প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ৯ম সংখ্যা, মার্চ ২০১৬, জমা.আউ-জমা.সানী ১৪৩৭ হিজরী, ফাল্গুন-চৈত্র ১৪২২ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়
গাইরুল্লাহর ইচ্ছা বা অভিপ্রায় বিষয়ক আকীদা
১. অধিকাংশ পূণ্যবান লোকদের সম্পর্কে মনে করা হয় যে, তাঁদের ইচ্ছা বা অভিপ্রায়ই হচ্ছে আল্লাহর মূল ইচ্ছা বা অভিপ্রায়। এই শ্রেণীর মনোভাবের সাথে শুধু কেবল ভ্রান্ত বিশ্বাসীরাই নয়, বরং তাওহীদের অনুসারীরাও এই ভুল বিশ্বাসের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানুষকে এই সূক্ষ্ম ভুল সম্পর্কেও অবহিত করেছেন এবং বলেছেন যে, পৃথিবীতে মাশিয়াত বা অভিপ্রায় শুধুমাত্র আল্লাহর। তাঁর অভিপ্রায় অনুসারেই পৃথিবী চলছে। সকল অভিপ্রায় এবং আশা আকাঙ্খা তাঁর অভিপ্রায়েরই অধীনস্থ। তাঁর অভিপ্রায়ের সাথে কোন মাখলুকের অভিপ্রায়ের কোন অংশী নেই। কিন্তু মানুষ আল্লাহর অভিপ্রায়ের সাথে গায়রুল্লাহর অভিপ্রায়কেও শরীক করে নিয়েছে। কামেল ও পরিপূর্ণ তাওহীদের মুয়াল্লিম রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই ধারণাকে কঠোরভাবে মূলোৎপাটিত করেছেন। কুরআনুল কারীমের বিভিন্ন স্থানে এই হাকীকতকে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে যে, আল্লাহর অভিপ্রায় ছাড়া আর কারো প্রকৃত অভিপ্রায় হতে পারেনা। অন্য সকল অভিপ্রায় তাঁর অভিপ্রায়েরই অধীনস্থ। তবে ঈমান ও আকীদার এই ভুল এতখানি ব্যাপক ও সাধারণ হয়ে পড়েছিল যে, যারা আদৌ বিশ্বাসী ছিল না, তারাও রাজা-বাদশাহ, প্রশাসক এবং বয়োবৃদ্ধদের সাথে কথাবার্তা বলার সময় এ কথা বলাকে উত্তম শিষ্টাচার বলে মনে করত। আপনি যা চান, হুজুর যা চান। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এভাবে কথা বলাকে নিষেধ করেছেন। এমনকি আল্লাহপাকের অভিপ্রায়ের সাথে তাঁর অভিপ্রায়কে সমকক্ষ বলে উল্লেখ করতেও সাহাবীদেরকে বারণ করেছেন। এই জাতীয় কথাবার্তা মানুষের কথোপকথনে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিল বলেই তিনি এর সংস্কার সাধন করেছেন এবং নির্দেশ করেছেন : আল্লাহ এবং গায়রুল্লাহর অভিপ্রায়ের মাঝে সংযুক্তির চিহ্ন পর্যন্ত যেন উপস্থাপন করা না হয় এবং এর সমকক্ষতার গন্ধও যেন বেরিয়ে না আসে। বরং অত:পর শব্দটি যোগে কথা বলবে যেন, আল্লাহর অভিপ্রায়ের পর অন্যান্য সকলের অভিপ্রায় বলে প্রতিপন্ন হয়।
২. একদা একজন ইহুদী খেদমতে নবুবীতে হাজির হয়ে মুসলমানদের লক্ষ্য করে বললো, তোমরা শিরক করছ এই কথা বলে যে, যা আল্লাহ চান এবং যা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম চান। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবীদের লক্ষ্য করে বললেন: তোমরা এভাবে বল যে, তিনি একক অদ্বিতীয়; যা চান, তাই করেন। অত:পর আপনি যা চান। (নাসাঈ: কিতাবুল ঈমান ওয়ানুজুর)
৩. এই ঘটনাটিই ইবনে মাজাহ থেকে এভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে-একদিন একজন সাহাবী স্বপ্নে দেখেছিলেন যে, একজন ইহুদী অথবা খ্রীষ্টান তাঁকে লক্ষ্য করে বলছে, তোমরা মুসলমানরা খুবই উত্তম লোক হতে, যদি তোমরা শিরক না করতে। তোমরা বল, আল্লাহ যা চান এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যা চান। সে সাহাবী রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর খেদমতে হাজির হয়ে নিজের এই স্বপ্নের কথা বর্ণনা করলেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন: আমিও এই ধরনের কথাকে খারাপ বলে জানি। তবে তোমরা এভাবে বল, যা আল্লাহপাক চান এবং অত:পর যা মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চান। (ইবনে মাজাহ: কিতাবুন নুজুর)
