গদ্দিনিশীন রাহবারে ফুরফুরা

ফুরফুরার হুজুর তখন বলিয়াছিলেন

শেরকা মুকাবিলা মে গীধাড় জিত সাখতা হ্যায়। এহ তুম লোগোঁকো দেখলানে কে লিয়ে রাখাহু। ইলেকশেনকা বাত তুম লোগমে হোগা কেহ হাম লোগ সাব কুছ কিয়ে হ্যাঁয়। তুমলোগোকো ফাকিরী দেখলানেকে লিয়ে এতনাহি বাকী রাখতাহু। অর্থাৎ আমি বাঘের মুকাবিলায় (নওশের আলীর প্রতিপক্ষ) শিয়ালতুল্য ম্যারেজ রেজিস্টারকে দাঁড় করিয়েছি তোমাদিগকে ফকিরী দেখাইবার জন্য। এই ম্যারেজ রেজিস্টারই ইলেকশানে আল্লাহ চাহে জিতবে। কারণ আমি বুঝতে পারছি ইলেকশান হয়ে গেলে তোমরা বলিবে, হুজুর আমরাইতো সব কিছু করিলাম। তোমাদের জ্ঞানে চক্কর লাগিয়ে দিবার জন্য বাঘের সঙ্গে শিয়াল দাঁড় করিয়েছি। তোমরা শেষে দেখবে এই শিয়ালই বাঘকে হার মানিয়েছে। ইলেকশন শেষে দেখা গেল-নওশের আলীর জামানতের টাকা পর্যন্ত বাজেয়াপ্ত হয়ে গেছে। তাঁর বাক্স খালি, ভোট নাই। জ্বিন্নাহ সাহেব নির্বাচনের আগে ১৯৪৬ সালের ফেব্রুয়ারির শেষের দিকে কলকাতায় আসেন। সেই সময় তিনি ফুরফুরার পীর সাহেবের সঙ্গে দেখা সাক্ষাত করেন। মুসলমানদের মহা পরীক্ষার দিনে যখন বড় বড় আলেমরা পর্যন্ত অখন্ড ভারতের প্রচারণায় ব্যক্তি স্বার্থে মুসলমানদের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিয়ে কংগ্রেসের সাথে একাত্ত্বতা ঘোষণা করেছিলেন, ঠিক সেই সময় ফুরফুরার পীর সাহেব কংগ্রেসের ফাঁদে পা না দিয়ে মুসলমানদের এই সংগ্রামে মুসলিম লীগকে সমর্থন করায় তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এবং দোয়া গ্রহণ করেন। ফুরাফুরার পীর সাহেব কর্তৃক প্রস্তুতকৃত প্রাদেশিক নির্বাচনের তালিকায় যাহাদের নাম ছিল তাঁহারা প্রত্যেকেই জয়লাভ করিয়াছিলেন। ১১৯টি মুসলিম আসনের মধ্যে ফুরফুরার পীর সাহেব কর্তৃক অনুমোদিত ১১৩টি আসনে ১১৩ জনই জয়লাভ করেন। ৬টি আসনে তৎকালীন মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশিম সাহেবের (বর্ধমান) মনোনীত প্রার্থী ছিলেন। ফুরফুরার পীর সাহেবের সঙ্গে সামান্যতম বেয়াদবী করার কারণে ঐ ৬টি আসনে আপত্তি হয় এবং পরবর্তীকালে পীর সাহেবের প্রার্থীগণ ঐ ৬টি আসনেও জয়লাভ করেন। অর্থাৎ হযরত পীর সাহেব কর্তৃক (বাংলা) প্রাদেশিক আইন সভায় মনোনীত প্রার্থীরা সকলেই একে একে জয়লাভ করেন। নির্বাচনের দ্বারা মুসলিম লীগ ভারতীয় মুসলমানদের একমাত্র প্রতিনিধিত্বকারী নেতৃত্বস্থানীয় ও ক্ষমতাসম্পন্ন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান তা সত্য বলিয়া প্রমাণিত হয়। মুসলিম লীগের পাকিস্তান দাবীর প্রতি ভারতীয় মুসলমানদের সমর্থন আছে নির্বাচনের রায়ে ইহাও প্রমাণ হইয়া যায়। কংগ্রেস নেতাগণ দাবী করিয়াছিলেন যে, কংগ্রেস হিন্দু-মুসলমান সকল সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্বকারী প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এই নির্বাচনের পর মুসলমানদের পক্ষে প্রতিনিধিত্ব করার দাবী নস্যাৎ হইয়া যায় এবং পাকিস্তান দাবী প্রকট হইয়া উঠে। লর্ড এটলীর শ্রমিক সরকারের নির্দেশে ভারতে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এই নির্বাচনে