জিবরাইল (আঃ)-এর সাথে রাসূলের কোরআন অনুশীলন

কোরআনের প্রতি গুরুত্বারোপ আল্লাহর সাথে সম্পর্ক স্থাপনের কুঞ্জিকা। অপরের সাথে কোরআন বিষয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা কোরআনের গভীর জ্ঞান, মর্ম উপলদ্ধির সহজ মাধ্যম। পারস্পরিক কোরআন বিষয়ক আলোচনা সততা ও তাকওয়ার ক্ষেত্রে একে অপরকে সহযোগিতা সদৃশ। রমজানে কোরআন শিক্ষায় রাসূলের সহপাঠী হওয়ার জন্য জিবরাইল (আঃ) আল্লাহ কর্তৃক নিয়োজিত ছিলেন। এ বিষয়ে হাদীসে বর্ণনা পাওয়া যায়-
ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, জিবরাইল (আঃ) রমজানের প্রতি রাতে রাসূলের সাথে সাক্ষাৎ করতেন এবং ফজর অবধি তার সাথে অবস্থান করতেন। রাসূল তাকে কোরআন শোনাতেন। আরো এসেছে, রাসূল তার প্রিয়তমা কন্যা ফাতেমাকে গোপনে জানালেন যে, জিবরাইল প্রতি বছর আমাকে একবার কোরআন শোনাতেন এবং শুনতেন এ বছর তিনি দু বার আমাকে শুনিয়েছেন-শুনেছেন। একে আমি আমার সময় সমাগত হওয়ার ইঙ্গিত বলে মনে করি।

ইবনে হাজার বলেন : জিবরাইল প্রতি বছর রাসূলের সাথে সাক্ষাৎ করে এক রমজান হতে অন্য রমজান অবধি যা নাজিল হয়েছে তা শোনাতেন এবং শুনতেন। যে বছর রাসূলের অন্তর্ধান হয়, সে বছর তিনি দু বার শোনান ও শোনেন।

হাদীসগুলো একে অপরের প্রগাঢ় বন্ধুত্বের নিদর্শন। রমজানে উত্তম সাহচর্য নির্ধারণ এ কারণেই আবশ্যক; উত্তম সাহচর্যের ফলে সময়ের সর্বোত্তম সুফল লাভ হবে সন্দেহ নেই। কুসংসর্গের ফলে এ বরকতময় মাসেও অনেকের সময় পাপের আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছে, এমন দৃষ্টান্ত আমাদের নিকট বিরল নয়। এক্ষেত্রে বান্দার জন্য অধিক তাকওয়া অবলম্বন জরুরি। মানুষ যাকে বন্ধু ও আপনজন হিসেবে গ্রহণ করে, অভ্যাস-আচরণ ও ধর্মাচারে প্রবলভাবে তার দ্বারা প্রভাবিত হয়, এ কারণে বন্ধু নির্বাচনে অত্যন্ত সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

কোরআন শিক্ষা, দিবসের তুলনায় রাতে কোরআন তেলাওয়াতের অধিক ফজিলত, রমজানে কোরআন তেলাওয়াত বেশি পুণ্যময় ও কল্যাণকর হওয়া, উত্তম সাহচর্যের ফলে আত্মিক উত্তম ফলশ্রুতি লাভ ইত্যাদি বিষয়ে উক্ত হাদীস একটি প্রামাণ্য দলিল।
ইবনে হাজার বলেন : তেলাওয়াত দ্বারা উদ্দেশ্য আত্মিক উপস্থিতি ও উপলব্ধি।
ইবনে বাত্তাল বলেন : রাসূলের এ কোরআন শিক্ষা ও অনুশীলনের একমাত্র কারণ ছিল পরকালের আকাক্সক্ষা ও ব্যাকুল ভাবনার জাগরণ এবং পার্থিব বিষয়ে অনীহার সৃষ্টি করা।