৪. আবু দাউদ শরীফে এই ঘটনার প্রেক্ষিত ছাড়াও এভাবে তালিম দেয়া হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবীদের লক্ষ্য করে বললেন, তোমরা এ কথা বলো না যা আল্লাহ চান এবং যা অমুকে চায়। বরং তোমরা এভাবে বল যে, যা আল্লাহ চান, এবং অত:পর যা অমুক ব্যক্তি চায়।
৫. কিন্তু ইমাম বুখারী আদাবুল মুফরাদ ও ইমাম বায়হাকী কিতাবুল আসমা ওয়াস সিফাতে যে সকল বর্ণনা সন্নিবেশ করেছেন, এতে বুঝা যায় যে, আল্লাহর অভিপ্রায়ের সাথে অন্য কারো অভিপ্রায়ের নামও নিতে নেই। এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর পবিত্র খেদমতে হাজির হয়ে কথা প্রসঙ্গে বললো, যা আল্লাহ চান এবং যা আপনি চান। ইরশাদ হলো, তুমি আল্লাহর সাথে সমকক্ষ দাঁড় করেছো, অথচ আল্লাহর প্রতিপক্ষ বলতে কিছুই নেই, তিনি একক ও অদ্বিতীয়। (আবু দাউদ : কিতাবুল আদব)
৬. এ পর্যায়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এতটুকু সচেতনতাও দেখিয়েছেন যে, এমন একটি কাজের অবতারণা করাও ঠিক নয়, যার কর্তা হবেন আল্লাহ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম। এতে করে আল্লাহর ও রাসূলের কর্তব্য ও দরজা কখনো এক বরাবর বলে প্রতীয়মান হবে না। একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর সামনে কোন এক ব্যক্তি বক্তব্য পেশ কালে কথার ফাঁকে বললো, যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং তাঁর রাসূলের আনুগত্য করেছে, সে হেদায়েত লাভ করেছে এবং যে তাদের দুজনের নাফরমানী করেছে… সে এই পর্যন্ত বলার পরই তাকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বারণ করলেন, এবং বললেন, চলে যাও, তুমি হলে একজন নিকৃষ্ট খতীব। (আদাবুল মুফরাদ : ইমাম বুখারী ১৫৭পৃ:, বায়হাকী পৃঃ ১১০, কিতাবুল আসমা ওয়াস সিফাত)
৭. এক্ষেত্রে লক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম অসন্তুষ্টি এজন্য প্রকাশ করেছিলেন যে, আল্লাহ ও রাসূলকে একসাথে উপস্থাপনের ফলে শ্রোতামণ্ডলীর মাঝে এই প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক ছিল যে, আল্লাহর আনুগত্য ও রাসূলের আনুগত্য একই বরাবর। এর মাঝেও শিরকের গন্ধ নিহিত আছে। এজন্য খতীবকে একথা বলা দরকার ছিল… যে আল্লাহ এবং রাসূলের নাফরমানী করবে যা বার বার কুরআনে উল্লেখ করা হয়েছে এবং একই শিক্ষা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রদত্ত বিভিন্ন ভাষণেও পাওয়া যায়।
৮. ধর্ম সম্বন্ধীয় ও শরিয়ত সম্পর্কীয় কোন কথায় যদি এই প্রকার বলা যায় যে, ইহা আল্লাহ এবং তার রাসূল জানেন অথবা এই সম্বন্ধে আল্লাহ ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর আদেশ এই প্রকার, তাতে কোন দোষ নেই। কারণ ধর্ম সম্বন্ধীয় সমস্ত বিষয় আল্লাহতাআলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে জানিয়ে দিয়েছেন, সমস্ত লোককে তাঁর আদেশ অনুসরণ করতে বলেছেন।
