হযরত বড় হুজুর (রহ.) এর সংস্কারমূলক কর্মসূচী
সাড়ে সাত শত বছরের মুসলিম শাসনামলে ভারতীয় উপমহাদেশে শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে মুসলমানদের যে এক চেটিয়া দখরলদারিত্ব ছিল ১৯৫৭ সালে পলাশীর প্রান্তরে তার দৃঢ় ভিত নড়ে যায় প্রচন্ড ভাবে গোলামীর জিঞ্জরে আবদ্ধ হয়ে হারানো গৌরবের শোকে মুহ্যমান মুসলিম জাতি একদিকে হয়ে পড়ে নিস্ক্রিয়, অপরদিকে ইংরেজদের অত্যাচার-উৎপীড়ন, জেল-জুলুম, বেপরোয়া ফাঁসি এবং হিন্দুদের মুসলিম নিধন যজ্ঞে মুসলিমরা একে একে হতে থাকে দুর্বল। ধর্ম চিন্তা, নৈতিকতা, সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও শিক্ষাসহ সকল ক্ষেত্রে দেখা দেয় চরম বন্ধ্যাত্ব ও এবং অধঃপতন।
১৭৯৯ সালে হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ (রহ.) এর চিন্তাধারায় আপ্লুত মহীশুরের টিপু সুলতানের ইংরেজদের কাছে পরাজয় এবং সর্বশেষ ১৮০৫ সালে দিল্লী ইংরেজদের দখলে চলে গেলে মুসলমানদের অবশিষ্ট মনোবল একেবারে চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যায়। ১৮৩১ সালে বালাকোটের ময়দানে সৈয়দ আহমদ বেরেলভী (রহ.) এর শাহাদাত এবং পরবর্তীতে ইং ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিপ্লব ব্যর্থ হয়ে যাবার পর উপমহাদেশে মুসলমানদের রাজনৈতিক জীবনের ন্যায় শিক্ষা, সংস্কৃতি, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক জীবনও সংকীর্ণ ও দুর্বিসহ হয়ে ওঠে।
এমনই এক পরিস্থিতিতে শায়খুল ইসলাম হযরত মাওলানা মোঃ আব্দুল হাই সিদ্দিকী (রহ.) যখন কর্মজীবনে প্রবেশ করলেন,
তখন সমাজের যে অবস্থার চিত্র তাঁর চোখের সামনে ফুটে উঠলো তা সংক্ষেপে নিম্নরূপ
- মুসলমানরা শিক্ষা দীক্ষায় চরমভাবে পিছিয়ে পড়েছিল। মুসলামানদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা মাদ্রাসার সংখ্যা ছিল একেবারে নগন্য।
- হিন্দুরা সর্ব প্রকার সুযোগ পেয়ে আধুনিক শিক্ষা গ্রহণ করে সমাজের অধিকাংশ বড় বড় পদসহ জমিদারী পর্যন্ত বাগিয়ে নিয়েছিল। অপরদিকে মুসলমানরা হয়ে পড়েছিল অস্পৃশ্য, মুর্খ, নির্যাতিত গরীব প্রজা। হিন্দু রাজা ও জমিদাররা মুসলমানদের ঐতিহ্য ধ্বংস করার জন্য অর্থনৈতিক নিপীড়নের সাথে সাথে ধর্মীয় ব্যাপারে বিপর্যয় ঘটানোর সর্বাত্বক প্রচেষ্টা চালাচ্ছিল।
- আশরাফ-আতরাফের শ্রেণীভেদ, বংশ গৌরব ও জাতি বৈষম্য মুসলিম সমাজকে জর্জরিত করে তুলেছিল। কুলি, তাঁতী, তৈলী, চাষী প্রভৃতি পেশাজীবী লোকদের হেয় দৃষ্টিতে দেখা হ’ত এবং তাদের সাথে কোন আত্মীয়তা করতে মানুষ ঘৃণা করতো।
- তাড়ী, মদ, গাঁজা, ভাং, আফিম, সুদ-ঘুষ, গান বাজনা, বেনামাজ, বে-পর্দা ইত্যাদিতে সমাজ ছেয়ে গিয়েছিল।
- বিভিন্ন বিদয়াতী ফকীরের অতি জঘন্য দল ও মত সমাজের সর্বস্তরে শিখড় গেড়ে বসেছিল।
