গদ্দিনিশীন রাহবারে ফুরফুরা

সবর ও শোকরের মূর্ত প্রতীক

কবি বলেছেন হাস্তিকো মিটাদো আগার মর্তবা চাহে কে দানা গোলে গোলজার হোতা হ্যায় খাকমে মিলকার। যদি কোন মর্তবা বা সম্মান চাও, তবে নিজের অস্তিত্বকে তুমি মিটিয়ে দাও। প্রতিটি দানা বা বীজের মূল হল মাটি। বীজ যদি মাটির ভেতরে দেয়া বা রোপণ করা না হয়, ঐ বীজ থেকে কোন গাছ হবে না। যখনই বীজ মাটিতে রোপণ করা হয়, বীজ তার নিজের অস্তিত্বকে বীজের মূল মাটিতে বিলীন করে দেয়। তখনই ঐ বীজ থেকে চারা গজায় এবং বড় গাছ হয়, ফুলে ফলে সুশোভিত হয়ে উঠে। জগতের মানুষ তার থেকে ফায়দা লাভ করে ধন্য হয়। যতক্ষণ পর্যন্ত কোন মানুষ নিজের হাস্তিকে (অস্তিত্বকে) আল্লাহর দরবারে মিটিয়ে (বিলীন করে) না দেয়, ততক্ষণ পর্যন্ত সে কামালিয়াত অর্জন করতে পারে না। ফুরফুরার মরহুম পীর সাহেবের সামগ্রিক জেন্দেগী পর্যালোচনা করলে দেখা যায় তিনি নিজের অস্তিত্ব বা হাস্তি আল্লাহর দরবারে সম্পূর্ণ মিটিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহপাকের ইচ্ছাই তাঁর ইচ্ছা। আল্লাহপাকের প্রতিটি কাজের প্রতি তিনি স্বতঃস্ফুর্তভাবে রাজী থাকেন। সবর ও শোকরের তিনি এক মূর্ত প্রতীক। ১৯৮৯ ও ৯০ সালে পর পর দুবছর প্রচন্ড- ঝড় বৃষ্টির কারণে পাকশী ওয়াজ ও ইসালে সওয়াব মাহফিল পন্ড হয়ে যায়। লক্ষ লক্ষ লোকের সে কি অপরিসীম দুর্দশা! পায়ের নীচে চাপা পরে দুজন ইন্তেকাল করলেন। কিন্তু হুজুর নির্বিকার। সামান্য একটু অসন্তুষ্টির ছাপও তাঁর চেহারা মুবারকে দেখা গেল না। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যেই মাহফিল হচ্ছে, ঝড়বৃষ্টিও দিয়েছেন তিনিই, মাহফিলটা প- হয়েছে তাঁরই ইচ্ছায়। সুতরাং আল্লাহপাকের ইচ্ছার মোকাবেলায় হুজুরের কিছুই বলার নেই। কোন অভিযোগও তাঁর নেই। অনুরূপভাবে, একবার দারুসসালাম ইসালে সওয়াবের সময় পর পর দুদিন ঝড়বৃষ্টির ফলে জলসা পন্ড হয়ে গেল। কিন্তু হুজুরকে দেখা গেল তাঁর মনে কোন ব্যথা নেই। নিজের ব্যক্তিগত জীবনে হুজুর নানা বালা মুছিবত, রোগ-শোকে গ্রেফতার হয়ে আছেন। কিন্তু এ ব্যাপারে তিনি নির্বিকার। আল্লাহর দরবারে এ সম্পর্কে তাঁর কোন অভিযোগ নেই। মাঝে মাঝে তিনি এমন অসুস্থ হয়ে পড়তেন যে, সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাবার উপক্রম হত। এ অবস্থায়ও তিনি যন্ত্রণায় ছটফট করতেন, আল্লাহকে ডাকতেন আর মাঝেমাঝে শুধু বলতেন গুনাহর শাস্তি। আল্লাহপাকের উপর নাখোশ হবার কোন আলামত এ অবস্থায়ও তাঁর মধ্যে দেখা যেত না। একবার দারুসসালামে মাহফিল চলাকালে হুজুরের আহলিয়া অসুস্থ হয়ে পড়লেন। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হল। কিন্তু নিকটের দুএকজন ছাড়া বিষয়টি কেউ টেরই পেল না এবং হুজুরের চেহারা মোবারকেও পূর্ণ প্রশান্তি বিরাজ করছিল। এলেম, আমল ও ইখলাসের অপূর্ব সমন্বয় প্রত্যেক মুসলমান নরনারীর জন্যে এলেম শিক্ষা করা ফরজ। শুধু এলেম শিক্ষা করলেই হবে না-সেই মুতাবেক আমলও করতে হবে। আমলবিহীন এলেমের কোন মূল্য নেই। আবার ইখলাস বা আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়ত ছাড়া যে আমল করা হয়,তাও আল্লাহর দরবারে কবুল হয় না। সুতরাং এলেম, আমল ও ইখলাস-এ ৩টির সমন্বয় যখন ঘটবে, তখনই প্রকৃত কামেল হওয়া যাবে। এলেম,আমল ও ইখলাসের অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছিল ফুরফুরার মরহুম হযরত পীর সাহেবের মধ্যে। ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক তথা জীবনের সর্বক্ষেত্রে হুজুর (রহ.) ইখলাস বা আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়ত ছাড়া একটি কাজও করতেন না। তিনি প্রায়ই বলতেন-বাবা আগে নিয়ত ঠিক করে নিন, তা’হলে প্রতিটি কাজই ইবাদতের মধ্যে গণ্য হবে। বাড়ি বানালেন, দক্ষিণ দিকে জানালা এই নিয়তে রাখুন যে, আজান শুনে নামাজ পড়বো, এতে জানালা রাখাটাও ইবাদতের মধ্যে গণ্য হয়ে যাবে। দক্ষিণের বাতাস থেকেও আপনি বঞ্চিত হবে না। হযরত পীর সাহেব হুজুর (রহ.) খুবই মিতব্যয়ী। জাঁকজমক বা অপচয়কে তিনি মোটেই পছন্দ করতেন না। তিনি যখনই যে টাকা খরচ করেন সবই ইসালে সওয়াবের নিয়তে করেন। ইসালে সওয়াবের নিয়ত ছাড়া তিনি একটা টাকাও খরচ করেন না। হুজুর একদিন বললেন-বাবা! ইসালে সওয়াবের নিয়ত ছাড়া আমি এক খিলি পানও খাই না। ছেলেমেয়ের বিয়েতে মেহমানদারি করেছেন; তাও নিয়ত করেছেন ইসালে সওয়াবের।