গদ্দিনিশীন রাহবারে ফুরফুরা
জীবনের শেষ দিন, ২০ শে ডিসেম্বর ২০০৬ সন, বুধবার
বাংলাদেশের উত্তর বঙ্গে ঠাকুরগাঁ এলাকায় কয়েকটি ওয়াজ মাহফিল উপলক্ষে হুজুর তখন ঠাকুরগাঁ সিদ্দিকীয়া বিশ্ব ইসলাম মিশন কুরআন সুন্নী কমপ্লেক্স-এ তাঁর খানকাহ ও বাসস্থানে অবস্থান করছেন। সঙ্গে ঢাকা থেকে গিয়েছেন তাঁর ছোটো কন্যা এবং তাঁর বড় সাহেজাদা সপরিবারে অর্থাৎ বর্তমান গদ্দিনশীন ফুরফুরার পীর হযরত মাওলানা আব্দুল হাই মিশকাত সিদ্দিকী, তাঁর স্ত্রী, পুত্র এবং কন্যা। উল্লেখ্য যে ঠাকুরগাঁ এলাকার মাহফিলসমূহে বড় সাহেবজাদাও ওয়ায়েজ হিসেবে আমন্ত্রিত হয়েছিলেন এবং তিনি বেশ কিছু বছর যাবৎ দেশের বিভিন্ন এলাকাতে ওয়াজ মাহফিলে যোগদান করতেন। আরো পূর্বে তিনি সৌদী আরবের রিয়াদস্থ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশুনা শেষে দেশে ফিরেছেন। সুতরাং তাঁর ওয়াজ অবশ্যই ইলমী এবং কিতাবী ওয়াজ তা বলাই বাহুল্য। স্বয়ং মরহুম পীর সাহেব হুজুরও বলতেন, মিশকাত ভালো আলেম হয়েছে, আমার পিতা যেমন আমাকে দায়িত্ব দিয়েছিলেন তেমনি আমি মিশকাতকে দায়িত্ব দিয়ে যাচ্ছি, আমি চলে যাবো, কিন্তু আপনাদেরকে একটা তলোয়ার দিয়ে যাচ্ছি, সে হচ্ছে আমার মিশকাত। সেই সূত্রে পিতার সঙ্গে তিনিও আমন্ত্রিত অতিথি ছিলেন। বিগত ১৮ই সেপ্টেম্বর, বুধবার দুইটি মাহফিল ছিল। দ্বিতীয় মাহফিলটি ছিলো মসজিদে। সেখানে মাইক ব্যবস্থা ভালো না থাকায় হযরত পীর সাহেব হুজুর আব্দুল কাহ্হার সিদ্দিকী (রহ.) বেশ উচ্চস্বরে ওয়াজ করেন। রাত প্রায় দশটার দিকে ফিরে আসেন ঠাকুরগাঁ খানকাহ কমপ্লেক্সে তাঁর বাসগৃহে। সেখানে অন্দর মহলে খাওয়া দাওয়া শেষ করে তিনি ছোটো মেয়ে এবং ভাইঝির সঙ্গে কথাবার্তা বলতে বলতে হঠাৎ মাথাটা নিচু করে চুপ হয়ে যান। এরপর ধীরে ধীরে উঠে দরজার দিকে এগিয়ে দরজা ধরে দাঁড়িয়ে থাকেন। এতে তাঁর ভাইঝি এবং ছোটো কন্যা হৎচকিৎ হয়ে কেঁদে ওঠেন। তাঁরা বুঝতে পারেন নিশ্চয় খুব বড় কোনো অসুবিধা হয়ে গেছে এবং হুজুর হয়তো মাথা ঘুরে পড়ে যেতে পারেন। বাইরের ঘরে অপেক্ষমান নূরু ভাই চিৎকার শুনে এসে হুজুরকে দরজাটা ধরে দাঁড়ানো অবস্থায় দেখতে পান। পরিবেশ অনুমান করে তিনি হুজুরকে ধরে গাড়িতে এনে তোলেন এবং ঠাকুরগাঁ মিশন কমপ্লেক্স এর অন্য প্রান্তে হুজুরের খানকাহ ও শয়নগৃহে নিয়ে আসেন। পর পরই দ্রুত স্থানীয় একজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার সাহেবকে আনা হয়। তিনি একটি ইঞ্জেকশন দেন এবং দ্রুত কোনো হাসপাতালে নেবার ব্যবস্থা করতে বলেন।
