গদ্দিনিশীন রাহবারে ফুরফুরা

জীবনপণ প্রতিজ্ঞা

ফুরফুরার মরহুম পীর সাহেব (রহ.) ছিলেন শিরক বিদআতের বিরুদ্ধে আপোষহীন। সকল প্রকার শিরক বিদআত হতে মুসলিম সমাজকে মুক্ত করার জন্য তিনি দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন। তাঁর সংগ্রাম ছিল সমাজকে শিরক বিদআত মুক্ত করার সংগ্রাম। এ ব্যাপারে যে কোন ত্যাগ স্বীকার করতে তিনি সদা প্রস্তুত ছিলেন। হুজুরের জীবনপণ প্রতিজ্ঞা ছিল। মুসলিম সমাজকে শিরক বিদআত মুক্ত করার জন্য প্রয়োজন হলে আমি আমার সমস্ত সম্পদ, বিবি, বাচ্চা সব কিছু এমনকি নিজের জানও কুরবানী করতে প্রস্তুত। শরীরের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও মুসলিম সমাজকে শিরক বিদআত মুক্ত করবোই ইনশাআল্লাহ। কয়েক যুগ আগেও এ উপ-মহাদেশের দীনী শিক্ষা প্রচারের একমাত্র মাধ্যম ছিল আরবি, উর্দু ও ফার্সি ভাষা। তৎকালীন সমাজে বাংলা ভাষায় দ্বীনি কিতাব খুঁজে পাওয়া দুষ্কর ছিল। ফুরফুরার তরফ থেকে সর্বপ্রথম বাংলা ভাষায় দীনী কিতাব এবং পত্র-পত্রিকা প্রকাশের উপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। ইসলামী বিশ্বকোষেও একথা উল্লেখিত। ফুরফুরার মরহুম পীর সাহেব (রহ.)এর নির্দেশে শত শত দীনী কিতাব প্রকাশিত হয়েছে। কুরআন-হাদীসের উপর গবেষণা করার জন্য তিনি কুরআন-হাদীস রিসার্চ সেন্টার এবং এই গবেষণালব্ধ কিতাব প্রকাশের জন্য ইশা’আতে ইসলাম কুতুবখানা প্রতিষ্ঠা করেছেন। ইতোমধ্যে এ প্রতিষ্ঠান থেকে শতাধিক কিতাব প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি কিতাব আন্তর্জাতিক খ্যাতি অর্জন করেছে। বেশ কয়েকটি ভারত থেকেও প্রকাশিত হয়েছে। বহু আর্থিক ক্ষতি স্বীকার করে হুজুর (রহ.) আজীবন মাসিক নেদায়ে ইসলাম পত্রিকা প্রকাশ অব্যাহত রেখে ছিলেন। এখনও তাঁর উত্তরসুরিরা এ পত্রিকা নিয়মিত প্রকাশ করছেন। এছাড়া মানবতা, Voice of Islam , Message of Islam প্রভৃতি সাময়িকী আকারে মাঝে মাঝে প্রকাশ করেছেন। উর্দু সাদায়ে কাউম ও আরবিতে হেলালে ইসলাম পত্রিকা প্রকাশ করার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। এছাড়া ট্যাবলয়েড সাইজে দুএক মাস পর পর ৪ পৃষ্ঠার সাময়িকী পত্রিকা এবং বিভিন্ন উপলক্ষে লক্ষ লক্ষ কপি হ্যান্ডবিল ছাপিয়ে মানুষকে ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন।শিক্ষা বিস্তারে ফুরফুরার অবদান অপরিসীম। ইংরেজ আমলে যখন মুসলমানদের শিক্ষার হার ছিল নিতান্তই নগণ্য সেই সময়ে ফুরফুরার প্রচেষ্টায় অসংখ্য মাদ্রাসা ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। মুসলমানদের শিক্ষিত করে তোলার এক বাস্তবমুখী পরিকল্পনা গৃহীত হয় ফুরফুরার তরফ থেকে। ফলে শিক্ষাব্যবস্থা দিন দিন উন্নত হতে থাকে এবং মুসলমানদের এক বিরাট অংশ শিক্ষিত হয়ে ওঠেন।

