গদ্দিনিশীন রাহবারে ফুরফুরা

সামান্য বিষয় নিয়ে ঝগড়া না করার আহবান

সামান্য ব্যাপার নিয়ে ফেৎনা-ফ্যাসাদ ও ঝগড়া-ঝাটি করে নিজেদের ধ্বংস ডেকে না আনার জন্য তিনি প্রতিটি জলসায় মুসলমানদেরকে হুঁশিয়ার করে দিতেন। তিনি বলতেন- সাবধান! জুজিয়াত মাসআলা নিয়ে ফেৎনা ফ্যাসাদ করো না, মুসলমানের ঘরে আগুন ধরিয়ে দিও না।(সাপ্তাহিক মানবতা,৫ম বর্ষ, ১ম, ২য়, ৩য়, সংখ্যা,পৃঃ১৩)

নিজেদের মধ্যে ঝগড়া ফ্যাসাদ না করার উপদেশ দিয়ে তিনি বলেন

কুরআন ঘোষণা করেছে-যদি তোমরা কোন বিষয় নিয়ে পরস্পর বিবাদ করে থাক, তা আল্লাহ ও রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও। অর্থাৎ আল্লাহ ও রাসূলের হুকুম মত ফায়সালা করে লও। হে জগতবাসী! যদি তোমাদের মধ্যে কোন কথা নিয়ে বা কোন বিষয় নিয়ে মতভেদ হয় ঝগড়া করো না,ফ্যাসাদ করোনা,আল্লাহর কুরআনের দিকে ফিরে যেও। কুরআনই তোমাদেরকে মীমাংসা করে দিবে। এরশাদ হয়েছে তোমরা ঝগড়া করোনা, কেননা তোমরা কমজোর হয়ে পড়বে। ঝগড়া-ফ্যাসাদ কওমকে কমজোর করে এবং ইজ্জত-হুরমত বিনষ্ট করে।(টেপরেকর্ড থেকে সংগৃহীত,মুহম্মদ ইব্রাহীম তর্কবাগীশ)

মিলাদ-কেয়াম নিয়ে বাড়াবাড়ি না করার উপদেশ

মিলাদ কেয়াম নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। একদল আলেম মিলাদ ও কেয়ামকে অপছন্দ করেন, বাকীরা জায়েজ ও মুস্তাহাব বলে জানেন। মিলাদ ও কেয়ামকে কেন্দ্র করে তৎকালনি মুসলিম সমাজ দ্বিধা বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। স্থানে স্থানে মিলাদ কেয়ামকে কেন্দ্র করে ঝগড়া-বিবাদ, মারামারি-এমনকি রক্তারক্তি পর্যন্ত হতে থাকে। এই চরম মুহূর্তে হযরত বড় (রহ.) ঘোষণা করেন, মিলাদ-কেয়াম মুস্তাহাব। আমি নিজে করি। আমার মুরিদ মোতাকেদীনগণও করে থাকে। মীলাদ-কেয়াম কোন মুসলমানের মাপকাঠি না। মীলাদ-কেয়াম করলেও কেউ জাহান্নামে যাবে না, না করলেও কেউ জাহান্নামে যাবে না। বরং যারা মিলাদ-কেয়াম ও খুটিনাটি বিষয় নিয়ে ফেৎনা-ফ্যাসাদ করবে-তারাই জাহান্নামে যাবে। (অসিয়ত ও নছিহত, মেজলা পীরজাদা মাওলানা আবু ইব্রাহীম সিদ্দিকী কর্তৃক সংকলিত, পৃঃ ৫ সপ্তাহিক মানবতা, ৫ম বর্ষ, ১ম ২য়, ৩য়, ও ৪র্থ সংখ্যা, পৃঃ ১৩)

