গোসল, কাফন, জানাযা, দাফন
পরদিন বৃহস্পতিবার রাজনৈতিক দলগুলো হরতাল ডেকেছিল। দূর দূরান্ত হতে ভক্ত-মুরীদ-মুহিব্বিনরা যাতে জানাযায় শরীক হতে পারেন তাই সবার পরামর্শে সিদ্ধান্ত হলো শুক্রবার বাদ জুমা জানাযার নামায অনুষ্ঠিত হবে।
পীর সাহেব হুজুর (রহ.)-এর হুজরাতেই তাঁকে গোসল করানো হলো। হুজুর (রহ.)-কে গোসল করালেন দারুস্ সালাম মাদ্রাসার মোহতামিম মাও. হাফেজ আব্দুল কাইয়্যুম সাহেবের নেতৃত্বে মাও. হাফেজ মোখলেসুর রহমান, খাদেম মোশাররফ, ক্বারী মোহাম্মদ আলী, হাফেজ আব্দুল্লাহ, জামসেদ, ডা. জহিরুল হক, মারুফ খান, খাদেম আবুল হাশেম প্রমুখ। পানি এনে দিয়ে সাহায্য করেন খাদেম রিফাত, দোকানদার রফিক, নজরুল, মোর্শারফ, ফয়েজ আহমাদ প্রমুখ। কাফনের কাপড় প্রস্তুত করে ক্বারী আব্দুল বাসেত সাহেব। কাফনের কাপড় পরান মাও. হাফেজ আব্দুল কাইয়্যুম, ক্বারী মোহাম্মদ আলী, হাফেজ আব্দুল্লাহ, জামসেদ, মারুফ খান, ডা. জহিরুল হক প্রমুখ। কাফন পরানোর পর সন্ধ্যা পর্যন্ত হুজুর (রহ.)-কে তাঁর হুজরাতেই রাখা হলো। হাজার হাজার দর্শনার্থী হুজুরকে এক নজর দেখার জন্য বেকারার ছিলেন। তাই তাদের সুবিধার্থে ফ্রিজিং গাড়িতে হুজুরকে রেখে মারেফাত হাউজের ও দায়েরা শরীফের মাঝে গাড়িটি রাখার ব্যবস্থা করা হয়। ফ্রিজিং গড়িটির ব্যবস্থা করেন হযরত মুফতি শাহীদুল ইসলাম সাহেব। গাড়িটির একপাশে কাঁচের দেয়ালের মধ্য দিয়ে সকলে হুজুরকে দেখতে পাচ্ছিলেন। তখনও তাঁর মুখে লেগে ছিল সেই চির পরিচিত ভুবন ভোলানো মুচকি হাসি।
ইশার নামাযের পর থেকে দর্শনার্থীদের দেখানোর ব্যবস্থা করা হলো। হাজার হাজার দর্শনার্থী লাইন ধরে শেষ বারের মতো হুজুরকে (রহ.) দেখেন। শুক্রবার জুমার নামাযের পূর্ব পর্যন্ত হুজুর (রহ.)-এর চেহারাখানা এক নজর দেখার জন্য দীর্ঘ লাইন লেগেই ছিল।
২২ ডিসেম্বর শুক্রবার সকালে হযরত পীর সাহেব হুজুর (রহ.)-এর কর্মময় জীবন শীর্ষক আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। শুরু হয় সকাল আটটায়, শেষ হয় জুমার পূর্বে। প্রথমেই তেলাওয়াতে কালাম পাকের মাধ্যমে অনুষ্ঠান শুরু হয়। অনুষ্ঠান উপস্থাপনায় ছিলেন মাও. আনোয়ার হোসেন। উক্ত অনুষ্ঠানে হযরত পীর সাহেব হুজুর (রহ.)-এর কর্মময় জীবনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা করেন জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতীব হযরত মাও. উবায়দুল হক, ইসলামী ঐক্যজোটের ভাইস চেয়ারম্যান, জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের নির্বাহী সভাপতি মাসিক মদীনা সম্পাদক মাও. মুহিউদ্দিন খান, জামাতে ইসলামী বাংলাদেশের আমীর মাও. মতিউর রহমান নিজামী, খেলাফত মজলিসের আমীর মাও. ইসহাক