গদ্দিনিশীন রাহবারে ফুরফুরা
মোঃ আব্দুল হাই সিদ্দিকী (রহ.)-এর বলিষ্ঠ ভূমিকা শীর্ষক এক প্রবন্ধে লিখেছেন-
পূর্ব হইতেই ভারতের হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে স্বার্থের দ্বন্দ্ব থাকায় রাজনৈতিক সমস্যা বিরাজ করিতেছিল। এক সময় ভারতের সংখ্যালঘু মুসলমানদের অধিকার রক্ষার জন্য অনন্যোপায় হইয়া মুসলমান নেতারা এই দুই জাতির ভিত্তিতে ভারত বিভাগের দাবি করেন। কংগ্রেস নেতাগণ ভারত বিভাগের তীব্র বিরোধীতা করিতে থাকেন।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় বৃটিশ সরকার খুব বিব্রত হইয়া পড়েন। ইহার ফলে ভারতের স্বাধীনতার পথ সুগম হয়। প্রতিশ্রুতি মোতাবেক ভারতের রাজনৈতিক সমস্যা সমাধানের জন্য বড় লাট লর্ডওয়াভেল একটি অন্তবর্তী সরকারের পরিকল্পনা রচনা করেন এবং বৃটিশ সরকারের অনুমোদনক্রমে ১৯৪৫ সালের ১৪ ই জুন এই পরিকল্পনা ঘোষণা করেন। এই পরিকল্পনায় অন্তবর্তী সরকারের প্রতিনিধিত্বের ব্যাপারে কংগ্রেস ও লীগ নেতাদের মধ্যে মতানৈক্য দেখা দেয়। মুসলিম লীগের দাবি ছিল যে-ভারতে মুসলিম লীগই মুসলমানদের একমাত্র প্রতিনিধি ও ক্ষমতাসম্পন্ন দল। কিন্তু কংগ্রেসের দাবি ছিল যে-কংগ্রেসই ভারতের জাতীয় প্রতিষ্ঠান এবং ভারতের সকল সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিত্ব করিবার অধিকার একমাত্র তাহাদেরই।
এই পরিস্থিতিতে বৃটিশ সরকার কংগ্রেস ও লীগের প্রতিনিধিত্ব করিবার দাবী পরীক্ষা করিবার প্রয়োজন উপলব্ধি করে ১৯৪৫ সালের ২১ শে আগস্ট বড় লাট ঘোষণা করেন যে, আগামী শীত মৌসুমে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক আইন সভাগুলির জন্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে। নির্বাচনের পর শীঘ্রই একটি সংবিধান সভা গঠিত হইবে এবং প্রধান দলগুলির সহায়তায় অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হইবে।
কংগ্রেস, মুসলিম লীগ ও অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলি বৃটিশ সরকারের সাধারণ নির্বাচনের প্রস্তাব গ্রহণ করে। কংগ্রেস জাতীয় প্রতিষ্ঠানরূপে অখন্ড ভারতের আদর্শে নির্বাচনে প্রতিযোগিতা করিতে প্রস্তুত হয়। তৎকালীন কতগুলি মুসলিম দল মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব করিবার দাবী করিত, আবার কংগ্রেসের অখ- ভারতের নীতিতে বিশ্বাসীও ছিল। ফলে তাহারা মুসলিম লীগ হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া পড়ে।
মুসলিম লীগ ভারতের মুসলমানদের একমাত্র প্রতিনিধিত্বকারী রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। ইহা প্রমাণ করিবার জন্য লীগ নেতাগণ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দীতা করিবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। মুসলিম লীগ ও মুসলমানদের ইতিহাসে এই নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
সর্বভারতের মধ্যে বাংলাদেশের মুসলমানদের সংখ্যা ছিল সবচাইতে বেশি। বাংলাদেশের মুসলমানগণ নির্বাচনে অন্যান্য প্রদেশের মুসলমানদের অপেক্ষা বেশি ভোট দিয়া মুসলিম লীগের শক্তির পরিচয় দিয়াছিল। এই সাফল্যের পিছনে ফুরফুরার পীর সাহেবের ঐকান্তিক চেষ্টা, সমর্থন ও রূহানী দোয়া সহায়ক ছিল।
মুসলিম লীগ পাকিস্তান দাবীর ভিত্তিতে এই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। ফুরফুরার পীর সাহেব রাজনীতি করেন নাই। কিন্তু মুসলমানদের বৃহত্তর স্বার্থে তিনি সাময়িকভাবে মুসলিম লীগকে জোর সমর্থন দান করেন এবং নেতাগণকে পরামর্শ দেন। এখানে উল্লেখ করা যাইতে পারে যে, এইচ, এস, সোহরাওয়ার্দী, জনাব খাজা নাযিমুদ্দিন, এ, কে ফজলুল হক ইনারা সকলেই ফুরফুরার পীর সাহেবের মুরিদ ও ভক্ত ছিলেন। মাওলানা আকরাম খাঁ সাহেব ফুরফুরার পীর সাহেবের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা পোষণ করিতেন।
