সর্বশেষ অসুস্থতা এবং ইন্তেকাল
তিনি ছিলেন ফুরফুরার পীর। এটা তাঁর পদবী। মুরীদ, প্রতিনিধি, খোলাফা এবং আমজনতা মুসলমানদের কাছে তিনি জগতশ্রেষ্ঠ ওলিআল্লাহ হিসেবে মর্যাদা পেয়েছিলেন। এই কথার প্রমাণ হিসেবে প্রখ্যাত আলেম, বর্ষীয়ান মুরুব্বী, দারুস্ সালাম আল জামিয়াতুস সিদ্দিকীয়া-এর প্রধান মুফতি এবং শাইখুল হাদীস, জাতীয় শরীআহ্ কাউন্সিলের সেক্রেটারি, হযরত মাওলানা ছাঈদ আহমাদ মুজাদ্দেদী বিগত ২২ শে ডিসেম্বর শুক্রবার কয়েক লক্ষ মানুষের উপস্থিতিতে দারুস্ সালামে দরবারে ফুরফুরার মার্কাজে ইশাআতে ইসলাম কমপ্লেক্সে আয়োজিত স্মরণ-সভায় বার্ষিক মাহফিলের স্টেজ থেকে তাঁর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অত্যন্ত আবেগ আপ্লুত কণ্ঠে ক্রন্দনরত অবস্থায় বলেছিলেন যে, কুরআন-হাদীসে আল্লাহ পাকের ওলি কারা এ সম্বন্ধে যে সমস্ত নমুনা দেওয়া হয়েছে নি:সন্দেহে সেই বিচারে মরহুম পীর সাহেব একজন ওলি আল্লাহ ছিলেন।
হযরত মাওলানা ছাঈদ আহমাদ সাহেবের মুখে এই উক্তির মূল্য আছে, কারণ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বেফাঁস কথা বলা তার স্বভাব নয়। আমরা এও জানি তিনি কাউকে ওলি আল্লাহ বলা পছন্দ করতেন না, বিশেষত বহু পীর সাহেবের নামের সঙ্গে ওয়াজ মাহফিলের পোস্টারে ওলিয়ে কামেল ছাপা হলে তিনি বলতেন, এভাবে গড়পড়তা ঢালাওভাবে ওলি আল্লাহ লকব দেওয়া ঠিক নয়। ফুরফুরার পীর সাহেব মরহুম মাওলানা আব্দুল কাহ্হার সিদ্দিকী (রহ.) নিজেও বলতেন, পোস্টারে আমার নাম ফুরফুরার পীর হিসেবে দেবে, ওলি আল্লাহ বা ওলিয়ে কামেল ইত্যাদি লিখবে না। আমি ওলি কিনা তা প্রমাণ হবে যেদিন হাশরের ময়দানে মিজানে নেকীর পাল্লায় আমল ওজন করা হবে তার পরে। বহু বছর ধরে আমরা এভাবে তাঁর হুকুমে কেবল পদবী ফুরফুরার পীর লিখতাম।
একজন পীর হিসেবে মানুষকে আধ্যাত্মিক জ্ঞান সাধনার শিক্ষা তিনি দিতেন। কিন্তু পাশাপাশি সমাজে ইসলামী শিক্ষা বিস্তারের জন্য বহু মাদরাসা, বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষার উপর গুরুত্ব দিয়ে মহিলা মাদরাসা স্থাপন করেছেন, দেশের স্বার্থে সমসাময়িক অবস্থার প্রেক্ষিতে মাঝে মাঝেই পত্রিকায় বক্তব্য প্রকাশ করতেন। গরীব শিশুদের জন্য এতিমখানা গড়েছেন। দেশের আলেম সমাজ এবং রাজনৈতিক নেতাদেরকে দেশের এবং ইসলামের স্বার্থে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য গড়ার প্রেরণা