প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ৯ম সংখ্যা, মার্চ ২০১৬, জমা.আউ-জমা.সানী ১৪৩৭ হিজরী, ফাল্গুন-চৈত্র ১৪২২ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়
অর্ঘ্য
অর্ঘ্য শব্দের সাথে ইসলামী সংস্কৃতির কোন দূরতম সম্পর্ক নেই। অর্ঘ্য হচ্ছে হিন্দু সম্প্রদায়ের পূজার উপকরণ এবং উপকরণ নিবেদনের কায়দা-কানুন। হিন্দু শাস্ত্র মতে, হিন্দুরা যাকে সম্মানিত ব্যক্তি মনে করেন, তাকে বরণ করার জন্য মালা চন্দনাদি দ্বারা বরণের উপাচারসহ অর্ঘ্য নিবেদন করে থাকেন। দেবতার মূর্তিকেও তারা বিভিন্নভাবে অর্ঘ্য নিবেদন করে থাকেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেষ হাসিনাকে কলিকাতার বইমেলার অনুান উপলক্ষে (১৯৯৯ সালের জানুয়ারি মাসে) চন্দনাদি দিয়ে কপালে তিলক এবং সিঁথিতে সিঁদুর দ্বারা হিন্দুরা অর্ঘ্য নিবেদন করেন। হিন্দুদের ধর্মীয় আচার অনুযায়ী যে সম্মান বা পূজা নিবেদন করা হয়, তাই অর্ঘ্য। এক কথায় বলা যায়, Anything offered in homage (to) সেটাই অর্ঘ্য। এবার মুসলমানরা চিন্তা করে দেখুন, আমরা যাকে সম্মান প্রদর্শন করে বরণ করবো, তাকে কি সম্মানের অর্ঘ্য নিবেদন করতে পারি? আমরা আমাদের নিয়মে ইস্তেকবাল করতে পারি, খোশ আমদেদ জানাতে পারি, অভর্থ্যনা করতে পারি। অন্যের পূজার শব্দ কেন আমরা ব্যবহার করবো?
অপ্সরা / অপ্সরী
দেবযোনি বিশেষ, স্বর্গ বারাঙ্গনা, সুরসুন্দরী, সহজ কথায় বলা যায় স্বর্গবেশ্যা (হিন্দু শাস্ত্র মতে)। কোন কোন মুসলিম লেখকের লেখায় সুন্দরীদের অপ্সরা সম্বোধন করতে দেখা যায়। কোন কোন মুসলিম পরিবারে মেয়ের নাম অপ্সরা রাখা হয়। মেয়ের মা-বাবা কি অপ্সরা বা অপ্সরী শব্দের সংজ্ঞা ব্যাখ্যা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হয়েই মেয়ের নাম রাখে কিনা তা জানি না। তারা ঈমান-আক্বিদায় নিাবান হলে নামকরণের আগে ঈমানের দাবির কাছে অবশ্যই আত্মসমর্পণ করতেন, মেয়ের নাম ইসলামী নাম রাখতেন। এই প্রয়োজনীয়তা তাগিদ অনেক মুসলিম পরিবার থেকে বিদায় নিয়েছে।
মুসলিম আক্বিদা মতে, বেহেশতে কোন বেশ্যা নেই, আছে হুর (The Virgins Promised to Muslims in Paradise)। সুতরাং বলা যায়, মুসলিম পরিবারে এ নাম শুধু হিন্দু নামই নয়, এ একদিকে ইসলামী সংস্কৃতি বিরোধী এবং অপরদিকে ঈমান-আক্বিদার সরাসরি লংঘনও বটে। অপ্সরা নামধারণ করে একটি মেয়ে কিভাবে নারী সম্ভ্রমের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে পারে? অতএব এ শব্দ যেমন আমরা লেখায় আনতে পারি না, তেমনি পারি না নামকরণেও।
অ্যাংকেল/অ্যান্টি
অ্যাংকেল-অ্যান্টি সম্পর্কে বিস্তারিত ব্যাখ্যার কোন প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। ব্যাপারটা এখন এমন এক পর্যায়ে এসেছে, যা সমাজ থেকে অপসারণ করা প্রায় অসম্ভব। আমি নিজেও দিনে কয়েক বার এ সম্বোধন শুনি।
এই দুটি সম্বোধন শব্দ ভিন কোন জাতি আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়নি। এ জন্য পশ্চিমা সংস্কৃতির রফতানিকারদের দোষারোপ করা যায় না। আমরাই আধুনিক হওয়ার জন্য যেমন চালচলন, বুলিবচনে ও পোশাক-পরিচ্ছদ পরিবর্তন এনেছি, নতুন নাম ধারণ করছি, তেমনি চাচা-চাচী, মামা-মামী, খালা-খালু, ফুফু-ফুফা সম্বোধন ছেড়ে অ্যাংকেল-অ্যান্টি গ্রহণ করেছি। এ ক্ষেত্রে বিশেষ অবদান রেখেছে আমাদের বিটিভি, রেডিও, সিনেমা, নাটক ইত্যাদি। এ সব মাধ্যমের ভূমিকা মা-বাবা বা আম্মা-আব্বার পরিবর্তে মাম্মী, মাম, ড্যাড, ড্যাডি বহু মুসলিম পরিবারে চালু হয়ে গেছে। আমরা যে অর্থে চাচা-চাচী বা মামা-মামী সম্বোধণ করি, ইংরেজি যাদের মাতৃভাষা তারাও এই অর্থে নিজেদের চাচা-চাচী বা মামা-মামীকে অ্যাংকেল-অ্যান্টি সম্বোধন করে থাকেন। এদিক দিয়ে আমাদের আর তাদের মধ্যে কোন পার্থক্য নেই। লক্ষণীয় দিকটি হচ্ছে এই, আমরা ওদের সম্বোধন-সংস্কৃতি গ্রহণ করলেও ওরা কিন্তু আমাদের সম্বোধন-সংস্কৃতি গ্রহণ করেনি।
ইংল্যান্ড, আমেরিকা এবং ফ্রান্সে যারা ফেরি করে জামা কাপড় বিক্রি করতো (Fawnbroker), ক্রেতারা তাদের অ্যাংকেল বলতো। (Uncle Sam) সম্বোধন করা হয়। অ্যান্ট ও অ্যান্টি একই অর্থবোধক। Aunt ইংরেজদের শব্দ Aunty আমেরিকায় উচ্চারিত শব্দ। Aunty Sally তিরস্কারের ভাবার্থেও ব্যবহার হয়। বাংলাদেশে অ্যাংকেল-অ্যান্টি বাজারী সম্বোধন হয়ে গেছে। সমবয়সীরাও একে অন্যকে তা সম্বোধন করে থাকেন।
যে ব্যক্তি অন্য জাতির সভ্যতা, সংস্কৃতি ও কৃষ্টির অনুসরণ করে, সে ঐ জাতির অন্তর্ভূক্ত হয়ে যায়, এতো শাস্ত্রীয় কথা। যদি আমরা এ অভ্যাস ত্যাগ না করি, তাহলে সম্বোধন ও কৃষ্টিতে আমরা যে অলক্ষ্যে খ্রীষ্টান চরিত্র ধারণ করবো, তাতে কোন সন্দেহ নেই। মুসলিম লেখকদের এ ব্যাপারে সতর্ক হওয়া উচিত। শুধু লেখালেখির বেলায়ই নয়, পারিবারিক অঙ্গনে পারস্পরিক সম্বোধনেও প্রত্যেকেই নিজ নিজ অবস্থানে সতর্ক হওয়া উচিত। অনেকে তাদের মা-বাবা সম্বোধনকে ড্যাডি-মাম্মীর যুপোকাে বলি দিয়েছেন।
