রাসূলের বিনয় ও যুহুদ

যার অন্তর লীন হয়েছে, বিনম্র হয়েছে মহান সত্ত্বার সামনে, সন্ধান পেয়েছে প্রকৃত মাবুদের, অনুভব করেছে আত্মিক দৌর্বল্যের, বিনয়-যুহুদ তার পরিচয় ও নির্দশন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রবের পরিচয় লাভ ও নিদর্শনই ধারণ করেছিলেন নিজের জন্য। শরিয়ত, শরিয়ত প্রদত্তার মহত্ত্ব, তার সাথে সম্পর্কের প্রবৃদ্ধি, পার্থিবে অনাসক্তি ও পরকালে প্রবল আসক্তি ইত্যাদির জন্য অন্তরের বিনয় ও নিবেদনের মাধ্যমে এ মারেফাত ও আল্লাহ ভীতির জন্ম নেয়। অভ্যাস ও আচরণের নানা ক্ষেত্রে রাসূল যুহুদ অবলম্বন করতেন, আচরণে অবলম্বন করতেন বিনয়ের সর্বোচ্চ পরাকাষ্ঠা।

রাসূল এক চাটাইতে পূর্ণ রাত্রি কাটিয়ে দিতেন। আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেন-
রমজানে লোকেরা মসজিদে দলে দলে সালাত আদায় করত; রাসূল আমাকে নির্দেশ দিলে আমি তার জন্য একটি চাটাই বিছিয়ে দিলাম, তিনি তাতে সালাত আদায় করলেন।

রাসূল রমজানে এতেকাফ পালন করতেন একটি তুর্কি তাঁবু টানিয়ে, যার প্রবেশমুখে ঝুলান থাকত একটি চাটাই। আবু সাইদ খুদরি বর্ণিত হাদীসে এসেছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতেকাফ পালন করলেন একটি তুর্কি তাঁবুতে, যার প্রবেশমুখে ছিল একটি চাটাই। তিনি বলেন : রাসূল স্বহস্তে উক্ত চাটাই ধরে একপাশে সরিয়ে দিলেন, অতঃপর মুখ বের করে মানুষের সাথে কথা বললেন।

শুকনো খেজুর পাতায় নির্মিত তাঁবুতে রাসূল এতেকাফ পালন করতেন। ইবনে উমর (রাঃ) বলেন : রাসূল রমজানের শেষ দশ দিন এতেকাফ পালন করলেন, তার জন্য শুকনো খেজুর পাতা দিয়ে গৃহ-সদৃশ বানা হল। মসজিদের ছাদ দিয়ে তার জায়নামাজে পানি গড়িয়ে পড়ত, তিনি মাটি আর কাদাতেই সেজদা করতেন। আবু সাইদ খুদরি (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে আছে- সে রাতে আকাশ-ঝেপে বৃষ্টি হল, একুশ তারিখের রাতের ঘটনা, রাসূলের জায়নামাজে চুঁইয়ে চুঁইয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। রাসূলের উপর আমার দৃষ্টি পড়ল। আমি দেখলাম, সকাল হয়ে এসেছে, পানি আর কাদায় তার মুখমণ্ডল মাখামাখি হয়ে আছে।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুবই সাদামাটাভাবে ইফতার ও সেহরি গ্রহণ করতেন। তার খাদেম আনাস বিন মালেক বর্ণনা করেন : রাসূল সালাত আদায়ের পূর্বে কয়েকটি ভেজা খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন, ভেজা খেজুর না হলে শুকনো খেজুর গ্রহণ করতেন। শুকনো খেজুরও না থাকলে কয়েক ঢোক পানি দিয়ে ইফতার করতেন। অপর এক হাদীসে তিনি বলেন : একদা সেহরিকালে রাসূল আমাকে লক্ষ্য করে বলেন-
হে আনাস আমি রোজা রাখতে আগ্রহী, আমাকে কিছু আহার করাও। আমি তার জন্য খেজুর ও এক পাত্রে পানি এনে হাজির করলাম। এ ছিল বেলালের (প্রথম) আজানের পরে।