হুজুর তখন কেবল নির্বাক চেয়েছিলেন, কিন্তু না জ্ঞান হারিয়েছেন, না কোনো অঙ্গ অবশ হয়েছে। ইতোমধ্যে হুজুরের বড় সাহেবজাদা ওয়াজ মাহফিল থেকে খানকাহে এসে পৌঁছান। সেখানে তখন ক্রন্দনের রোল উঠেছে। হুজুরের চোখেও তখন পানি। চেষ্টা করেও তিনি কথা বলতে পারছেন না। তাঁকে ঢাকায় নেবার কথা বলা হলে তিনি বুঝতে পারেন, কিন্তু ইশারায় আপত্তি জানান। অগত্যা সে রাত ঠাকুরগাঁতেই কেটে যায়। পরদিন সকালে পুনরায় সকলের অনুরোধ প্রত্যাখ্যাত হলে বড় সাহেবজাদা মিশকাত সাহেব হুজুরের পা জড়িয়ে ধরে কেঁদে ওঠেন এবং ঢাকা যেতে অনুরোধ করেন। অগত্যা হুজুর রাজি হলে তাঁকে জিপ গাড়িতে দীর্ঘ সফর না করিয়ে প্রথমে রংপুরে আনা হয়। উদ্দেশ্য সেখানেও বিশেষজ্ঞ ডাক্তার দেখানো এবং উন্নত এম্বুলেন্স বা হেলিকপ্টার যোগে হুজুরকে ঢাকাতে নেওয়া। ঢাকায় অবস্থানরত মার্কাজের কর্মকর্তাদেরকে খবর দেওয়া হয় এবং গোড়ানের ফারুক ভাই, যিনি হুজুরের অত্যন্ত প্রিয় ও কাছের মানুষ, তিনি উন্নতমানের এম্বুলেন্স এর ব্যবস্থা করার আগ্রহ প্রকাশ করেন। আগ্রহ অনেকেই প্রকাশ করেন। শেষে একটি এম্বুলেন্স ভাড়া করা হয় এবং হুজুরের দীর্ঘদিনের কর্মী মধুভাই মধ্যস্থতায় সহযোগিতা করেন। রাত প্রায় দশটা নাগাদ ঢাকা থেকে এম্বুলেন্স রংপুর পৌঁছে। তার পূর্বে রংপুরে দুজন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার হুজুরকে দেখে ব্যবস্থাপত্র দেন এবং সিটি স্ক্যান করিয়ে ব্রেইন স্ট্রোক হয়েছে জানান। এসকল ব্যবস্থাপনা দক্ষভাবে করেছেন রংপুরস্থ হুজুরের বিশ্ব ইসলাম মিশন ও খানকাহ এর পরিচালক জনাব সাইফুল সাহেব। হুজুরের অসুস্থতার খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন জিলা থেকে বহু মানুষ রংপুরে ভীড় করেন। রাত দশটার দিকে ঢাকার উদ্দেশ্যে এম্বুলেন্সে হুজুরকে নিয়ে এবং অন্য গাড়িতে তাঁর পুত্র ও পরিবারের অন্যরা রওনা হন। সেপ্টেম্বরের ২০ তারিখ ভোরে সকলে ঢাকায় পৌঁছেন। তাঁকে দেখতে আসেন অগণিত মানুষ। সকলেরই মন ভারাক্রান্ত। অনেকেরই চোখে অশ্রুর প্লাবন। হুজুর ইশারায় কথা বুঝাবার চেষ্টা করছেন, কখনো কাগজে লিখবার চেষ্টা করছেন। সব কথা বুঝা সম্ভব হচ্ছিল না। এতে তাঁরও বিরক্তি ও কষ্ট বাড়ছিলো, আমাদেরও মনোকষ্ট হচ্ছিল। শর্ষিণার পীর সাহেব সপরিবারে ঢাকাতে এলেন। উল্লেখ্য তিনি হুজুরের বড় জামাতা। তাঁরই উদ্যোগে প্রথমেই একজন নিউরোমেডিসিন বিশেষজ্ঞের সঙ্গে পরামর্শ করে ব্যবস্থাপত্র নেয়া হলো এবং চিকিৎসা শুরু হলো।