- কবরপূজা, কবর চুম্বন, হাজত-মানত করা, বিনা প্রয়োজনে কবরে বাতি জ্বালানো, কাওয়ালীর মজলিস করা, মহরম মাসে তাজিযা বের করা, ইমাম হোছাইনের দরগাহ তৈরী করা, পীরের নামে অজীফা পড়া, ফকীরি বিদ্যা, সিনায় সিনায় আসা, জ্বীন হাসিল করা মৃত পীর বা নবীকে মজলিসে হাজের নাজের জানা, পীরের কবরকে গোসল দিয়ে সেই পানি পান করা উত্তর, পশ্চিম কোনে বোগদাদী সিজদা করা, কুরআন শরীফ ৪০ পারা ধারণা করা এবং তন্মধ্যে ১০ পারা ফকীরদের সিনায় সিনায় আসা, শরিয়ত থেকে মারেফাতকে ভিন্ন জানা, নবীপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পেটে বাঁধা পাথর পাবার দাবী করা ওয়াজের মজলিশে মিথ্যা হাদীস বলা, সৈয়দ ছাড়া অন্য কেউ পীর হতে পারবে না ধারনা করা, সূর্য অস্তের দশ মিনিট পর ইফতার করা ইত্যাদি হাজারো বাতেল, কুফরী ও শেরেকী আকীদা ও কার্যাবলীতে সমাজ ছেয়ে গিয়েছিল।
- মুসলমানরা এত নীচে নেমে গিয়েছিল যে, গোড়া পীর, তেনা পীর, মানিক পীর, সত্য পীর, ইটা পীর, ভিটা পীর, ঢেলা পীর ইত্যাদির নামে মানত, সিন্নি , উরস্ বা স্মৃতি বার্ষিকী মেলা করাই ছিল তাদের কাছে ধর্মানুষ্ঠান।
- নবুওয়াতের মিথ্যা দাবীদার, ইংরেজদের পাচাটা গোলাম হুজুরে পাক (দ.)-এর খতমে নবুওয়াতকে অস্বীকারকারী ভন্ড মুর্তাদ মীর্জা গোলাম আহমদ প্রবর্তিত কাদিয়ানী ধর্মমতের প্রচারকার্য তখন পূর্ণোদমে চলছিল। বিচারপতি জাষ্টিস স্যার জাফরুল্লাহ খান, মুহাম্মদ আলী (এম, এ এল এল বি) খাজা কামাল উদ্দীন (লন্ডন ওকিং মসজিদের ইমাম)সহ বহু উকিল, ব্যারিষ্টার, মাষ্টার ও উচ্চ রাজকর্মচারীগণ কাদিয়ানী ধর্মমত গ্রহণ করে ইসলামের ছদ্মাবরনে এই মতবাদের প্রচার কার্য চালাচ্ছিল। সরল বিশ্বাসে তাদের কথা মেনে নিয়ে বেঈমান হচ্ছিল বাংলার মুসলমান।
- শিয়াদের আকীদা-বিশ্বাস এবং রুসুম-রেওয়াজ সমাজে ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করেছিল। আশুরার দিন কারবালার স্মরণে তাজিয়া বের করে, বুক চাপড়িয়ে মাতম করে এবং আরও অনেক বেশরা কাজ করে শোক প্রকাশ করা হত।
- বিধর্মী মিশনারীদের ব্যাপক প্রচারাভিযানের ফলে এদেশের সরলপ্রাণ মুসলমানরা দলে দলে বিধর্মী হয়ে যাচ্ছিল।
- কমূনজম বা নাস্তিকতাবাদ তখন বাংলার মাটিতে প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করেছিল।
- খারেজী, মোতাজিলী ও কাদরিয়া, জবরিয়া দলের প্রসার ঘটাতে শুরু করেছিল।
- হিন্দুয়ানী ধ্যান-ধারণা ও পূজা পার্বন মুসলিম সমাজে বিস্তার লাভ করেছিল। মুসলমান পুরুষ ও মহিলারা দল বেঁধে হিন্দুদের পূজায় শরীক হতো, পূঁজায় চাঁদা প্রদান ছাড়াও মুসলমানরা লক্ষ্মী পূজা, স্বরস্বতী পূজা, পদ্মাদেবীর পূজা, ওলাউটা দেবীর পূজা, শীতলাদেবীর পূজা করতেও মোটেই ইতস্তত করত না। ঠাকুর ঘরে মানত মানা সাধারণ ব্যাপার ছিল। সুলক্ষন ও কুলক্ষণ, যাত্রা অযাত্রা, বিয়ের দিন তারিখ, অমাবশ্যা পূর্ণিমা ইত্যাদি নিয়ে হাজারো কুসংস্কারে সমাজ ছেয়ে গিয়েছিল।
- মুসলামনী পোষাক ছেড়ে সার্ট, প্যান্ট, কোট, টাই, ধূতি ইত্যাদি বিজাতীয় পোষাক পরিধান করা সাধারণ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। এমনকি মুসলমানদের হিন্দুয়ানী নাম রাখা হ’ত এবং নামের পূর্বে শ্রীযুক্ত হত।
