রমজানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শেষ দশ দিন যাপন
রমজানের শেষ দশ দিনে, এতেকাফকালীন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন এবাদত-বন্দেগিতে কাটাতেন, পরিশ্রম করতেন কঠোরভাবে।
ভিন্ন এক হাদীসে আয়েশা (রাঃ) বলেন : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অন্য সময়ের তুলনায় রমজানের শেষ দশ দিনে প্রবেশ করে রাসূল রাত্রি জাগরণ করতেন, পরিবারের সকলকে জাগিয়ে দিতেন এবং পূর্ণভাবে প্রস্তুতি গ্রহণ করতেন, পরিশ্রম করতেন।
‘শেষ দশ দিনে প্রবেশ করে তিনি রাত্রি জাগরণ করতেন’ – হাদীসের এ অংশ দ্বারা প্রমাণ হয়, প্রথম বিশ দিন রাসূল পূর্ণ রাত্রি জাগরণ করতেন না, বরং, কিছু সময় এবাদত করতেন, ঘুমিয়ে কাটাতেন কিছু সময়। শেষ দশ দিনে তিনি, এমনকি বিছানাতেও গমন করতেন না। রাতের পুরোটাই এবাদতে ব্যয় করতেন।
হাদীসগুলো প্রমাণ করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দশ দিন এবাদতে হতেন কঠোর পরিশ্রমী, আল্লাহর দরবারে নিজেকে পেশ করতেন নতজানু ও বিনয়াবনত রূপে। সালাত, সিয়াম, সদকা, কোরআন পাঠ, জিকির, দোয়া, তাওয়াক্কুল, আশা ও ভীতি, মোহাসাবা, তওবা, অন্তরের একাগ্র উপস্থিতি ইত্যাদি এবাদতের মৌলিক বিষয়গুলো তিনি পূর্ণভাবে রূপায়ণ ও সম্মিলন করতেন এ কয় দিনে।
রাসূলের সেই হেদায়েত অনুসারে আমাদের অবস্থা বিচার করলে সহজে আমাদের অবস্থা ও চিত্র ফুটে ওঠে যা খুবই হতাশাকর, দুর্গতি আক্রান্ত ও অশুভ পরিণতিময়।
লাইলাতুল কদরের অনুসন্ধান ও তাতে রাত্রি-জাগরণ
লাইলাতুল কদর আল্লাহ তায়ালা বান্দাদের কাছ থেকে গোপন রেখেছেন, যাতে তার অনুসন্ধিৎসু ও গাফেলদের মাঝে সরল পার্থক্য করা যায়। রাসূল কদরের রাত্রির অনুসন্ধানে রাত্রি-জাগরণ করতেন, ব্যস্ত সময় যাপন করতেন। আবু সাইদ খুদরি হতে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন-
এ রাতের অনুসন্ধানে প্রথম দশ দিন আমি এতেকাফে যাপন করলাম, পরবর্তীতে যাপন করলাম মধ্যবর্তী দশ দিন। অতঃপর ওহির মাধ্যমে আমাকে অবগত করানো হল যে, সে রাত আছে শেষ দশ দিনে। সুতরাং, তোমাদের যে এতেকাফে আগ্রহী সে যেন এতেকাফ করে। তাই, লোকেরা তার সাথে এতেকাফ পালন করল।
রমজান বিষয়ক রাসূলের আদর্শ, হেদায়েত ও যাপন পদ্ধতি গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে এ বিষয়টি ফুটে ওঠে যে, রাসূল অত্যন্ত আগ্রহ, প্রেরণার মাধ্যমে কদরের রাত অনুসন্ধান করতেন, জাগরণ পূর্ণ রাত্রি। অন্য যে কোন রাতের তুলনায় অধিক ফজিলতময় হওয়ার ফলেই কেবল রাসূল তাকে এতটা গুরুত্ব প্রদান করেছেন। কদর হচ্ছে শাস্তি ও বরকতের রাত, মর্ত্যলোকে নেমে আসে এ রাতে আকাশের ফেরেশতাগণ, তা হাজার রাতের তুলনায় উত্তম ও সৌভাগ্য-মণ্ডিত। ইমান ও ইহতিসাব সহকারে যে এ রাত যাপন করবে, তার পূর্ব জীবনের সকল গোনাহ আল্লাহ ক্ষমা করে দিবেন।
এ মোবারক রাত্রিতে এবাদতকারীদের জন্য বিশেষভাবে যা কর্তব্য ও পালনীয়, তা হল, মাগরিব ও এশার সালাত জামাতের সাথে মসজিদে আদায় করা। কারণ, মোস্তাহাব আমলের জন্য ওয়াজিব আমল পরিত্যাগ বৈধ নয়; ফরজ আমলের তুলনায় ভিন্ন কোন এবাদত বান্দাকে এতটা নিকটবর্তী করতে পারে না। ইমাম যাহ্হাক বলেন : রমজানে যে ব্যক্তি মাগরিব ও এশার সালাত নিয়মিত আদায় করে যাবে, সে অবশ্য লাইলাতুল কদরের সওয়াবের অংশীদার হবে। বান্দার জন্য আল্লাহর সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান দান হচ্ছে দ্বীন বিষয়ে স্বচ্ছ দৃষ্টিভঙ্গি, আপন ইচ্ছা ও খেয়ালে নয়, আল্লাহর ইচ্ছা অনুসারে তার নৈকট্য অর্জন ও রাসূলের অনুসরণ।
লাইলাতুল কদরের অনুসন্ধান এবাদতের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষ উভয়ে একই শ্রেণীভুক্ত। কারণ, রাসূল এ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে তার পরিবার-পরিজনকে সাথে নিয়েছেন। উমর (রাঃ) হতে প্রমাণিত। রাত্রি যাপনের জন্য যখন সকলে মিলিত হল, তিনি পুরুষদের দায়িত্ব দিলেন উবাই বিন কাব-কে সুলাইমান বিন আবি হাসামাকে জাগরণের আদেশ দিতেন। পুরুষ ও নারীদের জন্য তিনি পৃথক-পৃথক ইমাম নির্ধারণ করতেন। তিনি বলেন : আমাকে আদেশ করলে আমি মেয়েদের ইমামতি করলাম।
সুতরাং, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের কর্তব্য কদরের রাত্রি অনুসন্ধান করা এবং রাত জেগে এবাদত-বন্দেগি করা। লাইলাতুল কদর সন্দেহ নেই, বান্দাদের জন্য আল্লাহ তায়ালার পক্ষ হতে এক বড় নেয়ামত, যাতে এবাদত হাজার গুণে বৃদ্ধি পায়, রহমত বর্ষিত হয় সকলের উপর। আল্লাহ আমাদের সকলকে এ রাতের যথোপযুক্ত সম্মান দানের মাধ্যমে কল্যাণ ও সৌভাগ্য হাসিলের তৌফিক দান করুন। আমীন।
