তাঁর সংগৃহীত এবং সংরক্ষিত লাইব্রেরিটিও তার বড় প্রমাণ। একটি মুহূর্ত সময়ও তাঁর জীবনে অপচয় হয়েছে বলে আমার মনে হয় না। দেশ, মুসলিম সমাজের উন্নতি অবনতি ইত্যাদি বিষয নিয়ে তাঁর উদ্ভাবনী এবং সৃজনশীল ভাবনা আমি খুব নিকটে থেকেই অবলোকন করেছি। অপ্রয়োজনীয়, অতিরিক্ত কথা গীবতের পর্যায়ে পড়তে পারে মর্মে তিনি এতই সতর্ক এবং আখেরাতমুখী ছিলেন যে, কখনো কোন মানুষ তাঁর সামনে বেশি কথার সাহস পেত না। আর তিনি তো বলতেনই না। আল-হাদীস এন্ড ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের প্রফেসার জনাব ড, আ. ন. ম. ইকবাল হোসাইন ভাইয়ের সাথে একদিন স্যারের নিজস্ব চেম্বারে আমি এই বিষয়টি প্রত্যক্ষ করি। শুধু ঝিনাইদহ কেন্দ্রিক তাঁর চিন্তা সীমাবদ্ধ ছিল না। দেশ ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তাঁর চিন্তা সম্প্রসারিত ছিল। আমি যখন স্যারের বৈবাহিক সম্পর্ক বিখ্যাত ফুরফুরার পীর পরিবারে সাথে মিশ্রিত বলে জানতে পারি, তখন স্যারের এই সীমাবদ্ধতা এবং সংকীর্ণতা ছাড়িয়ে কেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তাঁর সুপরিচিত ঘটে তা উপলব্ধি করা খুব সহজ হয়ে যায়। স্যার কেন্দ্রিয় মসজিদে একদিন মানুষ কিভাবে ভাল হয়ে গড়ে উঠতে পারে এবং নিজকে সেই পথে টিকিয়ে রাখতে পারে-এ বিষয়ে বক্তৃতা করেছিলেন। আমার এখনো স্পষ্ট মনে আছে স্যার বলেছিলেন-ভাল পরিবেশ এবং ভাল মানুষের সাথে (সাধক জ্ঞানী আমলিয়াত আলেম উলামা শ্রেণিদের সাথে) সব সময় উঠাবসা এবং সম্পর্ক তৈরির মাধ্যমেই একজন মানুষ ভাল হয়েও খারাপ হয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পেয়ে যায়।
ফুরফুরার সাথে সংশ্লিষ্ট বাংলাদেশের তিন খ্যাতিমান ব্যক্তিকে নিয়ে আমি গবেষণা সম্পন্ন করেছি। একজন ঝিনাইদহের (খাজুরা) মুন্সী মুহাম্মদ জহিরউদ্দিন, (দেখুন-‘মুন্সী মুহাম্মদ জহিরউদ্দিন: ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর অবদান, ইসলামিক ফাউন্ডেশন পত্রিকা, (গবেষণা ত্রৈমাসিক), ৫৫বর্ষ, ১ম সংখ্যা, জুলাই-সেপ্টেম্বর-২০১৫, ঢাকা)। দ্বিতীয় জন ছিলেন যশোরের এনায়েতপুরের খানবাহাদুর আহমাদ আলী। (দেখুন-মাসিক অগ্রপথিক, ইসলামিক ফাউণ্ডেশন, ৩১বর্ষ ৪ সংখ্যা, এপ্রিল-২০১৬, ঢাকা)।
তৃতীয় জন ছিলেন মাওলানা রুহুল আমিন বশিরহাটীর জীবনীসহ প্রায় ৪৫টি গ্রন্থের লেখক, প্রখ্যাত বাগ্মী সাতক্ষীরার (কলারোয়া) মাওলানা মোহাম্মদ ময়েজ্জদ্দীন হামিদী। এ সকল মনীষীদের উপর গবেষণা পরিচালনা করতে গিয়ে দেখেছি তাঁদের মাঝে কোন সংকীর্ণতা এবং সমাজের মঙ্গল কামনায় কোন সীমাবদ্ধতা ছিল না। বুদ্ধিবৃত্তিক জাগরণ সৃষ্টিই তাঁদের কর্মের মূল লক্ষ ছিল। লেখনি এবং বক্তৃতা তথা দাওয়াতী মিশন তৈরির মাধ্যমেই তাঁরা এই কাজটি সম্পন্ন করার চেষ্টা করেছেন। প্রকৃতপক্ষে উনিশ শতকে এবং বিশ শতকেও যে বা যাঁরাই এই বিখ্যাত পরিবারের সৃষ্টিশীল কর্ম তৎপরতা ও চিন্তার সাথে পরিচিতি হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করেছেন, তাঁদের মাঝেই সমাজ সংস্কার এবং লেখনির শক্তি জাগ্রত হয়েছে। বাংলাদেশে ইসলামী শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশ- বিস্তার ও ভৌতিক অবকাঠামো প্রতিষ্ঠায় ফুরফুরার পীর মাওলানা আবু বকর ছিদ্দিকী (রহ)- এর অপরিসীম অবদান জাতির মাঝে চিরদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আমার চোখে এখনো ভাসছে আমি যখন শাহজাদ পুর সরকারি কলেজে অধ্যাপনায়রত ছিলাম তখন সেখানকার কেন্দ্রিয় মসজিদটিতেও মাওলানা আবু বকর ছিদ্দিকী (রহ)-এর নাম খোদাইকৃত দেখতে পাই, সালটি দেওয়া আছে ১৯৩১। বাংলাদেশ এবং আসামে ‘ছিদ্দিকীয়া’ নামে যত ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান রয়েছে, আমার মনে হয় সবগুলোতেই তাঁর সোনার হাতের পরশ রয়েছে। এই পবিারের সাথে তাই তাঁর বৈবাহিক সম্পর্ক এবং বিদেশে পড়াশুনা (সৌদি আরবের রিয়াদে) এবং পৃথিবীর অন্যান্য দেশ ভ্রমণ করার কারণে সেখানকার গুণী ও পণ্ডিত মানুষের সাথে তাঁর সাক্ষাৎ পরিচয়-তাঁর মানস জগত পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এভাবেই তাঁর মধ্যে সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের পথ তৈরি হয়ে যায়। তিনি অধ্যবসায়ী এবং অনুপ্রাণিত হয়ে পরিণত হয়ে যান একজন ব্যক্তি থেকে একটি প্রতিষ্ঠানে। তাঁর কর্মতৎপরতা দেখে আমার মনে হয়েছে সারা বাংলাদেশেই তাঁর ‘আস-সুন্নাহ ট্রাস্টের’ শাখা তৈরির প্রচেষ্টা ছিল।
এখানে প্রতিষ্ঠিত সেবামূলক কর্মের মাঝেও তিনি বহু দিন স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। অসহায় বিধবা নারী ও শিশুদের জন্য সেলাই প্রশিক্ষণসহ চিকিৎসা, ধর্মীয় শিক্ষা ও আর্থিক সহযোগিতায় তাঁর দরদী মনের পরিচয় জাতির মাঝে একটি অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। এই সাথে আধুনিক বিজ্ঞান এবং ধর্মীয় শিক্ষার সমন্বয়ের মাধ্যমে যুগোপযোগী একদল যোগ্য আলেম তৈরির উদ্দেশ্যেই তাঁর ট্রাস্টটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। চিন্তা এবং কর্মের সাথে সমন্বয় করেই তাঁর প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়েছে। শুধু চিন্তা করেছেন, অথচ বাস্তবায়ন নেই-এ ধরনের মানসিকতার পরিচয় তাঁর জীবনে দেখা যায় না। তিনি সমগ্র দেশের আলেমদের মধ্যেও এই চিন্তা ছড়িয়ে দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন এবং কওমী আলিয়া সকল ধরনের আলেমদের সাথে তাঁর গভীর সম্পর্কও তৈরি হয়েছে। জেলার বিভিন্ন মসজিদের ইমামদেরকে তাঁর ট্রাস্টে আমন্ত্রণ জানিয়ে তাঁদের সাথে তাঁর সৃজনশীল চিন্তার সমন্বয় করারও চেষ্টা করেছেন।
তাঁদের মাধ্যমে তৃণমূল সমাজে প্রতিষ্ঠিত শিরক-বিদয়াত দূরীকরণে কর্মপন্থা কি হওয়া প্রয়োজন তা নিয়ে তাঁদের সাথে ব্যাপক আলাপ-আলোচনা ও পন্থা তৈরির চেষ্টা করেছেন। যুবক সমাজের মধ্যেও তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ছিল অপরিসীম। তিনি মসজিদে মসজিদে তাঁদের মাধ্যমে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের আয়োজন করে তাঁদেরকে কর্মে ব্যস্ত রাখতেন, যেন তারা বিপথগামী না হয়ে যায়। এমনি অসাধারণ সৃজনশীল কৌশলী মনোভাব সম্পন্ন মানুষ আমি দ্বিতীয়টি দেখিনি। এই সমাজকে অন্ধকারের হাত থেকে রক্ষার জন্য আলেমদের অপরিসীম অবদান স্যার দ্বীনের আলোর মত পরিষ্কার করে বর্ণনা দিতেন এবং তারা উৎসাহিতও হতেন। এ জন্য প্রয়োজন যে জ্ঞান চর্চা-তার ভিত্তিও তিনি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন এবং তা সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য প্রকাশের সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্তও ছিলেন। ইসলামী চিন্তাবিদ হিসেবে তাঁর পাণ্ডিত্য নিয়ে প্রশ্ন তোলার কোন অবকাশ নেই। এই জ্ঞান বিতরণে আন্তর্জাতিক প্রচার মাধ্যমেও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ সম্পৃক্ততার বিষয়ে জাতির মাঝে কোন অস্পষ্টতা নেই।
