রমজানে সফর করা, রোজা রাখা কিংবা ভঙ্গ করা

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানে সফর করতেন; সফরে তিনি কখনো কখনো রোজা পালন করতেন, কখনো ত্যাগ করতেন এবং পানাহার করতেন, অন্যদেরও আদেশ দিতেন রোজা ভঙ্গের। এ ব্যাপারে নানা হাদীস পাওয়া যায় ইবনে আব্বাস হতে তাউস বর্ণনা করেন : রাসূল রমজানে রোজা পালনরত অবস্থায় সফরে বের হলেন, পথে উসফান নামক এলাকায় পৌঁছে পানিপাত্র আনার নির্দেশ দিলেন। লোকদের দেখানোর জন্য তিনি প্রকাশ্যেই পানি পান করলেন। মক্কায় পৌঁছা অবধি তিনি পানাহার করতে থাকলেন। ইবনে আব্বাস বলতেন : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানে সফররত অবস্থায় রোজা পালন করেছেন এবং ভঙ্গ করেছেন। সুতরাং, যার ইচ্ছা রোজা রাখবে, যার ইচ্ছে ভঙ্গ করবে।

রমজানে সফররত অবস্থায় রাসূলের রোজা রাখা এবং ভঙ্গ করার বিষয়ে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে যে, যদি কষ্টের সম্ভাবনা না থাকে, রোজা ভাঙ্গার মত কিছু না ঘটে, তবে রোজা রাখাই উত্তম। কারণ, রাসূল এমনই করেছেন। আবু দারদার হাদীসে এসেছে- তিনি বলেন : প্রচণ্ড তাপে আমরা রাসূলের সাথে রমজানে সফরে বের হলাম, এমনকি আমাদের কেউ কেউ অধিক তাপের ফলে মাথায় হাত দিচ্ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা ব্যতীত আমাদের কেউ রোজাদার ছিলেন না। হাদীসটি প্রমাণ করে, সম্ভব হলে রোজা পালনই উত্তম। এর মাধ্যমে বান্দা দ্রুত দায়মুক্ত হবে, রোজা পালন করতে পারবে সঠিক সময়ে, সকলের সাথে একই সময়ে রোজা রাখার ফলে বিষয়টি তার জন্য সহজ হবে।

তবে, রোজা ভাঙ্গার মত যদি কোন কারণ থাকে, তবে রোজা না রাখাই উত্তম। এক হাদীসে রাসূল এরশাদ করেন-
আল্লাহ পছন্দ করেন তার প্রদত্ত রুখসত যাপন করা, যেমন- অপছন্দ করেন তার পাপে লিপ্ত হওয়া।

কখনো কখনো বরং এ অবস্থায় রোজা রাখা মাকরূহ। কারণ, মক্কা অভিযানকালীন রমজান মাসে রাসূল রোজা পালন করেননি। ইবনে আব্বাস (রাঃ)হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : রোজা পালনরত অবস্থায় রাসূল কুদাইদ ও উসফান নামক স্থানের মধ্যবর্তী প্রস্রবনে অবতীর্ণ হয়ে রোজা ভেঙে ফেললেন, মাস শেষ হওয়া অবধি তিনি এভাবেই পানাহার করে চললেন।

আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত তিনি বলেন : আমরা রাসূলের সাথে ছিলাম, আমাদের মাঝে অধিক ছায়া গ্রহণকারী ছিল সে ব্যক্তি, যে তার কাপড় দিয়ে ছায়া নিচ্ছিল। যারা রোজাদার ছিল তারা কিছুই করল না, আর যারা পানাহার করেছিল, তারা বাহন হাঁকাল, কাজে আত্মনিয়োগ করল এবং প্রচুর পরিশ্রম করল। রাসূল বললেন : পানাহারকারীগণ আজ সওয়াব নিয়ে গেছে।

যদি রোজা পালন করা খুবই কঠিন হয়ে পড়ে এবং পানাহার আবশ্যক হয়, তবে পানাহার বাধ্যতামূলক। কারণ, রাসূল এমন কঠিন অবস্থায় রোজা পালনকারীকে লক্ষ্য করে বলেছিলেন :
এরা পাপী, এরা পাপী।
এক ব্যক্তি, যে এমন কঠিন দুঃসাধ্য সময়ে রোজা রেখেছিল, তাকে ঘিরে ছিল একদল লোক এবং ছায়া দিচ্ছিল; দেখে রাসূল বললেন :
(এভাবে) সফরে রোজা পালন কোন পূণ্যের কাজ নয়।