অত্যন্ত আনন্দ ও সুখের বিষয়, বর্তমান সময়ে রমজানে একবার বা দু বার কোরআন খতমের ব্যাপক আগ্রহ মানুষের মাঝে দেখা যায়। সন্দেহ নেই, এ হবে মানুষের জন্য ব্যাপক কল্যাণবাহী। তবে, তারাবীহে যে তেলাওয়াত করা হয়, তেলাওয়াত ও সুর মাধুর্যের নানা কৌশলের প্রতি লক্ষ্য রাখার ফলে মর্ম উপলব্ধি ও গভীর চিন্তার প্রয়োগ হয় না। আল্লাহ পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেছেন-
এ এমন এক কিতাব বরকতময় যা আপনার নিকট অবতীর্ণ করেছি, যাতে তারা এর আয়াতগুলোয় গভীর চিন্তা করে এবং জ্ঞাণীগণ উপদেশ গ্রহণ করে।
সন্দেহ নেই, এ সম্মানিত সময়ের সবটুকু কল্যাণ নিংড়ে নেয়া সকলের কর্তব্য। সালফে সালিহীন হতে প্রমাণিত, এ সময়ে তারা সালাত ও অন্যান্য উপলক্ষে দীর্ঘক্ষণ কোরআন তেলাওয়াত করতেন এমনকি, ইমাম যুহরি বলেন : রমজান হচ্ছে কোরআন তেলাওয়াত ও আহার বিতরণের মাস; রমজান মাস আরম্ভ হলে ইমাম মালেক হাদীস অধ্যয়ন ও আহলে ইলমের সাথে ইলমি আলোচনা ও সভা-সমাবেশ পরিত্যাগ করে কোরআন তেলাওয়াতে নিমগ্ন হতেন।

তাদের অধিকাংশই বরং স্বল্প সময় ব্যয়ে কোরআন খতম করতেন দশ, সাত বা কেউ কেউ মাত্র তিন দিনে। উম্মতের মহান ইমামদের যারা বছরের পুরোটা সময় সতত নিরত থাকতেন কোরআনের আয়াতগুলো বুঝা ও মর্ম উপলব্ধিতে তাদের প্রতি লক্ষ্য করে বলা যায়, এটি খুবই সম্ভব; কিন্তু যারা কেবল রমজান মাসেই কোরআন তেলাওয়াতের কথা স্মরণ করে, তাদের পক্ষে এ কখনোই সম্ভব হতে পারে না। রাসূল এক হাদীসে বলেছেন-
তিন দিনের কমে (পূর্ণ) কোরআন কেউ পাঠ করলে তা উপলদ্ধি করতে সক্ষম হবে না।

কোরআনের উদ্ধৃতিগুলোর সত্যায়ন ও আহকামের পূর্ণ আনুগত্যের ভিত্তিতেই কোরআন তেলাওয়াত কাম্য। আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ বলেন-
কোরআন নিশ্চয় সুপারিশকারী, তার সুপারিশ গ্রহণ করা হবে, সে আল্লাহর কাছে হবে সত্যায়িত গৃহীত আবেদনকারী, যে কোরআনকে স্থাপন করবে সম্মুখে, কোরআন তাকে জান্নাতের দিশা দেবে, আর যে স্থাপন করবে পশ্চাতে, কোরআন তাকে টেনে নিয়ে যাবে জাহান্নামে।

কোরআন শিক্ষার ক্ষেত্রে এটিই ছিল রাসূলের সুমহান পদ্ধতি। আবু আব্দুর রহমান সালামি বলেন : কোরআনের মহান পাঠকগণ যেমন উসমান বিন আফফান, আব্দুল্লাহ বিন মাসঊদ ও অন্যান্যগণ আমাদের জানিয়েছে রাসূলের নিকট হতে তারা দশটি আয়াত লাভ করার পর তার মর্ম-কর্ম বিষয়ে সঠিক জ্ঞান লাভ ব্যতীত এগিয়ে যেতেন না। তারা বলেছেন : আমরা একই সাথে কোরআন, তার ইলম ও আমলের জ্ঞান অর্জন করেছি। আল্লামা সুয়ূতী বলেন : এ কারণেই তারা একটি সূরা মুখস্থ করার জন্য সময় নিতেন।

কোরআন তেলাওয়াতকারীর সুতরাং, কর্তব্য হল : তার কর্ম ও কথনে সঠিক ও সৎ পথের অনুসারী হওয়া। ইবনে মাসঊদ (রাঃ) বলেন-
কোরআনের বাহকের উচিত রাতে কোরআনে মগ্ন হওয়া যখন মানুষ নিদ্রায় মগ্ন হয়; এবং দিনে যখন মানুষ পানাহারে লিপ্ত হয় এবং দুঃখে যখন মানুষ আনন্দে উদ্বেল হয় এবং কান্নার সময় যখন মানুষ অহংকারে স্ফীত হয়।

আব্দুল্লাহ বিন আমর (রাঃ) বলেন- কোরআন বিষয়ে সমালোচক ও মূর্খদের সংসর্গ যাপন কোরআনের বাহকের জন্য উচিত নয়। বরং, সে হবে ক্ষমাশীল, ঔদার্যময়।
হাসান বলেন-
তোমরা কোরআন শিক্ষাকে বিভিন্ন পর্বে ভাগ করে নিয়েছ। রাতে তোমরা কোরআন শিক্ষায় অতিবাহিত কর। আর তোমাদের পূর্বসুরীগণ কোরআনকে মনে করতেন প্রতিপালকের পক্ষ হতে প্রেরিত বার্তা স্বরূপ। রাতে তারা এর শিক্ষায় মগ্ন হতেন, দিনে প্রয়োগ করতেন।

