ওয়াজিব ছুঁড়ে ফেলে মোস্তাহাব আমল নিয়ে ব্যতিব্যস্ত থাকার ফলে যখন এমন সিদ্ধান্ত প্রদান করা হয়েছে, তখন সহজে অনুমেয় যে, পার্থিব ক্ষুদ্র উপার্জনের সন্ধানে যে ভুলে যায় পরিবার-পরিজনের কথা, আল্লাহ তাকে কী পরিমাণ শাস্তি দিবেন, পরকালে তার কী পরিণতি হবে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অত্যাবশ্যকীয় কোন কারণ ব্যতীত এতেকাফগাহ হতে বের হতেন না। আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসূল এতেকাফরত অবস্থায় কোন কারণ ব্যতীত গৃহে প্রবেশ করতেন না। সাফিয়া (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এতেকাফরত অবস্থায় এক রাতে আমি তার সাথে সাক্ষাতের উদ্দেশ্যে গমন করলাম। আমি তার সাথে আলোচনা সেরে উঠে চলে এলাম। আমাকে পৌঁছে দেয়ার জন্য তিনি এলেন। সাফিয়ার আবাস ছিল উসামা বিন যায়েদের বাড়িতে।
প্রবল কোন কারণবশত: কখনো কখনো রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার পবিত্র দেহের কিছু অংশ এতেকাফগাহ হতে বের করতেন। আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : এতেকাফরত অবস্থায় রাসূল মসজিদ হতে তার মস্তক বের করতেন, আর আমি হায়েজা অবস্থাতেই তা ধৌত করে দিতাম।
রাসূল একবার তার স্ত্রী-গণকে উত্তম পথ প্রদর্শন, মনোরঞ্জন ও আনন্দ প্রদানের জন্য রমজানের এতেকাফ ত্যাগ করেছেন- তবে, একই বছরের শাওয়াল মাসের প্রথম দশ দিনে উক্ত এতেকাফের কাজা আদায় করে নিয়েছেন।
উম্মুল মোমিনীন আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেন : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন এতেকাফে মনস্থ হলেন, ফজরের সালাত আদায় করে এতেকাফগাহে প্রবেশ করলেন। রাসূল তাঁবু টানানোর নির্দেশ দিয়েছিলেন কারণ, তিনি রমজানের শেষ দশ দিন এতেকাফ করার মনস্থ করেছিলেন। জয়নবকেও নির্দেশ দেয়া হয়েছিল, সেটিও টানানো হয়েছিলো, তিনি ছাড়া অন্যান্যদেরকেও নির্দেশ দেয়া হয়েছিল, সেটিও টানানো হয়েছিল, তিনি ছাড়া অন্যান্যদেরকেও নির্দেশ দেয়া হয়েছিল ফলে তাদেরগুলো টানানো হয়েছিল। ফজরের সালাত শেষে রাসূল অনেকগুলো তাঁবু দেখতে পেলেন। তিনি বললেন : তোমরা কি এর মাধ্যমে পুণ্য অর্জনের ইচ্ছা করছ? রাসূল অতঃপর নির্দেশ দিলে তার তাঁবু গুটিয়ে নেয়া হল এবং তিনি রমজানে এতেকাফ পরিত্যাগ করলেন এবং শাওয়ালের প্রথম দশদিন এতেকাফের কাজা আদায় করলেন।
রাসূল, এভাবে দুটি ভাল কাজ একই সাথে সমাধা করেছেন এক দিকে এতেকাফ পালন করেছেন, অপরদিকে স্ত্রী-গণের মানসিকতার প্রতি সহানুভূতিপ্রবণ দৃষ্টি রেখেছেন, তাদের শিক্ষা দিয়েছেন যে, অযাচিত কোন কারণবশত: এবাদত বন্দেগির মাঝে বিঘœ সর্বার্থে অনুচিত।