আলী, তাবলীগ জামাতের কেন্দ্রীয় মুরুব্বী মাও. মোজম্মেল হক, মুসলিম লীগের নির্বাহী সভাপতি এডভোকেট নুরুল হক মজুমদার, বাংলাদেশ জমিয়তুল মোদাররেসিনের মহাসচিব মাও. সাব্বির আহমাদ মোমতাজি, চরমোনাইর পীর সাহেবের প্রতিনিধি মরহুম পীর সাহেবের সাহেবজাদা মুজাহিদ কমিটির নায়েবে আমীর মাও. সৈয়দ মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল মাদানী, ছারছীনার পীর সাহেবের প্রতিনিধি ছারছীনা মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাও. আমজাদ হোসাইন, জাতীয় শরীয়া কাউন্সিলের সেক্রেটারি জেনারেল ও ইসলামী ব্যাংক শরীয়া বোর্ডের ভাইস চেয়ারম্যান মুফতী ছাঈদ আহমদ, কুষ্টিয়া ইসলামী ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাষক মাও. কাওসার মুহাম্মদ বাকী বিল্লাহ, চরমোনাইর মরহুম পীর সাহেবের ছেলে মাও. সৈয়দ কাওসার বিন ইসহাক, ডা. তারিক সিদ্দিকী, ডা. জহিরুল হক, মাও. সাজ্জাদ আলী খান, মাও. ইদ্রিস আলী, মাও. আকরাম হোসাইন, মাও. আব্দুল কাইয়্যুম, মাও. আতাউল্লাহ্ বুখারী, মাও. সিরাজ্জম্ মুনির, মাও. শামসুদ্দিন, মাও. আশরাফ আলী খান, মাও. সামসুল আরেফীন, মাও. মতিউর রহমান, কারী আব্দুর রব, মো. ফখরুজ্জামান ফিরোজ এবং আরিফ আল মান্নান।
আলোচকবৃন্দ তাদের বক্তব্যের মাঝে বার বার আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ছিলেন। কেউ কেউ কান্নার অতিশয্যে ভালভাবে কথা বলতে পারছিলেন না। দরবারের মুরুব্বি হিসেবে সবার শেষে বক্তব্য রাখেন মেঝ হুজুর হযরত মাও. আবু ইব্রাহীম মো. ওবায়দুল্লাহ সিদ্দিকী। তিনি হযরত পীর সাহেব হুজুর (রহ.)-এর জীবনের বিভিন্ন দিক আলোচনা করেন। ১৯৭৭ সনের ১৩ মে মরহুম হুজুর কিভাবে পিতার স্থলাভিসিক্ত হয়েছিলেন, কিভাবে পিতার সকল মুরীদ-মুতাকেদিন তাঁর হাতে তাসদিকে বায়াত হলেন ইত্যাদি নানা বিষয় তুলে ধরেন। মেজ হুজুর বলেন যে, মরহুম পীর সাহেব হুজুর বহু বছর থেকে বলে আসছিলেন যে, মিশকাতকে আমার জায়গায় দায়িত্ব দিলাম, তাকে সামনে রেখে কাজ করবেন। সুতরাং মিশকাত বর্তমান ফুরফুরার পীর। এরপর সবাইকে তাঁর হাতে তাসদিকে বায়াত হবার আহ্বান জানিয়ে তাঁর বক্তব্য শেষ করলেন।
এরপর বর্তমান পীর হযরত মাও. আবুবকর আব্দুল হাই মিশকাত সিদ্দিকী উপস্থিত লক্ষ লক্ষ ভক্ত মুরিদ মুতাকেদীনকে তাসদিকে বাইয়াত করালেন। বাইয়াত করানোর পূর্বে অল্প সময় তিনি বাইয়াত সম্পর্কে আলোচনা করলেন। এরপর বাইয়াত শেষে তাওহীদ, রিসালাত, আখেরাত, ইবাদত ইত্যাদি বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সারগর্ভ ওয়াজ করলেন। এরপর বললেন : আমাকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে তার অর্থ আমি বড় কিছু হয়েছি তা নয়। বরং আমি আপনাদের খাদেম হিসেবে কাজ করবো। আমার মুরুব্বী চাচারা আছেন; আমি দায়িত্ব নিয়েছি তাদের পদতলে থেকে কাজ করার জন্যে।
