রমজানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এবাদতে রাত্রি জাগরণ
রাত্রি জাগরণ সালিহীন ও এবাদতগুজারদের নিদর্শন ও পরিচয়; যারা দাওয়াত ও সংস্কারের মহান দায়িত্বে সতত নিয়োজিত ও মগ্ন, তাদের মহান আদর্শ। এ ক্ষেত্রে তারা অনুসরণ-অনুবর্তন করেন সে মহান ব্যক্তিত্ব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের, রাত্রি জাগরণ ছিল যার পুরো বছরের এবাদত। ওজর ব্যতীত তিনি কখনো রাত্রি জাগরণ ত্যাগ করতেন না, সুতরাং রমজানে কী পরিমাণ রাত্রি জাগরণ করতেন, তা বলাই বাহুল্য।
রাসূলের রাত্রি জাগরণ, তাহাজ্জুদ ও সালাত আদায়ের বৈশিষ্ট্য ও রূপ বর্ণনা করে বিভিন্ন হাদীস বর্ণিত হয়েছে। হাদীসে এসেছে- রাসূল রাতে এগারো কিংবা তেরো রাকাতের অধিক সালাত আদায় করতেন না। উম্মুল মোমিনীন আয়েশা (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে এসেছে- রাসূল রমজান কিংবা অন্য সময়ে এগারো রাকাতের অধিক সালাত আদায় করতেন না। অন্য এক হাদীসে আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেন : রাসূল রাতে তেরো রাকাত সালাত আদায় করতেন। অতঃপর ভোরের আযান শ্রুত হলে সংক্ষেপে দু রাকাত সালাত আদায় করতেন।
তার রাত্রি জাগরণের পদ্ধতি ছিল নানা প্রকার, যেভাবেই করা হোক না কেন, এবাদতগুজার বান্দার জন্য তা হবে কল্যাণকর। তবে সুন্নত অনুসারে, উত্তম হচ্ছে জোড় হিসেবে দুই দুই রাকাত করে অধিকহারে আদায় করা।
রাকাতের সংখ্যা ও পদ্ধতি বিষয়ে যত বর্ণনা রয়েছে, তাতে আমরা দেখতে পাই, বিনয়-বিনম্রতার সাথে দীর্ঘ তেলাওয়াত, রাত্রি-জাগরণে ধ্যান-নিমজ্জন, অন্তরের সাক্ষ্য ও উপস্থিতিসহ জিকির ও দোয়া, প্রতিটি কর্মের সুষম সম্পাদন অধিক সংখ্যক রাকাতের তুলনায় উত্তম ও শ্রেয়। কারণ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সংখ্যা ও পদ্ধতি নির্দিষ্টকরণ ব্যতীতই হাদীসে ইরশাদ করেছেন-
রাতের সালাত দুই দুই সংখ্যায়।
তাত্ত্বিক ও অনুসন্ধিৎসু পাঠক মাত্রই স্বীকার করবেন, তারাবীহ নামাজের রাকাত-সংখ্যা বিষয়ে রয়েছে নানা মতবিরোধ ও এখতেলাফ। রাসূলের সুন্নাহর পুঙ্খানুপুঙ্খ অনুসন্ধানের পর আমরা স্বীকার করতে বাধ্য হব এ ব্যাপারে তিনি নির্দিষ্ট কোন সীমা এঁকে দেননি। কেবল রাত্রি জাগরণের ব্যাপারে সকলকে উৎসাহিত করেছেন। এ ব্যাপারে রাসূলের নীরবতা বিষয়টির ব্যাপক সম্ভাব্যতার প্রমাণ করে। সুতরাং, ব্যক্তির পক্ষে একাগ্রতা-বিনম্র চিত্ততা ও প্রশান্তির সাথে যতটা সম্ভব সালাত আদায় বৈধ, যদিও সংখ্যা ও পদ্ধতিগত দিক থেকে রাসূলকে অনুসরণ করা শ্রেয়।
