রাসূলের রাত্রিকালীন সালাতের দৈর্ঘ্য
রমজানে রাত্রিকালীন সালাতের ক্ষেত্রে রাসূল সালাতকে অনেক দীর্ঘ করতেন। উম্মুল মোমিনীন আয়েশা (রাঃ)-কে রমজানে রাসূলের সালাত বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন :
রমজান কিংবা অন্য সময়ে তিনি (রাতে) এগারো রাকাতের অধিক সালাত আদায় করতেন না। তিনি প্রথমে চার রাকাত আদায় করতেন, তার সৌন্দর্য ও দৈর্ঘ্য হত অতুলনীয়; অতঃপর চার রাকাত আদায় করতেন, তার সৌন্দর্য ও দৈর্ঘ্যও হত অতুলনীয়। এরপর তিন রাকাত আদায় করতেন। আমি বললাম : হে আল্লাহর রাসূল! আপনি বিতির আদায়ের পূর্বেই ঘুমাবেন? তিনি বললেন, হে আয়েশা! আমার দু-চোখ ঘুমায়, কিন্তু অন্তর ঘুমায় না।
নোমান বিন বশির বর্ণনা করেন, আমরা রমজানের তেইশতম রাত্রির প্রথম এক তৃতীয়াংশ রাসূলের সাথে যাপন করলাম। পঁচিশতম রাত্রিতে অর্ধরাত্রি আমরা তার সাথে কাটালাম। সাতাশতম রাত্রিতে এতটা সময় যাপন করলাম যে, আমাদের আশঙ্কা হল, সেহরি গ্রহণ করতে পারব না।
রাসূলের সাহাবীগণ দীর্ঘ সময় রাত্রি যাপনের ক্ষেত্রে ছিলেন তার উত্তম অনুসারী। সায়েব বিন য়াযিদ হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : উমর বিন খাত্তাব, উবাই বিন কাব ও তামিম দারিকে নির্দেশ দিলেন সকলকে নিয়ে এগারো রাকাত সালাত আদায় করতে। তিনি বলেন : ইমাম এতটা সময় তেলাওয়াত করতেন যে, আমরা দীর্ঘ সময় দণ্ডায়মান থাকার ফলে লাঠিতে ভর দিতাম। ফজর নিকটবর্তী হওয়ার পূর্বে আমরা প্রস্থান করতাম না। তার থেকে আরো বর্ণিত আছে : দীর্ঘ সময় দণ্ডায়মানের ফলে উসমান বিন আফফান এর কালে লোকেরা লাঠিতে ভর দিত।
যারা সংক্ষেপ তেলাওয়াতের মাধ্যমে তারাবীহ সালাতকে সংক্ষিপ্ত করেন, হাদীসগুলো তাদের বিরুদ্ধে স্পষ্ট প্রমাণ। এতটাই দ্রুততার সাথে তারা সালাত আদায় করেন যে, শুদ্ধভাবে উচ্চারণ করা হয় না, সালাতের রুকন ও ওয়াজিবগুলো পালন করা হয় না পূর্ণাঙ্গরূপে। মোস্তাহাব ও ধৈর্য-প্রশান্তির বিষয়ের উল্লেখ বাহুল্য বৈ নয়।
অপরদিকে, কেবল সংখ্যার ক্ষেত্রেই যারা রাসূলকে অনুসরণ করেন, পদ্ধতির ক্ষেত্রে বিন্দুমাত্র ভ্রƒক্ষেপ করেন না, তাদের অশুদ্ধতাও চিিহ্নত। রাসূল দীর্ঘ সময় সালাত আদায় করতেন, বিনয়-বিনম্রতার চূড়ান্ত করে নিজেকে আল্লাহর দরবারে পেশ করতেন। নামাজরত রাসূল ছিলেন প্রশান্তি ও ধৈর্যের এক জাজ্বল্যমান দৃষ্টান্ত। আমরা আল্লাহ পাকের দরবারে কল্যাণের দিশা ও সঠিক পথ-প্রাপ্তির তৌফিক কামনা করি।
তবে ইমামের দায়িত্ব তার জামাতের সাথে বৈধ সীমারেখা পর্যন্ত সমঝোতা করে সালাত পরিচালনা করা। দীর্ঘ সময় যদি তাদের নিয়ে সালাত আদায় সম্ভব না হয়, তবে যতটা সম্ভব সহনীয় পর্যায়ে দীর্ঘায়িত করবে। রাসূল বলেছেন-
