উপমহাদেশে খ্রিস্টান মিশনারীদের অপতৎপরতা বিষয়ে রচিত আল্লামা রাহমাতুল্লাহ কিরানবীর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ইযহারুল হক’ (অনূদিত গ্রন্থটি ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশিত হয়) অনুবাদের সময় তিনি এই বিষয়ে বাংলাদেশ কেন্দ্রিক খ্রিস্টান মিশনারীদের অপতৎপরতা বিষয়ে গবেষণায় আগ্রহী হয়ে উঠেন। লন্ডন থেকে প্রকাশিত ‘মাসিক যাইতূন’ (১ম বর্ষ, ৩য় স্যংা, জুন-জুলাই-২০১৫) পত্রিকায় তাঁর লিখিত একটি প্রবন্ধ ‘‘২০১৫ খৃস্টাব্দের মধ্যে বাংলাদেশের অন্তত ৫ কোটি মানুষ খৃস্টান হবে’’ পড়লে বাংলাদেশে খ্রিস্টান মিশনারীদের অপতৎপরতা বিষয়ে বিশেষ করে ঝিনাইদহ অঞ্চলের একটি পরিসংখ্যান চিত্রের আলোকে তিনি বিষয়টি পরিষ্কার করার চেষ্টা করেছেন। তাঁদের অপতৎপরতা বিষয়ে এই ধরনের শেকড় সন্ধানী অসাধারণ গবেষণামূলক প্রবন্ধ আমি এর আগে কখনো পড়িনি। তাই মুসলিম সমাজ হিতৈষী এই আলেমের অবদান জাতি কখনোই ভুলে যেতে পারে না- যিনি যুগধর্মের আলোকে একদল বলিষ্ঠ আলেমে দ্বীন গড়ে তোলার লক্ষে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ‘আস-সুন্নাহ ট্রাস্ট’ ও ‘আল-ফারুক একাডেমি’। এই সাথে পৃথিবী বিখ্যাত লেখকদের লিখিত দু®প্রাপ্য গ্রন্থের আলোকে গড়ে তোলা হয় এক সমৃদ্ধ লাইব্রেরি। এ পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৩০টি বলে জানা যায়। এর মধ্যে ৬টি অনূদিত গ্রন্থ। এ সকল কর্ম তৎপরতা ও গ্রন্থের তালিকা থেকে তাঁর বুদ্ধিদীপ্ত চিন্তা ও সৃজনশীলতার স্বাক্ষর পাওয়া যায়।
আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন এই আলেমে দ্বীন এবং শিক্ষাবিদের পিত্রালয় বৃহত্তর যশোর জেলার অন্তর্ভুক্ত ঝিনাইদহের হরিশংকরপুর ইউনিয়নের নরহরিদ্দা গ্রামে। জন্ম নানার বাড়ি ঝিনাইদহ জেলাধীন শেলকুপা থানার দিগনগর গ্রামে ১৯৫৮ সালের ১লা ফেব্রুয়ারি এবং মৃত্যু ২০১৬ সালের ১১ মে। আমার জন্মও যশোরের ঝিকরগাছাধীন ফারাসাতপুর গ্রামে। কিন্তু আমি তাঁর প্রথম নাম শুনি লালমনিরহাটের পাটগ্রামে। এখান থেকেই অনুমান করা যায় একজন লেখক সাম্রাজ্যের চেয়েও কত বড় হতে পারে! সত্যই লেখকরা খুব সহজেই মানস সাম্রাজ্য দখল করতে সক্ষম হয়। ভূমি সাম্রাজ্য যে কোন মুহূর্তে হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে কিন্তু লেখকরা মানস সাম্রাজ্য থেকে সেভাবে কখনো সাম্রাজ্যচ্যুত হয় না। ২৩ ডিসেম্বর-২০০৯ সালে পাটগ্রাম সরকারি কলেজে যোগদান করার পর এখানকার শহরে অবস্থিত কেন্দ্রিয় মসজিদে সালাত আদায়ের পর পেশ ইমাম সাহেবের নিকট ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীরের লিখিত তাঁর ‘হাদীসের নামে জালিয়াতি:প্রচলিত মিথ্যা হাদীস ও ভিত্তিহীন কথা’ নামক গ্রন্থের মাধ্যমে তাঁর চিন্তার সাথে আমি সর্ব প্রথম পরিচিত হই। গ্রন্থটি সচরাচার ধর্মীয় গ্রন্থের আদলে লেখা নয় দেখে তাৎক্ষণিকভাবে গ্রন্থটি ব্যক্তিগত সংগ্রহের জন্য মোবাইল ফোনের মাধ্যমে চেষ্টা করি কিন্তু ব্যর্থ হয়ে যাই। এরপর ২৮ জানুয়ারি-২০১৩ সালে চাকরির সুবাদে ঝিনাইদহ শহরে পদার্পণ করি। ঝিনাইদহ শহরের প্রাণ কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠিত কেন্দ্রিয় জামে মসজিদে তাঁর সাথে আমার প্রথম সরাসরি সাক্ষাৎ ও পরিচয় হয়। বাংলাদেশ ইসলামিক ফাউন্ডেশন থেকে প্রকাশিত গবেষণা পত্রিকা ‘ইসলামিক ফাউন্ডেশন পত্রিকা’য় (৪৬ বর্ষ ২য় সংখ্যা, অক্টোবর-ডিসেম্বর-২০০৬) ’‘আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক বিজ্ঞান:প্রেক্ষিত আল-কুরআন’’ শীর্ষক আমার একটি গবেষণামূলক প্রবন্ধ প্রকাশ পায়। ঐ একই সংখ্যায় ‘‘ইসলামের ইতিহাসে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ:একটি পর্যালোচনা’ শিরোনামে তাঁরও (ড. খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর) একটি লেখা প্রকাশ পায়। কাজেই এই লেখার সূত্র ধরেই স্যারের সাথে আমার প্রথম পরিচয় মসজিদের অভ্যন্তরেই।