যে সব পরিবারে অ্যাংকেল/ অ্যান্টি, ড্যাডি-মাম্মী চালু হয়েছে, সে সব পরিবারের উঠতি বয়সের ঝি-চাকররাও এই রেওয়াজ অনুসরণ করছে। এক পরিবারে গিয়ে দেখলাম, মধ্যম বয়সী এক মহিলা, যাকে আমি চিনি না এবং আর কখনো দেখিনি। ১০/১২ বছরের এক মেয়েকে জিজ্ঞাসা করলাম, ইনি কে? জবাবে বালিকাটি বললো, চিনলেন না? ইনি আমার অ্যান্টি। আবার জিজ্ঞাসা করলাম, সে তো বুঝলাম তোমার অ্যান্টি, তোমার মামী, খালা, ফুফু না চাচী? মেয়েটি বললো, তা আমি জানি না। মা বলেছেন অ্যান্টি বলতে, তাই অ্যান্টি বলি। যা হোক, মেয়েটির মা এসে সম্পর্ক পরিচিতি বলে দিলেন। আর এক বাসায় গিয়ে শুনি একই সম্বোধন। বোন সম্পর্কীয়া এক কিশোরীকে বাসার একটা শিশু বার বার অ্যান্টি বলছে, মা বাধা দিচ্ছেন, কিন্তু শিশু বাধা মানে না। কারণ, এই বাসায় এ সম্বোধন ছাড়া আর কোন সম্বোধনই নেই। তাই শিশু জানে অ্যান্টি, সম্বোধনও করছে তাই। আল্লাহ আমাদের এই কালচার থেকে মুক্তি দিন।
আচার্য/উপাচার্য
ওপার বাংলার বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর এবং ভাইস চ্যান্সেলরকে আচার্য এবং উপাচার্য বলা হয়। তারা অবশ্যই তাদের ধর্ম, সংস্কৃতি ও কৃষ্টি অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলর এবং ভাইস চ্যান্সেলরকে আচার্য-উপাচার্য বলতে পারেন। কিন্তু মুসলমানরাও কি মুসলিম সমাজে তা বলতে পারেন? মুসলমানদের ধর্ম, সংস্কৃতি ও কৃষ্টি অনুযায়ী এ সম্বোধন কি করা যায়? না, আমরা পারি না। পারি না এ জন্য যে, এ সম্বোধন আমাদের সংস্কৃতির সাথে সাংঘর্ষিক। পরিতাপের বিষয়, আমরা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চ্যান্সেলর ও ভাইস চ্যান্সেলরকে এ সম্বোধনই করে আসছি। কারণ একটাই, আর তা হচ্ছে এই, দাদা বাবুরা করেন, ওদের আর তাদের সাংস্কৃতিক উৎস হয়তো এক ও অভিন্ন। সুতরাং একই শব্দ ব্যবহারে বরং উৎসাহ বোধ করবেন। আমরা যারা এই শব্দ ব্যবহারের বিরোধিতা করি, আমাদের তারা প্রশ্ন করেন, তাহলে চ্যান্সেলর এবং ভাইস চ্যান্সেলরের বাংলা তরজমা এমন কি আছে, যা আমরা গ্রহণ করবো ? আমাকে এ প্রশ্ন করেছিলেন একজন পাঠক। আমি উত্তরে লিখেছিলাম, কেন আপনি তরজমার জন্য এত পেরেশান ? তরজমা ছাড়াই তো অনেক কিছু গ্রহণ করে নিয়েছেন। এ ক্ষেত্রেও বিনা তরজমায় অরিজিন শব্দ গ্রহণ করলে দোষ কি? যেমন কুরমা, কালিয়া, পোলাও, রেজালা, বুরহানি, রোস্ট, জর্দা, ফিরণী, পায়াশ, নেহারি, হালিম খাচ্ছেন। একটি আইটেমও তরজমা করে খান না। কোট, প্যান্ট, পাজামা, পাঞ্জাবি