কুলকুচা করা ও পানি দেয়া

রোজা অবস্থাতেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুলকুচা করতেন, পানি দিতেন নাকে। তবে নাকে পানি দেওয়ার ব্যাপারে খুবই সাবধানতা অবলম্বন করতেন। লাকিত বিন সাবরা (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীস বিষয়টিকে প্রমাণ করে; তিনি বলেন :
আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল। আমাকে ওজু বিষয়ে শিক্ষা দিন। তিনি বললেন, তুমি ওজু করবে পূর্ণাঙ্গরূপে খেলাল করবে আঙুলগুলো। যদি রোজাদার না হও, তবে নাকে পানি দেওয়ার ক্ষেত্রে গভীরে পৌঁছে দেবে।

মধ্যপন্থা অবলম্বনের এ এক অনুপম দৃষ্টান্ত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পরিচ্ছন্নতা ও সিয়ামের নীতিমালা সংরক্ষণের ক্ষেত্রে উম্মতের জন্য অতুলনীয় সমন্বয় সাধন করেছেন। কোন একদিনে অতিরঞ্জনের ন্যূনতম সুযোগ রাখেননি।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সওমে ওসাল

রাসূল কখনো কখনো রাত-দিন পূর্ণ সময় অনাহারে কাটাতেন এবং রোজা পালন করতেন। পুরো সময় যেন আল্লাহর এবাদতে পালিত হয় সওমে ওসাল পালনের মাধ্যমে এটাই ছিল তার উদ্দেশ্য। প্রমাণ হিসেবে কয়েকটি হাদীস এ স্থানে উল্লেখ্য : আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন-
তোমরা সওমে ওসাল (রাত-দিন একত্রে রোজা) পালন কর না। সাহাবীগণ বললেন, আপনি তো তা পালন করেন? তিনি উত্তরে বললেন : আমি তো তোমাদের কারো মত নই। আমাকে (আল্লাহর পক্ষ হতে, আত্মিকভাবে) পানাহার করানো হয়, আমি রাত যাপন করি পানাহার করানো অবস্থায়।

আবু হুরায়রা (রা.) কর্তৃক বর্ণিত : তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোজা ওসাল করতে বারণ করেছেন। মুসলমানদের একজন তাকে প্রশ্ন করলেন : হে আল্লাহর রাসূল! আপনি তো তা করেন? উত্তরে রাসূল বললেন : তোমাদের কেউ কি আমার অনুরূপ? আমি রাত যাপনকালে আল্লাহ আমাকে পানাহার করান। যখন তারা ওসাল করতে নাছোড় হল, তখন রাসূল তাদের সাথে একদিন সওমে ওসাল করলেন, অতঃপর আরেকদিন করলেন। এরপর চাঁদ উঠল। অতঃপর রাসূল বললেন : যদি চাঁদ উঠতে আরো বিলম্ব হত, তবে আমি আরো বৃদ্ধি করতাম। সওমে ওসালের ব্যাপারে তারা নাছোড় হলে রাসূল তাদের তিরস্কার করে এমন বলেছিলেন।

উল্লেখিত হাদীসগুলো পর্যালোচনা প্রমাণ হয়, সওমে ওসাল একমাত্র রাসূলের জন্য বিশিষ্ট; অন্য কারো জন্য তা পালন বৈধ নয়। তবে, কেউ যদি একান্তভাবে তা পালন করতে চায়, তাহলে অবধি বিলম্বিত করার বৈধতা রয়েছে। এক হাদীসে এসেছে, রাসূল বলেন :
তোমরা সওমে ওসাল কর না, কেউ যদি ওসাল করতে আগ্রহী হয়, তবে সে যেন সেহরি অবধি করে।

সেহরি অবধি ওসাল করার ক্ষেত্রে কেবল বৈধতা প্রদান করা হয়েছে, উৎসাহ কিংবা সম্মতি দেওয়া হয়নি। বিভিন্ন হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দ্রুত ইফতার করার জন্য উৎসাহ দিয়েছেন। সাহল বিন সাআদ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসূল বলেছেন-
মানুষ যতক্ষণ দ্রুত (সময় হওয়া মাত্রই) ইফতার করবে, ততক্ষণ ভালো থাকবে।

রাসূলের উক্তি সম্পর্কে আলেমদের মাঝে মতবিরোধ রয়েছে। আল্লাহর পক্ষ থেকে রাসূলের উক্ত খাদ্য ও পানীয় ছিল ইন্দ্রিয়গত, অনুভবীয়। অর্থাৎ আধ্যাত্মিকভাবে নয়, তাকে সরাসরি খাদ্যই প্রদান করা হত। এ ব্যাপারে তাদের যুক্তি, হাদীসের বাহ্যিক শব্দ-প্রয়োগ এ অর্থই বহন করছে সুতরাং, তা থেকে সরে এসে ভিন্ন কোন অর্থ নেওয়ার মানে নেই।

