এর কয়েকদিন পরই রোড এ্যাকসিডেন্টে স্যারের মৃত্যু সংবাদ আমার কলেজের সহকর্মী আমার অত্যন্ত শ্রদ্ধাভাজন ইংরেজি বিভাগের জনাব রুহুল আমিনের স্যারের মাধ্যমে অবগত হই এবং তাৎক্ষণিকভাবে ট্রাস্টে গমন করি। মাগুরা থেকে ট্রাস্টে তখনও স্যারের মরদেহ এসে পৌঁছায়নি। শত শত লোক সেখানে জমায়েত হয়েছে, আরও স্রোতের ন্যায় আসছে। স্যার যে কত জনপ্রিয়, বিনয়ী, শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তি এবং একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিলেন-সেদিন স্বচক্ষে তার প্রমাণ দেখেছিলাম।

মানব সমাজ ব্যবস্থায় উত্থিত বিভিন্নমুখী সমস্যা (বৈজ্ঞানিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক, ঐতিহাসিক, ঔপন্যাসিক, রাজনৈতিক-ইত্যাদি) সমাধানের জন্য কুরআন এবং হাদীসে গবেষণার জন্য বিপুল সমারোহ বিদ্যমান। এতদসত্ত্বেও সেই উৎসকে বাদ দিয়ে কুরআনের কতিপয় শব্দ ও নাহু -ছরফ বিষয়ক তাহকিক ও তারকিব-ইত্যাদি বিষয়ের মধ্যে সংকীর্ণ মানব মুক্তির চিন্তা ফুটিয়ে তোলারও প্রচেষ্টা সমাজে বিদ্যমান। অবশ্য বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চায় এই জ্ঞানের অপরিসীম অবদানের কথা অস্বীকার করা যায় না। এটারও অবশ্যই প্রয়োজন রয়েছে। তবে ব্যাপক অর্থে এর মধ্যে মানবীয় সমস্যা সমাধানের জন্য কোন ইঙ্গিত নেই বললেই চলে। যেহেতু কুরআন এবং হাদীস নিয়ে সনাতন প্রতিষ্ঠানে উচ্চতর গবেষণার কোনই ইঙ্গিত নেই, সেহেতু বাঙালি মুসলমানের মন গবেষণার জন্য ভিন্ন দিকে ধাবিত হয় এবং এটাই স্বাভাবিক। স্রোতের গতি পথ রুদ্ধ হলে নদীর স্রোত তো ভিন্ন দিকে প্রবাহিত হবেই। অতীতকাল থেকেই এমনকি এখনো শান্তির জন্য মকছুদুল মোমেনিন আর ছহী আমলনামা ও কল্পিত কাহিনী জাতীয় গ্রন্থকে পাথেয় হিসেবে গ্রহণ করার জন্য বাঙালি মন উন্মুক্ত হয়ে থাকে। উনিশ শতকে রচিত এ ধরনের যে সব গ্রন্থ পাওয়া যায় সেখান থেকে এই পরিচয় ও প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ছহী তালেনামা, নছিহত নামা, খোলাছাতুল মারেফাত, দেল রওশন, আশক কামাল, ফেরকায়ে আরবাইন, হাল আখের জামান, আহকামূল জুমা, কাসফল হক, আহকামোচ্ছালাত, খোলাছাতোন্নছিহাত-ইত্যাদি ধরনের গ্রন্থের মধ্যে বাঙালি মুসলমানরে চিন্তা ও বিশ্বাস জড়িয়ে ও ছড়িয়ে আছে। সমাজে তার ব্যাপক প্রভাব এখনো স্পষ্ট। অথচ তা থেকেও উন্নত বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তা ও চেতনা সৃষ্টির উৎস ও প্রেরণা কুরআন ও হাদীসে সংরক্ষিত রয়েছে, তা নিয়ে আজও নতুন করে চিন্তা করার সুযোগ ও পরিবেশ তৈরি করে দেওয়া যায়নি। ধর্মের নামে যে সকল সনাতন প্রতিষ্ঠান এদেশে সেই প্রাচীনকাল থেকেই প্রতিষ্ঠিত আছে, তার মধ্যে আল্লাহর সৃষ্টি বৈচিত্র তথা আধুনিক চিন্তা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার কোন লক্ষণই প্রত্যক্ষ করা যায় না। মনে করা হয় তা স্কুল- কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের কাজ। বিজ্ঞান মানেই যেন নাস্তিক্যবাদ! এক ধরনের ভুল ধারণা সেখান থেকেই প্রচার পেয়ে আসছে। অথচ কুরআনের গবেষণা সংক্রান্ত আয়াত পর্যালোচনা করলে সমাজে এই ধারণা যে কত মারাত্মক ক্ষতি দৃশ্যমান হচ্ছে-তা অকল্পনীয়। এরই ফলে সমাজে মূল্যবোধহীন বিজ্ঞান চর্চা ও বিজ্ঞানহীন মূল্যবোধ চর্চা সমানভাবে এগিয়ে যাওয়ার প্রেরণা ও পরিবেশ তৈরি হয়ে আছে। উভয় জ্ঞানের মধ্যে সমন্বয় না গড়ে ওঠায় মানব সমাজ কুরআন ও হাদীসের প্রকৃত স্বাদ থেকে বঞ্চিত থেকে যায়।