রাসূল কখনো পূর্ণ রাত্রি সালাতে জাগরণ করতেন না। কোরআন তেলাওয়াত ইত্যাদির মাধ্যমে কিছু সময় কাটাতেন। আয়েশা (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে এসেছে-
রমজান ব্যতীত কোন রাত্রিতে আমি রাসূলকে পূর্ণ কোরআন তেলাওয়াত করতে, কিংবা ভোর অবধি সালাতে কাটিয়ে দিতে অথবা পূর্ণ মাস রোজা পালন করে কাটিয়ে দিতে দেখিনি।
ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত : জিবরাইল (আঃ) রমজানের প্রতি রাতে ভোর অবধি রাসূলের সাথে কাটাতেন। রাসূল তাকে কোরআন শোনাতেন। রাসূল যদি সে রাতগুলোতে পূর্ণ সময় ব্যয়ে কিয়ামুল লাইল করে কাটিয়ে দিতেন, তবে জিবরাইল (আঃ)-এর কোরআন অনুশীলনে সময় পেতেন না।
এবাদতের এ পদ্ধতি শরীরের জন্য অনুকূল, মন হতে অংশ নেয় স্বতঃস্ফূর্তভাবে। এর ফলে ব্যক্তির জন্য পরিবারের হক আদায় সম্ভব হয়; এবাদতে অব্যাহততা আনা যায়, সহনীয়ভাবে, ক্রমশ: দ্বীনের মাঝে প্রবেশ সহজ হয়। নফস হঠাৎ বিতৃষ্ণ হয়ে ওঠে না। অধিক কিন্তু বিচ্ছিন্ন এবাদতের তুলনায় পরিমাণে স্বল্প ও অব্যাহত এবাদত কল্যাণকর ও আল্লাহর নিকট প্রিয়।
অধিকাংশ সময় রাসূল উম্মতের জন্য ফরজ করে দেয়া হবে এ আশঙ্কায় রাতে একাকী সালাত আদায় করতেন। আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন-
রাসূল রমজানে (রাতে) সালাত আদায় করতেন। একদিন আমি এসে তার পাশে দাঁড়ালাম। অতঃপর এক ব্যক্তি এসে দাঁড়াল। এভাবে কিছুক্ষণের মাঝে আমরা একটি দলে পরিণত হলাম। রাসূল যখন বুঝতে পারলেন যে, আমরা তার পিছনে দাঁড়ানো, তখন সংক্ষেপে সালাত আদায় করতে লাগলেন। অতঃপর তিনি তার গৃহে প্রবেশ করে একাকী সালাত আদায় করলেন। প্রত্যুষে আমরা তাকে বললাম : আপনি রাতে আমাদের সাথে কৌশল করেছেন? তিনি বললেন : হ্যাঁ। তোমরা জড়ো হওয়ার ফলেই আমাকে কৌশল করতে হয়েছে।
আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন-
এক রাতে রাসূল গৃহ হতে বেরিয়ে মসজিদে সালাত আদায় করলেন। কয়েক ব্যক্তি তার সাথে সালাত আদায় করল। পরদিন সকলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় প্রবৃত্ত হল, ফলে পূর্বের তুলনায় অধিক লোক সমাগম হল। দ্বিতীয় রাত্রিতেও রাসূল আগমন করলে লোকেরা তার সাথে সালাত আদায় করল, সকলে এ নিয়ে আলোচনায় অংশ নিল। তৃতীয় রাত্রিতে পূর্বেরও অধিক লোক সমাগম হল। রাসূল বের