অপর কেউ বলেন : এ আহার কোনভাবেই ইন্দ্রিয়গত বা অনুভবীয় ছিল না। বরং, আল্লাহ তাকে আপন জ্ঞানভাণ্ডার হতে তাকে যে মহান তত্ত্ব দান করতেন, মোনাজাতের মাধ্যমে অপার আস্বাদ, ভালোবাসা এবং আল্লাহ তায়ালার পরম নৈকট্যের যে ভূষণে তাকে শোভিত করতেন, এ তারই প্রতি ইঙ্গিতসূচক। যদি তাকে আমরা ইন্দ্রিয়গত ও অনুভবীয় পানাহার হিসেবেই সাব্যস্ত করি, তবে তাতে রাসূলের অক্ষমতাই কেবল প্রকাশ পাবে, সওমে ওসাল পালনকারী বলা হবে না। শেষোক্ত মতকেই অধিক যুক্তিযুক্ত মনে হয়।

এতে ইঙ্গিত পাওয়া যায়, আল্লাহ তায়ালার আনুগত্য ও এবাদতে নিজেকে লীন করে দেয়া, প্রবৃত্তীয় যাবতীয় লালসা ও আকাক্সক্ষা হতে মুক্ত থেকে আল্লাহকে ধ্যান-জ্ঞান বানিয়ে যাপন করা বান্দার জন্য নির্মাণ করে এক অপার্থিব রক্ষাব্যুহ, যা ভেদ করে শয়তানি শত্রু তাকে আক্রান্ত করতে পারে না কোনভাবে, এর ফলে প্রবৃত্তিজাত দৌর্বল্যগুলো মানুষ অতি সহজে কাটিয়ে উঠতে পারে। মানুষ যতটা পরিমাণে দৈহিক প্রয়োজন ও চাহিদাগুলো এড়াতে পারবে, দমন করতে পারবে প্রবৃত্তির আকাক্সক্ষা, সাফল্যের পালক ততটাই বৃদ্ধি পাবে তার হিসেবের খাতায়, ইচ্ছা ও প্রতিজ্ঞায় বলীয়ান হয়ে উঠবে। রোজা তার জন্য তখন হবে রক্ষাকবচ যাবতীয় পাপ ও গোনাহ হতে।

রাসূল সওমে ওসাল পালন করতেন, যা ছিল তার জন্য মোস্তাহাব আমলের তুলনায় ঊর্ধ্বের। এ পালন প্রমাণ করে, তার মানসিকতা ছিল অধিক কল্যাণব্রতীতায় নিরত, নফসকে প্রবৃত্তির বন্ধ্যাত্ব হতে মুক্ত রাখবার জন্য আত্মমগ্ন। তার আত্মা সন্তোষ প্রকাশ করত প্রয়োজনীয় পার্থিব আস্বাদ পেয়ে তাদের মুক্ত থাকত যাবতীয় গাফলত ও উদাসীনতা হতে। তিনি পার্থিব যাবতীয় কর্ম সম্পাদন করে স্রষ্টার জন্য সর্বোত্তম সময়টুকু বের করে আনতেন, মগ্ন হতেন তাতে আর এবাদতে। আর এ মানসিকতার সর্বোত্তম প্রকাশ ছিল রমজান মাসে, যে মাস রহমত-বরকতের মাস, এবাদত ও যুহুদ পালনের মহত্তম মৌসুম।
সওমে ওসাল ইঙ্গিত করে, আল্লাহ তায়ালা কখনো কখনো বান্দার জন্য এমন কর্মের আদেশ প্রদান করেন, বাহ্যিক দৃষ্টিতে যাকে মনে হবে অনুপযোগী, মানুষের স্বাভাবিক স্বভাব ও প্রকৃতির প্রতিকুল, খোলা চোখে যার যৌক্তিকতা আমাদের কাছে ধরা দেয় না।
রাসূলের স্বয়ং ওসাল করা সত্ত্বেও সাহাবীদের ওসাল হতে বিরত থাকার আদেশ প্রদান প্রমাণ করে, উম্মতের ব্যাপারে তিনি ছিলেন খুবই দয়ার্দ্র চিত্তের ও সহনশীল। নিষেধ ব্যতীত সাহাবীগণ তার কর্মের পূর্ণ অনুবর্তনে ছিলেন ব্রতী, তার অনুসরণে আত্মনিয়োগকারী।