বর্তমান পীর সাহেব হুজুরের বক্তব্য শেষ হলে জুমার খোত্বা ও নামায অনুষ্ঠিত হলো। তিনিই খোত্বা দিলেন ও ইমামতি করলেন। এরপর পিতার পক্ষ থেকে তিনি সবার কাছে ক্ষমা চাইলেন। পিতার কাছে কারো কোনো দেনা-পাওনা থেকে থাকলে তার জিম্বাদারী গ্রহণ করলেন এবং এ ব্যাপারে তাঁর সাথে যোগাযোগ করার অনুরোধ করলেন। এরপর পিতার জানাজার নামাযে ইমামতি করলেন। তখন বেলা প্রায় তিনটা।
জানাযায় দলমত নির্বিশেষে অধিকাংশ রাজনৈতিক ও অরাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ, সাবেক প্রেসিডেন্ট, মন্ত্রী, সচিব, দেশ বরেণ্য ওলামায়ে কেরাম, পীর মাশায়েখ, সরকারী ও বেসরকারী উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাবৃন্দ অংশগ্রহণ করেন। তন্মধ্যে জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোর্কারমের খতীব হযরত মাওলানা উবায়দুল হক, জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের নির্বাহী সভাপতি ও মদীনা সম্পাদক হযরত মাও. মুহিউদ্দিন খান, জামাআতে ইসলামীর আমীর ও সাবেক মন্ত্রী মাও. মতিউর রহমান নিজামী, জামাআতে ইসলামী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক মন্ত্রী আলী আহসান মো. মুজাহিদ, আওয়ামী লীগ নেতা ও সাবেক মন্ত্রী খ.ম. জাহাঙ্গীর, সাবেক প্রেসিডেন্ট এলডি.পি. সভাপতি ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী, ঢাকার মেয়র বি.এন.পি. নেতা জনাব সাদেক হোসেন খোকা, জামাআতে ইসলামীর উপদেষ্টা অধ্যাপক গোলাম আযম, জমিয়তুল মোদাররেসিনের মহাসচিব মাও. সাব্বির আহমাদ মোমতাজী, চরমোনাইর মুজাহিদ কমিটির নায়েবে আমীর মাও. মোসাদ্দেক বিল্লাহ আল-মাদানী, খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব ও যুগ্ম মহাসচিব যথাক্রমে মাও. জাফরুল্লাহ খান ও হাবিবুল্লাহ মিয়াজী, জমিয়তে ওলামায়ে ইসলামের মহাসচিব ও সাবেক এম.পি. মুফতি মুহাম্মদ ওয়াক্কাস, ইসলামী ঐক্য আন্দোলনের মাও. ইসা শাহেদী, ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনের পক্ষে মাও. আবু জাফর ও অধ্যাপক আশরাফ আলী আকন্দ, ছারছীনার পীর সাহেবের পক্ষে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাও. আমজাদ হোসেন, আওয়ামী লীগ নেতা সাবেক এম.পি. মকবুল হোসেন, আবুল হাসনাত আব্দুল্লাহ, ইলিয়াস মোল্লা, বি.এন.পি. নেতা সাবেক এম.পি. এস. এ. খালেক, খেলাফত মজলিসের আমীর ও সাবেক মন্ত্রী মাও. মো. ইসহাক আলী, মহাসচিব আহাম্মদ আব্দুল কাদের, ইসলামী ঐক্যজোট (শায়খুল হাদীস আজিজুল হক) নেতা সাবেক এম.