হলে সকলে তার সাথে সালাত আদায় করল। চতুর্থ রাত্রিতে এত মুসল্লি হল যে, মসজিদ তাদের ধারণ করতে অক্ষম হয়ে পড়ল। কয়েক ব্যক্তি ডেকে বলল : সালাত! কিন্তু, রাসূল ফজরের সালাতের পূর্বে বেরুলেন না। ফজরের সালাত আদায়ের পর তিনি সকলের দিকে ফিরে তাশাহুদ পাঠ করে বললেন : গত রাতের ঘটনা আমার অবিদিত নয়। কিন্তু, আমি আশঙ্কা করেছি যে, তোমাদের উপর রাতের সালাত ফরজ করা হবে, তোমরা তা আদায়ে অপরাগ হয়ে পড়বে।
আবু যর হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : আমরা রাসূলের সাথে রোজা পালন করেছি, যখন মাসের মাত্র সাতদিন বাকি ছিল, তখন তিনি আমাদের নিয়ে রাতের এক তৃতীয়াংশ সালাত আদায় করলেন। ষষ্ঠ দিনে তিনি আমাদের সাথে সালাত আদায় করেননি। পঞ্চম রাতে অর্ধ রাত্রি আমাদের নিয়ে সালাত আদায় করলেন। আমরা তাকে উদ্দেশ্য করে আরজ করলাম : হে আল্লাহর রাসূল! আপনি বাকি সময়টুকুও যদি আমাদের নিয়ে নফল সালাতে কাটাতেন। তিনি বললেন : যে ব্যক্তি ইমাম সালাত সমাপ্তি করা অবধি তার সাথে সালাত আদায় করবে, তার জন্য পূর্ণ রাত্রি সালাত আদায়ের সওয়াব লিখে দেয়া হবে। অতঃপর তিনি শেষ তিন রাত বাকি থাকা পর্যন্ত আর আমাদের নিয়ে সালাত আদায় করলেন না। তৃতীয় রাত্রিতে আমাদের নিয়ে সালাত আদায় করলেন। স্ত্রী ও পরিবার ও পরিজনদের ডেকে নিলেন। এতটা সময় তিনি আমাদের সাথে রাত্রি জাগরণ করেছিলেন যে সেহরির সময় অতিক্রান্তের ভয় হচ্ছিল।
রাসূল তার প্রতি আমার পিতা-মাতা উৎসর্গিত হোক উম্মতের কল্যাণ, শিক্ষা ও এবাদতে সহায়তা দানে ছিলেন বদ্ধপরিকর, অত্যন্ত আগ্রহী। কতটা সময় তিনি উম্মতকে সাথে নিয়ে রাত্রি জাগরণ-সালাত আদায় করেছেন বলাই বাহুল্য।
আগ্রহের সাথে সাথে তিনি এ আশঙ্কাও পোষণ করতেন যে, তার উম্মতের উপর রাত্রি জাগরণ ও সালাত আদায় ফরজ করা হতে পারে; ফলে কিছু লোক এ ব্যাপারে অক্ষমতায় আক্রান্ত হবে, গোনাহর ভাগীদার হবে ফরজ ত্যাগের ফলে। সাহাবীদের সীমাহীন আকাঙ্খার কারণে তিনি তাদের সাথে রাতে সালাত আদায় করতেন, অন্যথায়, পরবর্তী দুর্বল মুসলমানদের প্রতি লক্ষ্য রেখেই তিনি এ ব্যাপারে তাদের বারণ করেছিলেন।
আল্লাহ তার প্রিয় রাসূলের মহত্ত্ব, দয়ার্দ্রতা এবং আবেগের যথার্থ চিত্র তুলে ধরেছেন : কোরআনে এসেছে-
অবশ্যই তোমাদের মাঝে, তোমাদের থেকেই একজন রাসূল আগমন করেছেন, যা তোমাদেরকে বিপন্ন করে, তা তার জন্য কষ্টদায়ক, সে তোমাদের মঙ্গলকামী, মোমিনদের জন্য দয়ার্দ্র ও করুণাময়।