একদিন চিকিৎসা করার পর হুজুর আসর ওয়াক্তে কথা বলেছিলেন। পরে অজ্ঞাত কারণে ওষুধ খাওয়া বন্ধ করে দিলেন এবং অবস্থার পরিবর্তন হলো। আর কথা বলতে সক্ষম হলেন না। পূর্বের মতোই কেবল ইশারা ইঙ্গিতে ভাব প্রকাশ করছেন। আমরা নানান জল্পনা কল্পনা করলাম। ঠিক হলো ডা. দীন মোহাম্মদ সাহেবের কাছে হুজুরকে নিয়ে যাওয়া হবে। হুজুরও রাজি হলেন। গোড়ানের ফারুক সাহেব ব্যবস্থা করলেন। ডা. দীন মোহাম্মদ ব্যবস্থাপত্র দিলেন। কিন্তু এ ক্ষেত্রেও হুজুর নিয়মিত ওষুধ গ্রহণে আপত্তি জানাতে লাগলেন। ফলে অবস্থার উন্নতি আশানুরূপ হলো না। অথচ এরই মধ্যে হুজুর শান্তভাবে সকল দর্শনার্থীকে দেখা করতে দিলেন; এ সময়ের বিভিন্ন অবস্থা সম্পর্কে কিছু কথা আলোচনা করছি।
সেপ্টেম্বরের ২২ তারিখ। জুমাবার। নিত্যদিনের মতো হুজুর জুমার পূর্বে যথারীতি মার্কাজ অফিসের সামনে তাঁর নির্ধারিত চেয়ারে এসে বসলেন। দর্শনার্থীদের ভিড় লেগে গেল তাঁর চারপাশে। তিনি তাদের সাথে মুসাফাহা এবং ইশারা-ইঙ্গিতে কুশল বিনিময় করছিলেন। তাঁর চেহারায় ছিল না কোনো দুশ্চিন্তার ছাপ। রেজা বিল কাজা, তাওয়াক্কুল আর সবরের এক মূর্ত প্রতীক হয়ে বসে ছিলেন তিনি।
যথারীতি জুমার নামায জামাতে আদায় করলেন। জামাতের পর আবার মার্কাজ অফিসের সামনে তার নির্ধারিত চেয়ারে বসলেন। দেখতে দেখতে তাঁর চারপাশে দর্শনার্থীদের ভিড় জমে গেল। কিছুক্ষণ পর হঠাৎ তিনি কেমন যেন হয়ে গেলেন। ইশারায় ফোন আনতে বললেন। এরপর কাউকে ফোন করতে বললেন। কিন্তু আমরা কেউই বুঝছিলাম না কাকে ফোন করতে হবে। অত:পর ফোন-বুক আনতে বললেন। নিজে তন্ন তন্ন করে ফোন-বুকে কার যেন নাম খুঁজতে লাগলেন। কিন্তু তার কাঙ্খিত নাম পেলেন না। আমরা কাগজ কলম দিয়ে নাম লিখে দিতে বললাম। কিন্তু তিনি নাম লিখলেন না। এভাবে বিকাল হয়ে এলো। এ সময় হযরত পীর সাহেব (রহ.)-এর বড় সাহেবজাদা হুজুর বললেন হজ্জ এজেন্সির মাহমুদ ভাইকে ফোন করবো? হুজুরের মুখ এবার উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। তিনি মাথা ঝাকিয়ে সায় দিলেন।
