গদ্দিনিশীন রাহবারে ফুরফুরা

মাসিক নেদায়ে ইসলাম

মুসলমান জাতির এক ক্রান্তিলগ্নে ১৯৪১ সালে ইসলামের বাণী মানুষের ঘরে ঘরে পৌঁছে দেবার জন্যে ফুরফুরার বড় হুজুর হযরত আব্দুল হাই সিদ্দিকী (রহ:) এই পত্রিকা সর্বপ্রথম প্রকাশ করেন। তখনকার দিনে ইসলামী পত্রিকার সংখ্যা ছিল নিতান্তই হাতে গোনা। যা-ও দু চারটা ছিল তারও সার্কুলেশন সংখ্যা ছিল একেবারেই নগন্য। আর সবগুলোরই প্রতিষ্ঠাতা পৃষ্ঠপোষক ছিলেন ফুরফুরার পীর সাহেব ও তার খলিফাগণ। অবশ্য মাওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ, মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন প্রমুখ কিছু পত্রিকা বের করেছিলেন। প্রতিষ্ঠালগ্ন হতে বহু ঘাত প্রতিঘাত পেরিয়ে নেদায়ে ইসলামের প্রকাশনা আজও অব্যাহত আছে। প্রথমে কলকাতা হতে প্রকাশিত হলেও দেশ বিভাগের পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গ্রাহক এবং এজেন্টদের কাছে নেদায়ে ইসলাম পৌঁছাতে নানা রূপ জটিলতা দেখা দেয়। ফলে পূর্ব পাকিস্তানে পৃথকভাবে নেদায়ে ইসলাম মুদ্রণের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয়। বহু বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে ১৯৬২ সনের জানুয়ারিতে ঢাকা হতে সর্বপ্রথম নেদায়ে ইসলাম প্রকাশ করা হয়। তখন পর্যন্ত এদেশে নিয়মিত ইসলামী পত্রিকা প্রকাশিত হতো না। ঢাকায় ৬০ নং হেমেন্দ্রদাস রোড, বাংলাবাজার হতে নেদায়ে ইসলাম প্রকাশিত হতে থাকে, সম্পাদকের দায়িত্ব পান জনাব আব্দুল মজিদ সাহেব (রহ:)। তখন নেদায়ে ইসলামের প্রকাশনায় আরও যারা অবদান রাখেন তন্মধ্যে ড. মুহাম্মাদ শহীদুল্লাহ (রহ:) মাও. ইসমাইল (রহ.) প্রমুখের নাম চির স্মরণীয় হয়ে থাকবে। হযরত আব্দুল হাই সিদ্দিকী (রহ:)-এর ইন্তেকালের পর হযরত আব্দুল কাহ্হার সিদ্দিকী (রহ:)-এর পৃষ্ঠপোষকতায় নেদায়ে ইসলাম প্রকাশিত হতে থাকে। আশির দশকের মাঝামাঝি তৎকালীন সম্পাদক জনাব আব্দুল মজিদ (রহ:)এর ইন্তেকালের পর সম্পাদনার দায়িত্ব পান মাও. গুলজার হোসাইন সাহেব। আর্থিক সমস্যা ও লোকবলের অভাবে আশির দশকের শেষের দিকে কিছুদিন নেদায়ে ইসলাম প্রকাশ বন্ধ থাকে। অত:পর নব্বই দশকের শুরুতে মরহুম পীর সাহেব হযরত আব্দুল কাহ্হার সিদ্দিকী (রহ:)-এর পৃষ্ঠপোষকতায় জমিয়তুল মুসলিমীন হিযবুল্লাহর ভারপ্রাপ্ত পরিচালক হযরত মাও. আবুল বাশার জিহাদী সাহেব ট্যাবলয়েড সাইজে নেদায়ে ইসলাম পুন:প্রকাশ করেন। তখন এ পত্রিকার পৃষ্ঠা সংখ্যা ছিল ৪ (চার), হাদীয়া ২ (দুই) টাকা। কিছুদিন পর ম্যাগাজিন সাইজে পত্রিকা প্রকাশ করা হয়। ছাপা হতো লেটার প্রেসে। তখন পৃষ্ঠা সংখ্যা উন্নিত হয় ২৪ (চব্বিশ)-এ ও এর পরে ৩২ (বত্রিশ) এ, হাদীয়া ৫ (পাঁচ) টাকা। এ সময় প্রচ্ছদ হতো এক কালারে। পত্রিকার ম্যানেজার ছিলেন জনাব মো: আলম সাহেব। অফিস ছিল ঐ ৬০ নং হেমেন্দ্রদাস রোডেই। এভাবে হযরত মাও. আবুল বাশার জিহাদী সাহেবের তত্ত্বাবধানে শুরু হয় পত্রিকার নতুন অভিযাত্রা। ১৯৯৪ সনে আর্থিক সংকটের কারণে মাঝে মাঝে দু মাসের পত্রিকা এক সাথে প্রকাশিত হতে থাকে। এ পর্যায়ে পত্রিকার প্রধান পৃষ্ঠপোষক ফুরফুরার