পরিধানেও তরজমার প্রয়োজন বোধ করেন না। চেয়ার, টেবিল, কাগজ, কলম ব্যবহারেও দরকার পড়ে না তরজমার। শুধু এ শব্দগুলোই নয়, এমন হাজার হাজার শব্দ ব্যবহার করছেন তরজমা ছাড়া, আমাদের ভাষার সাথে এগুলো একাকার হয়ে গেছে। এসব যদি তরজমা ছাড়া চলে, তাহলে চ্যান্সেলর আর ভাইস চ্যান্সেলর ব্যবহার কেন চলবে না? নিজের নামই তো তরজমা ছাড়া ব্যবহার করছেন। নিজের নাম নূরুল ইসলাম অর্থাৎ ইসলামের আলো বা নূর। আপনার পত্রে তো আপনার নাম তরজমা ছাড়াই দেখলাম। একই ফর্মুলায় চ্যান্সেলর/ভাইস চ্যান্সেলর থাকনা। বিদেশে মানুষ আচার্য চিনে না, চিনে চ্যান্সেলর।
আমার এ পত্রের কোন জবাব ঐ পাঠক থেকে পাইনি। প্রকৃত কথা হচ্ছে নতুন শব্দ ব্যবহারে আপত্তি তো থাকার কথা নয়, আপত্তির কারণ তখনই সৃষ্টি হয়, যদি শব্দের ব্যবহার আমাকে স্বকীয় সংস্কৃতি থেকে দূরে সরাতে চায়, আমার ঈমান-আক্বিদাকে আঘাত করে, তাহলে তা আমি গ্রহণ করতে পারি না।
আচার্য শব্দের অর্থ দৈবজ্ঞ ব্রাহ্মণ, গ্রহবিপ্র, বৈদাধ্যাপক, শিক্ষাগুরু। বৈদিক যুগে হিন্দু ধর্ম-শাস্ত্রভিত্তিক শিক্ষালয়ের শিক্ষকদের আচার্য বলা হতো। তারা বৈদিক ধর্ম শিক্ষা দিতেন। অন্য এক তথ্যে জানা যায়, যিনি যে কোন শাস্ত্রে জ্ঞান লাভ করে অনুরূপ আচরণ করতেন, তাকেও সে আচরণের আচার্য বলা হতো। এই আচরণের মধ্যে শাস্ত্রীয় (বৈদিক শাস্ত্র) শিক্ষাদানই প্রধান। হিন্দুদের শিক্ষা গুরুর পদ বা আসনের নামই আচার্যের আসন। যিনি শিষ্যকে বা শিষ্যদের বেদ পড়াতেন, তিনি আচার্য হিসেবে পরিচিত হতেন। হিন্দুদের পূজা-পার্বনের মূল আসনে বসে যিনি পূজা-পার্বন সম্পন্ন করেন, তিনিও আচার্য। তার স্ত্রী আচার্যা বা আচার্যানী।
এবার চিন্তা করে দেখুন তো, আচার্য/উপাচার্য পদ পদবী বা সম্বোধন মুসলমানের কাছে গ্রহণযোগ্য কিনা? যার মধ্যে ঈমানের কণামাত্র অবশিষ্ট আছে এবং স্বকীয় সংস্কৃতির প্রতি কিছুটাও ভালোবাসা আছে, তিনি কি পারেন পর ধর্মের ধর্মীয় পদকে বরণ করে নিতে? ওরা ভাষার জাল ফেলে সংস্কৃতির বড়শী দিয়ে আমাদের বিদ্ধ করে আচার্য সংস্কৃতিতে দীক্ষা নিতে বাধ্য করেছে, আর আমরাও দীক্ষা নিয়ে যেন নিজেদের ধন্য করছি। তরুণ নওজোয়ান মুসলমানরাই পারেন এই অপসংস্কৃতির শিকড় উৎপাটন করে এ দেশের মুসলমানদের ঈমান হেফাজত করতে। চ্যান্সেলর/ভাইস চ্যান্সেলর শব্দের মধ্যে অপসংস্কৃতির দুর্গন্ধ বা গন্ধ কোনটাই নেই, কিন্তু আচার্য/উপাচার্য শব্দের বাহিরে-ভিতরে অপসংস্কৃতির রক্ত-মাংস এর উৎকট দুর্গন্ধ রয়েছে।