বর্তমানেও যে ধরনের পাঠ্য-বই ও সিলেবাসের ইঙ্গিত পাওয়া যায়, তার অনেক অংশেই জুড়ে রয়েছে সূফিতত্ত্ব ভাবনায় ও সেই সংকীর্ণ বস্তুবাদী চিন্তায় আড়ষ্ট যেখানে মূল্যবোধ ও নৈতিকতা সৃষ্টির বাস্তব কোন পদক্ষেপ ও প্রেরণা নেই, কুরআন এবং হাদীস কেন্দ্রিক কোন উচ্চতর বৈজ্ঞানিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার প্রচেষ্টা নেই। অবশ্য ইসলামকে হেফাযতের নামে বাধা আসার সম্ভাবনা থাকার কারণে সাধারণ শিক্ষা ও ধর্মীয় শিক্ষা/নৈতিক শিক্ষা নাম দিয়ে কোন প্রকারে বাঙালি মুসলমানের মনকে রক্ষা করে চলার প্রচেষ্টা সেখানে বিদ্যমান। বাঙালি মুসলমান সেটাকেই তাদের জীবনে যথেষ্ট বলে মনে করে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার বৃথা চেষ্টা করে। এভাবেই একটি প্রতিষ্ঠিত চিন্তা থেকে বেরিয়ে এসে নতুন কিছূ প্রতিষ্ঠা করা কঠিন বলেই মনে করা হয়। বিজ্ঞান ও মূল্যবোধ-এদুটোর সমন্বয় ছাড়া সমাজকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যেমন অসম্ভব, তদ্রƒপ আখেরাতে বিশ্বাস ছাড়া সমাজে প্রকৃত মূল্যবোধ শিক্ষা প্রতিষ্ঠা করাও অসম্ভব। কুরআন এবং হাদীসে এই দুটোর-ই সমন্বয় প্রত্যক্ষ করা যায়। বর্তমান সমাজে মূল্যবোধের চর্চা হলেও, সেখানে যেমন বিজ্ঞান নেই, তদ্রƒপ বিজ্ঞান চর্চা থাকলেও সেখানে মূল্যবোধের চর্চা নেই। ফলে প্রকৃত মূল্যবোধ চর্চার অভাবে সমাজ ধ্বংসের দ্বার প্রান্তে উপনীত প্রায়। এই উভয় জ্ঞানের মধ্যে সমন্বয় সাধন করার চেষ্টা করে ধ্বংসের হাত থেকে জাতিকে মুক্ত করার প্রচেষ্টায় ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহঃ) সমাজে একজন প্রকৃত সংস্কারকের ভূমিকা পালন করে তাঁর প্রভুর সান্নিধ্যে চলে গেছেন।

আমি যখন স্যারের সাথে প্রথম পরিচয় হই, তখন যেন আমার মনে হয়েছিল আমি একজন গুণী-মনীষী এবং তাকওয়াবান মানুষের সাথে পরিচিতি হলাম। হাস্যোজ্জ্বল চেহারায় দাঁতের মাঝে যেন কিছুটা নুরের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠছিল। ব্যক্তিত্ব, বুদ্ধিদীপ্ত আর বলিষ্ঠ সাহসিকতার পরিচয়ের সাথে অসাধারণ বিনয়ীভাবটাও তাঁর চেহারায় ফুটে ছিল। আমি সব সময় ভাবতাম এই গুণী মানুষটিকে চিনতে ফুরফুরার বিখ্যাত পীর পরিবারের কখনো ভুল হয়নি। হোমিও চিকিৎসকের বয়স বৃদ্ধির সাথে সাথে যেমন তাঁর অভিজ্ঞতা এবং রোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি পায় তদ্রƒপ আমি ভাবতাম সময় পেরিয়ে একদিন যখন তাঁর চেহারায় বয়সে বার্ধক্য এসে যাবে সেদিন তাঁর ভক্তদের সংখ্যা এবং তাঁর আকাশচুম্বী খ্যাতি পৃথিবী পর্যবেক্ষণ করবে-তা নিঃসন্দেহ।

কিন্তু সেই গুণী মানুষটিই যে এভাবে চলে যাবে আমি তা কখনো ভাবতেও পারিনি। তাঁর মৃত্যু সংবাদ আমার কাছে বিশ্বাস হচ্ছিল না। তাই পুনরায় ইবি’র আরবি বিভাগের সভাপতি এবং প্রফেসার জনাব ড. মাহবুবুর রহমান সাহেবের নিকট থেকে প্রকৃত তথ্য জানার চেষ্টা করি। এটাই পৃথিবীর নিয়ম। মানুষ যা ভাবে-তা যেমন ঘটে না, তদ্রƒপ মানুষ যা ভাবে না, তাই-ই ঘটে। এই রীতি মেনে চলেই আমাদেরকেও একদিন এ পৃথিবী ছেড়ে চলে যেতে হবে। স্যারকে নিয়ে এভাবে স্মৃতিচারণ করব- এ কথা ভাবতেই চোখ ছল ছল করে ওঠে। হে আল্লাহ! তুমি আমার স্যারের সকল কর্মকে কবুল করে নাও এবং তাঁকে সুউচ্চ জান্নাতে স্থান করে দাও। আমাদেরকেও তোমার দ্বীনের পথে অটল রেখে ঈমানের সাথে মৃত্যু দাও। হে দয়াময় প্রভু! আমিন! ছুম্মা আমিন!!!