নারী শিক্ষা

নারী শিক্ষা বিস্তারেও ফুরফুরার অবদান চিরস্মরনীয় হয়ে থাকবে। ফুরফুরার মরহুম পীর সাহেব নারী শিক্ষার প্রতি অত্যধিক জোর দিতেন। তিনি বলতেন, কেবলমাত্র পুরুষ জাতির শিক্ষা ও প্রগতির দ্বারা সমাজের জাগরণ আসবে না। নারী জাতিরও শিক্ষা সংস্কারের বিশেষ প্রয়োজন। আদর্শ মাতা না হলে আদর্শ সন্তান আশা করা যায় না। তবে নারীদের শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে পর্দার সাথে। তাদের জন্য ভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। ফুরফুরার মরহুম পীর সাহেবের প্রচেষ্টায় ঢাকার দারুস সালামসহ দেশের আরও বেশ কয়েকটি স্থানে অনেকগুলো মহিলা মাদ্রাসা স্থাপিত হয়েছে। মাদ্রাসা ও মসজিদ প্রতিষ্ঠায় হযরত পীর সাহেব (রহ.)এর আত্মত্যাগ সত্যিই নজিরবিহীন। বাংলা-ভারতের আনাচে কানাচে তিনি অসংখ্য মাদ্রাসা ও মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেছেন। এছাড়া আরো অনেক জায়গায় জমি খরিদ করে গিয়েছেন মাদ্রাসা-মসজিদ করার নিয়তে। নিজের কষ্টার্জিত টাকার প্রায় সবটাই তিনি ব্যয় করতেন মাদ্রাসা-মসজিদের কাজে। মাদ্রাসার আয়ের ঘাটতি নিজের তহবিল হতে পূর্ণ করে দিতেন। একবারের ঘটনা। দারুস্সালাম মাদ্রাসার খুব অর্থ সংকট দেখা দেয়। হযরত পীর সাহেবের হাতেও টাকা নেই। এখন কী করবেন? হযরত পীর সাহেব (রহ) স্বীয় বিবির সোনার অলঙ্কারগুলো তাঁর এযাযত নিয়ে মাদ্রাসায় দিয়ে দিলেন। এমনকি ঘরের মূল্যবান জায়নামাযটিও দিয়ে দিলেন। এসব বিক্রি করে অর্থের সংস্থান করা হলো।আরেকবার মাদ্রাসা অর্থসংকটে পড়লে হযরত পীর সাহেব (রহ)কে তা জানানো হলো। হুজুর বললেন, বাবা হাতে টাকা নেই। ঘরের অলঙ্কার বা তদ্রুপ কোনো মূল্যবান বস্তুও দেখছি না যে বিক্রি করবো! এখন কি করা যায় ? অত:পর একজনের কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে তা মাদ্রাসায় দান করে দিলেন। ঢাকার দারুস্সালাম মার্কাজে ইশাআতে ইসলাম এবং পাবনার পাকশীতে দারুশ শরিয়ত রিয়াজুল জান্নাত নামে বহুমুখী দুটি ইসলাম প্রচারের কেন্দ্র বা কমপ্লেক্স তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন। দারুস্সালামে আগ্রার তাজমহলের নক্শায় এবং পাকশীতে হুমায়ুন টোম্বের নকশায় এতদঞ্চলের বিশাল দুটি দর্শনীয় মসজিদ নির্মাণের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। মসজিদ ছাড়াও এসব কেন্দ্রে সুবিশাল মাদ্রাসা, ইয়াতিমখানা, মুসাফিরখানা, খানকাহ, ওযুখানা, ইসালে সওয়াবের দর্শনীয় স্থায়ী স্টেজ ও গেট, কুতুবখানা ইত্যাদি স্থাপিত হয়েছে। শুধুমাত্র দারুস্সালামেই প্রায় দেড় হাজার ছাত্র-ছাত্রী দীনী শিক্ষা লাভ করছে। পাকশী ও দারুস সালাম মাদ্রাসা দুটোকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের জন্য হুজুর (রহ.) আজীবন সচেষ্ট ছিলেন। নামও দিয়েছিলেন পাকশী কুরআনী ইউনিভার্সিটি ও দারুস সালাম কুরআন-হাদীস বিশ্ববিদ্যালয়। আর্থিক অসচ্ছলতার কারনে হুজুর (রহ.) এর স্বপ্ন এখনও বাস্তবায়িত হয়নি।