শুক্রবার এলেই যেন ঝিনাইদহ শহরে পৃথক একটি ঈদের মত আমেজ তৈরি হয়। আমি লক্ষ করেছি এর মূল আকর্ষণ ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর। তাঁর বক্তৃতা শুনার জন্য ১২ টার আগেই মসজিদে লোক সমাগম ঘটত দেখে আমিও একদিন সেই পথে শামিল হয়ে যাই। স্যারের বুদ্ধিদীপ্ত আলোচনা এবং কৌশলী দৃষ্টিভঙ্গি দেখে আমি সত্যই ভীষণ আবেগ-আপ্লুত হয়ে পড়ি। কেন মানুষ আগে ভাগে তাঁকে সরাসরি সামনে পাওয়ার জন্য সেখানে উপস্থিত হয়-তা উপলব্ধি করি। যে মানুষটির বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার কিংবা ইসলামী জ্ঞানার্জন করার সৌভাগ্য হয়নি আমার কাছে মনে হয় তার জন্য আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর নিজেই একটি শ্রেষ্ঠ দ্বীনি প্রতিষ্ঠান। যেখান থেকে খুব সহজেই নানাবিধ বিষয়ে উত্থাপিত মনের প্রশ্নের উত্তর জানা সম্ভব হয় এবং নিজের আত্মা জ্ঞান সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। তাঁর ভাষণ থেকে কত মানুষ হৃদয়ে অব্যক্ত প্রশ্নের সহজ সমাধান পেয়ে উপকারিতা লাভ করেছে, তার ইয়াত্তা নেই। আমি আমার বাল্য বন্ধু ঝিনাইদহ শহরের বাসিন্দা হাফেজ আব্দুর রশীদের (বর্তমান ব্যাংকার) নিকট পূর্বেই তাঁর পাণ্ডিত্যপূর্ণ বক্তৃতার অসাধারণ প্রভাব বিষয়ে অবগত হই। আজ আমি সকানে এবং স্বচক্ষে তা পর্যবেক্ষণ করি। ঝিনাইদহে যখন থেকেছি তখন প্রায় সময় শুক্রবারে কেন্দ্রিয় মসজিদে তাঁর পিছনে সালাত আদায়ের চেষ্টা করেছি। তাঁর বক্তৃতা শ্রবণের চেষ্টা করেছি, ভীষণ উপকৃত হয়েছি। অন্য মসজিদের প্রতি এই আকর্ষণ আমার নেই। কেন নেই? তা নিজেও উপলব্ধি করি। স্যার যে বিষয় বক্তৃতা দিতেন, তার নাড়ি-নক্ষত্র ধারাবাহিকভাবে বর্ণনা করে যেতেন। যারা শেকড় সন্ধানী গবেষক এবং চিন্তা করার মানুষ-তাদের নিকট এই ভাষণ একটি মাইলফলক। তাঁর ভাষণ এবং লেখার প্রভাব আমার ক্ষুদ্র লেখক জীবনকেও সর্বদা শাণিত করে চলেছে।
আমার লেখা ‘১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা সংগ্রাম:মুসলিম অবদান’ গ্রন্থে ১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা সংগ্রামে ওহাবীদের অংশগ্রহণ বিষয়ে একটি অধ্যায় সংযুক্ত আছে। আমি জানতাম উপমহাদেশে ইংরেজ বিরোধী আন্দোলনকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্য এর নেতৃবৃন্দকে ‘ওহাবী’-নামে আখ্যায়িত করার যে ষড়যন্ত্র তৈরি করা হয় তার পিছনে হাত ছিল ইংরেজ বুদ্ধিজীবীদের। কিন্তু স্যারের ‘ইসলামের নামে জঙ্গিবাদ’ গ্রন্থটি পড়ার পর আমার এই ভুল ধারণা দূরীভুত হয়ে যায়। মূলত সৌদি আরবের রাজনৈতিক উত্থান-পতন নিয়ে স্যারের পড়াশুনা থাকার কারণেই এই বিষয়ে তাঁর ধারণা ছিল অত্যন্ত পরিষ্কার। সৌদি আরবের ধর্মীয় নেতা মুহাম্মদ ইবনু আব্দুল ওহাব (১৭০৩-১৭৯২) প্রচারিত মতবাদকে ‘ওহাবী মতবাদ’ বলা হয়। উপমহাদেশে এই মতবাদের বহুল অপপ্রচার রয়েছে। নামধারী ইসলাম বিদ্বেষীদের দ্বারাই ইসলামকে খাটো করার জন্যই মূলত এই ‘ওহাবী’ শব্দকে একটি মতবাদ হিসেবে প্রচার করার চেষ্টা করা হয়। সৌদি আরবে এদের অনুসারীরা ১৮০৪ সালের দিকে মক্কা-হিযাযসহ উপদ্বীপের অধিকাংশ অঞ্চল তাদের (ওহাবীদের) অধীনে দখলে নেয়। তৎকালীন তুর্কী খিলাফাত এ নতুন রাজত্বকে তার আধিপত্য ও নেতৃত্বের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর বলে মনে করে। এ সময় তাদের প্ররোচনায় ‘ওহাবী’ শব্দটি মুসলিম সাম্রাজ্যে অত্যন্ত ঘৃণ্য শব্দে পরিণত হয়। ব্রিটিশরা সেই পথেই এর সাথে বিষ মিশিয়ে প্রচারের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে এবং এ উপমহাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলনে যোগদানকারী আলেম-উলামা এবং সাধারণ মুসলমানদের উপর তার খড়গ নেমে আসে। আমি স্যারের গ্রন্থ পড়েই এই তথ্য অবগত হই এবং আমি তাঁর সাথে এ বিষয়ে সম্পূর্ণ একমত পোষণ করি।
দিনটি ছিল শুক্রবার। আমি স্যারের ট্রাস্টের লাইব্রেরিতে বসে বই পড়ছি। স্যার আসলেন। তাঁর সাথে কুশল বিনিময় হলো। দেখেছি স্যার সব সময় আগেই নিজের হাতটি বিনয়ের সাথে বাড়িয়ে দিতেন। আমার জীবনে নিরহংকার, বিনয়ী এমন গুণী মানুষ আমি দ্বিতীয়টি দেখিনি। তিনি সাধারণ কোন আলেমের মত ছিলেন না। একজন ব্যতিক্রমী গুণী মানুষ হিসেবে তাঁর পরিচয় গড়ে উঠেছিল বিশ্বব্যাপি। সময় তখন প্রায় ১২ টা। স্যার কেন্দ্রিয় মসজিদের উদ্দেশ্যে গাড়ীতে উঠবেন। এ সময় আমি এবং আব্দুর রহমান সালাফী ভাই দাঁড়িয়ে। স্যার আমাদের দু’জনকে গাড়িতে উঠালেন। স্যার সামনে আমি এবং আব্দুর রহমান ভাই পিছনে বসে আছি। এ সময় আমার হাতে ছিল আমার লেখা ‘ ১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা সংগ্রাম: মুসলিম অবদান’ গ্রন্থটি। গাড়ির মধ্যে বইটি আমি স্যারকে দেখাই। আমার লেখা বইগুলো তখনও স্যারের লাইব্রেরি স্পর্শ করেনি। স্যার আমার বইটি নেড়ে চেড়ে দেখে-আব্দুর রহমান ভাইকে লক্ষ করে একটি কথা বলেছিলেন, তা এখনো আমার কানে বাজে। স্যার বলেছিলেন-আব্দুর রহমান, আমি চাই আমার প্রতিষ্ঠানে একজন চিকিৎসক, একজন ইতিহাসবিদ, একজন কৃষিবিদ, একজন অর্থনীতিবিদ ইত্যাদি পেশার গুণী মানুষের সমাবেশ ঘটুক। তাঁদের জ্ঞানের সাথে এখানকার শিক্ষার্থীরা পরিচিত হোক। তাঁদের মাধ্যমে এখানকার বিভিন্নমুখী প্রতিভা বিকাশের পথ তৈরি হোক।
একটি বুদ্ধিদীপ্ত -চিন্তাশীল-সৃজনশীল শিক্ষার্থী এবং উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির জন্য তাঁর ব্যাকুল চিন্তা গাড়ির মধ্যেও থেমে নেই দেখে আমি অভিভুত হয়ে যাই। সেদিন স্যার গাড়ির মধ্যেই একটি ঘটনার কথা স্মরণ করেছিলেন। বলেছিলেন-আনারস খাওয়ার পর যদি দুধ খাওয়া হয়, তবে মানুষের শরীরে নাকি বিষের প্রতিক্রিয়া দেখা দেই এবং মানুষটি মারা যায়। কিন্তু একদিন এক অনুষ্ঠানে একজন চিকিৎসক আনারস খেয়ে সাথে সাথে দুধ পান করে এটি যে একটি সামাজিক কুসংস্কার তা প্রমাণ করেন। এই ঘটনা দ্বারা স্যার বূঝাতে চাইলেন-এভাবে যদি প্রতিষ্ঠানে বিষয়ভিত্তিক বিজ্ঞ-জ্ঞানী-গুণী মানুষের জ্ঞানের সমন্বয় ঘটানো সম্ভব হয়, তবে সমাজে নানাবিধ যে কুসংস্কার ও অন্ধ বিশ্বাস ছড়িয়ে আছে তা একদিন অবশ্যই দূরীভুত হয়ে আলোকিত মুসলিম সমাজ ও সংস্কৃতির উৎপত্তি ও বিকাশ ঘটবে-তা নিঃসন্দেহ।