যখন তোমাদের কেউ ইমামতি করবে, সে যেন সংক্ষেপ করে, কারণ, তাদের কেউ দুর্বল, অসুস্থ কিংবা বৃদ্ধ। তবে, যখন একাকী পড়বে, ইচ্ছা অনুসারে সালাত দীর্ঘ করবে।
এতেকাফে আল্লাহর একান্ত সান্নিধ্য যাপন
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানে এতেকাফ পালন করতেন, একান্ত কিছু সময় যাপন করতেন আল্লাহ তায়ালার সান্নিধ্যে। রাসূলের এতেকাফকালীন সময় বিচার করলে এ ব্যাপারে তার আচরণ, সুন্নত ও অবস্থা স্পষ্টরূপে আমাদের নিকট প্রতিভাত হবে।
প্রতি বছর রাসূল মদীনায় এতেকাফ পালন করতেন। আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেন- রাসূল প্রতি রমজানে এতেকাফ পালন করতেন।
রাসূল মাসের প্রতি দশে এতেকাফ করেছেন, অতঃপর লাইলাতুল কদর শেষ দশ দিনে জেনে তাতে স্থির হয়েছেন। এ ব্যাপারে বিভিন্ন হাদীস রয়েছে-
রাসূল বলেন-
আমি কদরের রাত্রির সন্ধানে প্রথম দশ দিন এতেকাফ করলাম। এরপর এতেকাফ করলাম মধ্যবর্তী দশদিনে। অতঃপর ওহি প্রেরণ করে আমাকে জানান হল যে তা শেষ দশ দিনে। সুতরাং তোমাদের যে এতেকাফ পছন্দ করবে, সে যেন এতেকাফ করে। ফলে, মানুষ তার সাথে এতেকাফ যাপন করল।
আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মৃত্যু-পূর্ব পর্যন্ত রমজানের শেষ দশ দিনে এতেকাফ পালন করেছেন।
এতেকাফকালীন রাসূল মসজিদে সকলের থেকে আলাদা করে একটি তাঁবু সদৃশ টানিয়ে দেওয়ার আদেশ দিতেন। সকল হতে বিচ্ছিন্ন হয়ে তাতে তিনি আল্লাহর একান্ত সান্নিধ্য যাপন করতেন। অন্তরের যাবতীয় একাগ্রতা ও মনোযোগ, আল্লাহর যিকির, বিনয়-বিনম্রতার সাথে নিজেকে তার দরবারে সমর্পণ যেন হয় অন্তরের একমাত্র চিন্তা ও ধ্যান-এ উদ্দেশ্যেই রাসূল নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে একান্ত সময় যাপন করতেন।
আবু সাইদ (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসূল এক তুর্কি তাঁবুতে এতেকাফে বসলেন, যার প্রবেশমুখে ছিল একটি চাটাইয়ের টুকরো। তিনি বলেন : রাসূল সে চাটাইটি হাতে ধরে একপাশে সরিয়ে রাখলেন এবং মুখমণ্ডল বের করে মানুষের সাথে কথোপকথনে নিয়োজিত হলেন।
নাফে বিন উমর হতে বর্ণিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানের শেষ দশ দিনে এতেকাফ করতেন। নাফে বলেন : আব্দুল্লাহ (রাঃ) মসজিদের যে অংশে রাসূল এতেকাফ করতেন, তা আমাকে দেখিয়েছেন।
ইবনে কায়্যিম বলেন : এসব আয়োজন এতেকাফের উদ্দেশ্য ও রুহ লাভের জন্য। মূর্খরা যেমন করে জনবহুলভাবে, জাঁকজমকের সাথে এতেকাফ করে, তা সিদ্ধ নয় কোনভাবে।
