গদ্দিনিশীন রাহবারে ফুরফুরা
জাতীয় পর্যায়ে অ্যাওয়ার্ড বা পদক প্রাপ্তি
ভন্ড পীর-ফকীরদের দরবারে ওরশ, ওয়াজ, ইসালে সওয়াব ইত্যাদির নামে গান-বাজনা ইত্যাদির জলসা বসে। সে সমস্ত জলসায় নারীরাও বেপর্দাভাবে যাতায়াত করে। কবর সিজদা, পীর সিজদা, পীর-মুরীদি ও মারেফাতের নামে ধোঁকা দেয়া, শিরক, বিদ’আত, সুন্নত বিরোধী কর্মকান্ডে সারা দেশ ভরে গিয়েছে। ফলে মানুষের দীন, ঈমান, আমল সব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ফুরফুরার মরহুম পীর সাহেব (রহ.) এসকল বাতিলপন্থীর প্রতিরোধ করে এদের কর্ম ও আকীদা-বিশ্বাসের অসারতা ও ভয়াবহতা মানুষের সামনে তুলে ধরে এদের খপ্পর থেকে সরল প্রান মুসলমানদের ঈমান রক্ষার জন্য আজীবন প্রানপন চেষ্টা চালিয়ে গেছেন। নিজের জানের ঝুঁকি নিয়ে বাতিলপন্থীদের এলাকায় উপস্থিত হয়ে তিনি নির্র্ভীকভাবে মানুষদেরকে হক আর বাতিলের পার্থক্য বুঝিয়ে দিতেন। তাদেরকে এসব শরীয়ত বিরোধ কাজ হতে ফিরে আসার আহবান জানাতেন। বিদআতকে ছেড়ে দিয়ে বিশুদ্ধ হাদীসের উপর আমল করতে মানুষকে উদ্বুদ্ধ করতেন। কাদেরিয়া, চিশতীয়া, নকশবন্দীয়া, মোজাদ্দেদিয়া তরিকার নামে যেসব জায়েয আমল-ওযিফা সমাজে প্রচলিত তিনি সেগুলোকে জায়েয বলে জানতেন, কিন্তু রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে সরাসরি সহীহ হাদীসের মাধ্যমে যেসব আমল ওযিফা বর্ণিত হয়েছে সেগুলোর উপর আমল করাকে উত্তম মনে করতেন এবং এ ব্যাপারে সবাইকে সব সময় উদ্বুদ্ধ করতেন। যখনই কোনো বিষয়কে সুন্নত বা নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের প্রিয় বা পছন্দনীয় বলে জানতে পারতেন তখনই তা বিনা দ্বিধায় মেনে নিতেন ও সবাইকে সে বিষয়ে উদ্বুদ্ধ করতেন। জায়েয-নাজায়েয-এর তুলনায় সুন্নাত না খেলাফে সুন্নাত তার উপরই তিনি বেশি গুরুত্ব দিতেন। জায়েয অথচ খেলাফে সুন্নাত এমন বিষয়ও তিনি এড়িয়ে চলতেন। বিদআতের বিসর্জন, সুন্নতের পুনরুজ্জীবন এবং শিরক বিদআত মুক্ত কুরআনী সমাজ গড়ায় বিশেষ অবদানের জন্য কুরআন শিক্ষা সোসাইটি তাঁকে জাতীয় পর্যায়ে ২০০৩ ঈসায়ীতে বিশেষ অ্যাওয়ার্ড বা পদক প্রদান করে।
শিরক হতে বাঁচার জন্য প্রয়োজন হলে জীবন উৎসর্গ করতে হুজুরে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হুকুম করেছেন
তোমাদের যদি কাটিয়া বা পুড়িয়া ফেলা হয় অথবা ফাঁসি দেওয়া হয়, তথাপি আল্লাহর সহিত কখনও শিরক করিবে না।
অথচ বড়ই আফসোসের বিষয়-ঈমান রক্ষার জন্যে, শিরক থেকে বেঁচে থাকার জন্যে কোন ত্যাগ স্বীকারতো দূরে থাক, নিজের ইচ্ছায় বা অগোচরে আমরা এমন সব আকীদা-বিশ্বাস পোষণ করছি বা এমন সব কাজ করে বসছি যা সরাসরি শিরকের পর্যায়ভুক্ত। আমাদের মধ্যে কুফরী আকীদা, শেরেকী বিশ্বাস, তাওহীদ বিরোধী শিরক বিদআত কাজ এমনভাবে বিস্তার লাভ করেছে যে, নিজেদের অজান্তেই আমরা ঈমান হারাতে বসেছি, অথচ ভাবছি যে, আমি মুসলমান।
মুসলমানদের এই ঘোর দুর্দিনে মুসলিম সমাজকে শিরক বিদআত মুক্ত করে তাদের ঈমান ও আমল হেফাজতের জন্যে বহুমুখী কর্মসূচী নিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন ফুরফুরার মরহুম পীর সাহেব হুজুর হযরত মাওলানা আবুল আনসার মোঃ আব্দুল কাহ্হার সিদ্দিকী সাহেব। নিজের আরামকে হারাম করে অসুস্থ শরীর নিয়ে বৃদ্ধ বয়সে বাংলা-ভারতের আনাচে কানাচে ঘুরে ঘুরে তাকরীরি (বক্তৃতা) ও তাহরীরি (লেখনি) ইশাআতের মাধ্যমে তিনি মুসলমানদেরকে শিরক সম্পর্কে সচেতন করে তুলেছেন। সহজ সরল যুক্তি দিয়ে তিনি মুসলিম সমাজে প্রচলিত শিরকী বিদআতী আকীদা-বিশ্বাস ও কাজগুলোর অসারতা ও জঘন্যতা প্রমাণ করে মুসলমানদের এগুলো পরিত্যাগ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তাঁর সার্বক্ষণিক চিন্তা ছিল একটাই, কি করে মুসলিম সমাজকে যাবতীয় শিরক হতে মুক্ত করে প্রকৃত তাওহীদের রঙে রাঙানো যায়।
শুধু ওয়াজ, বক্তৃতা, মৌখিক প্রচার বা লেখনির মাধ্যমে মানুষকে উপদেশ দিয়ে, শিরক-বিদআত পরিত্যাগ করে সৎ পথে আসার আহ্বান জানিয়েই তিনি বসে থাকেননি বরং ব্যক্তিগত, পারিবারিক ও সামাজিক জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে, তার প্রতিটি আচরণে, প্রতিটি কাজে আমরা দেখেছি এর বাস্তব প্রতিফলন।
কেউ বিপদে পড়ে দোয়া চাইতে এলে হুজুর বলতেন, বাবা বিপদ মুক্তি আল্লাহর হাতে, আমার কোন ক্ষমতা নেই। আপনি সালাতুল হাজত পড়ে আল্লাহর কাছে মুক্তি চান, আল্লাহপাকই ইনশা-আল্লাহ মুক্ত করে দিবেন। আমি দোয়া করছি। কেউ জোর হাতে সামনে দাঁড়ালে বা বসলে তিনি রেগে গিয়ে তাকে স্বাভাবিকভাবে বসতে বলে বলতেন, আমি ঠাকুর নাকি যে এভাবে বসেছেন?
