গদ্দিনিশীন রাহবারে ফুরফুরা

একবার চোখের রোগে আক্রান্ত হওয়ায় তার দৃষ্টিশক্তি খুব কমে গিয়েছিল। রাতের বেলা দেখতে পেতেন না বললেই চলে। এমতাবস্থায়ও তিনি নামাজের জামাআতে শরীক হতেন। একদিন সাথে কেউ না থাকায় একাই এশার নামাজ পড়বার জন্যে ঘর হতে বের হলেন। হাতরাতে হাতরাতে মসজিদের দিকে চললেন। পথে গাছের একটি বড় ডাল পড়েছিল। কিন্তু তিনি সেটা দেখতে না পেয়ে সোজা হেঁটেই চললেন। ফলে হোচট খেয়ে পড়ে গেলেন এবং মারাত্বকভাবে আহত হলেন। ১৯৪৪ বা ৪৫ সালের ঘটনা। হযরত আব্দুল হাই সিদ্দিকী (রহ.) বর্ধমান জেলায় তাঁর শ্বশুর বাড়ি যাচ্ছিলেন। পথে ইস্তেঞ্জার হাজত হওয়ায় গাড়োয়ানকে গাড়ী থামাতে বললেন। গাড়ী থেমে গেলে হযরত গাড়ী থেকে নামলেন। ইস্তেঞ্জার পর একটি কুলুখ নিয়ে হেঁটে হেঁটে ২/৩টা জমি পার হয়ে গেলেন। ঢেলাটি ফেলে দিতে গিয়ে হঠাৎ চমকে ওঠলেন। তারপর সেখানে ঢেলাটি না ফেলে পুনরায় প্রথম জমিতে ফিরে এসে যেখান থেকে ঢেলাটি উঠিয়েছিলেন ঠিক সেখানে সেটি ফেলে দিলেন। অতঃপর কাপড় ঠিক করে বললেন এক জমি হতে মাটি নিয়ে অন্য জমিতে ফেলে দেয়া তাকওয়ার খেলাপ। ঐ জমিতে ঢেলাটি ফেলতে গিয়ে আমার স্মরণ হলো যে, ঢেলাটি ঐ জমির নয়। তাই ওটাকে এখানে ফেললাম। বড় হুজুর (রহ.) প্রথম জীবনে সফরে বাসে অথবা ট্রেনের তৃতীয় শ্রেণীতে যাতায়াত করতেন। একদিন তিনি ভানকুনি ষ্টেশনে ট্রেন ধরার জন্য অপেক্ষা করছিলেন। ট্রেনের তখন প্রায় এক ঘন্টা দেরী। তাঁকে সাধারণের মত একই স্থানে বসে থাকতে দেখে মহানুভব ষ্টেশন মাষ্টার বললেন আপনি পুণ্যবান মানুষ। আসুন, ফাষ্ট ক্লাসের ওয়েটিং রুম খুলে দেই। একটু বিশ্রাম করবেন। হযরত বড় হুজুর (রহ.) তখন বললেন, আমি চন্দননগর যাবো থার্ড ক্লাসে, কাজেই ফার্ষ্ট ক্লাসের ওয়েটিং রুমে বিশ্রাম করা আমার জন্য জায়েজ হবে না। সুতরাং আমি ওখানে যাবো না। হযরতের উত্তর শুনে ষ্টেশন মাষ্টার তাঁকে বিষ্ময়ে দেখতে লাগলো। বড় হুজুর (রহ.) কুষ্টিয়া এক মাহফিলে যাচিছলেন। গড়াই নদীর পার হয়ে যেতে হবে। হুজুর ঘোড়ার গাড়ীতে যাচ্ছিলেন। তখন সভাস্থল কয়েক মাইল দূরে। কিন্তু রাস্তা এত কর্দমাক্ত ছিলে যে ঘোড়ার চলতে খুব কষ্ট হচ্ছিল। হযরত ঘোড়ার কষ্ট দেখে গাড়ী থামাতে বললেন । সাথীদের বললনে, এ হাটু কাঁদা ডিঙ্গিয়ে ঘোড়ার পথ চলতে খুবই কষ্ট হচ্ছে। ওকে আর কষ্ট দিয়ে কাজ নেই। চলো আমরা হেঁটে যাই। একথা বলেই হুজুর হাঁটা শুরু করলেন এবং এ কাঁদার মধ্যে দিয়ে কয়েক মাইল পথ হেঁটে নদী পার হয়ে মাহফিলে উপস্থিত হলেন । ১৯৭৫ সাল। ঢাকার বায়তুল মোকাররম মসজিদে বড় হুজুর (রহ.) এর জলসা। হুজুর গাড়ী থেকে নেমে সিঁড়ি দিয়ে উঠছেন। এমন সময় এক লোক এসে এমনভাবে হুজুরের পা জড়িয়ে ধরলো যে, হুজুর প্রায় পড়েই যাচ্ছিলেন। মারাত্বক ভাবে পা মচকে গেল। হাঁটা চলাই প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়লো। পরদিন ঐ লোক ৬০ হেমেন্দ্র দাস রোড, বাংলাবাজারস্থ খানকাহ শরীফে হুজুরের কাছে মাফ চাইতে আসলো। হুজুর তাকে মাফ করে দিয়ে সামান্য একটু ধমক দিলেন না, বরং মুচকি হেসে বললেন, বাবা কালতো আমার পাটা ভেঙ্গেই ফেলেছিলে আর কি?[ বর্ণনাকারী: হযরত মাওলানা আবুল বাশার জিহাদী সাহেব] ঝিনাইদহে এক বাড়ীতে দাওয়াত। বড় হুজুর (রহ.) খেতে বসেছেন। বেশ কিছু খেয়ে ফেলেছেন। সাথীরা মাত্র দু এক লোকমা মুখে দিয়েছেন। এমন সময় হুজুর বলে উঠলেন, বাবারা, খানায় বিষ মেশানো হয়েছে। কেউ খানা স্পর্শ করবে না। পরে অনুসন্ধান করে অপরাধীকে হুজুরের সামনে আনা হ’ল। হুজুর তাকে মাফ করে দিলেন। বিষ মেশানো খানা খাওয়ার পরও আল্লাহর রহমতে বড় হুজুর (রহ.)-এর কিছুই হল না । কিন্তু সাথী যারা ২/১ লোকমা খেয়েছিলেন, তারা বহুদিন পর্যন্ত অসুস্থ ছিলেন। বড় হুজর (রহ.) এর বেশ কিছু আত্মীয়স্বজন তাঁর সাথে ভীষণ শত্রুতা পোষণ করতো। তিনি যখন ওয়াজ করতেন, তখন তারা বলতো, এতো ওয়াজ হচ্ছে না, যেন ঢোল বাজাচ্ছে। এ ছাড়া সব সময় হুজুরের বিরুদ্ধে লেগেই থাকতো। কিন্তু তিনি কখনও তাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করতেন না। কলকাতার বাড়ীতে এসকল আত্মীয়-স্বজনের জন্যে তিনি দুটি আলাদা কামড়া তৈরী করে দিয়েছিলেন, যাতে করে কলকাতায় আসলে তাদের কোন কষ্ট না হয় এবং এ কামড়াগুলোতে তারা বিশ্রাম নিতে ও রাত্রি যাপন করতে পারে।