বিশ তারিখের দিবসের সূর্যাস্তের পর একুশ তারিখের রাতের সূচনাতে রাসূল তার এতেকাফগাহে প্রবেশ করতেন এবং তা হতে বের হতেন ঈদের চাঁদ দেখা যাওয়ার পর। মধ্যবর্তী এইশেষ দশদিন, যাতে এতেকাফের বিধান দেয়া হয়েছে। আবু সাইদ খুদরি হতে বর্ণিত, তিনি বলেন : রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রমজানের মধ্যবর্তী দশ দিনে সম্মিলিতভাবে এতেকাফ পালন করতেন। বিশতম রাত্রি বিগত হয়ে একুশতম দিবস উদিত হলে তিনি গৃহে প্রত্যাবর্তন করতেন এবং যারা তার সাথে এতেকাফ যাপন করত, তারাও ফিরে আসত, সম্মিলিতভাবে যাপিত রাত্রিগুলোর যে রাতে তিনি প্রত্যাবর্তন করতেন, একবার সে রাত্রি যাপন করলেন সকলকে নিয়ে সকলের উদ্দেশ্যে ভাষণ দিলেন, তাদের নির্দেশ দিলেন আল্লাহ তায়ালার আদেশ বিষয়ে। অতঃপর বললেন- আমি ইতিপূর্বে এই দশে সম্মিলিতভাবে এতেকাফ পালন করতাম। এখন আমাকে জানানো হয়েছে যে, শেষ দশ রাত্রিতে সম্মিলিতভাবে যাপন করা কাম্য। সুতরাং যে আমার সাথে এতেকাফ করবে, সে যেন এতেকাফস্থলে অবস্থান করে। আমাকে এ (লাইলাতুল কদর) দেখানো হয়েছিল, অতঃপর আমি তা বিস্মৃত হয়েছি। তোমরা তা শেষ দশ দিনে অনুসন্ধান কর এবং অনুসন্ধান কর প্রতি বেজোড়ে। আমি দেখতে পেয়েছি যে, আমি পানি ও কাদায় সেজদা দিচ্ছি। একুশের রাতে আকাশ ঝেপে বৃষ্টি এল এবং রাসূলের জায়নামাজে চুঁইয়ে চুঁইয়ে পানি পড়ল। হাদীসটি প্রমাণ করে, একুশের রাত্রি হতেই এতেকাফের সূচনা এবং এতেকাফ দিসবগুলোর শেষ দিবসের সূর্যাস্তের পরই কেবল এতেকাফকারী আপন গৃহে প্রত্যাবর্তন করবে।
এস্থলে উল্লেখ্য যে, আয়েশা (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত এক হাদীসে আমরা দেখতে পাই, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজর বাদে এতেকাফস্থলে প্রবেশ করতেন। তার বর্ণিত হাদীসে এসেছে-
অর্থ ঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন এতেকাফের ইচ্ছা পোষণ করতেন, তখন ফজর আদায় করে এতেকাফগাহে প্রবেশ করতেন। এতে উভয় বর্ণনার মাঝে সংঘর্ষ হবে না। কারণ, বুখারীর ভিন্ন এক রেওয়ায়েতে একই হাদীস কিছু শাব্দিক তারতম্য সহ বর্ণিত হয়েছে এবং তাতে আছে- অর্থাৎ, তিনি প্রবেশ করলেন এমন স্থানে যাতে তিনি ইতিপূর্বে এতেকাফ করেছেন। পূর্বের রাতে একুশের রাতে এখানে এতেকাফ করে রাসূল কোন কারণে হয়ত বেরিয়েছিলেন এবং ফজর বাদ তাতে আবার প্রবেশ করেছেন। কারণ হাদীসে বর্ণিত অতীতকালীন ক্রিয়া, যার মানে হল তিনি ইতিপূর্বে তাতে এতেকাফ করেছেন। এ জাতীয় ক্ষেত্রগুলোতে শব্দকে তার মৌলিক অর্থে রাখাই কাম্য।
উক্ত বর্ণনার আলোকে, এতেকাফে আগ্রহী ব্যক্তি বিশ তারিখ দিবসের সূর্যাস্তের পর এতেকাফের স্থানে প্রবেশ করবে এবং ত্রিশ পূর্ণ হওয়া কিংবা দুজন সাক্ষীর সাক্ষ্যের মাধ্যমে মাস শেষ হওয়ার ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়ার পর উক্ত এতেকাফগাহ হতে প্রস্থান করবে। এখানেই এতেকাফের কালের সমাপ্তি। এতেকাফের কাল রমজানেই সীমাবদ্ধ, অন্য কোন মাসে নয়।
