শহরে এসে খলিফা হিসেবে হেদায়েতের কাজ শুরু করেছেন। তাদের নিজস্ব মার্কাজ বা দরবার গড়ে তুলেছেন। পক্ষান্তরে ফুরফুরার বড় হুজুর পীর সাহেব (রহ.) এর যিনি আওলাদ তিনিও তাঁকে ভালবাসতেন। সেই ভালবাসা কেবল পীরের প্রতি মুরীদের ভালবাসার মত নয়, নিজের পিতার প্রতি সন্তানের ভালবাসা। উপরন্ত তিনি ঘরের মানুষ। উঠতে বসতে চলতে ফিরতে সর্ব সময়ের সঙ্গী বা অনুসারি বা অনুগামী। সুতরাং কেবল মাহফিলে নয় বা মজলিশে নয়, ঘরোয়া পরিবেশেও তিনি পীরের সঙ্গ পেয়েছেন। কারণ তিনি পীরের পাশের বেডের সঙ্গী। এখন কথা হচ্ছে দূরের মানুষ বেশি বুঝবে না কাছের মানুষ বেশি বুঝবে ? কার সাক্ষ্য বেশি গ্রহণযোগ্য হবে ? এ বিষয়ে আইনের ধারা আছে। যিনি ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী বা ডাইরেক্ট এভিডেন্স (উরৎবপঃ বারফবহপব) তার সাক্ষ্যের দাম বেশি। পক্ষান্তরে কোন ঘটনা যিনি দূর থেকে দেখেন বা শুনে বলেন (ঐবধৎ ংধু বারফবহপব) তার সাক্ষ্য দুর্বল ও ক্ষেত্র বিশেষে অগ্রহণযোগ্য। সুতরাং অনেক খলিফা আছেন যারা বছরে একবার বার্ষিক ইসালে সওয়াব মাহফিলে পীরের কাছে যান ও সোহবত এখতিয়ার করেন। সারা বছর তারা এ পরিবেশে থাকেন না, তাঁরা মুরিদ হওয়ার আগে ও পরে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া শিখেছেন, তাদের পারিবারিক পরিবেশও বিভিন্ন ধারার। পক্ষান্তরে মরহুম বড় হুজুর পীর সাহেব যেমন তাঁর পিতার প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে শিক্ষা তালিম ও তাওয়াজ্জুহ লাভ করতে করতে বেড়ে উঠেছেন, তেমনি তাঁর ছেলে ফুরফুরার মরহুম পীর সাহেবও তাঁর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে শিক্ষা লাভ করেছেন, বেড়ে উঠেছেন, তালিম ও তাওয়াজ্জুহ পেয়েছেন; সুতরাং স্বাভাবিকভাবেই ঘনিষ্ঠ সান্নিধ্য ও গাইডেন্সের কারণে এদের সাক্ষ্য ডাইরেক্ট এভিডেন্সের মতই নির্দ্বিধায় গ্রহণযোগ্য। এই কারণে আমি বলতে চাই, যারা বলেন দাদার মতবাদ ওমুক ছিল তমুক ছিল তাঁরা যতই দাদার দরদী হোন না কেন, আপন সন্তানের দরদ হবে নিঃস্বার্থ ও নিরঙ্কুশ এবং প্রত্যক্ষ সাক্ষ্যের মতোই যে কোনো খলিফার চাইতে বাপদাদার মতবাদের ব্যাপারে এই ছেলের সাক্ষ্য আইনেরও দৃষ্টিতে বেশি গ্রহণযোগ্য। সুতরাং ফুরফুরার মরহুম পীর সাহেব (রহ.) তাঁর বাপদাদার মতবাদকে প্রত্যক্ষভাবে বুঝে ছিলেন ও শিখে ছিলেন। কেবল তাই নয়, তিনিই এই মতবাদের ধারক ও বাহক ছিলেন। ফুরফুরায় তাঁর আরো তিনজন আপন ভাই ও প্রায় পঁয়ত্রিশজন চাচাত ভাই ছিলেন ও এখনও অনেকেই আছেন, যারা অনেকেই মুত্তাকী, ভালো ওয়ায়েজ্বিন, কেউ কেউ বড় মাপের আলেম এবং অনেকেই পীর হিসেবে কাজ করেছেন ও এখনও করছেন। তথাপি ফুরফুরার গদ্দীনশীন পীর ছিলেন একমাত্র ইনি এবং মুজাদ্দেদে জামান (রহ.)-এর সম্পত্তির মুতাওয়াল্লি একমাত্র মরহুম পীর সাহেব মাওলানা আবুল আনসার মোহাম্মদ আব্দুল কাহহার সিদ্দিকী আল কুরাইশী। এই পদ ও সম্মান তাঁকে স্বয়ং মুজাদ্দেদে জামান (রহ.) তাঁর জন্মেরও প্রায় কুড়ি বছর আগে লিখিত উইল-এর মাধ্যমে দিয়ে গিয়েছিলেন। বস্তুত আল্লাহ যাকে সম্মান দেন এভাবেই তিনি তা লাভ করেন।