রমজান মাসে রাসূলের জেহাদ

রমজান হত রাসূলের জন্য পরীক্ষা, ব্যয় ও আত্মদানের মাস। এ মাসে তিনি বিভিন্ন জেহাদ ও সম্মুখ যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করতেন। রমজানে একই সাথে তিনি সশরীরে অংশ নিয়েছেন যুদ্ধে এবং বিভিন্ন যুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য প্রেরণ করেছেন সেনাদল বা সারিয়া।

আবু সাইদ খুদরি হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : রমজানের ষোলো তারিখে আমরা রাসূলের সাথে যুদ্ধে অংশ নিয়েছি। আমাদের কেউ কেউ রোজা রেখেছে, কেউ ভেঙ্গেছে। ভিন্ন শব্দে এসেছে আমরা রাসূলের সাথে রমজানে যুদ্ধে অংশ নিতাম, আমাদের কেউ রোজা রাখত, কেউ রাখত না। রোজাদার আহারকারীর উপর ক্ষোভ পোষণ করত না এবং আহারকারীও রোজাদারের উপর ক্ষোভ পোষণ করত না।

উমর বিন খাত্তাব (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন- আমরা রাসূলের সাথে রমজান মাসে দুটি যুদ্ধে অংশ নিয়েছি বদর ও মক্কা বিজয়। এ উভয় যুদ্ধে আমরা পানাহার করেছি।

এমনকি গাযওয়ায়ে তাবুকে যে যুদ্ধে আরব উপদ্বীপের দক্ষিণাঞ্চল জুড়ে ইসলামের সালতানাত সুদৃঢ় হয়েছে, নবম হিজরীতে যে যুদ্ধে রাসূল মদীনা হতে বের হয়ে প্রত্যাবর্তন করেছেন রমজানে, সেটিও সংগঠিত হয় রমজান মাসে।

স্বশরীরে অংশ না নিয়ে রাসূল এ মাসে বিভিন্ন যুদ্ধ দল নানাস্থানে জেহাদের অংশগ্রহণের জন্য প্রেরণ করেছেন। শাম হতে প্রত্যাবর্তনকারী কোরাইশি কাফেলার মুখোমুখি হওয়ার জন্য প্রেরণ করেন হামজা বিন আব্দুল মোত্তালেব উপদলকে, এ ছিল প্রথম হিজরির রমজান মাসের ঘটনা। হিজরী দ্বিতীয় বর্ষের রমজান মাসে, বদর যুদ্ধের পর তিনি প্রেরণ করেন আমর বিন আদির উপদল, এদের উদ্দেশ্য ছিল আসামা বিনতে মারওয়ানকে খুন করা, যে তা রচিত কবিতা দিয়ে নিন্দা করে বেড়াত ইসলামের, প্ররোচনা দিত মুসলমানদের নানাভাবে। সপ্তম হিজরীতে রমজান মাসে প্রেরণ করেন আব্দুল্লাহ বিন আবি আতিক এর যুদ্ধ উপদল, যাদের প্রেরণ করা হয়েছিল খন্দকের যুদ্ধে মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন গোত্র-উপদলকে ঐক্যবদ্ধ-সংগঠিতকারী আবু রাখে বিন সালাম বিন আবিল হুকাইককে হত্যা করতে।
ফাতহে মক্কার যুদ্ধে রাসূলের অবস্থানের ব্যাপারে কোরাইশের মাঝে বিভ্রান্তি সৃষ্টির জন্য হিজরী চতুর্থ বর্ষে রমজানে আবু কাতাদা বিন রবয়ির উপদল প্রেরণ করা হয়। একই বর্ষে রমজানে যথাক্রমে উজ্জা, সুয়া ও মানাত ধ্বংস করার জন্য প্রেরণ করা হয় খালিদ বিন ওয়ালিদ ও আমর বিন আস এবং সাদ বিন যায়েদ আশহালির উপদল তিনটিকে।

