প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ ১২ম সংখ্যা, জুন ২০১৭, শাবান-রমজান ১৪৩৮ হিজরী, জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় ১৪২৪ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়
রমজান মাসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে আচরণ ও কর্ম নিয়ে আল্লাহর দরবারে উপস্থিত হতেন, তা সকলের জন্য জীবন্ত এক উদাহরণ;তিনি তার এবাদত ও বিনয়-লীন আনুগত্য আল্লাহর কাছে উপস্থাপন করতেন। নানাভাবে শোভিত-মহিমান্বিত করতেন তার এ সময়গুলোকে।
রাসূল যেভাবে রোজা পালন করতেন
এবাদতের বিবিধ উপকরণ দ্বারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রোজার দিবসগুলোকে শোভিত করতেন অত্যন্ত আগ্রহ ও ব্যাকুলতার সাথে তিনি সেহরি ও ইফতার গ্রহণ করতেন। রোজা ভাঙার সময় হলে দ্রুত ইফতার করে নিতেন, পক্ষান্তরে সেহরি করতেন অনেক দেরিতে, সুবহে সাদিকের কিছু পূর্বে সেহরি সমাপ্ত করতেন। ইফতার করতেন ভেজা বা শুকনো খেজুর, অথবা পানি দিয়ে। ভেজা খেজুর দিয়ে সেহরি করাকে পছন্দ করতেন তিনি। জাঁকজমকহীন স্বাভাবিক সেহরি ও ইফতার গ্রহণ করতেন সর্বদা।
রমজানে রাসূলের এ আচরণ বিষয়ে বিভিন্ন হাদীসে উল্লেখ পাওয়া যায়- আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেনঃ
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাত আদায়ের পূর্বে কয়েকটি ভেজা খেজুর দিয়ে ইফতার করতেন, যদি ভেজা খেজুর না থাকত, তবে সাধারণ শুকনো খেজুরই গ্রহণ করতেন। যদি তাও না থাকত, তবে কয়েক ঢোক পানিই হত তার ইফতার।
আবু আতিয়া হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : আমি এবং মাসরুক আয়েশা (রাঃ)-এর নিকট উপস্থিত হলাম। মাসরুক তাকে উদ্দেশ্য করে বলল : মোহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দু’ সাহাবী উপস্থিত হয়েছে, যাদের কেউ কল্যাণে পশ্চাৎবর্তী হতে আগ্রহী নয়; তাদের একজন মাগরিব ও ইফতার উভয়টিকেই বিলম্ব করে, অপরজন দ্রুত করে মাগরিব ও ইফতার। আয়েশা বললেন : কে মাগরিব ও ইফতার দ্রুত করে? বললেন : আব্দুল্লাহ। আয়েশা উত্তর দিলেন : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এভাবেই রোজা পালন করতেন।
আব্দুল্লাহ বিন আবি আউফা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন ঃ
একবার, রমজান মাসে আমরা রাসূলের সাথে সফরে ছিলাম। সূর্য অস্তমিত হলে তিনি বললেন, হে অমুক! নেমে এসে আমাদের জন্য ছাতু ও পানি মিশ্রিত ইফতার পরিবেশন কর। লোকটি বলল : হে আল্লাহর রাসূল! এখনও তো দিবসের কিছু বাকি আছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পুনরায় বললেন : নেমে এসে আমাদের জন্য ছাতু ও পানি মিশ্রিত ইফতার পরিবেশন কর। বর্ণনাকারী বলেন : সে নেমে এসে ছাতু ও পানির ইফতার প্রস্তুত করে রাসূলের সামনে উপস্থিত করলে তিনি তা গ্রহণ করলেন। অতঃপর তিনি হাতের ইশারা দিয়ে বললেন : সূর্য যখন এখান থেকে এখানে অস্ত যাবে এবং রাত্রি আগত হবে এতটুকু অবধি, তখন রোজাদার রোজা ভাঙবে।
