প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ ১০ম সংখ্যা, এপ্রিল ২০১৭, জমা.সানি-রজব ১৪৩৮ হিজরী, চৈত্র-বৈশাখ ১৪২৩-২৪বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

সপ্তম অনুচ্ছেদ

পাকভারত উপমহাদেশের মুসলমানগণ বিশেষ করে সম্ভ্রান্ত বংশের লোকেরা বিধবার দ্বিতীয় বিবাহকে লজ্জাজনক কাজ বলে মনে করে থাকেন। শরীয়তের দৃষ্টিতে যেমন প্রথম ও দ্বিতীয় বিবাহ একই মর্যাদা রাখে, যুক্তির দিক দিয়েও তা সমান। এতদুভয়ের মধ্যে পার্থক্য করার কোন কারণ নেই। ভারতীয় কাফেরদের সাথে মেলা-মেশা এবং সহায় সম্পত্তির প্রতি আসক্তির কারণে এধরনের ভ্রান্ত ধারণা প্রতিষ্ঠা লাভ করেছে। এ ভিত্তিহীন লোকাচারকে তাসের ঘরের সাথে তুলনা করলে অত্যুক্তি হবে না। ঈমান ও বুদ্ধি তো বলে, প্রথম বিবাহ যেভাবে কোন ধরণের বাধা-বিঘ্ন থাকে না দ্বিতীয় বিবাহেও তেমনিভাবে কোন প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা অনুচিত।

দ্বিতীয় বিবাহে যদি সংকোচ বোধ হয় তাহলে প্রথম বিবাহে তা হবে না কেন? বরং দ্বিতীয় বিবাহকে দূষণীয় মনে করলে, শরীয়তের বিধানকে নীচতা ও অসম্মানের হেতু ভাবার দরুন এতে করে কুফরী হওয়ার আশংকা আছে। দ্বিতীয় বিবাহের প্রচলন ঘটানোর জন্য আমার এ প্রচেষ্টার প্রধান কারণ হচ্ছে, কোন কোন পরিস্থিতিতে প্রথম বিবাহের মতো দ্বিতীয় বিবাহও ফরয হয়ে পড়ে। উদাহরণত যুবতী মেয়েলোক যার বাহ্যিক পোশাক-আশাকে অন্তরের বাসনা প্রস্ফুটিত হয়, একাকিনী থাকলে বিপথগামী হওয়ার সম্ভাবনা, খাদ্য-বস্ত্রের অভাব, অভাবের কারণে পর্দা ও ধর্ম বিনষ্ট হওয়ার আশংকা, এমতাবস্থায় এই মেয়েলোকের দ্বিতীয় বিবাহ করা নিশ্চিতই ফরয হবে। পরিস্থিতি দেখে ততটা প্রয়োজন অনুভুত না হলেও দ্বিতীয় বিবাহ ফরয হতে পারে।

কেননা, অভিজ্ঞতার আলোকে বলা যায়- যে কাজ করতে সংকোচ বোধ হয় এবং যাকে লজ্জা ও গন্নতা বলে ধারণা করা হয় সে কাজকে ব্যাপকভাবে প্রচলিত না করা পর্যন্ত লোকের এ সংকোচ বোধের অবসান হবে না ,কাজেই আলেমদের প্রধান উদ্দেশ্যই হচ্ছে, এ কাজকে যাতে দূষণীয় মনে করা না হয় তার পরিবেশ সৃষ্টি করা। তবে যেহেতু এ কাজের প্রচলন একে কার্যে পরিণত করার উপরই নির্ভর করে, সেহেতু এর বাস্তব সম্মত প্রচলনের চেষ্টা করা অত্যন্ত প্রয়োজন।