অন্যান্য এবাদত অব্যাহত রেখেও রাসূল ও তার সাহাবীগণের এ ধরণের সম্মুখ সমরে অংশগ্রহণ প্রমাণ করে রোজা পালন ব্যক্তির মাঝে এক ইতিবাচক প্রেরণা ও শক্তি জোগায়, যা একই সাথে শারীরিক ও অন্তর স্বতঃস্ফূর্ততার জন্ম দিয়ে ব্যক্তিকে করে তোলে চূড়ান্ত কল্যাণকামী।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও পুণ্যময় সাহাবাদের এ আদর্শ প্রমাণ করে জেহাদ ও এবাদত এবং আল্লাহ তায়ালার মহব্বত ও তার মহত্ত্ব, আদেশ-নিষেধের মাঝে সৃদৃঢ় সম্পর্ক এগুলোই হচ্ছে সত্যবাদী মুজাহিদদের অবশ্য অর্জনীয় গুণ। দ্বীনের পথে মুজাহিদদের গুণ বর্ণনা প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কোরআনে
এরশাদ করেন-
হে ইমানদারগণ! তোমাদের মাঝে কেউ যদি তার দ্বীন হতে ফিরে যায়, তবে অচিরে আল্লাহ তায়ালা এমন এক জাতি পাঠাবেন, যাদের তিনি পছন্দ করেন, তারাও তাকে পছন্দ করে। যারা মোমিনদের ব্যাপারে হবে বিনম্র কিন্তু কাফেরদের উপর হবে কঠোর। তারা আল্লাহর পথে জিহাদে অংশ নিবে, নিন্দুকের নিন্দার ভয় করবে না, এ আল্লাহর ফজিলত, যাকে ইচ্ছা তিনি তা দান করেন। আর আল্লাহ প্রশস্ত, সর্বজ্ঞ।

একই সাথে, পার্থিব প্রবৃত্তির আস্বাদে যারা বিভোর, ভুলে আছে যারা তাআত ও আনুগত্যের যাবতীয় অনুসঙ্গ, তাদের প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
আপনি বলুন, তোমাদের নিকট যদি আল্লাহ, তার রাসূল এবং আল্লাহর পথে জেহাদ অপেক্ষা অধিক প্রিয় হয় তোমাদের পিতা, সন্তান-সন্ততি, তোমাদের ভ্রাতা, পত্নী, তোমাদের স্ব-গোষ্ঠী, অর্জিত সম্পদ, তোমাদের ব্যবসা-বাণিজ্য, যার মন্দকালের আশঙ্কা কর এবং তোমাদের বাসস্থান, যা তোমাদের পছন্দ কর, তাহলে অপেক্ষা কর আল্লাহর বিধান আসা অবধি। আল্লাহ ফাসেক কওমকে হেদায়েত করেন না।

রমজানের আমলে আহলে কিতাবিদের সাথে বৈপরিত্ব

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানের আমলের ক্ষেত্রে আহলে কিতাবিদের সাথে বৈপরিত্য রেখেছেন। এক হাদীসে এসেছে, রাসূল বলেন-
দ্বীন বিজয়ী হবে, যে যাবৎ মানুষ দ্রুত ইফতার করবে। কারণ ইহুদি-নাসারা তা বিলম্বে করে। অপর এক হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন- যে অবধি মানুষ দ্রুত ইফতার করবে (অর্থাৎ সময় হওয়া মাত্রই), ভাল থাকবে। তোমরা দ্রুত ইফতার কর, কারণ, ইহুদিরা তা বিলম্বে করে।
তিনি আরো এরশাদ করেন- আমাদের ও আহলে কিতাবিদের রোজার মাঝে পার্থক্য হল সেহরি গ্রহণ।

ইসলাম ধর্মের রয়েছে বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও মর্যাদা। তার বৈশিষ্ট্যগুলো পৌত্তলিক ও বিকৃতকারী আহলে কিতাবিদের থেকে সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। রোজা ইত্যাদি ক্ষেত্রে, তাই রাসূল ছিলেন পার্থক্য বজায় রাখার নিদর্শন ও নির্দেশক।

উম্মত আজ সাংস্কৃতিক, চেতনাগত এক ব্যাপক দৌর্বল্যে আক্রান্ত, সর্বক্ষেত্রে অন্যের পদাঙ্ক অনুসরণই হয়ে উঠেছে তার একমাত্র ভবিতব্য। কাফের ও পৌত্তলিকদের সাথে বৈসাদৃশ্য গ্রহণ, সন্দেহ নেই, তার জন্য ছিল সর্বাধিক প্রয়োজনীয় একটি বিষয়। ধর্ম ও ধর্ম-চেতনার যা তাদের জন্য বৈশিষ্ট্যের মর্যাদা প্রাপ্ত, তাতে নিজেদের স্বকীয়তা প্রমাণ গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। চিন্তা ও চেতনার মৌলনীতির যা স্তম্ভের স্বীকৃতি প্রাপ্ত, মূল্যবোধ ও সাংস্কৃতিক স্বাজাত্যবোধের পরিচায়ক, তাই কেবল তাদের হারানো দিনের পুনরূপায়নের চাবিকাঠি হতে পারে, ফিরিয়ে আনতে পারে কাক্সিক্ষত বিজয়, আর স্বভূমি উদ্ধারের সুবাতাস।