সালাম করতেই স্যার আগেই হাত বাড়িয়ে দিলে আমি তাঁর সাথে মোসাফাহ করি এবং সামান্য কুশল বিনিময় করে ঐ দিনের মত বিদায় গ্রহণ করি। এরপর স্যারের সাথে আমার বহু বার দেখা-সাক্ষাৎ ও ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি পেয়েছে। পরবর্তীতে ‘আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক বিজ্ঞান:প্রেক্ষিত আল-কুরআন’ (শিরীন পাবলিকেশন্স, ঢাকা-২০১২) শিরোনামে যেমন আমার একটি গ্রন্থ প্রকাশ পেয়েছে, তদ্রƒপ ‘ইসলামের নামে জঙ্গিবাদ’ শিরোনামে স্যারেরও একটি গ্রন্থ প্রকাশ পেয়েছে। দুটি প্রবন্ধ প্রকাশ থেকে পরবর্তীতে দুটি গ্রন্থ প্রকাশ পেয়েছে-এ বিষয়ে স্যারের চিন্তার সাথে আমার চিন্তার একটি অদ্ভুত মিল রয়েছে। আমি একাধিকবার স্যারের আস-সুন্নাহ ট্রাস্টে গমন করে তাঁর প্রতিষ্ঠিত লাইব্রেরি থেকে বই ইস্যু করে বাড়িতে ব্যবহার করেছি, এখনো করি। তাঁর দু®প্রাপ্য লাইব্রেরি আমাকে মুগ্ধ করে। এখানে সকল প্রকার বুদ্ধিজীবী/লেখক ও গবেষকদের বই দেখে আমি আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়ি। তাঁর জ্ঞানের বহর কেন এত গভীর তা পরিমাপ করা তখন আমার জন্য খুবই সহজ হয়ে যায়। কেন বিজ্ঞান এবং মূল্যবোধের কথা তাঁর লেখায় এবং বক্তৃতায় বেশি উচ্চারিত হয় তাও অনুমান করা কঠিন মনে হয়নি। এই সময় একদিন আমার প্রকাশিত গ্রন্থের একটি সেট স্যারের সামনে উপস্থিত করি। স্যার সেগুলো লাইব্রেরিতে রাখার জন্য অত্যন্ত আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং তা ন্যায্য মূল্য দিয়েই তাঁর লাইব্রেরিতে রাখার ব্যবস্থা করা হয়। আমার প্রকাশিত গ্রন্থসমূহের মধ্যে ছিলঃ (১) আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিক বিজ্ঞান: প্রেক্ষিত আল-কুরআন, ঢাকা:শিরীন পাবলিকেশন্স, ২০১২। (২) ১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা সংগ্রাম: মুসলিম অবদান, ঢাকা:শিরীন পাবলিকেশন্স, ২০১৪। (৩) গাজী কালু ও চম্পাবতী : ইসলাম প্রচারে তাঁদের প্রভাব, ঢাকা:শিরীন পাবলিকেশন্স, ২০১০। (৪) দারিদ্র্য ও বেকারত্ব দূরীকরণ: ইসলামী দৃষ্টিকোণ, ঢাকা:শিরীন পাবলিকেশন্স, ২০১৪। (৫) প্রাচীন মিশর ও প্রত্নতাত্ত্বিক বিজ্ঞান: প্রেক্ষিত আল-কুরআন, ঢাকা:সুহৃদ প্রকাশন, ২০১০। (৬) আত্মশুদ্ধি প্রতিষ্ঠা: পথ ও পাথেয়, ঢাকা:শিরীন পাবলিকেশন্স, ২০১৫। (৭) ১৮৫৭ সালের আযাদী আন্দোলন : প্রেক্ষিত বাংলাদেশ, গবেষণা বিভাগ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন, ২য় সংস্করণ-২০০৯, প্রথম সংস্করণ-২০০৩। আমি খুবই নগন্য একজন ব্যক্তিত্ব। গুণী মানুষ হিসেবে যে ধরনের পরিচয় থাকা দরকার তা আমার মোটেও নেই। তারপরও আমাকে যে এভাবে গ্রহণ করা হবে-আমি তা ভাবতেও পারিনি। আমি স্যারের উদারতার পরিচয় পেয়ে ভীষণ খুশি, আনন্দিত। একজন মানুষ কেন আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন হয়ে গড়ে ওঠে আমি হৃদয় দিয়ে তা উপলব্ধি করার চেষ্টা করি। একইভাবে অগাধ পাণ্ডিত্য অর্জন করা সত্ত্বেও অনেকের দ্বারাই এই খ্যাতি অর্জন সম্ভব হয় না কেন-তাও উপলব্ধি করা সহজ হয়। আমি সব সময় গুণী মানুষের পাশে থাকার চেষ্টা করেছি। দেখেছি খুব পাণ্ডিত্য থাকা সত্ত্বেও এক ধরনের অহংকারসুলভ মানসিকতার কারণেই অনেকের দ্বারা এই খ্যাতি ও গুণ অর্জন অসম্ভব হয়ে যায় এবং এক সময় তাঁরা আস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়। তাই আমাদের শিক্ষার জন্য স্যারের বর্ণাঢ্য জীবন নিয়ে উচ্চতর গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।