কোন কারণবশত: যদি এতেকাফ ছুটে যেত, তবে রাসূল পরবর্তীতে তা কাজা করে নিতেন পূর্বের হাদীসে যেমন উল্লেখ হয়েছে যে, স্ত্রী-গণের হকের প্রতি লক্ষ্য রেখে তিনি এতেকাফ বর্জন করেছিলেন, পরবর্তীতে শাওয়ালের প্রথম দশদিনে তা কাজা করে নিয়েছেন। একবার সফরে থাকার কারণে এতেকাফ পালন সম্ভব না হলে রাসূল পরবর্তী বছরের বিশ দিন এতেকাফ করে তা কাজা করে নিয়েছিলেন। আনাস বিন মালেক (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন- রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানের শেষ দশদিনে এতেকাফ পালন করতেন। এক বছর তিনি এতেকাফ পালনে সক্ষম হলেন না, তাই পরবর্তী বছরে তিনি বিশ দিন এতেকাফ করে নিয়েছিলেন।
উবাই বিন কাব হতে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূল রমজানের শেষ দশদিনে এতেকাফ পালন করতেন, একবার সফর জনিত কারণে তিনি এতেকাফ করলেন না, পরবর্তী বছরে, তাই দশদিন এতেকাফ করে নিলেন।
এতেকাফের কারণে রাসূল সফর বাদ দেননি, সফর সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রয়োজন ও কল্যাণ হতেও পিছপা হননি এবং ভুলে যাননি এতেকাফের কথা, পরবর্তী বছরে তাই, তাৎক্ষণিক এতেকাফসহ কাজা এতেকাফও আদায় করে নিয়েছিলেন। বর্তমান আলেম সমাজ, সংস্কারক ও দায়িদের আমরা দেখতে পাই যে, সাময়িক যৌক্তিক কোন কারণবশত: হয়তো তারা নির্দিষ্ট কোন এবাদত মওকুফ করতে বাধ্য হন, অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কর্মের সাথে সমন্বয় সাধন করে তা পালন করতে পারেন না বিধায় তাকে ত্যাগ করেন। কিন্তু রাসূলের প্রদর্শিত হেদায়েত অনুসারে পরবর্তীতে তা পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হন না।
এতেকাফ পরিত্যাগের প্রবণতা বর্তমানে খুবই ব্যাপক হারে পরিলক্ষিত হচ্ছে। ইমাম যুহরি বলেন : অবাক ব্যাপার! মুসলমানগণ এতেকাফ পরিত্যাগ করছে হর-হামেশা অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় আগমন পরবর্তীতে মৃত্যু অবধি এতেকাফ পরিত্যাগ করেননি।
উম্মতের মহান দায়িত্ব সত্ত্বেও রাসূলের এতেকাফ, মসজিদে স্থাপিত তাঁবুতে একাকিত্ব যাপন, মাওলার এবাদত ও জিকিরে আত্মা ও মনন সমর্পণ ইঙ্গিত করে যে কোন কালের দায়ি, সংস্কারক ও আলেম মাত্ররই কর্তব্য ও দায়িত্ব নিজের জন্য একাকী-নির্বিঘœ কিছু সময় নির্ধারণ করা, যাতে আত্মিক অনুসন্ধান ও নফসের মোহাসাবায় নিরত হবে।