তিনি ছিলেন খুবই স্বল্পাহারী। যামারা বিন আব্দুল্লাহ বিন আনিস তার পিতা হতে বর্ণনা করেন : আমি বনি সালামার এক মজলিসে বসা ছিলাম, আমি ছিলাম তাদের মাঝে সর্বকনিষ্ঠ তারা বলাবলি করল, লাইলাতুল কদর সম্পর্কে আমাদের পক্ষ হতে রাসূলকে কে প্রশ্ন করবে? এটি ছিল একুশে রমজানের সকালের ঘটনা। আমি বেরিয়ে মাগরিবের সালাতে রাসূলের নিকট উপস্থিত হলাম। অতঃপর তার গৃহের দরজায় দণ্ডায়মান হলে তিনি পাশ দিয়ে গমন করলেন। বললেন, প্রবেশ কর। প্রবেশ করলে আমাকে তার রাতের খাবার প্রদান করা হল। তিনি দেখতে পেলেন খাদ্য স্বল্পতার কারণে আমি খাদ্যগ্রহণ হতে বিরত থাকছি।

এ থেকে প্রমাণ হয় রাসূলের হেদায়েত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ জুড়ে রয়েছে বিনয় ও যুহুদ। বিনয় ও যুহুদের অর্থ হল- পরকালে কল্যাণ সাধন করে না, এমন যাবতীয় কিছু পরিহার করা, উদারতা, লোক-দেখানো জাঁকজমক না করা, পার্থিব বিষয় যথাসম্ভব এড়িয়ে যাওয়া, কখনো কখনো কঠোরতা অবলম্বন, জরাজীর্ণ বেশ ধারণ ইত্যাদি; যেন আত্মা প্রবৃত্তির দাসত্বে আকণ্ঠ নিমজ্জিত না হয়ে পড়ে। এবাদতের মৌলিকত্ব হল আত্মার বিনয়, আগ্রহ ও ব্যাকুলতার সাথে শরিয়তের প্রতি সর্বস্ব নিয়োগ। পার্থিবের সাথে প্রগাঢ় সম্পর্ক, তার জাঁকজমক নিয়ে সর্বদা মেতে থাকা এ পথের সবচেয়ে বড় বাধা। এর মাধ্যমে প্রমাণিত যুহুদ ও বিনয়ের সর্বনিম্ন স্তর অর্জন যে কোন মুসলমানের অবশ্য কর্তব্য। এ ব্যাপারে মৌলনীতি হচ্ছে : বান্দা হারাম প্রবৃত্তির পরওয়া করবে না বিন্দুমাত্র, বৈধ হোক কিংবা অবৈধ ওয়াজিব আদায়ের ক্ষেত্রে যে বিষয় বাধা, তাকে এড়িয়ে যাবে দৃঢ়তার সাথে।

তবে, এর উদ্দেশ্য এই নয় যে, প্রবৃত্তির যে কোন আস্বাদকে মানুষ সর্বদা এড়িয়ে যাবে; প্রকারান্তরে যা পর্যবসিত হয় পার্থিব বৈরাগ্যে, আল্লাহ তায়ালা ইসলামকে এ জাতীয় অসামাজিক বৈরাগ্য থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত রেখেছেন। আমরা বরং, সর্বক্ষেত্রে আল্লাহর রাসূল ও পুণ্যবান সাহাবাদের পদাঙ্ক অনুসরণ করব, বিচার-বিশ্লেষণ ব্যতীত কোন বিষয়কে সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাব না, কিংবা গ্রহণ করব না অমূলকভাবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের হেদায়েত দান করুন, প্রদর্শন করুন সঠিক ও ঋজু পথ।
এই সূত্র ধরে বলা যায়, মৌলিকভাবে সম্পদ অর্জন অবাঞ্ছিত নিন্দনীয় বিষয় নয়, তবে সম্পদ অর্জনের ক্ষেত্রে বান্দাকে আল্লাহর তরে অন্তরকে করে তুলতে হবে বিনয়ী, একমুখী; অন্তরের প্রশান্তি ও সন্তোষ সম্পদে নয়, পেতে হবে আল্লাহর সাথে সম্পর্কের উপর ভিত্তি করে, পরকালীন চিন্তাই হবে তার সার্বক্ষণিক চিন্তা ও ধ্যান, সাফল্যের মাপকাঠি। যুহুদের প্রকৃত স্বরূপ এর মাঝেই নিহিত। সম্পদ চিন্তা ও মোহে আকণ্ঠ নিমজ্জন, সম্পদের অর্জন ও প্রবৃদ্ধির লালসা যুহুদের সাথে এগুলোর ন্যূনতম সম্পর্ক নেই; টাকা ও অর্থের দাসত্বের অনুরূপ এগুলো হচ্ছে পার্থিবের দাসত্বের প্রতিফল।