আবু সাঈদ খুদরি হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : রোজা পালনরত অবস্থায় আমরা রাসূলের সাথে মক্কায় সফরে বের হলাম। এক স্থানে যাত্রা বিরতিকালে রাসূল বললেন : তোমরা শত্রুব্যুহের কাছাকাছি পৌঁছে গেছ, পানাহার তোমাদেরকে শারীরিকভাবে সবল করে তুলবে। সুতরাং, আমাদের রুখসত প্রদান করা হয়েছিল। আমাদের কেউ রোজা রেখেছিল, পানাহার করেছিল কেউ কেউ। অতঃপর ভিন্ন এক স্থানে উপনীত হলে রাসূল আমাদের উদ্দেশ্য করে বললেন : তোমরা ভোরে শত্রুর মুখোমুখি হবে, পানাহার হবে তোমাদের জন্য বলদায়ক, সুতরাং, তোমরা পানাহার কর। পানাহার ছিল বাধ্যতামূলক। তাই আমরা সকলে পানাহার করলাম। তিনি বলেন : এরপর আমরা অনেকবার রমজানের সফরে রাসূলের সাথে রোজা রেখেছি। ইবনে কায়্যিম বলেন : পানাহারের জন্য বাসস্থান অতিক্রম করতে হবে রাসূল এমন বলেননি, এ ব্যাপারে রাসূল থেকে সহি কিছুই পাওয়া যায় না।

আমাদের মতে, এ মত ব্যক্তিগতভাবে আনাস (রাঃ)-এর। সফরের সূচনা ব্যতীত কেউ রুখসত পালন করতে পারবে না। কারণ, রাসূলের অসংখ্য সফরের কোথাও আমরা এর দৃষ্টান্ত পাই না। এবং কোরআনে এসেছে-
তোমাদের মাঝে যে অসুস্থ হবে, কিংবা সফরে থাকবে, ভিন্ন সময় রোজা রেখে নিবে। যে সফরের সূচনা করেনি, সে সফরকারী হতে পারে না। অধিকাংশ আলেমের মতামত- সফরের সূচনা ব্যতীত পানাহার করা যাবে না।

সফরে রোজা পালনের উত্তম-অনুত্তম বিচারে শাস্ত্রজ্ঞ ও তত্ত্ববিদদের যাবতীয় বর্ণনা ও মতামতকে সামনে রেখেই আমরা বলতে পারি; সফরে রোজা পালন কিংবা ভঙ্গ করা উভয়টিই রাসূলের আচরিত পথ। সফরের রোজা কিংবা পানাহারের বিষয়টি অযৌক্তিকভাবে যারা খারিজ করে দেন, তাদেরকে এ বিষয়ের প্রতি সবিশেষ যত্নবান হতে হবে সন্দেহ নেই।

চাঁদ দেখা কিংবা ত্রিশ দিন পূর্ণ করার মাধ্যমে রোজা ভঙ্গকরণ

চাঁদ দেখার নিশ্চয়তা কিংবা পূর্ণ ত্রিশ দিন অতিক্রম ব্যতীত রাসূল রোজা ভঙ্গ করতেন না। হাদীসে এসেছে-
তোমরা চাঁদ দেখে রোজা রাখ এবং তা দেখেই রোজা ভঙ্গ কর এবং একে অভ্যাসে পরিণত কর। যদি তা মেঘে ঢেকে যায়, তবে ত্রিশ দিন পূর্ণ কর। দু ব্যক্তি যদি সাক্ষ্য প্রদান করে, তবে সাক্ষ্য অনুসারে, রোজা রাখ, অথবা ভঙ্গ কর। মাসের সূচনা-সমাপ্তির উভয়টিই সৌর বাৎসরিক হিসেব নয় প্রত্যক্ষণের উপর ভিত্তি করে নির্ধারণ কাম্য।

