প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ৯ম সংখ্যা, মার্চ ২০১৬, জমা.আউ-জমা.সানী ১৪৩৭ হিজরী, ফাল্গুন-চৈত্র ১৪২২ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়
[ফেব্রুয়ারী সংখ্যার পর ]
পরদিন সকালে আবু তালহা বিষয়টি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অবহিত করলে তিনি বলেন আল্লাহ তোমাদের গত রাতের বরকত দান করুন। সেই রাতেই উম্মু সুলাইম গর্ভবতী হন। গর্ভের এই সন্তান প্রসব করার পর উম্মু সুলাইম তাকে আনাসের হাতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট পাঠান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটু খেজুর চিবিয়ে শিশুর গালে দেন এবং সে মুখ নেড়ে একটু চুষতে থাকে। তাই দেখে তিনি বললেন দেখ, আনসারদের খেজুরের প্রতি স্বভাবগত টান রয়েছে। তিনি এই শিশুর নাম রাখেন আবদুল্লাহ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই পবিত্র লালার বদৌলতে উত্তরকালে এই ছেলে অন্যান্য আনসার নওজোয়ানদের মধ্যে সর্বক্ষেত্রে শ্রেত্ব অর্জন করেন। এই আবদুল্লাহর মাধ্যমে আবু তালহার বংশধারা চলেছে। ইসহাক ও উবাইদুল্লাহ নামে তাঁর ছিল দুই ছেলে, আর ইয়াহইয়া নামে ইসহাকের এক ছেলে। এরা সবাই ছিলেন তাঁদের যুগের অন্যতম হাদীস বিশারদ। (মুসনাদে আহমাদ-৩/২৫৭, তারীখ ইবন আসাকির-৬/৬, বুখারী ও মুসলিমেও বিভিন্নভাবে উপরোক্ত ঘটনা বর্ণিত হয়েছে।)
হযরত আবু তালহার মৃত্যুসন সম্পর্কে মতভেদ আছে। ইমাম নাওয়াবী বলেন তিনি হিজরী ৩২ অথবা ৩৪ সনে ৭০ বছর বয়সে মদীনায় মারা যান। তাঁর মদীনায় মৃত্যুর কথা অধিকাংশ সীরাত বিশেষজ্ঞ বলেছেন। তবে আবু যুরয়া আদ-দিমাশ্কী বলেছেন, তিনি শামে মারা গেছেন। আবার কেউ বলেছেন, তিনি সমুদ্র পথে অভিযানে বেরিয়ে মারা যান। আবু যুরয়া আদ-দিমাশকী থেকে বর্ণিত হয়েছে, আবু তালহা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনতিকালের পর চল্লিশ বছর একাধারে রোযা রেখে জীবন কাটান। এই বর্ণনা উপরে উল্লেখিত মৃত্যুসনের পরিপন্থী। কারণ, তিনি যদি হিজরী ৩২ অথবা ৩৪ সনে মারা যান তাহলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের পর ৪০ বছর রোযা রেখে বাঁচার প্রশ্নই ওঠে না। যাঁরা বলেছেন তিনি মদীনায় মারা গেছেন, তাঁরা একথাও বলেছেন যে, খলীফা হযরত উসমান (রা) তাঁর জানাযার নামায পড়ান। (তাহজীবুল আসমা ওয়াল লুগাত – ১/৪৪৫, ৪৪৬)
বসরাবাসীরা বলেন, তিনি শেষ জীবনে সমুদ্র পথে অভিযানে বেরিয়ে পথিমধ্যে মারা যান। এই মতে তাঁর মৃত্যুসন হিজরী ৫১। বিভিন্ন গ্রন্থে আবু তালহার এই জিহাদে যাওয়ার চমকপ্রদ ঘটনার বিবরণ পাওয়া যায়। একদিন সূরা তাওবাহ তিলাওয়াত করছেন। যখন ইনফিরু খিফাফান ওয়া সিকালান অভিযানে বের হয়ে পড়, ভারি অবস্থায় হোক অথবা হালকা অবস্থায় (আয়াত ৪১)-এ পর্যন্ত পৌঁছেন তখন তাঁর মধ্যে জিহাদের প্রবল উদ্দীপনা সৃষ্টি হয়। তিনি পরিবারের লোকদের বললেন আল্লাহ যুবক – বৃদ্ধ সকালের ওপর জিহাদ ফরয করেছেন। আমি জিহাদে যেতে চাই, তোমরা আমার সফরের ব্যবস্থা কর। একথা দুইবার উচ্চারণ করেন। একেতো বার্দ্ধক্য, তাছাড়া ক্রমাগত সিয়াম পালন করতে করতে তিনি শীর্ণকায় ও দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। পরিবারের