আহলে হাদীসও আমার ভাই

হযরত বড় হুজুর (রহ.)-এর সময়ে লা-মাজহাবী ও মাজহাবী অর্থাৎ আহলে হাদীস ও হানাফীদের মধ্যে মত বিরোধ চরম আকার ধারণ করে। দুদলের মধ্যে ঝগড়া-ঝাটি, মারামারি, হানাহানি লেগেই থাকতো। এ সমস্যার সমাধানের জন্য হুজুর (রহ.) ঘোষণা করেন হানাফী, শাফেয়ী, হাম্বলী, মালেকী আমরা চার ভাই না, আমরা হলাম পাঁচ ভাই। আহলে হাদীসও আমাদের আর এক ভাই। তিনি আরো বলতেন, আহলে হাদীস-আহলে হানিফ, আহলে হানিফ আহলে হাদীস। হযরতের এ ঘোষণার ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে সাপ্তাহিক মানবতায় বলা হয়: তিনি (ফুরফুরার পীর সাহেব) ইঙ্গিত ইশারায় মাজহাবী ও লা-মাজহাবীদের বিভেদ বিশৃংখলা মিটিয়ে দিয়েছেন। অর্থাৎ উপরোক্ত ভাষণের দ্বারা তিনি বুঝিয়ে দিচ্ছেন- আয় মুসলমান! তোমরা আহলে হাদীস ও আহলে হানাফী বলে দুদল হয়ে মুসলমানের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করে সমাজকে কলুষিত করছো কেন? আসলে হানাফী মাজহাব ও অন্যান্য মাজহাবগুলো কুরআন ও হাদীস থেকেই এসেছে-কুরআন হাদীছের প্রকাশ নেই। অতএব মাজহাবী ও লা-মাজহাবী নিয়ে ফেতনা শুরু করা যে একেবারেই অমূলক এটাই হুজুর ইঙ্গিত ইশারায় বুঝিয়ে দিয়েছেন। (সাপ্তাহিক মানবতা, ৫ম বর্ষ, বিশেষ স্মরনিকা, পৃঃ ১৩)

তাবলীগ জামাত সম্পর্কে

হযরত (রহ.)-এর সমসাময়িককালে তাবলীগ জামাত বেশ প্রভাব বিস্তার করতে শুরু করে। কেউ কেউ তাবলীগি জামাতকে পছন্দ করতো, কেউ কেউ করতো না। অনেক চরমপন্থী আবার ওহাবী বলে তাবলীগ জামাতকে কাফের ফতোয়া দিতেও দ্বিধাবোধ করতো না। তাবলীগ ওয়ালারও বে-তাবলীগ ওয়ালাদের বিশেষ পছন্দ করতো না। এ পরিস্থিতিতে হযরত আব্দুল হাই (রহ.) মুসলমানদের মধ্যে ঐক্য ও সংহতি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ঘোষণা করেন- ….তাবলীগ ও হিযবুল্লাহ, হিযবুল্লাহও তাবলীগ। অর্থাৎ যদি কুরআন ও সুন্নাহ মোতাবেক হয় তাহলে তাবলীগ জামাতের সাথে হিযবুল্লাহর কোন মতবিরোধ নেই। প্রকৃত পক্ষে হিযবুল্লাহ ও তাবলীগ একই দল। (সাপ্তাহিক মানবতা,১৯৮৪ ইং পৃঃ ১৩) তিনি বলতেন তাবলীগ জামাত আমাদের কাজকেই সহজ করে দিচ্ছে। তাবলীগ জামাত কাজ করছে রুমী মিস্ত্রীর আর আমি কাজ করছি চীনা মিস্ত্রীর। রুমী মিস্ত্রী ঘর করে দেয়, চীনা মিস্ত্রী তাতে রং চড়িয়ে দেয়। তাবলীগ জামাত হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষা কেন্দ্র। আর পীর মাশায়েখদের তালীমগাহ হল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের মত। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষা পেলে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়া যেমন অনেকটা সহজ হয়, তেমনি তাবলীগ জামাতভুক্ত হয়ে একজন মুসলমান ইসলামের প্রাথমিক জিনিসগুলো শিখে নিলে পীর মাশায়েখদের জন্য তাদের উচ্চ পর্যায়ের তালীম দেয়া অনেকটা সহজ হয়ে যায়। তিনি বলতেন, তোমরা তাবলীগ কর, কিন্তু তাফরীক করোনা। মুসলমানদের মধ্যে বিভক্তি সৃষ্টি করো না। একবার ফুরফুরা দরবারের এক খলিফা তাবলীগ জামাতের বিরুদ্ধে একটি বই লিখে প্রকাশ করলে হুজুর (রহ.) তার উপর অত্যন্ত গোস্বা হন এবং এ বইটি প্রচার না করার জন্য তাকে সতর্ক করে দেন।