জনৈক সাহাবীর সূত্র ধরে আব্দুল্লাহ বিন হারেস বর্ণনা করেন, তিনি বলেন : আমি রাসূলের নিকট হাজির হলাম, তিনি সেহরি খাচ্ছিলেন। রাসূল বললেন : নিশ্চয় তা বরকত স্বরূপ, আল্লাহ পাক বিশেষভাবে তা তোমাদেরকে দান করেছেন, সুতরাং তোমরা তা ত্যাগ কর না।
যায়েদ বিন সাবেত হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : আমরা রাসূলের সাথে সেহরি খেলাম, অতঃপর তিনি সালাতে দণ্ডায়মান হলেন। আমি বললাম : সেহরি ও আযানের মধ্যবর্তী সময়ের স্থায়ীত্ব কতটা? তিনি বললেন : পঞ্চাশ আয়াত তেলাওয়াত পরিমাণ দৈর্ঘ্য। বিলম্বে সেহরি গ্রহণ রোজার জন্য সহজ, রোজাদারের জন্য প্রশান্তিকর এবং বিলম্বে সেহরি গ্রহণের কারণে ফজরের সালাত ছুটে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে না।
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : মোমিনের উত্তম সেহরি শুকনো খেজুর।
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন ঃ
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেহরিকালীন আমাকে উদ্দেশ্য করে বলেছেন-
হে আনাস, আমি রোজা রাখতে আগ্রহী। আমাকে কিছু আহার করাও। আমি তার সামনে শুকনো খেজুর ও একটি পাত্রে পানি উপস্থিত করলাম। বেলালের (প্রথম) আযানের পর তিনি সেহরি গ্রহণ করেছিলেন।
উপরোক্ত হাদীসগুলো সামনে রেখে আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হই যে, রাসূল ইফতার করতেন দ্রুত আনাস (রাঃ)-এর স্পষ্ট হাদীস এ বিষয়ের উৎকৃষ্ট প্রমাণ, তিনি বলেন : আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে, এমনকি এক ঢোক পানি দিয়ে হলেও ইফতার করা ব্যতীত মাগরিবের সালাত আদায় করতে দেখিনি।
আব্দুল্লাহ বিন উমর (রা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন রাসূল বলেছেন-
এক ঢোক পানি দ্বারা হলেও তোমরা সেহরি গ্রহণ কর।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উবুদিয়ত ও দাসত্বের সর্বোচ্চ পরাকাষ্ঠা পেরুনের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালিয়েছেন, সাধ্যানুসারে যাবতীয় উপকরণ ব্যবহার করে কর্মের মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার নৈকট্য অর্জন করতে প্রয়াসী হয়েছেন।
কীভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজান যাপন করেছেন, সানুপুঙ্খ দৃষ্টিতে আমরা যদি তা বিবেচনা করি, তবে দেখতে পাব, রোজাদারদের যারা সেহরি গ্রহণ করেন না, বা করলেও সম্পন্ন করেন অনেক দ্রুত মধ্যরাতে, তারা অবশ্যই সুন্নতের সঠিক পথ-বিচ্যুত। দ্রুত সেহরি গ্রহণের কারণে নফ্সকে অযথা ভোগানো হয়। মূলত: রাসূল আমাদের জন্য হেদায়েতের যে আদর্শ রেখে গিয়েছেন তার পুণ্যবান সহচরগণ সমুন্নত করেছেন যে আদর্শ ও কর্মনীতির মৌল পন্থা, তার অনুসরণ ও অনুবর্তনেই সাফল্য ও কল্যাণ। আমর বিন মায়মুন (রাঃ) বলেন : মোহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীগণ ছিলেন সকলের চেয়ে সর্বাধিক দ্রুত ইফতারকারী এবং বিলম্বে সেহরি গ্রহণকারী।