মরহুম পীর হযরত মাও. আব্দুল কাহ্হার সিদ্দিকী সাহেব (রহ:) সরাসরি নিজের তত্ত্বাবধানে নেদায়ে ইসলাম প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত নেন। পত্রিকার অফিস স্থানান্তরিত হয় মার্কাজে ইশাআতে ইসলাম, ২/২ দারুস সালাম, মিরপুর, ঢাকায়। এখান থেকে প্রথম সংখ্যা ছাপা হয় ১৯৯৪ সনের নভেম্বরে। তখন কম্পিউটার কম্পোজে, উন্নত অপসেট ছাপায় পত্রিকাটি এক নতুন মাত্রা পায়। মত ও পথ বিশেষ সংখ্যা হিসেবে এ সংখ্যাটি ছাপা হয়।একদল উদ্যোগী যুবককে নিয়ে গঠিত হয় নেদায়ে ইসলাম প্রকাশনা পরিষদ । ম্যানেজার হিসেবে যোগদান করেন আমাদের সবার পরিচিত আবদুল মোমিন ভাই । নিজের চাকরী ছেড়ে দিয়ে একান্তভাবে সময় দেন নেদায়ে ইসলামকে। তাঁর ত্যাগ অতুলনীয়। ইশাআতে ইসলাম কুতুবখানার প্রচুর বই ও পুরানো নেদায়ে ইসলাম বস্তায় ভরে দেশময় ঘুরে বেড়ান এই উদ্যোমী যুবক পীর সাহেব হুজুরের মাহফিলে মাহফিলে, এসব বিক্রি করে নেদায়ে ইসলামের জন্য ফান্ড সংগ্রহের লক্ষ্য নিয়ে। সংগৃহীত হয় একটি ক্ষুদ্র ফান্ড। চলতে থাকে নেদায়ে ইসলামের অব্যাহত প্রকাশনা। তখন পত্রিকার পৃথক প্রচ্ছদ ছিল না। ফর্মা কাগজের এক পৃষ্ঠায় এক কালারে প্রচ্ছদ মুদ্রিত হতো। পরে ১৯৯৫ সনের রবিউস সানি মাস থেকে দুই কালারে ডিজাইন, প্রসেস ও পজিটিভ করে প্রচ্ছদ ছাপা শুরু হয়। এক পর্যায়ে কিছু পৃষ্ঠপোষক ও আজীবন সদস্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেয়া হয়। উদ্দেশ্য ফান্ড কালেকশন। তিনজন পৃষ্ঠপোষক ও সাত জন আজীবন সদস্য সংগৃহীত হয়। ফান্ডও কিছুটা সমৃদ্ধ হয়। তখন পর্যন্ত নেদায়ে ইসলাম ৩২ পৃষ্ঠায় ছাপা হচ্ছিল। পরবর্তীতে ১৯৯৮ সনের ডিসেম্বর মাস হতে নতুন আঙ্গিকে বর্ধিত কলেবরে ৪০ পৃষ্ঠায় নেদায়ে ইসলাম ছাপা শুরু হয়। তখন থেকেই আর্ট পেপারে চার কালারে কম্পিউটার ডিজাইনে পৃথক প্রচ্ছদে নেদায়ে ইসলাম ছাপা হয়ে আসছে। হাদীয়া রাখা হয় ১০ (দশ) টাকা। অদ্যাবধি এ কলেবরেই নেদায়ে ইসলাম প্রকাশিত হচ্ছে। এক পর্যায়ে নেদায়ে ইসলামের জন্য নিজস্ব কম্পিউটার কেনা হয় ১৯৯৯ সনে। নতুন আঙ্গিকে নতুন কার্যালয়ে নতুন ব্যবস্থাপনায় প্রকাশনা শুরু হবার পর পর্দার আড়ালে যারা তাদের অক্লান্ত শ্রম দিয়ে তিলে তিলে নেদায়ে ইসলামকে বর্তমান পর্যন্ত নিয়ে আসতে সাহায্য করেছেন তাদের মধ্যে আছেন প্রতিষ্ঠিত লেখক ও কলামিস্ট ডা: তারিক সিদ্দিকী, সহকারী সম্পাদক জাহাঙ্গীর হোসেন সাইফুল্লাহ, একাউন্টস অফিসার মাহবুব আলম ও আব্দুল্লাহ জাবির তপাদার, প্রাক্তন কম্পিউটার অপারেটর আব্দুল গাফ্ফার, বিভাগীয় সম্পাদক আব্দুল্লাহ ইবনে মুর্শিদ, সম্পাদনা সহকারী মাহমুদ ওয়াজেদ, হিলফুল ফুযুলের প্রাক্তন সাংগঠনিক সম্পাদক ডা. একে মাহমুদ রুমী, ম্যানেজার আব্দুল মোমিন এবং অফিস সহকারী হাবীবুর রহমান, আনোয়ার হোসেন খান এবং আরো অনেকে নানাভাবে সহযোগিতা করেছেন। লেখা দিয়ে, গ্রাহক ও এজেন্ট হয়ে, পত্রিকা পড়ে ও অন্যকে পড়তে দিয়ে কত যে হাজারো মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নেদায়ে ইসলামের কাজে সাহায্য করেছেন আর করছেন তার ইয়ত্তা নেই।