লোকেরা বললো আল্লাহ আপনার ওপর রহম করুন! আপনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগের সকল যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন, আবু বকর ও উমারের যুগেও ধারাবাহিকভাবে জিহাদে লিপ্ত থেকেছেন। এখনও আপনার জিহাদের লোভ আছে? আপনি বাড়ীতে থাকুন, আমরা আপনার পক্ষ থেকে জিহাদে বেরিয়ে পড়ছি। শাহাদাতের অদম্য আবেদন যাঁকে ধাক্কাচ্ছে তাঁকে ঠেকাচ্ছে কে? বললেন আমি যা বলছি তা কর। নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাঁর সফরের ব্যবস্থা করা হয়। সত্তুর বছরের এই বৃদ্ধ আল্লাহর নাম নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েন। মুসলিম বাহিনী প্রস্তুত ছিল। অভিযানটি ছিল সাগর পথে। আবু তালহা জাহাজে চড়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন। তীব্র প্রতীক্ষা, কখন শত্রসেনার মুখোমুখি হবেন। এমন সময় তাঁর ডাক এসে যায়। তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
সাগর পথে কোথাও একটু ভূমির চিহ্ন দেখা গেল না। প্রবল বায়ু ও বিক্ষুব্ধ সাগর জাহাজটি অজানা লক্ষ্যের দিকে ঠেলে নিয়ে গেল। এই মুমিন মুজাহিদের লাশ সাত দিন জাহাজের ডেকে পড়ে রইল। অবশেষে একটি অজানা দ্বীপ পাওয়া গেল এবং সেখানেই দাফন করা হলো। এত দিনেও লাশে পচন ধরেনি বা সামান্য বিকৃতি ঘটেনি। (তাবাকাত- ৩/৫০৭, তারীখু ইবন আসাকির – ৬/৭, তারীখুল ইসলাম ওয়া তাবাকাতুল মাশাহীর-২/১২০, উসুদুল গাবা-৫/২৩৫, আনসাবুল আশরাফ-১/২৪২)
হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে আবু তালহা অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করতেন। তাঁর বর্ণিত হাদীস সমূহে বিভিন্ন মাসয়ালা অথবা যুদ্ধ-বিগ্রহের আলোচনা থাকতো। দীর্ঘ দিন তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহচর্য লাভে ধন্য হয়েছেন, অথচ আমলের ফজীলাত বিষয়ক কোন বর্ণনা তাঁর থেকে পাওয়া যায় না। তাঁর বর্ণিত হাদীসের মোট সংখ্যা ৯২টি (বিরানব্বই)। তার মধ্যে বুখারী ও মুসলিম প্রত্যেকে একটি করে হাদীস বর্ণনা করেছেন। আবদুল্লাহ ইবন আববাস ও আনাস ইবন মালিকসহ সাহাবীদের একটি দল এবং বিশিষ্ট তাবেঈদের একটি দলও তাঁর নিকট থেকে হাদীস শুনেছেন ও বর্ণনাও করেছেন। (তাহজীবুল আসমা-১/৪৪৫, তারিখে ইবন আসাকির-৬/৪)
হযরত আবু তালহার একদল ছাত্র ও ভক্ত একবার তাঁর অসুস্থ অবস্থায় দেখতে আসলো। তারা দেখলো, দরজায় একটি ছবিযুক্ত পর্দা টাঙ্গানো। তারা পরম্পর পরস্পরের দিকে তাকাতে লাগলো। একটু সাহস করে যায়িদ ইবন খালিদ বলেই ফেললেন গতকাল তো আপনি ছবি নিষিদ্ধ হওয়া সম্পর্কিত হাদীস বর্ণনা করলেন। তিনি উবাইদুল্লাহ খাওলানীকে বললেন হাঁ, তা করেছিলাম। তবে এ কথাও তো বলেছিলাম, কাপড়ে যে ছবি থাকে তা এর আওতায় পড়বে না। (মুসনাদ – ৪/২৮)
একদিন আবু তালহা আহার করছেন। সাথে উবাই ইবন কাব এবং আনাস ইবন মালিকও আছেন। আহার শেষে আনাস অজুর জন্য পানি চাইলেন। আবু তালহা ও উবাই দুই জনই বললেন গোশত খাওয়ার কারণে হয়তো অজুর কথা মনে হয়েছে? আনাস বললেন জী হ্যাঁ! আবু তালহা বললেন তোমরা তায়্যিবাত – পবিত্র বস্তুসমূহ খেয়ে অজু করছো অথচ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনটি করতেন না। (মুসনাদ-৪/৩)