বর্তমান সময়ে ইফতার ও সেহরিকে কেন্দ্র করে আমরা যে জাঁকজমক ও আচার অনুষ্ঠান দেখতে পাই, রাসূল কোনভাবেই এর বৈধতা প্রদান করেননি। অতিরিক্ত ভোজন ও বিলাসী আহারের ফলে নফস অলসতায় আক্রান্ত হয়, এবাদতের ক্ষেত্রে তার মাঝে সীমাহীন শৈথিল্য ছড়িয়ে পড়ে। সে তাই, বঞ্চিত হয় এ মহান মৌসুমের প্রকৃত ফললাভে। দুঃখজনক বিষয় এই যে, কোথাও কোথাও দেখা যায়, মানুষ হারাম ও অবৈধ খাদ্য দিয়ে ইফতার ও সেহরি গ্রহণ করছে, সেহরি ও ইফতারের পিছনে ব্যয় করছে অবৈধ উপায়ে অর্জিত সম্পদ। মানুষ কতটা নির্বিকার হয়ে পড়েছে, এগুলো তার জ্বলন্ত প্রমাণ। আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন।
মানুষ সতত ধোঁকায় আক্রান্ত নিজেকে নিয়ে; নিজেকে সে বঞ্চিত করছে এমন সৌভাগ্য ও অবশ্যম্ভাবী ফলশ্রুতি থেকে যা হতে পারত তার নাজাতের উপকরণ, পরকালীন দরজা বুলন্দীর কারণ। যেদিন কাজে আসবে না পাহাড়সম সম্পদ, একপাল সন্তান-সন্ততি, আল্লাহ যাকে বিশুদ্ধ অন্তরে শোভিত করেছেন, কেবল তার ললাটেই শোভা পাবে মুক্তির সৌভাগ্য। ইহকালীন নশ্বর কিছু বিষয়ের প্রতি লক্ষ্য রেখে মানুষ ত্যাগ করছে-হেলায় হারাচ্ছে পরকালীন অবিনশ্বর প্রাপ্তিকে এবং রমজান মাসে রাসূল নির্দেশিত কর্মপন্থা ও আহার-ভোজনের নীতিমালা অনুসরণ না করে আল্লাহর সাথে এবাদতের ক্ষেত্রে দূরত্ব দৃষ্টি পাপাচার-অনাচারে আক্রান্ত হওয়া ছাড়াও আক্রান্ত হয় নানারকম দৈহিক অসুস্থতা, স্বাস্থ্যহানীতে যার জের টানতে হয় দীর্ঘ সময়।
আত্মার প্রবঞ্চনা ও মোহ হতে যে সতর্ক সতত, নিজেকে তার রক্ষা করাই কাম্য। সময় বয়ে যাচ্ছে নিরবধি, সুযোগ হাতছাড়া হচ্ছে ক্রমাগত যে কর্ম পরকালে কাজে আসবে, বয়ে আনবে মহান ফলাফল তা ক্রমে নিঃশেষ তলানিতে এসে ঠেকছে। রাসূলের পুণ্যময় আচরণ ও জীবনাচারের যে আলো আমাদের স্পর্শ করেছে, তা নিয়েই যে ব্যক্তি বেঁচে থাকতে প্রয়াসী, রাসূলের পূর্ণাঙ্গ অনুবর্তনই যার ইহকালীন একমাত্র অবলম্বন, পার্থিব আস্বাদকে ছুঁড়ে মারা তার দায়িত্ব; আলস্য পরিহার করে ধর্মের মৌলিক এবাদতে নিজেকে নিয়োগ করা, সৌভাগ্যের অনুষঙ্গের মাধ্যমে আত্মায় ও মননে শোভিত হওয়া এবং অধিকহারে কল্যাণ কর্মে ব্রতী হওয়া তার একমাত্রিক কর্তব্য।
ইফতার কালে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দোয়া
ইবনে উমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন :
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন ইফতার করতেন, (ইফতার সেরে) বলতেন পিপাসা নিবারিত হয়েছে, নিষিক্ত হয়েছে নালিগুলো আর আল্লাহ চাহে তো পুরস্কারও নির্ধারিত হয়েছে।
পক্ষান্তরে, আমরা বর্তমানে দেখতে পাই, ইফতারকালে আহার-ভোজন অনুষ্ঠানের ফলে অধিকাংশ রোজাদারই দোয়ার বিস্মৃত হন, ভুলে যান রোজা শেষে আল্লাহর দরবারে নতজানু হয়ে প্রার্থনা জানাতে। বিশেষত, নানা আয়োজনে অন্তপুরে ব্যস্ত থাকেন যে নারীরা তাদের কথা বলাই বাহুল্য। এভাবে, রোজাদারগণ দোয়া কবুলের মহত্তম সময়গুলো হেলায় হারান।
