গদ্দিনিশীন রাহবারে ফুরফুরা

দরবারে নববী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এরবাস্তব নমুনা এ দরবার

দরবারে নববী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাস্তব নমুনা আমরা দেখতে পেয়েছি ফুরফুরার মরহুম হুজুরের দরবারে। তাঁর সাথে সাক্ষাৎ করে মনের কথা অকপটে তাঁর কাছে যে কেউ প্রকাশ করতে পারতো। তাঁর দরবারে আম, খাছ বলে কোন জায়গা নির্দিষ্ট ছিল না-সকল শ্রেণীর দর্শনার্থীই একই সাথে পাশাপাশি কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে বসতে পারেতো। অধিকাংশ সময়েই হযরত পীর সাহেব (রহ.) একটি ভাঙ্গা চৌকিতে বসে অথবা মাটির উপর চাদর বিছিয়ে বসে সাক্ষাৎ প্রার্থীদের সাথে আলাপ-আলোচনা করতেন। তবে শেষদিকে কিছুদিন অসুস্থতার জন্যে নীচে বসতে পারতেন না; তাই একটি পুরনো চেয়ারে বসতেন। কোন কথার উপর জোড় দিতে হলে হুজুরেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কথাটি ৩ বার উচ্চারণ করতেন। পীর সাহেবও এ সুন্নতটির উপর আমল করতেন। হুজুরেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মজলিসে বসে এমনভাবে কথা বলতেন এবং এমন ব্যবহার করতেন যে, উপস্থিত প্রত্যেক সাহাবা (রা.) মনে করতেন-হুজুর আমাকেই সবচেয়ে বেশি ভালবাসেন। এ সুন্নতটির বাস্তব নমুনা আমরা দেখতে পেয়েছি ফুরফুরার মরহুম পীর সাহেবের জেন্দেগীতে। হুজুর সাক্ষাত প্রার্থীদের সাথে এমনভাবে কথা বলতেন যে, প্রত্যেকেই মনে করতো হুজুর হয়তো আমাকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। তাদের সাথে এমন ব্যবহার করতেন যে, প্রত্যেকেই মনে করতেন-হুজুর আমাকেই সবচাইতে বেশি মুহাব্বত করে থাকেন। তাঁর ব্যবহারে দুঃখ পেয়েছেÑ এমন লোক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। শিশুরাও হুজুরের সাথে কথা বলতে ভয় পেতো না। দারুস্সালাম এতিমখানার ছোট ছোট এতিম ছেলেগুলো বিকেল হলেই হুজুরকে ঘিরে বসে যেত। হুজুর তাদের সাথে শিশু সুলভ মজাক করতেন। তখন হুজুরকে ঘিরে রাখা বাচ্চাদের কলকাকলিতে এমন এক বেহেশতী পরিবেশ সৃষ্টি হতো যা না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। মুসলমান ভাইকে হাসি মুখে অভ্যর্থনা করা হুজুরেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নত। নবীপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কথা বলার সময় মুচকি হাসতেন এবং অত্যন্ত প্রফুল্ল বদনে কথা বলতেন। পীর সাহেব হুজুর (রহ.) সাক্ষাত প্রার্থীদের হাসি মুখে অভ্যর্থনা জানতেন এবং অত্যন্ত প্রফুল্ল বদনে কথা বলতেন। কথা বলার সময় অপরূপ মুচকি হাসি তাঁর মুখের শোভাকে বাড়িয়ে তুলতো।

ছাগল চড়নো ও গাছপালা লাগানো

হুজুরেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ছাগল চড়িয়েছেন। তিনি ছাগলের দুধ খুব পছন্দ করতেন। পীর সাহেব (রহ.) এ সুন্নতটি পালনের নিয়তে কয়েকটি ছাগল প্রতিপালন করতেন। অধিকাংশ সময়ে তিনি নিজেই এগুলোর দেখা শোনা করতেন। কখনো কখনো এগুলোকে খানিকটা চড়িয়েও বেড়াতেন। তিনি এ ছাগলের দুধও পান করতেন সুন্নত পালনের নিয়তে। হুজুরেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম গাছপালা লাগাতে খুব উৎসাহিত করতেন এবং এটাকে সদকায়ে জারীয়া হিসেবে উল্লেখ করেছেন। পীর সাহেব (রহ.) এ সুন্নতটি জেন্দা করার লক্ষ্যে প্রায়ই গাছ লাগাতেন এবং সবাইকে এ কাজে উৎসাহিত করতেন।

বিধর্মীদের সাথে ভাল ব্যবহার

বিধর্মীদের সাথে ভাল ব্যবহার করাও হুজুরেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নত। একবার এক ইহুদী মসজিদে ঢুকে পেশাব করতে শুরু করলো। সাহাবা (রা.) গণ বাঁধা দিতে উদ্যত হলেন। হুজুরেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁদেরকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ওকে বাঁধা দিও না-পেশাব করতে দাও। তা না হলে ওর পেশাবের রোগ হয়ে যাবে। ইহুদীর পেশাব করা শেষ হলে হুজুর তাকে আদর করে কাছে ডেকে বুঝিয়ে বললেন এটা আমাদের মসজিদ, এখানে আল্লাহর ইবাদত করা হয়। এখানে পেশাব করতে নেই। ইহুদী হুজুরেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে মুসলমান হয়ে গেল। আরেকবার এক বিধর্মী হুজুর হুজুরেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মেহমান হল। হুজুরেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খুব করে মেহমানদারী করলেন। রাতের বেলা লোকটি বিছানায় পায়খানা করে রেখে পালিয়ে গেল। পরদিন হুজুরেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজ হাতে সব কাপড়গুলো ধুলেন। একটুও বিরক্ত হলেন না। বিধর্মীদের সাথে ব্যবহারের ক্ষেত্রে ফুরফুরার হযরত পীর সাহেব (রহ.) পরিপূর্ণভাবে হুজুরেপাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর অনুকরণ করে চলেছেন। তাইতো বহু বিধর্মী হুজুরকে অপরিসীম ভক্তি ও মুহাব্বাত করতো। কোন নতুন কাজে হাত দেবার আগে তারা হুজুরের অনুমতি, উপদেশ ও দোয়া নিতে আসতো। মুসলমান হওয়ার জন্যে হুজুর তাদেরকে কখনোই জোর-জবরদস্তি করতেন না। তিনি কখনও তাদের ধর্মের প্রতি বিদ্বেষভাব দেখাননি। তাইতো দেখা যায়-অসংখ্য হিন্দু হযরতের ওয়াজের মাহফিলে খুব আগ্রহ সহকারে যোগদান করতেন এবং তাঁর যুক্তিপূর্ণ ওয়াজ শুনে বিমুগ্ধ হয়ে যেতেন। কেউ কেউ আবার ইসলাম কবুল করে মুসলমান হয়ে ধন্য হয়েছেন।