আবু তালহা একদিন নফল রোযা রেখেছিলেন। ঘটনাক্রমে সেই দিনই বরফ পড়েছিল। তিনি কয়েকটি তুষার খন্ড হাতে নিয়ে খেয়ে ফেলেন। আপনি তো রোযার মধ্যে খাচ্ছেন-লোকেরা এ কথা বললে তিনি মন্তব্য করেন এ একটা বরকত, এর কিছু অর্জন করা উচিত। এ কোন খাদ্যও নয়, পানীয়ও নয়। (মুসনাদ – ৩/২৭৯, তারিখু ইবন আসাকির-৬/১০)
হযরত আবু তালহার মধ্যে কাব্য -প্রীতি ও প্রতিভা ছিল। তিনি কবিতা রচনা করতেন, আবৃত্তিও করতেন। প্রচন্ড যুদ্ধের সময় তিনি গুন গুন করে কবিতার পংক্তি আওড়াতেন। সীরাতের বিভিন্ন গ্রন্থে তাঁর কিছু পংক্তি সংকলিত হয়েছে। (দ্র আল-ইসাবা-৪/১১৩, তারিখু ইবন আসাকির -৬/৭ আল-ইসতীয়াব)
হযরত আবু তালহার চরিত্রের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট হুব্বে রাসূল বা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি গভীর প্রেম ও ভালোবাসা। যুদ্ধের ময়দানে শত্র পক্ষের প্রচন্ড আক্রমণে যখন সাথীরা বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছে তখনও তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জন্য নিজের জীবনকে বাজি রেখে রুখে দাঁড়িয়েছেন। নিজের গোটাদেহ আঁড় করে দিয়ে তাঁকে হিফাজত করেছেন। প্রিয় নবীর গায়ে যেন আঁচড় লাগতে না পারে – এই আশায় তীর – বর্শার আঘাত নিজের বুকে ধারণ করেছেন। তাঁর প্রেমের গভীরতা এর দ্বারাই কিছুটা মাপা যায়। তিনি সাধারণত সকল অভিযানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে থাকতেন এবং দুই জনের উটও প্রায় পাশাপাশি চলতো।
একবার মদীনায় শত্রর আক্রমণের ভীতি ছড়িয়ে পড়ে। হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু তালহার মানদূর নামক ঘোড়াটি চেয়ে নিলেন এবং যে দিক থেকে শত্রর আক্রমণের আশঙ্কা ছিল সেই দিকেই যাত্রা করলেন। আবু তালহাও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে পিছনে পিছনে চললেন। কিন্তু তাঁর পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবার ফিরে আসলেন এবং পথে আবু তালহার সাথে দেখা হয়ে গেল। তিনি আবু তালহাকে বললেন সেখানে কিছু না। তোমার ঘোড়াটি খুব দ্রুতগতি সম্পন্ন।
হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি যে তাঁর গভীর ভালোবাসা ছিল, খুব ছোট ছোট ব্যাপারেও তা প্রকাশ পেত। তাঁর বাড়ীতে কোন জিনিস এলে তার কিছু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাড়ীতেও পাঠিয়ে দিতেন। একবার হযরত আনাস একটি খরগোশ ধরে আনলেন। আবু তালহা খরগোশটি জবেহ করে তার একটি রান নবীগৃহে পাঠিয়ে দিলেন। একবার আবু তালহার স্ত্রী উম্মু সুলাইম এক থালা খেজুর পাঠালেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খেজুরগুলি আযওয়াজে মুতাহ্হারাত ও অন্যান্য সাহাবীদের মধ্যে ভাগ করে দিলেন। (মুসনাদ – ৩/১২৫, ১৭১)
হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শেষ রোগ যন্ত্রণায়- যাতে তিনি ইন্তেকাল করেন, একদিন আবু তালহা গেলেন তাঁকে দেখতে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেন তোমার কাওমকে (আনসার) আমার সালাম বলবে। কারণ, তারা যা বৈধ ও উচিত নয় তা থেকে নিজেদেরকে দূরে রাখে এবং ধৈর্য ধারণ করে। (হায়াতুস সাহাবা – ১/৪০১)