গত দু বছর থেকেই হুজুর (রহ.) হজ্জে যেতে চাচ্ছিলেন। সর্বশেষ তিনি ২০০৪ সনে হজ্জ করেছেন। সুস্থ থাকাকালীন প্রায় প্রতি বছরই হজ্জে যেতেন। হজ্জের সময় এলেই তিনি কেমন যেন অস্থির হয়ে পড়তেন। আল্লাহর ঘর কাবা ও নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের রওজার মহব্বতে ছুটে যেতেন মক্কা-মদীনায়। জীবনে তিনি প্রায় পঞ্চাশ বার মক্কা শরীফ গিয়েছেন; হজ্জ ও উমরা উপলক্ষে। ২০০৫ সনে আয়োজন সব ঠিক থাকার পরও হঠাৎ করে দ্বীনি সফরে অস্ট্রেলিয়ায় যাবার প্রোগ্রাম হয়ে যাওয়ায় তিনি হজ্জে যেতে পারেননি। এরপর ২০০৫ সনে রমযানে উমরায় যাবার প্রস্তুতি নেন। পরে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে হজ্জে যাবার সিদ্ধান্ত নেন। সে মোতাবেক ২০০৬ সনে হজ্জে যাবার সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়ে যায়। প্রথমে মদীনায় যাবেন। দু তিন দিন মদীনায় থেকে মক্কা যাবেন। কিন্তু শেষ মুহূর্তে বিমান কর্তৃপক্ষ মদীনার ফ্লাইট সিডিউল দিতে ব্যর্থ হওয়ায় হুজুর (রহ.) সফর স্থগিত করে দেন। সিদ্ধান্ত নেন বড় কাফেলাসহ পরের হজ্জে অর্থাৎ এবার যাবেন। পরিচিত মহলে ও মাহফিলে মাহফিলে তিনি এই ঘোষণা প্রচার করছিলেন। যারা তাঁর সাথে হজ্জে যেতে চায় তারা যেন যোগাযোগ করেন।
এতবড় অসুস্থতা সত্ত্বেও হুজুর (রহ.) হজ্জের কথা ভুলে যাননি। এয়ার পীস ট্রাভেল্স এজেন্সির এম.ডি. মাহমুদ সাহেবকে তিনি তাই ডেকে পাঠালেন। সন্ধ্যার পর মাহমুদ সাহেব এলেন। হুজুর (রহ.) ইশারা-ইঙ্গিতে মাহমুদ সাহেবকে হজ্জের ব্যাপারে সব ব্যবস্থা গ্রহনের জন্য বললেন। তাঁর বড় সাহেবজাদা হুজুরকে তাঁর পরিবারের সদস্য যারা হজ্জে যাবেন তাদের নাম লিখে দিতে ইশারা করলেন। হুজুরের নির্দেশ মতো হুজুরের পরিবারের সদস্য এবং হজ্জে যেতে ইচ্ছুক মুরীদ-মুহিব্বিনদের নাম তালিকাভুক্ত করা হলো।
দেখতে দেখতে রমযান ২৫ সেপ্টেম্বর হতে শুরু হয়ে গেল। অন্যান্য বারের রমযানের মতোই অসুস্থতা সত্ত্বেও হুজুর তাঁর কর্মসূচী চালিয়ে যেতে লাগলেন। প্রতিদিন ইফতার মাহফিলে গিয়ে দুআ পরিচালনা করতে লাগলেন। কিন্তু তখনও তিনি কথা বলতে পারছিলেন না।