এ ব্যাপারে উদাসীনতা, গাফিলতি ও ভ্রƒক্ষেপ-হীনতা নফসের ক্লেদাক্ততা ও অসুস্থতা কেবল বৃদ্ধিই করে; এক সময় বাসা বাধে মানুষের অনুভূতি ও চিন্তার গোপনতম এলাকায়, কুড়ে কুড়ে নষ্ট করে ঈমান ও বিশ্বাসের বিনির্মাণগুলো। আল্লাহ আমাদের হেফাজত করুন। আল্লাহ পাকের সাহায্য-সহযোগিতা প্রার্থনা পরিত্যাগ লাঞ্ছনা ও ধ্বংসের দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়, বান্দা সহজে হারিয়ে ফেলে নিজেকে পাপের অতল নিমজ্জনে। আল্লাহর কাছে সাহায্য প্রার্থনা, আকুতি জানান ও নিজেকে তার দরবারে বিলীন করবার উত্তম পন্থা হল- আত্মার পরিমার্জন ও উন্নতিকল্পে একাকিত্ব যাপন- তার অপূর্ণতাগুলো ঢেকে দেয়া, হিম্মত ও প্রতিজ্ঞার সঞ্চার, আল্লাহ ও আখেরাতের পথে নিজেকে মহীয়ান করে গড়ে তোলা- সন্দেহ নেই এ উদ্দেশ্য রূপায়ণে এতেকাফই হচ্ছে বান্দার জন্য সর্বোত্তম উপায়।
আধুনিকতা ও সংস্কৃতির ছায়ায় গড়ে উঠছে আমাদের যে নতুন প্রজন্ম, তাদের প্রতি ন্যূনতম লক্ষ করলেই দেখতে পাবেন- মহত্ত্ব ও কল্যাণের সর্ব-ব্যাপকতা সত্ত্বেও তারা এ সুন্নতকে পরিত্যাগ করছেন অনায়াসে, তাই আত্মার পরিমার্জন ও পরিচ্ছন্নতা অর্জন তাদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না কোনভাবে। যদিও কোন কোন শ্রেণির মাঝে এই সুন্নত বিস্তার লাভ করছে ধীরে ধীরে কিন্তু এখনও তাদের ও তাদের কর্মের মাঝে রাসূলের প্রদর্শিত হেদায়েত বিরোধী কর্মকাণ্ডের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় কিংবা এতেকাফের উদ্দেশ্য ও আদব ক্ষুণœ হয় নানাভাবে। নিম্নে তার কিছু উল্লেখ করা হল-
এতেকাফের মৌলিক উদ্দেশ্য বিরোধী ও একাগ্রতা বিনষ্টকারী যে বিষয়টি সর্বপ্রথম লক্ষণীয় তাহল মোবাইল ব্যবহার। আল্লাহর তরে অন্তরের নিবিষ্টতা, পার্থিব যাবতীয় সম্পর্ক ও যোগাযোগ হতে কিছু সময়ের জন্য বিচ্ছিন্নতা, জিকির ও ধ্যানে অবগাহন ইত্যাদি চূড়ান্তভাবে লঙ্ঘিত হয় মোবাইল ব্যবহারের ফলে।
তবে, মুসলমানদের জন্য অতি প্রয়োজনীয় কোন কর্মে শর্তহীনভাবে কি মোবাইল ব্যবহার নিষিদ্ধ? এ ব্যাপারে দ্বিমত রয়েছে। মূলত: যদি এতেকাফের শরয়ি উদ্দেশ্য ও বাস্তবতা ক্ষুণœ না হয়, লঙ্ঘিত না হয় তার মৌলিক উদ্দেশ্য, তবে শর্তহীনভাবে মোবাইল ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হবে না। এ বিষয়ে আল্লামা ইবনে উসাইমিন বলেন : এতেকাফরত অবস্থায় মোবাইল যদি মসজিদে থাকে, তবে মুসলমানদের ধর্মীয় প্রয়োজনে মোবাইল ব্যবহার বৈধ। কারণ, এর ফলে তাকে মসজিদ থেকে বের হতে হচ্ছে না। তবে, যদি মসজিদের বাইরে হয়, তাহলে ব্যবহার করবে না। কেউ যদি মুসলমানদের প্রয়োজনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকে, তবে সে এতেকাফ পালন করবে না। কারণ, মুসলমানদের প্রয়োজন পূরণ করা এতেকাফের তুলনায় গুরুত্বপূর্ণ। মুসলমানদের কল্যাণ সর্বব্যাপী ও প্রবৃদ্ধিশীল এতেকাফের সংক্ষিপ্ত। তবে সংক্ষিপ্ত ও প্রবৃদ্ধি-বিলগ্ন বিষয়ও যদি হয় ইসলামের গুরুত্বপূর্ণ ওয়াজিব হুকুম, তবে তা পালন করাই হবে আবশ্যকীয়।