দিয়েছেন এবং নিজে সকল দল-মত-সংগঠনের সঙ্গে সদ্ভাব রক্ষার মাধ্যমে বৃহত্তর ঐক্য সৃষ্টির দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বহু সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত সমস্যায় বিচলিত হয়ে তাদেরকে পরামর্শ, সুপারিশ, অর্থসম্পদ ইত্যাদির মাধ্যমে সহায়তা করেছেন। ব্যক্তিকেন্দ্রিক না হয়ে ফুরফুরা যেন সমাজ সেবা ও সংস্কার এর ভূমিকায় অবদান রাখে সেদিকে লক্ষ্য রেখে ফুরফুরার সংগঠনসমূহকে গণমুখী এবং বৃহৎ মঞ্চের দিকে পরিচালিত করেছেন, অত্যন্ত নামগুলো শুনেই তা বুঝতে পারা যাবে; যেমন, মার্কাজে ইশাআতে ইসলাম (অর্থাৎ ইসলাম প্রচার কেন্দ্র, কিন্তু ফুরফুরার প্রচার কেন্দ্র নাম দেননি) জমিয়তুল মুসলিমিন হিযবুল্লাহ (অর্থাৎ আল্লাহ পাকের দল মুসলমানদের সংগঠন কিন্তু ফুরফুরার মুরীদের সংগঠন নাম দেননি এবং ওয়াজেও বলতেন যে, দুনিয়ার সমস্ত মুসলমান হচ্ছে আল্লাহ পাকের দল) সুতরাং এহেন উদার নৈতিক কর্মবীর, সমাজ হিতৈষী, সংস্কারক, জননেতা, ধর্মীয় নেতা, আধ্যাত্মিকতার ওস্তাদ পীর বিরল এবং তাঁর সম্পর্কে মানুষ আরো কিছু জানতে চাইবেন সেটা স্বাভাবিক।
হুজুরের ইন্তেকাল হয় ২০ শে ডিসেম্বর, ২০০৬ সন, বুধবার। জানাযার নামায হয় ২২ শে ডিসেম্বর, শুক্রবার। ২০ থেকে ২২ শে ডিসেম্বর প্রতিদিন বহু মানুষ দারুস্সালামে, মার্কাজে ইশাআতে ইসলাম কমপ্লেক্সে এসেছেন। দেশের দূর দূরান্ত এবং বিদেশ থেকেও অনেকে এসে যেন জানাযায় শরিক হতে পারেন সেজন্য শুক্রবার ২২ শে ডিসেম্বর পর্যন্ত বিলম্ব করা হয়। কয়েক লক্ষ মানুষ জানাযায় শরিক হয়েছিলেন; কমপ্লেক্সের বিশাল চত্বর, পার্শ্বের একটি মাঠ, মিরপুর রোড পর্যন্ত বিশাল খোলা প্রান্তর, পার্শ্ববর্তী এলাকাতেও স্থান সংকুলান না হওয়ায় মানুষ মিরপুর রোডের উপর দাঁড়িয়ে যায় এবং রাস্তার গাড়ি চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এদেশে এমন ঘটনা বিরল।
তৎসত্ত্বেও বহু মানুষ আজ ২৭/১২/২০০৬ অবধি দারুস্ সালামে এসে বলছেন তাঁরা আগে জানতে পারেননি। অনেকেই জানতে চেয়েছেন হুজুরের শেষ দিনগুলোর সম্পর্কে। সেজন্য আমরা সংক্ষেপে একটা বিবরণ প্রকাশ করছি। এই বিবরণটি প্রণয়ন করেন হুজুরের প্রতিষ্ঠিত ইশাআতে ইসলাম কুতুবখানা কর্তৃপক্ষ। প্রণয়নের পূর্বে সংশ্লিষ্ট সকলের সঙ্গে পরামর্শ করা হয়েছে। বিশেষ করে হুজুরের দীর্ঘদিনের সহচর, নূরু ভাই নামে পরিচিত হুজুরের গাড়ির ড্রাইভার