১৯৪৫ সালের নভেম্বর মাসে কেন্দ্রীয় আইন সভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ৩০টি মুসলমান আসনের সব কয়টি মুসলিম লীগ দখল করে। ফুরফুরার পীর সাহেবের নিকট তৎকালীন মুসলমানরা ভারতের মুসলমানদের স্বার্থে পরামর্শ ও দোয়া কামনা করিতেন। কখনও ফুরফুরার হযরত পীর সাহেব বিভিন্ন মিটিংয়ে তাহার পক্ষ হইতে প্রতিনিধিত্ব করিবার জন্য তৎকালীন ফুরফুরার মুহাদ্দিস (দেওবন্দ হইতে ফারেগ) হযরত মাওলানা ইসহাক মাদানীপুরী সাহেবকে পাঠাইতেন।
১৯৪৬ সালের মার্চ মাসে প্রাদেশিক আইন সভার নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। প্রাদেশিক নির্বাচনী সংস্থার কর্মসচিব জনাব সোহরাওয়ারর্দী ফুরফুরার হুজুরের নিতান্ত ভক্ত ও মুরিদ ছিলেন। পদাধিকার বলে প্রাদেশিক আইন সভার (বাংলার) জন্য নমিনেশান লিস্ট তৈরি করার ব্যাপারে তিনি ফুরফুরার পীর সাহেবের উপরে সম্পূর্ণ দায়িত্ব ছাড়িয়া দেন। ফলে ফুরফুরার পীর সাহেব এককভাবে সারা বাংলার মুসলিম লীগের প্রার্থীদের তালিকা তৈরি করেন এবং উহা অনুমোদনের জন্য প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সভাপতি মাওলানা আকরাম খাঁ সাহেব লাহোরে জ্বিন্নাহ সাহেবের নিকট লইয়া যান। জ্বিন্নাহ সাহেবের একজন একান্ত পরিচিত ব্যক্তি যশোর জেলার বিশিষ্ট নেতার নাম তালিকায় না থাকায় জ্বিন্নাহ সাহেব অসন্তুষ্ঠি প্রকাশ করেন এবং মাওলানা আকরাম খাঁ সাহেবের সহিত কথোপকথন শুরু করেন।
জ্বিন্নাহ সাহেব: এই লিস্ট কোন বানায়া হায়? অর্থাৎ এই নমিনেশানের তালিকা কে বানিয়েছেন?
উত্তরে মাওলানা আকরাম খাঁ: এই লিস্ট ফুরফুরার পীর সাহেব তৈরি করিয়াছেন।
জ্বিন্নাহ সাহেব: আপলোগ মোল্লাহ মুন্সী মে লিস্ট বানা লেতে হ্যাঁয়? অর্থাৎ আপনারা মোল্লা মুন্সীদের নিকট থেকে লিস্ট তৈরি করেন?
মাওলানা আকরাম খাঁ সাহেব: এই মোল্লা মুন্সী নাহি, ইনহোনে আগার বিগাড় যায়ে তো সারা বাংলা, আসাম বিগাড় যায়ে গা। আপ দাস্তাখাত লাগা দিজিয়ে।
অর্থাৎ ইনি মোল্লাহ মুন্সী নহেন। ইনি যদি বিরোধী হয়ে যান, সমস্ত বাংলা ও আসামের মানুষ (লীগ) বিরোধী হয়ে যাবে। কাজেই আপনি এই প্রার্থী তালিকা অনুমোদনের সহি দ্বিধাহীন চিত্তে করিয়া ফেলুন।
জ্বিন্নাহ সাহেব: হ্যাঁ আসসি বাত হ্যায়, বাস আওর কোই বাত নাহি। মাই দাস্তাখাত লাগাতা হুঁ। অর্থাৎ হ্যাঁ এমন কথা! আর কোন কথার প্রয়োজন নাই। আমি সহি করিয়া দিলাম।
লাহোর হইতে অনুমোদনকৃত প্রার্থীদের তালিকা মাওলানা আকরাম খাঁ সাহেব লইয়া আসিলেন। উল্লেখ্য যে, মাওলানা আকরাম খাঁ সাহেব অন্য মাযহাবের লোক ছিলেন। তথাপিও তিনি মুসলমানদের বৃহত্তর স্বার্থে ফুরফুরার পীর সাহেবের সঙ্গে হাত মিলাইয়া কাজ করিয়াছেন। এই ব্যাপারে তাহাদের সঙ্গে কোন দিন কোন মনমালিন্য ঘটে নাই।
ফুরফুরার পীর সাহেব মুসলিম লীগের এই প্রাদেশিক আইন সভার নির্বাচন তথা পাকিস্তান আন্দোলনকে রূপায়িত করার সংগ্রামে ঝাঁপাইয়া পড়েন। মুরিদ ও মুহেব্বীনগণ নিজ পীরের নির্দেশ পালন করার জন্য মাঠে ময়দানে নামিয়া মুসলিম লীগের সফলতার জন্য প্রচার কার্য চালাইতে থাকেন।
একদিনের ঘটনা এই রকম ছিল যে, জনাব সোহরাওয়ারর্দী পীর সাহেবকে বলিলেন, নওশের আলীকা মুকাবিলামে এক আদ্না সা মেরেজ রেজিস্টার কিস তারেহসে জিত সাখতা? এইতো সের কা মুকাবিলা মে গিধাড় হ্যায়।
অর্থাৎ সোহরাওয়ার্দী বলিলেন, হুজুর, নওশের আলীর প্রতিপক্ষ সামান্য একজন ম্যারেজ রেজিস্টার। এই লিস্ট আপনি তৈরি করিয়াছেন। আমরা মুরিদ হিসাবে আপনার কাজের প্রতিবাদ করার কোন সাহস করি নাই। আমার জ্ঞানে নওশের আলী একজন সিংহ বাঘ, আর নওশের আলীর প্রতিপক্ষ একজন সামান্য ম্যারেজ রেজিস্টার, শক্তির তুলনায় একজন শিয়াল সমতুল্য। ঐ ব্যক্তি কেমন করিয়া জিতিতে পারে?