কেউ কেউ পিতা-মাতার আদেশ উপেক্ষা করে এতেকাফ পালন করে। এতেকাফ সুন্নত, পিতা-মাতার আদেশ মান্য করা ওয়াজিব। সুন্নতের তুলনায় ওয়াজিব পালন অগ্রগামী সন্দেহ নেই। আল্লাহ তায়ালা হাদীসে কুদসিতে এরশাদ করেন-
আমার আরোপিত ফরজই বান্দাকে আমার নিকটবর্তীকারী আমলের মাঝে সর্বাধিক প্রিয়।
সুতরাং, ফরজ পালনই বান্দার জন্য অধিক যুক্তিযুক্ত ও অগ্রগণ্য। আল্লামা ইবনে উসাইমিন এ বিষয়ে যে বিস্তারিত বর্ণনা প্রদান করেছেন, এখানে তার উল্লেখ খুবই সময়োচিত বলে আমি মনে করি। তিনি বলেন-
তোমার পিতা যদি তোমাকে এতেকাফে বাধা প্রদান করে এবং এতেকাফ ত্যাগ করার মত যৌক্তিক কারণ উল্লেখ করে, তবে তুমি এতেকাফ পালন কর না। কারণ, হয়তো এ ব্যাপারে তিনি তোমার মুখাপেক্ষী। এতেকাফ ত্যাগ করার মত প্রয়োজন-অপ্রয়োজনের মানদণ্ডও তার কাছে, তোমার কাছে নয়। তুমি যে মানদণ্ড মান্য কর, এতেকাফের প্রতি আসক্ত হওয়ার ফলে হয়তো তা সঠিক ও ন্যায্য নয়। তবে, পিতা যদি প্রয়োজনীয় বিষয়টির উল্লেখ করে কল্যাণের ব্যাখ্যা না করেন, তবে, এক্ষেত্রে তার আদেশ কায়মনোবাক্যে মান্য করা তোমার জন্য আবশ্যক নয়। কারণ, এমন বিষয়ে তাকে তোমার মান্য করার প্রয়োজন নেই, যা কল্যাণ শূন্য।
কেউ কেউ অসময়ে নিদ্রা, অনর্থক আলাপ-আলোচনা ও গল্প-গুজবে সময় নষ্ট করে, যা কোনভাবেই কাম্য নয়। এগুলো এড়িয়ে যাওয়া এতেকাফকারীর জন্য অবশ্য কর্তব্য।
হাদীসে দিবস ও রাতের যে সকল সময়-নির্দিষ্ট অনির্দিষ্ট সুন্নত উল্লেখ করা হয়েছে, যেমন : ফরজ সালাতের পূর্বে ও পরে পালিত সুন্নত, দ্বিপ্রহরের সুন্নত, ওজুর সুন্নত, জিকির-আজকার ও কোরআন পাঠ, এতেকাফকারীদের সাথে দ্বীনি আলোচনায় অংশগ্রহণ, সালাতে প্রথম কাতারের সংরক্ষণ, সালাত শেষে নির্দিষ্ট জিকির পাঠ ইত্যাদির ক্ষেত্রে কেউ কেউ অনীহ আচরণ করে থাকে। এ এবাদত ও জিকির-আজকারের মাধ্যমে এতেকাফকারীর সময়গুলো হিরণ§য় হয়ে উঠে, বিশুদ্ধ হয় তার আত্মা, পূরণ হয় এতেকাফের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য।
নিজ এলাকা ও দেশের বাইরে সফররত অবস্থায় যারা এতেকাফ পালন করেন, যেমন- হারামাইন সফরের কারণ প্রদর্শন করে নফল সালাত ত্যাগ করেন, এ কোনভাবেই ঠিক নয়। কারণ, সফরে থাকা সত্ত্বেও রাসূল নফল সালাত হতে বিরত থাকতেন না। রাসূল বরং জোহর, মাগরিব ও এশার সুন্নত ত্যাগ করতেন, অন্যান্য নফল এবাদতগুলো যথাযথভাবেই পালন করতেন।