অষ্টম অনুচ্ছেদ

আমাদের সমাজে ধর্ম ও ধার্মিকতার অস্তিত্ব বিলুপ্ত প্রায়; অথচ শিক্ষার্থীগণ বড় বড় পদলাভের আশায় দ্বীনি শিক্ষাকে জলাঞ্জলি দিয়ে ইংরেজি, দর্শন, যুক্তিবিদ্যা ইত্যাদি গঠনে নিমগ্ন। এই বিষয়গুলো শিক্ষা করা অনুচিত তা অভিজ্ঞতা থেকে পূর্বেই প্রমাণিত হয়েছে, যেহেতু কোরআনের সতর্কবাণী দ্বারা তা আরো সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন-

وَيَتَعَلَّمُونَ مَا يَضُرُّهُمْ وَلَا يَنْفَعُهُمْ

অর্থঃ ‘তারা এমন বিষয় শিক্ষা করে যা না কোন অপকার করে আর না কোন উপকারে আসে।’ ইংরেজি শিক্ষার্থীগণ প্রায়ই বলে থাকেন-‘ইংরেজি তো একটা ভাষা, ভাষা শিক্ষার ক্ষতি কি? কিন্তু তারা একথা বুঝতে রাজি নন যে, ভাষা শিক্ষা তো খারাপ কিছু নয়, তবে যে শিক্ষা মানুষের নৈতিক উন্নতির সহায়ক নয় বরং অবনতির সহায়ক আদতে বৈধ হলেও এমতাবস্থায় সে শিক্ষা গ্রহণ থেকে বিরত থাকা উচিত। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায়, হাঁটা-চলা করা তো মূলতঃ সম্পূর্ণ বৈধ কাজ, কিন্তু সেই হাঁটা-চলাই যখন চুরি বা কোন অসৎ উদ্দেশ্যে হবে তখন হারাম হবে একথা সবাই স্বীকার করবেন।

বড় বড় পদলাভের উদ্দেশ্যেই কেবল এ সমস্ত শিক্ষা গ্রহণ করে উচ্চতর ডিগ্রি নিয়ে থাকে ছাত্ররা। এসব পড়াশুনা করে তারা শরীয়ত বিরোধী কাজ-কর্মে আত্মনিয়োগ করে। যে শিক্ষার মাধ্যমেই এসব শরীয়ত বিরোধী কাজে অনুপ্রেরণা সৃষ্টি হবে সে শিক্ষাই পরিত্যাজ্য-গর্হিত। এ শিক্ষা গ্রহণের অন্যান্য অপকারিতা হচ্ছে, ধর্মের প্রতি অমনোযোগী হওয়া, ধর্মীয় বিশ্বাসে ভ্রান্তি সৃষ্টি হওয়া, মনে আত্মগর্ব ও অহংকার সৃষ্টি হওয়া ইত্যাদি। দ্বীনি দায়িত্ব পালনে সর্বদা সচেষ্টা এবং ইলম ও আমল বিশুদ্ধ থাকলেও প্রতিপত্তিশালী হবার আকাক্সক্ষার দরুন সে শিক্ষা গ্রহণ উচিত হবে না। তবে কেউ যদি নিজের দৈনন্দিন কাজ-কর্ম বা ধর্মীয় প্রয়োজনে এসব শিক্ষা করে তাহলে দূষণীয় নয়। এ কাজের জন্য অবশ্য কোন সনদের প্রয়োজন হয় না। কেবল শিক্ষাই যথেষ্ট। ধর্মীয় প্রয়োজনে শিক্ষার্জন করছেন বলে কোন শিক্ষার্থীর দাবি শুধুমাত্র তখনই সঠিক বলে ধরা হবে যখন তার সনদ লাভের চেষ্টা না থাকবে।

এই ধরনের বিকৃত চিন্তাধারা থেকেই আকিদাগত ভ্রান্তি ও ধর্মীয় ব্যাপারে অসতর্কতার উৎপত্তি হয়। এ ছাড়াও অনেকে এই উদ্দেশ্যে এসব শিক্ষা গ্রহণ করেন যে, এতে করে সমাজে একটা সম্মানের পাত্র হওয়া যাবে এবং কেউ স্বল্প জ্ঞানী বলতে পারবে না। এই উদ্দেশ্যও সঠিক নয়। পরিশেষে এ সমস্ত শিক্ষা যেন প্রয়োজনীয়তিরিক্ত না হয় সেদিকে খেয়াল থাকা দরকার।