যাদেরকে আল্লাহ কোরআন শিক্ষায় ভূষিত করেছেন, দান করেছেন এ মহান নেয়ামত, তারাই যখন ছিলেন এমন ব্যাকুল ও কোরআন শিক্ষার অতিশয় আগ্রহে মগ্ন সুতরাং, আমরা কেন, কি কারণে পিছিয়ে যাব? কোরআনে উক্ত মহান ব্যক্তিদের উল্লেখ করে এরশাদ করা হয়েছে-

এটা সংরক্ষণ ও পাঠ করার দায়িত্ব আমার। যখন আমি তা পাঠ করি, তখন তুমি সে পাঠের অনুসরণ কর। অতঃপর তা ব্যাখ্যা করার দায়িত্ব আমারই। কোরআনের এ আয়াত ও বর্ণনাগুলো নিশ্চয় আমাদের নতুন উদ্যমে কোরআন পাঠে আত্মনিয়োগ করার পথে আগ্রহী করে তুলবে! কোরআনের মর্ম ও উপলব্ধি, জ্ঞান ও হেদায়েত আমাদের আত্মাকে করবে আরো প্রসারিত-প্রশস্ত, পার্থিব ব্যাপারে আরো বেশি সতর্ক ও কল্যাণকামী।

কোরআন শিক্ষা ও অধ্যয়নের ক্ষেত্রে সকলের সাথে সহপাঠ, সম্মিলিত অনুশীলন না একাকী তেলাওয়াত উত্তম? এ ব্যাপারে নানা মত থাকলেও, প্রকৃতপক্ষে বিষয়টি পাঠক ও তেলাওয়াতকারীর মানসিকতা ও ইচ্ছার উপর নির্ভর করে। সকলের সাথে সমবেত হয়ে সহপাঠ বা অনুশীলন যদি তেলাওয়াতকারীর নিকট উত্তম ও অধিক একাগ্রতা-বিনয় উদ্রেককারী মনে হয়, তবে তাই উত্তম, অন্যথায়, তার মানসিকতা অনুসারে একাকী-নির্জনতা বেছে নিবে, মগ্ন হবে ঐকান্তিক নীরবতায়।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মহানুভবতা, সকলের সাথে সমান এহসানপ্রবণ আচরণ, বিনয়, যুহুদ, অপরকে প্রাধান্য প্রদান ইত্যাদি ক্ষেত্রে কোরআনের সহপাঠ কীভাবে ক্রিয়া করত, আগামীতে আমরা তা আলোচনা করব।

কোরআনের প্রতি সর্বস্ব নিবেদন ও আকুতি দাওয়াত ইলাল্লাহর জন্য খুবই সহায়ক, আনুগত্য ও এবাদতে বিপুলতা আনয়নকারী এবং সৎকাজের উদগাতা। এ ক্ষেত্রে অধিক অগ্রগামী ব্যক্তি এ সকল সৎকর্মের মাধ্যমে নিজেকে ভূষিত করতে সক্ষম হবে সন্দেহ নেই।

বর্তমান মুসলিম সমাজের দূরাবস্থার সচেতন যে কোন সমাজ-পাঠকই স্বীকার করতে বাধ্য হবেন; উম্মতের অধিকাংশ দূরাবস্থার সূচনা কোরআনের বর্জনের সূত্র ধরে। কোরআনকে হেলা করেছে বলেই জাতি ও উম্মত হিসেবে মুসলিম উম্মাহ আজ সবার চোখে, যাবতীয় সক্রিয় ক্ষেত্রে হেলার পাত্র। কোরআনের সামাজিক পাঠ দুর্বল হয়ে যাওয়ার ফলে দুর্বল হয়ে পড়ছে ক্রমশ তাদের অস্তিত্বের ভীত, সামাজিক-সাংস্কৃতিক বলয়। কোরআনের পূর্ণ অনুসরণ-অনুবর্তন ব্যতীত এই ‘তীহ’ হতে আমাদের মুক্তি নেই, অনবরত তাতেই আমাদের ঘুরপাক খেতে হবে দীর্ঘ লাঞ্ছিতকাল ধরে। কোরআন তেলাওয়াত, গবেষণা, সর্বাত্মক আমল ও কোরআনের শাসন প্রণয়ন ইত্যাদি হবে আমাদের এ পথ উত্তরণের স্তর ও পর্ব। আল্লাহ আমাদের তৌফিক দান করুন।