জীবন সায়‎েহ্ন আমলের আধিক্য

জীবনের শেষ সময়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানে অধিক আমল করতেন। হাদীসে পাওয়া যায়, রাসূল এ সময়ে এতেকাফে দ্বিগুণ সময় ব্যয় করতেন। আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন-
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতি রমজানে দশ দিন এতেকাফে যাপন করতেন, যে বছর তার ঊর্ধ্বারোহন হয়, সে বছর তিনি বিশ দিন এতেকাফে যাপন করেন।

শেষ সময়ে তিনি দু বার জিবরাইল (আঃ)-এর সাথে কোরআন সহপাঠ ও অনুশীলনে অংশ নেন। রাসূলের প্রিয়তমা কন্যা ফাতেমা (রাঃ) বর্ণিত হাদীসে এসেছে, তিনি বলেন : আমাকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোপনে জানালেন যে, জিবরাইল প্রতি বছর আমাকে একবার কোরআন শোনাতেন-শুনতেন, এবার তিনি তা দু বার করেছেন, একে আমি আমার সময় ঘনিয়ে আসার ইঙ্গিত মনে করছি।
আবু হুরায়রা বর্ণিত হাদীসে উভয়টির উল্লেখ পাওয়া যায় এভাবে তিনি বলেন-
রাসূলকে প্রতি বছর একবার কোরআন পাঠ করে শোনান হত, যে বছর তার ঊর্ধারোহন হয়, সে বছর তাকে দু বার শোনান হয়। প্রতি বছর তিনি দশ দিন এতেকাফ করতেন, যে বছর তার তিরোধান হয়, সে বছর তিনি বিশ দিন এতেকাফ পালন করেন।

আল্লাহ তায়ালার শ্রেষ্ঠত্ব ও মর্যাদা সম্পর্কে যে জ্ঞাত হয়েছে, পেয়েছে আপন আত্মার পরিচয়, তার দারিদ্র্য, লাঞ্ছনা, সর্বক্ষেত্রে খালেকের মুখাপেক্ষিতা, উপলব্ধি করতে পেরেছে পার্থিবের ক্ষণস্থায়ীত্ব, একে গ্রহণ করেছে পরীক্ষার স্থল হিসেবে এবং পরকালকে ভেবেছে চিরকালীন আবাস, ফলে রাসূলের অনুবর্তন ও কল্যাণ কর্মে সর্বাত্মক আত্মনিয়োগ হয়েছে তার ফলশ্রুতি, উপযোগিতা বিচারে সে গ্রহণ করেছে সময়ের সর্বাধিক কল্যাণকর সিদ্ধান্ত। বিশেষত: জীবনের দীর্ঘ বসন্ত যার অতিক্রান্ত হয়েছে ইতিমধ্যে, পৌঁছে গেছে পরকালগাহের সন্নিকটে, তার জন্য এ কর্ম পন্থা খুবই সময়োচিত সন্দেহ নেই।

এই হচ্ছে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আলোকিত প্রকাশ্য জীবনের ক্ষুদ্র অথচ অনুসরণীয় কয়েকটি নিদর্শন, বরকতময় মহত্তম সময়ের সর্বোচ্চ ব্যবহারের জন্য রাসূল যাকে গ্রহণ করেছেন কর্মপদ্ধতি হিসেবে। এ হচ্ছে আল্লাহর সৃদৃঢ় ঋজু পথ আঁকড়ে ধরবার আলোকবর্তিকা এ পথ বিচ্যুত ব্যক্তি মাত্রই বিভ্রান্ত, অতলান্ত অন্ধকার গহ্বরে নিপতিত। রাসূল প্রদর্শিত সুন্নতের পথে ফিরে আসা ব্যতীত সে ক্রমাগত ঘুরপাক খাবে পথের বাকচক্রে। হে আল্লাহ! আমাদেরকে তৌফিক দান করুন আপনার আনুগত্য করার, রক্ষা করুন আপনার অবাধ্যতা হতে, দৃঢ়-অবিচল রাখুন দ্বীনের উপর; রাসূলের সর্বাত্মক অনুসরণের সৌভাগ্যে ভূষিত করুন। আমীন॥