ঐক্য রক্ষার অনন্য নজীর

বিভিন্ন সময়ে বাতেলপন্থীরা হযরত আব্দুল হাই সিদ্দিকী (রহ.) কে পরাস্ত করবার জন্য নানা ধরনের ফন্দি আটতো। তারা হুজুরের বিভিন্ন জলসা পন্ড করার জন্য ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হত। কিন্তু হুজুর (রহ.) মুসলমানদের বৃহত্তর ঐক্যের স্বার্থে এদের সাথে সংঘর্ষ এড়িয়ে এমন বুদ্ধিদীপ্ত ফায়ছালা উপস্থাপন করতেন যার ফলে বাতেলপন্থীরা লা-জবাব হয়ে যেত। উদাহরণস্বরূপ এখানে দুটি ঘটনা উল্লেখ করা হল একবার ফেনী শহরের দক্ষিণাঞ্চলে বড় হুজুর (রহ.)-এক জলসায় উপস্থিত হয়ে দেখেন-লোকজন সব দুভাগে বিভক্ত হয়ে আছেন। দায়িত্বশীলদের কাছে জিজ্ঞেস করে জানা গেল-বিপক্ষের লোকেরা বড় হুজুর (রহ.) কে কাফের জানে এবং তারা তাই এই জলসাকে পন্ড করার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে। একথা শুনে বড় হুজুর (রহ.) মঞ্চে উঠে দাঁড়ালেন এবং উচ্চস্বরে পাঠ করলেন লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। অতঃপর উপস্থিত বিপক্ষ দলের লোকদের উদ্দেশ্য করে বললেন বাবারা! আব্দুল হাই এখন মুসলমান হয়েছে তো ? হুজুর (রহ.)-এর আকস্মিক এ অভিনব পদক্ষেপে বিপক্ষদলীয় লোকেরা সব লা-জবাব হয়ে গেল। অতঃপর আর দ্বিরুক্তি না করে সবার সাথে মিলে মিশে ওয়াজ শুনতে লাগলো। আরেক বারের ঘটনা। ফেনীর মিজান ময়দানে জলসা। বড় হুজুর (রহ.)-এর পূর্ববর্তী বক্তাকে উপস্থিত জনতার একাংশ মিলাদ কেয়াম সম্পর্কে নানা ধরনের প্রশ্ন করে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে। তারা জলসা পন্ড করার পাঁয়তারা করতে থাকে। বড় হুজুর (রহ.)-এর কাছে এ খবর পৌঁছলে তিনি মঞ্চে উঠেই বলে উঠেন বাবারা! যারা মিলাদ কেয়াম করে তারা জাহান্নামে যাবে না, আর যারা মিলাদ কেয়াম করে না-তারাও জাহান্নামে যাবে না। বরং যারা মিলাদ-কেয়াম নিয়ে ঝগড়া করে-তারাই জাহান্নামে যাবে। হযরত পীর সাহেব (রহ.)-এর এ ফায়সালা শোনার পর উপস্থিত বিরুদ্ধবাদীদের আর কিছুই বলার থাকে না। গন্ডগোল করার কোন অজুহাত খুঁজে না পেয়ে অগত্যা তারা বাধ্য হয়ে ওয়াজ শুনতে থাকে। (ঘটনা দুটো প্রত্যক্ষদর্শীর কাছ থেকে ফেনী নিবাসী সুফি মোঃ অব্বুল কাশেম সাহেবের মাধ্যমে সংগৃহীত) এভাবে হেকমতের মাধ্যমে বড় হুজুর (রহ.) মুসলমানদের পারস্পরিক ঝগড়া-ঝাটির মীমাংসা করে তাদেরকে নিজেদের মধ্যকার অনিবার্য সংঘর্ষের হাত থেকে বাঁচিয়েছেন এবং মুসলমানদের মধ্যকার ঐক্য ও সংহতিকে সুদৃঢ় করেছেন।