নবম অনুচ্ছেদ

লেখক ও প্রকাশকগেেণর স্বত্ব ক্রয়-বিক্রয় বা রেজিস্ট্রি করাও এক ধরনের কুপ্রথা। মুহাদ্দিস ও ফকীহগণের নিকট এ বিষয়টি সম্পূর্ণ পরিষ্কার যে, শরীয়তের দৃষ্টিতে এ ধরনের স্বত্ব মূলতঃ কারো অধিকার রাখার বস্তু নয়। কাজেই এতে কোন এক ব্যক্তির অধিকার খাটানো এবং অন্যদেরকে তা থেকে উপকার লাভে বাধা দেওয়া নিষিদ্ধ। আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করো না।’

দশম অনুচ্ছেদ

গণমান্য, জ্ঞানী-গুণী ও ব্যবসায়ীদের অনেকেই ঘোড় দৌড়, মেলা, নৌকা বাইচ, নাটক থিয়েটার ইত্যাদি খেল-তামাশার অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে থাকেন। এ সকল আয়োজনাদিতে অনুষ্ঠিত অধিকাংশ ক্রিয়া-কর্মই শরীয়তবিরোধী। ঢোল ও বাদ্যযন্ত্র ছাড়া এসব কল্পনাই করা যায় না। বেশ্যা নারীদের গমনাগমন তো আছেই। ঘোড়দৌড়ে জুয়া খেলাও হয়। নৌকা বাইচে যুবক পুরুষেরা হাঁটুর উপর কাপড় তুলে রাখে। কাফেরদের অনুসরণে মেলায় কত রকমের অবৈধ কার্যকলাপ চলে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। উপরোক্ত বহুবিধ কারণে এ সমস্ত অনুষ্ঠানে যোগদান করা গুনাহের কাজ এবং সাথে সাথে কুফরী ক্রিয়াকলাপ এগুলোর প্রচার-প্রসারের পক্ষে সহায়তাও করা হয়।

হাদীসে আছে, যে ব্যক্তি কোন জাতির আয়োজনকে সম্প্রসারিত করবে সে ব্যক্তি সেই জাতির অন্তর্ভুক্ত হবে। এমনকি রসূল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাাবয়ে কেরাম (রা.)-কে জনপথে সভা অনুষ্ঠান করতে নিষেধ করেছেন। কেননা, এ ধরনের জায়গায় লোকজন গোনাহ থেকে আত্মরক্ষা করেছেন। কেননা, এ ধরনের জায়গায় লোকজন গোনাহ থেকে আত্মরক্ষা করতে পারে না। অন্য হাদীসে রসূল রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিয়ামতের কাছাকাছি সময়ে কাবা ঘরকে অবমাননা করার উদ্দেশ্যে আগমনকারী এক জনগোষ্ঠীকে ভূ-গর্ভে ধসিয়ে দেওয়ার সংবাদ প্রদান করেছেন। হযরত উম্মে সালামা (রা.) আরয করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! এ জনগোষ্ঠীতে তো ব্যবসায়ীগণও থাকতে পারে। রাসূলুল্লাহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাবে বললেন, যারা থাকবে তারা সবাই ভূ-গর্ভে বিলীন হয়ে যাবে।

ব্যবসায়ী ভাইয়েরা! আপনারা তো শুধু নিজের সাময়িক প্রয়োজনের দিকেই চেয়ে আছেন। উপরোক্ত হাদীস আর কোরআন শরীফের স্পষ্ট ঘোষণা ‘আল্লাহই রিযিকের মালিক; ইত্যাদি পাঠ ও অনুধাবন করে নিজেকে সান্ত¦না দিতে চেষ্টা করুন।