গদ্দিনিশীন রাহবারে ফুরফুরা

পর্দার ব্যাপারে গুরুত্বারোপ

প্রত্যেক প্রাপ্ত বয়স্ক মুসলমান নারীর জন্যে পর্দা করা ফরজ। বেগানা পুরুষের সামনে বেপর্দা অবস্থায় যাওয়া হারাম। যুবতী মহিলাদের জন্যে বাইরে বের হবার সময় মুখম-ল, হাত ও পায়ের পাতা ঢেকে রাখাও অপরিহার্য কর্তব্য। পর্দার ব্যাপারে ফুরফুরার পীর সাহেব (রহ.) আপোষহীন। দারুসসালামে তাঁর তিন তলা বাড়ি। তিন তলা বাড়ির বারান্দায় বের হলে যদি কেউ মহিলাদের দেখে ফেলে তাই হুজুর (রহ.) উঁচু বাউন্ডারী দেয়ালের উপরে দোতলা পর্যন্ত মুলি বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেড়াও করে দিয়েছিলেন। হুজুরের বাড়ির বাউন্ডারীর ভেতর দিনের বেলা পর্দার খেলাফ হবার সম্ভাবনা থাকায় পুরুষদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। রাতের বেলা বিশেষ প্রয়োজনে দুএকজন খাদেম বাউন্ডারীর ভেতর প্রবেশ করতে পারতেন। তবে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ সর্বাবস্থায়ই নিষিদ্ধ ছিল। ফুরফুরার দরবারে মহিলাদের আসা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ। যেসব মহিলা মুরিদ হতে চান হুজুর (রহ.) তাদেরকে স্বামী, ভাই, বাপ বা কোন মহররম পুরুষের-মাধ্যমে মুরিদ হতে উপদেশ দিতেন। প্রাপ্ত বয়স্ক মহিলাদের বাড়ির কাজে নিয়োগ করলে পর্দার খেলাফ হবার সম্ভাবনা থাকে। তাই হুজুর (রহ.) নাবালেগ ছোট ছোট মেয়েদের বাড়ির টুকি টাকি কাজকর্ম করার জন্যে নিয়োগ করতেন।

উস্তাদের প্রতি তাজীম

হযরত আলী (রা.) বলেন, যে আমাকে একটি অক্ষর শিক্ষা দিয়েছে, আমি তার গোলাম হয়ে রয়েছি। উস্তাদের প্রতি যথাযথ আদব প্রদর্শন করা সুন্নত। হযরত পীর সাহেব (রহ.) তার উস্তাদের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করে চলেন। একবার দারুসসালামে হুজুরের একজন উস্তাদ তাশরীফ আনেন। হুজুর তার সম্মানে আদবের সাথে দাঁড়িয়ে গেলেন। উস্তাদের বিভিন্ন কথার উত্তরে হুজুর দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে খুব নিম্নস্বরে জি হুজুর, জি হুজুর করছিলেন। মনে হচ্ছিল-কোন বেআদবী হয়ে যায় এই ভয়ে তিনি সন্ত্রস্ত আছেন। উস্তাদ যতক্ষণ দারুস্সালাম অবস্থান করেছেন, হুজুর তাঁর সাথে যথাযথ আদব বজায় রেখে চলেছেন।