তবে, সালফে, সালিহীনের কেউ কেউ ঈদের জামাতে বের হওয়া অবধি মসজিদে অবস্থান করেছেন।
এতেকাফরত অবস্থাতেও রাসূল পাক-পবিত্রতা ও পরিচ্ছন্নতার প্রতি গুরুত্বোরোপ করতেন, যেমন- বর্ণিত হয়েছে উরওয়ার হাদীসে। তিনি বলেন :আয়েশা (রাঃ) আমাকে বলেছেন, হায়েজা অবস্থায় তিনি রাসূলের কেশবিন্যাস করে দিতেন। রাসূল তখন মসজিদে অবস্থান করতেন, গৃহে অবস্থানরতা আয়েশার নিকট তিনি মস্তক এগিয়ে দিতেন এবং তিনি হায়েজা অবস্থাতেই তার কেশ বিন্যাস করে দিতেন।
ইবনে হাজার বলেন : হাদীসটি প্রমাণ করে, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা, সুগন্ধি ব্যবহার, গোসল, ক্ষৌরকর্ম, কেশ বিন্যাস বৈধ। অধিকাংশ আলেমের মত এই যে, এতেকাফকালীন কেবল সেসব বিষয় মাকরূহ, যা মাকরূহ সচরাচর মসজিদে।
একেকাফকালীন রাসূল কোন অসুস্থ ব্যক্তির দর্শনে যেতেন না, অংশ নিতেন না কোন জানাযায়, বর্জন করতেন স্ত্রী সংস্পর্শ বা সহবাস। আয়েশা (রাঃ) বলেন : এতেকাফকালীন সুন্নত হচ্ছে অসুস্থের দর্শনে গমন না করা, জানাযায় অংশ না নেয়া, নারী সংসর্গ ও সহবাস বর্জন করা এবং অত্যবশ্যকীয় কোন প্রয়োজন ব্যতীত এতেকাফ হতে বের না হওয়া।
এতেকাফরত অবস্থায় রাসূলের স্ত্রী-গণ তার সাথে সাক্ষাৎ করতেন এবং কথোপকথন করতেন তার সাথে। সাফিয়া (রাঃ) বলেন : রাসূল এতেকাফরত অবস্থায় আমি তার সাথে সাক্ষাতের জন্য এলাম, তার সাথে আলাপ করে অতঃপর চলে এলাম। অপর রেওয়ায়েতে আছে- একদা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মসজিদে অবস্থানকালীন তার স্ত্রী-গণ তার পাশে ছিলেন, তারা ছিলেন আনন্দিত…।
হাদীসগুলো প্রমাণ করে, এতেকাফরত অবস্থাতেও রাসূল স্ত্রী-গণের সংবাদ নিয়েছেন। এতেকাফের ফলে যে মূর্খরা তাদের পরিবার-পরিজনের কথা ভুলে যায়, তারা এ থেকে শিক্ষা নিতে পারে। আমার বোধগম্য নয় যে, আল্লাহ তায়ালার স্পষ্ট বর্ণনা সত্ত্বেও তারা কীভাবে এ আচরণ করতে দুঃসাহস দেখায়। আল্লাহ বলেন-
হে মোমিনগণ! জেনে শুনে আল্লাহ ও তার রাসূলের বিশ্বাস ভঙ্গ করবে না, তোমাদের পরস্পরের আমানতের খেয়ানতও করবে না। এবং হাদীসে এসেছে রাসূল বলেছেন-
মানুষের জন্য পাপ হিসেবে এতটুকুই যথেষ্ট যে, যার ভরণ-পোষণ তার দায়িত্ব তাকে বিনষ্ট করে দেয়।
পরিবারের সাথে এ জাতীয় আচরণ, সন্দেহ নেই, হারাম। এর পাপ এতেকাফের সওয়াব অপেক্ষা বড়। কারণ, এর ফলে ওয়াজিবকে পরিত্যাগ করে মোস্তাহাবের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়। উমরা, এতেকাফ ও এ জাতীয় অন্যান্য আমলের ক্ষেত্রে একই হুকুম।
