গদ্দিনিশীন রাহবারে ফুরফুরা

মসলমানদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠায় শাইখুল ইসলাম আব্দুল হাই সিদ্দিকী (রহ.)

ইসলামের শিক্ষা হল দুনিয়ার মুসলমান পরস্পর ভাই ভাই। আল্লাহপাক মুসলমানদেরকে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন এবং দলে দলে বিভক্ত হতে নিষেধ করেছেন। যতদিন মুসলমানরা একতাবদ্ধ ছিল-দুনিয়ার কোন শক্তি তাদের সামনে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবার সাহস পায়নি। যখন থেকে মুসলমানদের মধ্যে বিভেদের সৃষ্টি হল, দলাদলির সূচনা ঘটলো-তখন থেকেই শুরু হয়েছে তাদের অধঃপতন। হযরত আব্দুল হাই সিদ্দিকী (রহ.)- এর সমসাময়িক সময়ে মুসলমানরা হাজারো দলে বিভক্ত ছিল। যে যার দল নিয়ে মেতে থাকতো। প্রত্যেকেই নিজ দলে বেশি লোক ঢোকানোর জন্যে অন্য দলের কুৎসা রটিয়ে বেড়াতো। এক মুসলমান আরেক মুসলমানকে দেখতে পারতো না। এক আলেম আরেক আলেমকে, এক পীর আরেক পীরকে, এক পীরের মুরিদ আরেক পীরের মুরিদকে, এক দল আরেক দলকে দেখতে পারতো না। প্রত্যেক দলই ধারণা করতো-একমাত্র আমার দলই সত্য পথে রয়েছে, আর সবাই পথভ্রষ্ট। মুসলমানদের মধ্যকার এ বিভেদের সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বিধর্মীরা মুসলমানদেরকে একেবারে কোনঠাসা করে ফেলেছিল। মুসলমানদের এ ঘোর দুর্দিনে ফুরফুরার হযরত বড় হুজুর আবদুল হাই সিদ্দিকী (রহ.) তামাম বিশ্বের মুসলমানদের মধ্যে একতা ও সংহতি প্রতিষ্ঠার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন-

বড় হুজুর (রহ.)-এর প্রতিষ্ঠিত সাপ্তাহিক মানবতা পত্রিকায় বলা হয়েছে-

আল্লাহপাক কালামে মজীদে ঘোষণা করেছেন- বিশ্বের এক প্রান্তের মুসলমান অপর প্রান্তের মুসলমানের ভাই। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়-আজ মুসলমানের ভেতর শতদল। পীরে পীরে দলাদলি, আলেমে আলেমে হানাহানি! এই রকম পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে যে-এক পীর আরেক পীরকে দেখতে পারে না, এক আলেম আর এক আলেমের নিন্দা করে। প্রত্যেকেই নিজের দলে লোক বেশি ঢোকানোর জন্য অন্য দলের কুৎসা রটায়।সেই কারণে কুরআন মজীদের ঘোষণা মুসলমান ভাই ভাই এর অস্তিত্ব বাস্তবে পাওয়া যায় না। কিন্তু আমরা দেখতে পেয়েছি-আমাদের পীর মোর্শেদ বড় হুজুর কুরআনের নির্দেশ অনুযায়ী মুসলমান ভাই ভাই এর বাস্তব নজীর দেখিয়ে গেছেন। (সাপ্তাহিক মানবতা, ৫ম বর্ষ, ১ম, ৩য় ও ৪র্থ সংখ্যা, অক্টোবর, ১৯৮৪ ইং, পৃঃ ১২) হযরত পীর সাহেব (রহ.) ঘোষণা করেন- তামাম বিশ্বের মুসলমান আমরা ভাই ভাই। ইন্নামাল মুমিনুনা ইখওয়া-না। মায়ের পেটের ভাই বুনিয়াদী রেশতা আর মুমিন ভাই আবাদী রেশতা। দেওবন্দীরা আমার ভাই,তাবলীগ জামাত আমার ভাই, জৌনপুরীরা আমার ভাই, আহলে হাদীসও আমার ভাই। যতক্ষণ না কোন মুসলমান কুফরে পৌঁছে যায়-সে আমার ভাই। কত বড় ঘোষণা! বিশ্ব মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধের এর চেয়ে উত্তম নিদর্শন আর কি হতে পারে? ইসায়ী ১৯৫৭ সনের ২৪ শে নভেম্বর জমিয়তে ওলামা ও হেজবুল্লাহ কমিটির বার্ষিক অধিবেশনে সভাপতির ভাষণে তিনি বলেছিলেন- আজ আমাদের মধ্যে নূতন মুসলমান, নব্য আলেম, নব্য পীর জন্ম লাভ করিয়া শত শত মত ও পথের সৃষ্টি করত ইসলাম হইতে-আল্লাহর মনোনীত দীন ও উহার পথ হইতে, রাসূলের আদর্শ হইতে বিচ্যুত হইয়া পড়িতেছে। সমাজকে বিভ্রান্ত করিয়া কুফর ও শিরকের দিকে লইয়া যাইতেছে। তাহারা যেন নব ইসলাম সৃষ্টি করিতেছে। কেহ কেহ বা নাস্তিক ভাবাপন্ন হইয়া পড়িতেছে। ইহা অপেক্ষা দুঃখ, ক্ষোভ এবং ত্রাসের কারণ আর কি হইতে পারে? এই নূতন নূতন পথের পথিক ও চালকগণ আজ মুসলমান সমাজকেও খন্ড বিখন্ড করিয়া ছাড়িতেছে। হাজেরিনে মজলিস! আমি এই খন্ডিত সমাজকে ঐক্যবদ্ধ করিতে চাই। একতাই শক্তি। আমাদিগকে ঐক্যবদ্ধ হইতে হইলে নিজেদের ভেতর হইতে এই ভেদ-জ্ঞান দূর করিতে হইবে।পীরানে পীর বুজুর্গানদের নাম করিয়াও আজ দলাদলির সৃষ্টি করিতেছে। আপনারা আজ শুনিতে পান-এরা ফুরফুরাভী দল, এরা জৌনপুরী দল, ওরা দেওবন্দী ফেরকা। ফলত এই দল ও ফেরকা পোরস্তী ইসলাম সমর্থন করে না। আমরা যেদিন সত্যিকারের মুসলমান হইবো-সেই দিন এই ফেরকা পোরস্তী থাকিবে না।ঐক্যহীন সমাজ ধ্বংস হইয়া যাইতে বাধ্য। সুতরাং সকল ভেদাভেদ বিস্মৃত হইয়া চলুন আমরা ঐক্যবদ্ধ হই। (মাসিক নেদায়ে ইসলাম, ১৫শ বর্ষ, ৬ষ্ঠ সংখ্যা, পৌষ-১৩৬৮ বাং, পৃঃ ১৬০, ১৬২