দয়া ও ক্ষমা

প্রিয়নবী হুজুরেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছিলেন ক্ষমার সাগর। যেই তায়েফবাসীরা পাথর মেরে হুজুরেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে রক্তরাঙ্গা করেছিল, সারা শরীর মোবারকে বসন্তের দাগের মত দাগ হয়ে গিয়েছিলো-সেই তায়েফবাসীদের হুজুরেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ক্ষমা করে দিলেন। মক্কাবাসীদের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে নিজের জন্মভূমি মক্কা ছেড়ে হিজরত করেন। সুযোগ পেয়েও সেই মক্কাবাসীদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিলেন না। তাদেরকেও ক্ষমা করে দিলেন। এমনি হাজারো ঘটনার নজীর হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জেন্দেগীতে পাওয়া যাবে। নায়েবে নবী হুজুরেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ফুরফুরার হযরত পীর সাহেবের ক্ষমাগুণ ছিল অতুলনীয়। কেউ মস্ত বড় অপরাধ করেও যদি হুজুরের কাছে ক্ষমাপ্রার্থী হয়, হুজুর সাথে সাথে তাকে ক্ষমা করে দিতেন। একবার হযরত পীর সাহেবের জনৈক ঘনিষ্ঠ কর্মচারী বিনা কারণে যেভাবে তাঁর বিরুদ্ধাচরণ করেছিল এবং যেভাবে ও যে ভাষায় গালিগালাজ করেছিল, তা শুনলে যে কোন মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে যাবে। কিন্তু পরবর্তীতে উক্ত ব্যক্তি যখন বিশেষ প্রয়োজনে হুজুরের স্মরণাপন্ন হলেন হুজুর তখন তার অতীত আচরণ ও সমস্ত রকম বেয়াদবী ও অশিষ্ট ব্যবহারের কথা একেবারে ভুলে গিয়ে তার সাথে অত্যন্ত সদয় ও ভদ্র ব্যবহার করলেন। হুজুরের বেশ কিছু আত্মীয় স্বজন ও তাদের অনুসারী নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্যে অন্যায়ভাবে হুজুরের বিরুদ্ধাচরণ করছিল। হুজুরকে অপদস্থ করার জন্যে তারা সব রকম কৌশল অবলম্বন করলো। এমনকি হুজুরের বিরুদ্ধে মিথ্যা দোষারোপ করে বই পুস্তক পর্যন্ত ছাপাতে শুরু করলো। এত শত্রুতা পোষণ করা সত্ত্বেও হুজুর নিয়মিত তাদের সুবিধা-অসুবিধার খোঁজ-খবর নিতেন, রোগ-শোক হলে দেখতে যেতেন, সময়ে সময়ে হাদীয়া তোহফা পাঠাতেন। তাদের কেউ কেউ নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে যখন হুজুরের কাছে এসে ক্ষমা চাইলো-হুজুর সাথে সাথে তাদের ক্ষমা করে দিলেন। এখনও যেই সমস্ত আত্মীয়স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশি হুজুরের সাথে শত্রুতা পোষণ করতেন, হুজুর তাদের সাথেও ভাল ব্যবহার করতেন। ওরা শত্রুতা করলেও তিনি নিজে আত্মীয় ও প্রতিবেশির হক্ব পালন করতেন মোটেই অবহেলা করেননি।

খাদেম ও বাড়ির লোকদের সাথে ব্যবহার

খাদেম ও বাড়ির কাজের লোকদের সাথে ব্যবহারের ক্ষেত্রেও হুজুর (রহ.) সুন্নতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর পুরোপুরি পাবন্দ ছিলেন। খাদেম বা বাড়ির কাজের লোকদের তিনি কখনও এমন কোন কাজের নির্দেশ করেননি, যা করা তাদের জন্যে কষ্টকর হত। নিজে যা খেতেন, তাই তাদের খাওয়াতেন; নিজে যা পরতেন, তাই তাদের পরাতেন, ঈদে প্রত্যেককে নতুন কাপড় এবং বেতনবাদেও কিছু অতিরিক্ত টাকা হাদীয়া হিসেবে দিতেন। কোথাও দাওয়াত খেতে গেলে-তাদের কয়েকজনকে সাথে নিয়ে যেতেন। নিজে তদারকি করে তাদেরকে খাওয়াতেন। কেউ অসুস্থ হলে নিজের হাতে তার সেবাযত্ন করতেন এবং ঔষধ খেতে দিতেন। কখনো কখনো নিজেই তাদের কাজে সহযোগিতা করতেন।