হুজুরের আদত ছিল দর্শনার্থী এলেই তাদের তিনি দ্বীনের কথা শোনাতেন। আমি গেলেই বিভিন্ন বিষয়ে লিখতে বলতেন। এক এক করে পয়েন্টগুলো বলে যেতেন আর নোট করে নিতে বলতেন। অথচ তিনিই কথা বলতে পারছিলেন না। অসংখ্য দীন-পিপাসু মানুষ একটু খানি দীনের কথা-আশার কথা শোনার জন্যে তার কাছে এসেছে, অথচ তিনি তাদের কোনো নসিহত করতে পারছিলেন না। এটা যে তাঁর অন্তরের কত বড় দু:খ ছিল তা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। অথচ তাঁর এ কষ্ট তিনি মানুষকে বুঝতে দিতেন না। সর্বক্ষণ তাঁর মুখে লেগে থাকতো তাঁর সেই ভুবন ভোলানো চির পরিচিত মুচকি হাসি।
একদিন মার্কাজের বারান্দায় বসে আছি। কোনো দর্শনার্থী তখন ছিল না। তাঁর চোখ পানিতে ভরে উঠলো। বুকে হাত দিচ্ছিলেন আর আমার দিকে তাঁকিয়ে হাত নেড়ে বোঝাতে চাচ্ছিলেন বুকে কত কথা জমে আছে অথচ বলতে পারছি না। তাঁর চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছিল। চোখ দিয়ে পানি পড়ছিল উপস্থিত সবার। আমি বললাম কত মানুষ মুখ দিয়ে গানবাদ্য-গালিগালাজ করে, আর আপনি মানুষকে আল্লাহর দিকে ডাকেন। ওদের জবান খোলা অথচ আপনারটা আল্লাহ বন্ধ করে দিয়েছেন। আল্লাহর পরীক্ষা! চিন্তা করবেন না, ইন্শা-আল্লাহ সুস্থ হয়ে যাবেন। এরপর কয়েকদিন পর থেকে ধীরে ধীরে দু একটি শব্দ বলতে পারতেন, কিন্তু পুরো বাক্য বলতে পারতেন না।
ইতোমধ্যে গোড়ানের ফারুক সাহেব প্রস্তাব দিলেন ঢাকার এপোলো হাসপাতালে বিদেশী বিশেষজ্ঞ ডাক্তারের পরামর্শ নিলে কেমন হয়। সকলে একমত এবং হুজুরও রাজি হলেন। কিন্তু যথারীতি ওষুধ কিছু খেয়ে হুজুর ওষুধ বন্ধ করে দিলেন। হযরত মাওলানা সাঈদ আহমদের চেষ্টায় একজন হোমিওপ্যাথি ডাক্তার ওষুধ দিলেন, তাও হুজুর খেলেন, কিন্তু বিশেষ উন্নতি হলো না।
দেখতে দেখতে রমযান মাস শেষ হয়ে এলো। রমযানের শেষ সপ্তাহে হুজুর একটু একটু করে কথা বলা শুরু করলেন। ঈদের দিন সকাল বেলা, বি.এস.টি.আই. কর্মকর্তা কবীর ভাইকে স্পষ্টভাবেই হুজুরের সাথী হয়ে হজ্জে যাবার জন্য বললেন। ঈদের পরে সপ্তাহখানেকের মধ্যে হুজুর বেশ ভালোই কথা বলতে পারছিলেন। পরিবারের সবাইকে নিয়ে হজ্জে যাবার জন্য জোর প্রস্তুতি নিতে লাগলেন। আহলিয়া, তিন পুত্র, এক পুত্র-বধূ, দু কন্যা, দুই জামাতা, ছয় নাতি-নাতনি নিয়ে হুজুরের পরিবারেরই ষোল জন। মুরীদ-মুহব্বিনসহ ঊনত্রিশ জনের কাফেলা। তাঁর বড় জামাতা ছারছীনার পীর, কন্যা, নাতি-নাতনিসহ পৃথক কাফেলায় চৌদ্দ-পনের জন হুজুরের উৎসাহেই হজ্জে যাবার প্রস্তুতি নিলেন। সবাইকে নিয়ে হজ্জে যাবার বড় আকাঙ্খা!