বাংলাদেশে ধর্মপ্রাণ শিক্ষিত এবং অশিক্ষিত সকল প্রকার মুসলমানদের কাছে খাজা নিযামুদ্দিন আউলিয়া রচিত ‘রাহাতুল মুহিব্বীন’ মুফতী হাবীব ছামদানীর লেখা ‘বার চান্দের ফযীলাত’ এবং মাও. গোলাম রহমানের লেখা ‘মকছুদোল মোমেনীন’ গ্রন্থসমূহের সাথে কঠিন ধর্মীয় আবেগ জড়িত রয়েছে। এখানে কোন অসত্য-মিথ্যা-বানোয়াট-জাল হাদীস থাকতে পারে তা কেউ কখনো বিশ্বাস করতে পারে না। উদ্ধার করাও সম্ভব নয়। হাদীসের নামে সত্য বলেই তা সমাজে প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। বাংলাভাষীদের মাঝে প্রতিষ্ঠিত এই সত্য যে মিথ্যা-বানোয়াট তা প্রমাণ করার জন্য কলম যুদ্ধ চালিয়ে অত্যন্ত পরিশ্রমী দ্বীনের এই কাণ্ডারী ‘হাদীসের নামে জালিয়াতি’ গ্রন্থ রচনা করে সমাজে তাঁর স্থায়ী প্রভাব সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়েছেন। অসাধারণ তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রীতি এবং ভালভাসা। তাঁর লেখনি এবং কর্মতরপরতার মধ্যেই এর প্রমাণ বিদ্যমান রয়েছে। রাসূলের শাফায়াত ছাড়া মুক্তি অসম্ভব। তিনি তাঁর প্রমাণ প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। বর্তমান দেশ ছাড়িয়ে বাইরেও তাঁর গ্রন্থের বিপুল চাহিদা তৈরি হয়েছে। রাসূলের সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামে প্রতিষ্ঠিত এই সকল হাদীসকে মিথ্যা জাল-বানোয়াট বলে প্রমাণ করা কোন সহজ কথা নয়।
বৈজ্ঞানিক সূত্র প্রয়োগ করে নতুন নতুন বস্তু আবিষ্কারের মতই তাঁর ‘হাদীসের নামে জালিয়াতি’ গ্রন্থের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত বিখ্যাত ব্যক্তিদের লেখা গ্রন্থের মধ্যেও জাল হাদীস প্রয়োগ হয়েছে কি না তা চিহ্নিত করা খুব সহজ হয়ে যায়। সমাজে প্রতিষ্ঠিত বহু কথা হাদীসের নামে প্রচলিত আছে। এগুলোকে মিথ্যা-বানোয়াট-জাল বলা অত্যন্ত সাহসিকতার পরিচয় এবং ঈমানী শক্তির পরিচায়ক। পাণ্ডিত্য-গভীর জ্ঞান এবং কঠিন অধ্যবসায় ছাড়া এ ধরনের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করা কারো পক্ষেই সম্ভব হয় না। ‘আরবি সাহিত্যের ইতিহাস’ গ্রন্থটির লেখক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞ প্রফেসার জনাব আ. ত. ম. মুসলেহ উদ্দিন। প্রকাশক ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ঢাকা। এই গ্রন্থটি শুরুই করা হয়েছে একটি জাল হাদীস দিয়ে। বিচারপতি তকী উসমানী একজন খ্যাতিসম্পন্ন ব্যক্তিত্ব। তাঁর একটি গ্রন্থের নাম ‘হাদীসের প্রামাণ্যতা’। অথচ এর মধ্যেও জাল হাদীস বিদ্যমান। এগুলো নির্ণয় করা সহজ হয়েছে ‘হাদীসের নামে জালিয়াতি’ গ্রন্থের মাধ্যমে। প্রকৃতপক্ষে গ্রন্থটির শক্তিশালী উপকারিতার কথা বর্ণনা করে শেষ করা যায় না। সুতরাং এভাবে প্রতিষ্ঠিত একটি সত্যকে মিথ্যা প্রমাণ করার মত দুঃসাহস একমাত্র তাঁর পক্ষেই দেখানো সম্ভব। তিনি তাঁর গ্রন্থে প্রমাণ ছাড়া একটি উক্তিও ব্যবহার করেছেন বলে মনে হয় না। আরবি ভাষা ছিল তাঁর নিকট মাতৃভাষাতুল্য। তাঁর গ্রন্থে যে সকল তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে, তা এ দেশে দু®প্রাপ্য-দুর্লভ।