ভারতের বিভিন্ন দলের প্রতিনিধিত্বের দাবীর পরীক্ষা হয়। কংগ্রেস অখন্ড ভারতের আদর্শে এবং মুসলিম লীগ পাকিস্তান দাবীর ভিত্তিতে প্রতিদ্বন্দীতা করে। মুসলিম লীগ প্রায় এক চেটিয়া মুসলমান আসনগুলিদখল করিয়া ভারতীয় মুসলমানদের রাজনৈতিক জীবনের প্রতিনিধিত্ব করার দাবী সামঞ্জস্য বিধান করিতে প্রয়াস পায় এবং ১৯৪৬ সালের ১৯শে ফেব্রুয়ারী বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী এটলীর ঘোষণা মতে ভারতে একটি বৃটিশ সরকারের মন্ত্রী মিশন প্রেরিত হয়। এই মন্ত্রী মিশন ভারতীয় নেতাদের সহিত বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করেন। ভারতের মুসলিম লীগ তাহাদিগকে জানায় যে, ভারতীয় মুসলমানেরা সংখ্যালঘু নয়। তাহারা একটি জাতি এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ তাহাদের জন্মগত অধিকার। কংগ্রেস সভাপতি মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ৩রা এপ্রিল মন্ত্রী মিশনের সহিত সাক্ষাত করেন। তিনি সর্ব ভারতীয় (অখন্ড ভারত) যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে মত প্রকাশ করেন। এইভাবে আলোচনার পর আলোচনা চলিতে থাকে। মুসলিম লীগকে পাকিস্তান দাবী হইতে সরিয়া পড়ার জন্য অর্থাৎ ভারত বিভাগের দাবী প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে কংগ্রেস নেতাগণ ১৯৪৭ সালে বাংলাদেশ ও পাঞ্জাব বিভাগের দাবী উত্থাপন করেন। কিন্তু জ্বিন্নাহ কিছুতেই পাকিস্তান দাবী হইতে সরিয়া পড়েন নাই। ইংরেজ ও কংগ্রেসের যৌথ ষড়যন্ত্রের মুখে জেহাদ করিয়া পাকিস্তান অর্জন করিতে হয়। ষড়যন্ত্রকারীদের এইরূপ ধারণা ছিল যে, খন্ডিত পাকিস্তান অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এবং প্রতিরক্ষার ব্যাপারে এত দুর্বল হইবে যে ইহার পক্ষে টিকিয়া থাকা অসম্ভব হইবে। কিন্তু আল্লাহপাকের অপার করুনা ১৯৪৭ সালের ১৫ই আগস্ট পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম হয়। ফুরফুরার পীর সাহেব যদি মাওলানা আবুল কালাম আজাদ ব্যক্তিবর্গের মতন কংগ্রেসের দাবীর সমর্থনে অখন্ড ভারতের দাবী সমর্থন করিতেন তাহা হইলে নির্বাচনে নিঃসন্দেহে বাংলা ও আসামের মুসলিম লীগ প্রার্থীগণের পরাজয় ঘটিত। পাকিস্তান আন্দোলনের প্রতিক্রিয়া বাংলা আসামের জমিনে বানচাল হইত এবং সমগ্র ভারতে ইহার প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হইত। এই বাংলাদেশ পূর্ব পাকিস্তান হিসাবে ঘোষিত না হইলে আজ স্বাধীন বাংলাদেশের সৃষ্টি হইত না। ফলে এই দেশ ভারতের অন্তর্ভূক্ত হইয়া থাকিত। তাই ফুরফুরার পীর সাহেব সময় সময় বলিতেন মায়ের চেয়ে মাসির দরদ বেশি? এই কথার দ্বারা তিনি বুঝাইতে চাহিয়াছেন তিনি বাংলার স্বাধীনতার জন্মদাতা। তাঁর অভাবে এই পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের জন্ম অসম্ভব ছিল। এই দেশকে ও দেশবাসীকে তিনি অন্তর দিয়া ভালবাসিতেন। তিনি বলিতেন আমি যখন এই জমিনের বাইরে যাই, তখন আমার শরীরটা সঙ্গে যায়, কিন্তু রূহটা থাকে এই দেশে। (হযরত পীর সাহেব (রহ.) এর ভাষণ ও ইতিহাসের পাতা থেকে সংকলিত, নেদায়ে ইসলাম, ৪৪ বর্ষ ১১তম সংখ্যা)