পি. শহিদুল ইসলাম, তাবলীগ জামাতের কেন্দ্রীয় মুরুব্বী মাও. মোজাম্মেল হক, মিশনারী ওয়েল ফেয়ার ট্রাস্টের চেয়ারম্যান বিচারপতি আব্দুর রউফ, মিরপুরের বিভিন্ন ওয়ার্ডের কমিশনারবৃন্দ, মুসলিম লীগের নির্বাহী সভাপতি এডভোকেট নুরুল হক মজুমদার, মসজিদ মিশনের সভাপতি মাও. যয়নুল আবেদীন, সাবেক রাষ্ট্রদূত নজরুল ইসলাম খান, প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ মাও. আবুল কালাম আযাদ, প্রমুখ উল্লেখযোগ্য। পীর সাহেব হুজুর (রহ.)-এর তিন ভাই, ভগ্নিপতি, তিন ছেলে, জামাতাগণ, ভ্রাতুষ্পুত্র, ভগ্নিপুত্র, নাতি, আত্মীয়স্বজনসহ বাংলা ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে আগত লক্ষ লক্ষ ভক্ত মুরীদান ও সাধারণ মুসলমান জানাজায় শরীক হয়েছেন।
জানাযা শেষে পরিবারের সদস্যরা খাটিয়া বহন করে মার্কাজে ইশাআতে ইসলাম মসজিদ সংলগ্ন কবরস্থানে নিয়ে গেলেন। ২১ ডিসেম্বর কবরস্থানের সর্ব পশ্চিমে কবর তৈরি করা হয়েছিল। জীবদ্দশাতেই হুজুর স্থানটি দেখিয়ে দিয়ে মার্কাজের ক্যাশিয়ার হাজি নজরুল সাহেবকে বলেছিলেন : আমার ইচ্ছা তো মদীনায় জান্নাতুল বাকীতে শোয়া। যদি বাংলাদেশে শুতেই হয় তবে এ জায়গায়ই শোয়ার নিয়ত। সে হিসেবে ঐ স্থানটিই নির্বাচিত হয়। মাদ্রাসার শিক্ষক, ছাত্র, হুজুরের আত্মীয়স্বজন, মুরীদ-মুহিব্বিনের অনেকেই কবর খননের কাজে শরীক হন। সিন্দুক টাইপের কবর তৈরি করা হয়। কবরে নামলেন বড় সাহেবজাদা হযরত মাও. আবুবকর আব্দুল হাই মিশকাত সিদ্দিকী, মেঝ সাহেবজাদা মোস্তফা মাদানী সিদ্দিকী, ছোট সাহেবজাদা আয়াতুল্লাহ সিদ্দিকী, সেঝ হুজুরের ছেলে মুজাহিদ সিদ্দিকী এবং ছোট হুজুরের ছেলে সওবান সিদ্দিকী। হুজুরকে কবরে নামানোর সময় উপস্থিত আত্মীয়স্বজন, ভক্ত-মুরীদদের বুক ফাটা আর্তনাদে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হলো।
সান্তনা দিয়েও অনেককে চুপ করানো যাচ্ছিল না। বাঁশ ও চাটাই দেয়ার কাজেও ভাই, পুত্র, জামাতাগণ, নাতি, ভগ্নীপতিসহ মুরীদগণ সহযোগিতা করলেন। এরপর পালাক্রমে সবাই মাটি দেবার কাজে শরীক হলেন। মাটি দেয়া শেষ হতে হতেই আসরের সময় হয়ে গেল। আসরের নামাযের জামাতের পূর্বেই আমাদের প্রাণপ্রিয় মুরুব্বী মেঝ হুজুর মুফতিয়ে আযম মাও. আবু ইব্রাহিম সিদ্দিকী সাহেব সংক্ষিপ্ত নসীহত শেষে বিশেষ মুনাজাত পরিচালনা করলেন।
যে ঐক্যের আশা তিনি পোষণ করতেন, দলমত নির্বিশেষে তাঁর জানাযায় ভিন্ন ভিন্ন মতাদর্শের রাজনৈতিক দলের নেতৃবর্গ এবং বহু ধর্মীয় সংগঠনের নেতৃবর্গের উপস্থিতি এবং শোক প্রকাশের মাধ্যমে যেন সেই বৃহত্তর ঐক্য স্থাপনের একটা দৃষ্টান্ত পাওয়া গেলো। আল্লাহ আমাদেরকে সামাজিক শান্তির জন্য ঐক্য রক্ষার তওফিক দিন, আমীন