আবু তালহা বলেন আমি একদিন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গেলাম। তখন তাঁর চামড়া ও চেহারায় এমন এক অবস্থা দেখলাম যা এর পূর্বে আর কখনও দেখিনি। ইয়া রাসূলুল্লাহ! এমন অবস্থায় আমি আপনাকে আর কক্ষণও দেখিনি। বললেন আবু তালহা এমন অবস্থা হবে না কেন। এইমাত্র জিবরীল বেরিয়ে গেলেন। তিনি আমার রবের পক্ষ থেকে সুসংবাদ নিয়ে এসেছিলেন। তিনি বলে গেলেন আল্লাহ আমাকে আপনার কাছে এই সুসংবাদ দিয়ে পাঠিয়েছেন যে, আপনার উম্মাতের কেউ আপনার ওপর একবার দরুদ ও সালাম পেশ করলে আল্লাহ ও তাঁর ফিরিশতাগণ তার ওপর দশবার দরূদ ও সালাম পাঠ করবেন। (উসুদুল গাবা-৫/২৩৫) আহমাদ ও নাসাঈ অন্যভাবে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন! তাতে আছে, জিবরীল বললেন, আপনার উম্মাতের মধ্যে যে ব্যক্তি আপনার ওপর দরূদ ও সালাম পাঠ করবে আল্লাহ তার জন্য ১০টি নেকী লিখবেন, তার ১০টি গুনাহ মাফ করবেন এবং তার ১০টি মর্যাদা বৃদ্ধি করবেন। (হায়াতুস সাহাবা-৩/৩১৩)
মদ হারাম হওয়ার পূর্বে একদিন তিনি খেজুর থেকে তৈরী ফাদীখ নামক এক প্রকার মদ পান করছিলেন। এমন সময় এক ব্যক্তি এসে খবর দিল, মদ হারাম ঘোষিত হয়েছে। সাথে সাথে তিনি আনাসকে বললেন মদের এই কলসটি ভেঙ্গে ফেল। আনাস নির্দেশ পালন করলেন। (বুখারী – ২/১০৭)
যখন সূরা আলে ইমরানের এই আয়াত- তোমরা কোন কল্যাণই লাভ করতে পারবে না যতক্ষণ না তোমরা এমন সব জিনিস (আল্লাহর রাস্তায়) খরচ কর যা তোমাদের নিকট সর্বাধিক প্রিয় -নাযিল হলো তখন আনসারদের যার কাছে যে সব মূল্যবান জিনিস ছিল সবই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট নিয়ে গেল এবং আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দিল। আবু তালহা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট উপস্থিত হয়ে তাঁর বীরাহ নামক বিশাল ভূ-সম্পত্তি আল্লাহর রাস্তায় ওয়াক্ফ করে দিলেন। এখানে তাঁর একটি কুয়ো ছিল। কুয়োটির পানি ছিল সুস্বাদু এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর পানি খুব পছন্দ করতেন। আবু তালহার এই দানে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুব খুশী হয়েছিলেন। (শাজারাতুজ জাহাব-১/৪০, তারীখু ইবন আসাকির -৬/৮, হায়াতুস সাহাবা -২/১৫৭)
আবদুল্লাহ ইবন আবী বকর থেকে বর্ণিত। একদিন আবু তালহা তাঁর একটি বাগিচার দেয়ালের পাশে নামাযে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এমন সময় একটি ছোট্ট পাখী- এদিক ওদিক উড়ে বেরোনোর পথ খুঁজতে থাকে; কিন্তু ঘন খেজুর গাছের জন্য বেরোনোর পথ গেল না। আবু তালহা নামাযে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ এই তামাশা দেখলেন। এদিকে নামায কত রাকায়াত পড়েছেন তা আর স্মরণ করতে পারলেন না। ভাবলেন, এই সম্পদই আমাকে ফিতনায় (বিপর্যয়ে) ফেলেছে। নামায শেষ করে তিনি ছুটে গেলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে। ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বললেন ঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! এ সবই আমি সাদাকা (দান) করে দিলাম। এই সম্পদ আপনি আল্লাহর পথে কাজে লাগান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বললেন এই সম্পদ তোমার নিকট আত্মীয়দের মধ্যে বণ্টন করে দাও। নির্দেশমত তিনি যাঁদের মধ্যে বণ্টন করে দেন তাঁদের মধ্যে হাসসান ইবন সাবিত ও উবাই ইবন কাবও ছিলেন। (তারীখু ইবন আসাকির -৬/৮, হায়াতুস সাহাবা -৩/৯৭, মুসনাদে আহমাদ -৩/১৪১)