আল-কুরআন একাডেমি লন্ডন’ থেকে বিনামূল্যে বিতারণকৃত কুরআনের ১৯-২১ পৃষ্ঠায় ‘কোরআন শরীফ:শব্দ ও আয়াতের পুনরাবৃত্তির রহস্য’’ শিরোনামে একটি অধ্যায় আছে। কুরআনের শব্দ সংখ্যা নিয়ে এখানে একটি অদ্ভুত পরিসংখ্যান জুড়িয়ে দেওয়া আছে। মানুষ এতদিন তা সত্য বলেই বিশ্বাস করে আসছে। এই পরিসংখ্যান যে ভুল তার প্রমাণ উপস্থিত করে আমি একটি গবেষণা প্রবন্ধ রচনা করি। এই প্রবন্ধের একটি ফটোকপি আমি স্যারের নিকট দেওয়ার জন্য স্নেহভাজন আবাসিক ছাত্র সালমানের কাছে রেখে আসি। পরে স্যারের সাথেও এ বিষয়ে আমার সরাসরি কথা হয়। স্যার আমাকে বলেন-আমি যেন ঢাকা অফিসে তাঁদের সাথে যোগাযোগ করি। যদি সাড়া না পাওয়া যায় তবে যেন তা পত্রিকায় প্রকাশের ব্যবস্থা করি। আমি স্যারের এই পরামর্শ মোতাবেক ব্যবস্থা গ্রহণ করি। ঢাকা থেকে ই-মেইল যোগে সেটি লন্ডনে প্রেরণ করা হয়। লন্ডনে একজন তুর্কী আলেমের দ্বারা রিভিউ হওয়ার পর তাঁদের বঙ্গানুবাদিত কুরআন থেকে ‘‘শব্দ ও আয়াতের পুনরাবৃত্তির রহস্য-২০১৩’’ অংশটুকু পরবর্তী সংস্করণে সম্পূর্ণ বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় বলে জানানো হয়। এই অধ্যায়ের সঠিক পরিসংখ্যানটি আমার লেখা ‘আল-কুরআন:শব্দ সংখ্যা ও তার শিক্ষা’ গ্রন্থে সংযুক্ত করা আছে। মূলত স্যারের উত্তম পরামর্শ গ্রহণ করেই আমি এই পথে অগ্রসর হই, যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন কোন পণ্ডিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে আমি এই বিষয়ে অগ্রসর হতে বাধা পাচ্ছিলাম।
স্যারের মৃত্যুর সপ্তাহ দিন আগের একটি ঘটনা। আমার সর্বশেষ প্রকাশিত গ্রন্থের নাম ‘আল-কুরআন:শব্দ সংখ্যা ও তার শিক্ষা” (ঢাকা, নভেল পাবলিশিং হাউস, ফেব্রুয়ারি-২০১৬)। গ্রন্থটি হাতে পাওয়ার পর পরই স্যারের কথা মনে পড়ে যাই। মনে সংকোচ সৃষ্টি হয়। পৃথিবী বিখ্যাত গ্রন্থ, কোটি কোটি মানুষের আবেগ জড়িত যে গ্রন্থের সাথে (আল-কুরআন) সেই গ্রন্থ নিয়ে আমার মত ক্ষুদ্র গুনাহগার একজন মানুষ শব্দ সংখ্যা দিয়ে গ্রন্থ লেখার সাহসকে ধৃষ্টতাই বলতে হয়। তাই সরাসরি স্যারের নিকটে গ্রন্থটি নিজে না গিয়ে কিভাবে পৌছানো যায় তা নিয়ে ভাবতে থাকি। প্রথমত তাঁর ট্রাস্টের দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিচালক জনাব আব্দুর রহমান ভাইয়ের কাছে যাই। গ্রন্থটি দেখাতেই তিনি খুবই খুশি হন এবং সঙ্গে সঙ্গে বলেন-আমার স্যার (ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর) বর্তমান তাফসির লেখার জন্য গ্রন্থের সংগ্রহে রয়েছেন। এই গ্রন্থটি পেলে স্যারের বিরাট উপকার হবে। আপনি সরাসরি স্যারের নিকট যান স্যার ভীষণ খুশি হবেন। আমি আর দেরি না করে ট্রাস্টে চলে যাই ঠিক, কিন্তু কিছুতেই স্যারের নিকটে সরাসরি যাওয়ার সাহস হারিয়ে ফেলি। আমি আবারও আমার অত্যন্ত স্নেহভাজন সালমানের মাধ্যমে গ্রন্থের দুটি কপি একটি ভাউচারসহ প্রেরণ করি। সালমান এসে জানাই, স্যার এরূপ গ্রন্থ পেয়ে ভীষণ খুশি হয়েছেন এবং আমার জন্য দোওয়া করেছেন। আমি বাড়ি ফিরে আসি।