ঠিক হলো প্রথমে মদীনা যাবেন। যিয়ারত শেষ করে মক্কায় গিয়ে হজ্জ সম্পাদন করবেন। ২১ ডিসেম্বর ফ্লাইট। ফিরতি ১০ জানুয়ারি ২০০৭।
এর মাঝে হুজুর চাঁদপুরে এক মাহফিলে ওয়াজ করে এলেন। আমাদের অন্তরটা খুশিতে ভরে উঠলো। হুজুর আল্লাহর রহমতে কথা বলতে পারছেন। সুস্থ হয়ে উঠছেন, আল্হামদুলিল্লাহ। ওদিকে দারুস্ সালাম মাহফিল ঘনিয়ে আসছিল। হুজুরের নির্দেশে ইশতেহার, পোস্টার তৈরি হলো। পোস্টার ইশতেহারের ওয়াজগুলো বার বার শুনে হুজুর সংশোধন করে দিলেন। দারুস্ সালাম বার্ষিক ওয়াজ মাহফিলের ১০ দিন আগে ২৪ নভেম্বর জুমাবার হুজুর আমাকে ফোন করে ডেকে পাঠালেন। আমি হুজুরের সামনে যাবার পর হুজুর বললেন কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে। তাই মনের শেষ কথাগুলো দিয়ে একটা ইশতেহার ছাপিয়ে দাও। একথা বলে হুজুর বলতে লাগলেন, আমি নোট করে নিচ্ছিলাম। হুজুরের বলা শেষ হলে আমি ফ্রেস করে লিখে হুজুরকে পড়ে শোনালাম। হুজুর কিছু সংশোধন-সংযোজন করলেন। এরপর ছাপানোর হুকুম দিলেন। প্রথমে পঞ্চাশ হাজার ছাপাতে কত লাগবে জিজ্ঞেস করলেন। টাকার পরিমাণ শুনে পঁচিশ হাজার ছাপাতে বললেন। আর টাকা দিতে গিয়ে বললেন বাবা খুব চিন্তায় আছি। হজ্ঝের টাকা এখনও সব শোধ হয়নি, তাছাড়া পাকশী মসজিদের ঋণ! উপস্থিত কয়েকজন হিযবুল্লাহর সদস্য ইশতেহারটি ছাপানোর কাজে শরীক হতে চাইলে হুজুর সানন্দে রাজি হলেন। দুবারে ছাপা হলো প্রায় ছেষট্টি হাজার ইশতেহার। এটিই ছিল হুজুরের তরফ থেকে শেষ ইশতেহার।
দেখতে দেখতে দারুস্ সালাম বার্ষিক ওয়াজ ও ইসালে সওয়াব চলে এলো। ৫ ডিসেম্বর মঙ্গলবার মাহফিল শুরু হলো। প্রতিদিনই হুজুর ওয়াজ করেছেন। সকলেই পরিতৃপ্ত হলেন। এবার তিনি প্রতিদিন মাগরিব বাদ তাঁর বড় সাহেবজাদাকে তালীম দিতে ও ওয়াজ করতে নির্দেশ দিলেন। তাঁর তালীম ও ওয়াজ শেষে হুজুর নিজে ওয়াজ করলেন। ৮ ডিসেম্বর জুমার পূর্বে শেষ নসীহত ও আখেরী মুনাজাত হুজুর নিজে পরিচালনা করলেন।
মাহফিল শেষে হুজুর হজ্জ ও যিয়ারতের চিন্তায় নিমগ্ন হলেন। যারা তাঁর সাথে কাফেলায় নাম লিখিয়েছেন বা কেউ হজ্জে যাবার পূর্বে তাঁর সাথে দেখা করতে এলেই তিনি মক্কা-মদীনার কথা স্মরণ করে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়তেন। দুয়া করুন আল্লাহ যেন নেন এভাবে বার বার দুয়া চাইতেন। কখনো কখনো প্রস্তাবিত হজ্জ যাত্রীদের নিয়ে আবেগভরে দুয়া করতেন।
এদিকে হজ্জের ফ্লাইটের তারিখ পরিবর্তন হয়ে ২১ থেকে ২৩ ডিসেম্বর হলো।