যারা দায়ি, সংস্কার কর্মে নিয়োজিত, তাদের জন্য বিষয়টি গাইড ও আদর্শ স্বরূপ। মানুষের হেদায়েত ও দাওয়াতের ক্ষেত্রে যথাসাধ্য শ্রম ব্যয় করে নিজেকে তারা উজাড় করে দেবে, উম্মতের জন্য অন্তরে পালন করবে সহানুভূতি, করুণা ও হৃদ্যতা। তাদের অস্বীকৃতি ও বিকারকে এড়িয়ে দ্বীনকে তুলে ধরবে সরল নীতিমালা হিসেবে।
উল্লেখিত হাদীসগুলোর মাধ্যমে আমরা তারাবীহ নামাজের ফজিলত বিষয়ে অবগতি লাভ করি, প্রথমে তা ছিল রাসূল কর্তৃক অনুমোদিত-প্রবর্তিত মসজিদে আদায়কৃত সুন্নত; পরবর্তীতে ফরজ করে দেয়ার আশঙ্কায় রাসূল তা পরিত্যাগ হওয়ার সম্ভাবনা যখন লুপ্ত তিনি দেখতে পেলেন, লোকেরা বিচ্ছিন্নভাবে মসজিদে তারাবীহ-র সালাত আদায় করছে, সকলকে লক্ষ্য করে তিনি বললেন :
আমার মনে হয়, সকলে যদি এক ইমামের পিছনে তা আদায় করত, তবে তা হত সুন্দর-উত্তম। অতঃপর তিনি গুরুত্বের সাথে সকলকে উবাই বিন কাব-এর ইমামতিতে একত্রিত করলেন।
উমরের এ আদেশ সাহাবীদের সকলে সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নিয়েছিলেন এমনকি, একদা রমজানের প্রথম রাত্রিতে আলী (রাঃ) মসজিদে এসে দেখতে পেলেন, তাতে আলো জ্বলছে, সকলে সমন্বয়ে কোরআন তেলাওয়াত করছে, তখন তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে উমর (রাঃ)-কে লক্ষ্য করে বললেন : হে উমর বিন খাত্তাব! আল্লাহ আপনার কবরকে আলোয় আলোকিত করুন, যেভাবে আপনি মসজিদকে কোরআনের আলোয় আলোকিত করেছেন।
সুতরাং, যে ব্যক্তি তা পালন করতে আগ্রহী এবং এ ব্যাপারে রাসূল ও তার সাহাবাগণের অনুবর্তী তার দায়িত্ব যতেœর সাথে তা পালন করা। হাদীসে আছে একবার রাসূল যখন কয়েকজনকে নিয়ে রাত্রি যাপন করছিলেন, অর্ধ রাত্রি অতিক্রান্তের পর জনৈক সাহাবী তাকে বলল : আপনি যদি বাকি রাতটুকু আমাদের নিয়ে নফল আদায় করতেন! তখন রাসূল বললেন : ইমামের সাথে যে ব্যক্তি রাতে সালাত আদায় করল এবং ইমাম সমাপ্ত করা অবধি সে প্রস্থান করল না, তাকে পূর্ণ রাত্রি এবাদতে যাপনের সওয়াব প্রদান করা হবে। রাসূলের এ উক্তি প্রমাণ করে, ইমামের সাথে রমজানের রাত্রি এবাদতে যাপন খুবই ফজিলতপূর্ণ একটি কর্ম।
তারাবীহ সালাতের রাকাতের সংখ্যার ক্ষেত্রে ব্যক্তি বিশেষের সীমারোপ এবং ইমামের সালাত সমাপ্তির পূর্বেই প্রস্থান হাদীসটি প্রমাণ করে বৈধ হলেও, উত্তম ও প্রশংসনীয় হতে পারে না কোনভাবে। যারা এভাবে বিষয়টির ইজতিহাদ করেছেন, আমি মনে করি, তাদের ইজতিহাদ প্রশংসনীয় নয়।