এবং ওয়াজ মাহফিলের তারিখ নির্ধারণ ও বহুবিধ কাজের তদারককারী জনাব নূর আহমদ, হুজুরের দীর্ঘদিনের সহচর ও খাদেম জনাব মাওলানা আবুল হাশেম, সাম্প্রতিক সময়ের সহচর ও খাদেম মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম, তাকে হুজুর তার সার্বক্ষণিক ওযু রাখার চেষ্টার জন্য প্রশংসা করতেন এবং আদর করে বড় আব্বা সম্বোধন করে কৌতুক করতেন, ইশাআতে ইসলাম কুতুবখানার কর্মচারী আনোয়ার হোসেন, হুজুরের দীর্ঘদিনের সহচর এবং যাকে নিজ অভিভাবকত্বে বিয়ে দিয়েছেন ও প্রত্যেক সফরে যাবার সময় যাকে ডেকে ঘরের দিকে সর্বদা খেয়াল রাখতে নির্দেশ দিতেন, হুজুরের একান্ত আদরের জনাব রজব আলী, হুজুরের প্রিয় দারুস সালাম মাদরাসার ছাত্র মো. রিফাত উল্লাহ, সে নিজের পড়াশুনার ফাঁকে প্রায়ই হুজুরের খেদমত করতো এবং শেষ দিনগুলিতে কাছাকাছি থাকতো, জনাব হারুনুর রশীদ, যিনি হুজুরের নিজের লোক হিসেবে সর্বত্র পরিচিত, তিনি হুজুরের অন্যতম প্রতিনিধি হিসেবে বহু গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক কাজের দায়িত্বপ্রাপ্ত, হুজুরের ছোটোবেলার থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সাথী ও সমবয়সী হয়েও যিনি নির্দ্বিধায় সব বয়সের মানুষের সঙ্গে প্রাণখুলে মিশে যেতে পারেন এবং যাঁকে সম্প্রতি তাঁর কর্মস্থল থেকে ডেকে সার্বক্ষণিক দারুস্ সালামে থাকতে হুজুর হুকুম দিয়েছিলেন এবং নির্দ্বিধায় তিনি সে হুকুম পালন করে ব্যক্তিগত সকল অসুবিধা মেনে নিয়ে, প্রত্যেক দিকে লক্ষ্য রেখে হুজুরের অসুস্থতায় ব্যবস্থাপনা, হুজুরের ইন্তেকালে হুজুরের পরিবারের সদসদের শোকাহত অবস্থায় সান্তনা, জানাযা ইত্যাদি সকল বিষয়ের ব্যবস্থাপনা ইত্যাদিতে যাঁর ঐকান্তিক অবদান সকলে সন্তুষ্টচিত্তে অনুভব করেছেন সেই আমাদের মুরুব্বী মেজো হুজুর মুফতিয়ে আযম মাও. আবু ইব্রাহীম মো. ওবায়দুল্লাহ সিদ্দিকী (হাফিযাহুল্লাহ) এর সঙ্গে পরামর্শ করা হয়েছে। একথাও অবশ্যই উল্লেখ করা দরকার যে, হুজুরের বড় সাহেবজাদা ও ফুরফুরার বর্তমান গদ্দিনিশীন পীর হযরত আল্লামা আবুবকর আব্দুল হাই মিশকাত সিদ্দিকী, মেজ সাহেবজাদা হযরত মোস্তাফা মাদানী সিদ্দিকী, ছোট সাহেবজাদা হযরত ফতেহ আলী আয়াতুল্লাহ সিদ্দিকী সাহেব সহ মরহুম হুজুরের সঙ্গী ও সর্বজন প্রিয় হারুন ভাইয়ের সঙ্গে অবশ্যই পরামর্শ করা হয়েছে। অন্যান্য যাদের সঙ্গে আলাপ করা হয়েছে সকলের কাছে কৃতজ্ঞতা জানাই।