- সুদ খাওয়া, সুদী কারবার করা, জমি বন্ধক রাখা, সুদ জাতীয় পন্থায় জমি ও ফসলের কারবার করা এদেশে মারাত্মক ব্যাধির ন্যায় বিস্তার লাভ করেছিল। খুব সংখ্যক লোক পাওয়া যেত যারা সুদ খেতো না।
- বিয়েতে পণ প্রথা, হলুদ বাটা, গায়ে হলুদ, ফুরুল সাজান, পাত্র-পাত্রী নামে দিয়ার ভাসান ইত্যাদি কঠিন গুনাহর কাজ শরিয়তী ইসলাম আচ্ছন্ন করে ফেলেছিল।
- নতুন নতুন মিথ্যা মাজার ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে উঠেছিল এবং সেগুলো গাঁজাখোর, লম্বাচুলধারী মেয়ে পুরুষে পাশবিক ভোগের আড্ডাখানায় পরিণত হয়েছিল। এছাড়া গ্রামে গঞ্জে, হাটে-বাজারে বাউল ফকীরদের গান বাজনা আর গাজার আসর গড়ে উঠেছিল। ভন্ড পীরে ছেয়ে গিয়েছিল গোটা দেশ।
- গ্রামে-গঞ্জে বিরাট বিরাট মেলা বসতো। এ সকল মেলায় নারী পুরুষের সমাগমসহ যাদু তেলেসমাতি, নাচ-গান, জুয়া, ঘোড়-দৌড়, নৌকা-বাইচ ইত্যাদি বেশরিয়ত কাজকর্ম চলতো।
মোটকথা-শেষ নবী হযরত রাসূলে করীম (দ.) এর নবুওয়াত প্রাপ্তির সময়ে সমগ্র বিশ্ব বিশেষ করে আরব জাহানে যে অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল, যার কারণে ঐতিহাসিকরা ঐ সময়কে জাহিলিয়াত যুগ বলে উল্লেখ করেছেন, ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলমানদের উপরও তখন অনেকটা তদ্রুপ জাহিলিয়াত তথা মুর্খতা চেপে বসেছিল।
[(১) স্মরণিকা সিদ্দীকিয়া ৪ঠা জানুয়ারী ৯৪, ২) হযরত আব্দুল হাই সিদ্দিকী (রহ.) এর জীবনী মুহাঃ ইব্রাহিম তর্কবাগীশ, (৩) হযরত আব্দুল হাই সিদ্দিকী (রহ.) এর জীবন ও বাণী-মাওলানা সিরাজুল ইসলাম]
সেই সময়ে উপমহাদেশের মুসলমানদের অবস্থা কতটা শোচনীয় হয়ে পড়েছিল তার প্রমাণ আমরা পাই জার্মান ঐতিহাসিক ঐধহং কড়যহ এর অ ঐরংঃড়ৎু ড়ভ ঘধঃরড়হ রহ ঃযব ঊধংঃ গ্রন্থের ১৫ পৃষ্ঠায়,
ওহ ওহফরধ বংঢ়বপরধষষু, সধহু ঢ়বড়ঢ়ষব বিৎব গড়যধসসবহঃ ড়হষু হধসব. ঞযবু ড়নংবৎাবফ ঃযব ঃযবরৎ ষড়ংি ড়ভ রহযবৎরঃধহপব ধহফ সধৎৎরধমব, ধহফ ঢ়ৎধুবফ ঃড় ঃযবরৎ হবরমযনড়ৎং সধহু এড়ফং,
অর্থঃ তৎকালে অনেক লোক, বিশেষ করে ভারতে, শুধু নামে মাত্র মুসলমান ছিল। তারা হিন্দুদের রীতিনীতি মেনে চলতো। তাদের পূজা পার্বনের অনুষ্ঠান উপভোগ করতো। বিবাহশাদী ও সম্পত্তির উত্তরাধিকারের ব্যাপারে তাদের নিয়মকানুন মেনে চলতো এবং তাদের বহু দেব-দেবীর উপসনা করতো। (হক্বীক্বতে ইনসানিয়াত, মুহাঃ ইব্রাহিম তর্কবাগীশ, পৃ ঃ৭)
জাতির এমনি এক মহা দুর্যোগময় মূহূর্তে যোগ্য পিতার উত্তরসূরী হযরত মাওলানা মোঃ আব্দুল হাই সিদ্দিকী (রহ.) সর্বপ্রকার জাহেলিয়াত আর বাতেল মতবাদের মুলোৎপাটন করে এদেশের মুসলিম সমাজকে কুরআনী আলোর নুরাণী আভায় স্নাত করার প্রত্যয় দীপ্ত শপথ নিয়ে এগিয়ে আসেন। প্রথমে পিতার সাথে এবং পরে পিতার স্থলাভিসিক্ত হিসেবে তিনি আজীবন সমাজ সংস্কারের কাজে স্বীয় জান-মাল উৎসর্গ করে গিয়েছেন।