একবার এক ব্যক্তি মদীনায় এলো, সেখানে থাকা-খাওয়ার কোন সংস্থান তার ছিল না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করলেন, যে এই লোকটিকে অতিথি হিসেবে গ্রহণ করবে আল্লাহ তার ওপর সদয় হবেন। আবু তালহা সাথে সাথে বললেন ঃ আমিই নিয়ে যাচ্ছি। বাড়ীতে ছোট ছেলে-মেয়েদের খাবার ছাড়া অতিরিক্ত কোন খাবার ছিল না। আবু তালহা স্ত্রীকে বললেন এক কাজ কর, তুমি ভুলিয়ে-ভালিয়ে বাচ্চাদের ঘুম পাড়াও। তারপর মেহমানের সামনে খাবার হাজির করে কোন এক ছুতোয় আলো নিভিয়ে দাও। অন্ধকারে আমরা খাওয়ার ভান করে শুধু মুখ নাড়াচাড়া করবো, আর মেহমান একাই পেট ভরে খেয়ে নেবে। যেই কথা সেই কাজ। স্বামী-স্ত্রী মেহমানকে পরিতৃপ্তি সহকারে আহার করালেন; কিন্তু ছেলে-মেয়ে সহ নিজেরা উপোস থাকলেন। সকালে আবু তালহা আসলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট। তিনি তাদের তীব্র প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও তারা অন্যকে নিজেদের ওপর প্রাধান্য দান করে (সূরা হাশর – ৯)
এই আয়াতটি তাঁকে পাঠ করে শোনান। তারপর আবু তালহাকে বলেন, অতিথির সাথে তোমাদের রাতের আচরণ আল্লাহর খুব পছন্দ হয়েছে। (মুসলিম -২/১৯৮, হায়াতুস সাহাবা- ২/১৬০, ১৬১)
নিা ও আন্তরিকতা ছিল আবু তালহার বিশেষ গুণ। খ্যাতি ও প্রদর্শনী থেকে তিনি সব সময় দূরে থাকতেন। বীরাহা সম্পত্তি দান করার সময় তিনি কসম খেয়ে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেন, একথা যদি গোপন রাখতে সক্ষম হতাম তাহলে কক্ষণও প্রকাশ করতাম না। (মুসনাদ -৩/১১৫)
আবু তালহা ছিলেন বলি কণ্ঠস্বরের অধিকারী। আনাস (রা) বলেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন, সৈন্যদের মধ্যে আবু তালহার একটি জোর আওয়ায একদল সৈনিক থেকেও উত্তম। অন্য বর্ণনা মতে এক হাজার মানুষের চেয়েও উত্তম। অন্য একটি বর্ণনায় এসেছে মুশরিকদের জন্য আবু তালহার একটি হুংকার একদল সৈন্যের চেয়েও ভয়ংকর। (তারীখুল ইসলাম ওয়া তাবাকাতুল মাশাহীর -২/১১৯, তাবীখু ইবন আসাকির -৬/৭, উসুদুল গাবা – ৫/২৩৫)
হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আবু তালহার পরিবারের জন্য দুআ করেছেন। (তারীখু ইবন আসাকির -৬/৯) হযরত আনাস (রা) বলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের পর সারা বছরই আবু তালহা রোযা পালন করতেন। শুধু দুই ঈদ ছাড়া কখনও রোযা ত্যাগ করতেন না। কারণ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লামের জীবদ্দশায় সব সময় জিহাদে ব্যস্ত থাকায় তখন রোযা রাখতে পারতেন না। (তাহজীবুল আসমা – ১/২৪৬)
ইবন হাজার আল-ইসাবা গ্রন্থে আবু তালহার সম্মান ও মর্যাদার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন এই বলে, তিনি ছিলেন উঁচু স্তরের মর্যাদাবান সাহাবীদের অন্যতম।