এ ক্ষেত্রে উদ্ভূত যে কোন বিরোধ এড়ানো মুসলমানদের অবশ্য কর্তব্য সন্দেহ নেই, এমনকি সম্মিলিতভাবে সকলে যদি গৌণ মতকে মেনে নেয় কিংবা সৌর বাৎসরিক হিসেবের উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত প্রদান করে। যে মতবিরোধের ফলে ফরজ-ওয়াজিবের মত মৌলিক বিষয় লঙ্ঘিত হবে, মানুষ ব্যাপক ফেতনা ও ভ্রাতৃঘাতী পাপে আক্রান্ত হবে, ছড়াবে ঘৃণা ও বিদ্বেষের বিষ, তা এড়িয়ে এ ধরনের সম্মিলিত গৌণ মতামত মেনে নেওয়াই উত্তম।
এভাবে, পারস্পরিক মতদ্বৈধতায় লিপ্ত হওয়া, সর্বৈবে, পাপ আযাবের উদ্রেককারী। সর্বমান্য বিজ্ঞ আলেম-সমাজের নেতৃত্ব কিংবা কেন্দ্রীয় গ্রহণযোগ্য দিকনির্দেশনা ব্যতীত এ মতবিরোধ প্রকট রূপ ধারণ করে মুসলিম সংখ্যালঘু এলাকাগুলোয়। চাঁদ দেখা যাক কিংবা সৌর বাৎসরিক হিসাব মানা হোক, অসহনীয়ভাবে তারা বিরোধে জড়িয়ে পড়ে। এক্ষেত্রে সহিষ্ণু ও ভ্রাতৃসুলভ আচরণ প্রদর্শন কাম্য।

উপরোক্ত বিষয়গুলো রাসূলের সে মহান আচরণীয় আদর্শের প্রতিফলন, যা তিনি উম্মতের নিকট পেশ করেছেন, এ আচরণ ও অভ্যাসের মাঝ দিয়েই তিনি আল্লাহর দরবারে রমজান মাসে নিজেকে উপস্থাপন করেছেন, রোজার সুন্নত, মোস্তাহাব ও আদব পালন করেছেন রহমতের আকুতি ও ব্যাকুলতা নিয়ে। নফল ও সুন্নতের ব্যাপারে রাসূল যতটা যত্নবান ছিলেন, তার তুলনায় অনেক বেশি ছিলেন ফরজ ও ওয়াজিব আদায়ের ব্যাপারে এবং হারাম ও পাপকে এড়িয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে। এক হাদীসে কুদসীতে রাসূল এরশাদ করেন:
বান্দার উপর আমি যা ফরজ করেছি, আমার নিকটবর্তীকারীর মাঝে তাই আমার সর্বাধিক প্রিয়।

অপর এক হাদীসে রাসূল এরশাদ করেন :
মিথ্যা কথন, সে অনুসারে আমল ও মূর্খতা প্রসূত আচরণ যে ব্যক্তি ত্যাগ না করবে, তার পানাহার পরিত্যাগে আল্লাহর কোন প্রয়োজন নেই (অর্থাৎ আল্লাহ তাকে সওয়াব প্রদান করবেন না)।

এ বিষয়টিই নাজাত আকাক্সক্ষী যে কোন মুসলমানকে নিজেকে জানবার, উপলব্ধি করবার এবং নিজ অবস্থানকে শনাক্ত করবার মুখোমুখি এনে দাঁড় করায়; সম্পর্ক, যোগাযোগ, আচরণীয় ও নৈতিক যাবতীয় ক্ষেত্রে নিজেকে সুন্দর শোভামম ও সৌন্দর্যমণ্ডিত করে তুলতে উৎসাহ জোগায়। সে হয়ে উঠে রাসূলের অধিক নিকটবর্তী ও অনুবর্তী।

উপরোক্ত বিষয়গুলোর উপলব্ধির পর আমরা বুঝতে পারব কতটা ঠুনকো বিষয় নিয়ে নব্য, আধুনিক সচেতন সমাজ নিজেদের কল্যাণব্রতী প্রমাণ করতে চাচ্ছে। যারা সুন্নত ও মোস্তাহাবকে কেন্দ্র করে ফরজ ও বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলোকে হীনতর মনে করছে। লাভ অর্জনের পূর্বে মূলধন সংরক্ষণ অধিক গুরুত্বপূর্ণ সচেতন ব্যক্তি মাত্রই এ প্রাপ্ত বাক্য সম্পর্কে জ্ঞাত। সুন্নত ও মোস্তাহাব পালন করার নিমিত্তে যদি ফরজ ও ওয়াজিব ত্যাগ করতে হয় তবে তা হবে খুবই পরিতাপের ও পরিণতির বিচারে ভয়াবহ। আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন।