প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ৪র্থ সংখ্যা,অক্টোবর ২০১৬, জিলহজ-মুহাররম ১৪৩৭-৩৮ হিজরী,আশ্বিন-কার্তিক ১৪২৩ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

[চলমান]
হযরত -উমারের খিলাফতকালে শামের ওয়ালী ওয়াযীদ ইবন আবী সুফইয়ান খলীফাকে লিখলেন কিছু কুরআনের মুয়াল্লিম পাঠানোর জন্য। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে যারা কুরআন সংগ্রহ করেছিলেন এমন পাঁচ ব্যক্তিকে খলিফা ডাকলেন। তারা হলেনঃ মুয়াজ ইবন জাবাল, উবাদা ইবনুস সামিত, আবু আউইব আল-আনসারী, উবাই ইবন কাব ও আবুদ দারদা। খলীফা তাদেরকে বললেনঃ শামবাসী ভাইয়েরা এমন কিছু লোক পাঠানোর অনুরোধ করেছে যারা তাদেরকে কুরআনের তালীম ও দ্বীনের তারবিয়াত দান করবেন। এ ব্যাপারে আপনাদের পাঁচ জনের যে কোন তিনজন আমাকে সাহায্য করুন। আপনারা ইচ্ছা করলে লটারীর মাধ্যমেও তিন জনের নাম নির্বাচন করতে পারেন। অন্যথায় আমিই তিনজনকে বেছে নিব। তারা বললেনঃ লটারী কেন? আবু আইউব একজন বৃদ্ধ মানুষ, আর উবাইতো অসুস্থ। বাকী থাকলাম আমরা তিনজন। উমার (রা.) তাদেরকে হিমস, দিমাশ্ক ও ফিলিস্তিনে যাওয়ার নির্দেশ দিলেন। মুয়াজ গেলেন ফিলিস্তিনে। (সুওয়ারুম মিন হায়াতিস সাহাবা-৭/১৩২-১৩৪)

বিভিন্ন ঘটনা দ্বারা একথা স্পষ্ট বুঝা যায় যে, প্রথম খলীফা আবু বকরের (রা.) যুগেই হযরত ময়াজ গুরুত্বপূর্ণ র্রাীয় দায়িত্ব পালনের জন্য শামে চলে যান। হযরত -উমার (রা.) যখন খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণ করেন তখন তিনি সিরিয়ার এক ফ্রন্টে যুদ্ধরত। সেখান থেকে তিনি ও আবু উবাইদা সমতা ও ন্যায় বিচারের উপদেশ দান করে খলীফাকে একটি পত্র লেখেন। (হায়াতুস সাহাবা-২/১৩১০) খলীফা -উমারের খিলাফতকালে ইসলামী বিজয়ের প্রবল প্লাবন শামের ওপর দিয়েই বয়ে চলে। হযরত মুয়াজও একজন সৈনিক হিসাবে রণক্ষেত্রে চরম বীরত্ব ও সাহসিকতা প্রকাশ করেন।

হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের ফলে হযরত মুয়াজের মধ্যে বিচিত্রমুখী প্রতিভার বিকাশ ঘটে। তার মধ্যে দেখা দেয় বহুবিধ যোগ্যতা। তিনি হন একাধারে শরীয়াতের মুফতী, মজলিসে শূরার সদস্য, কুরআন ও হাদীসের শিক্ষক, প্রদেশের ওয়ালী, দূত, সাহসী সেনাপতি, বিজয়ী যোদ্ধা ও যাকাত উসূলকারী ইত্যাদি।

দৌত্যগিরির দায়িত্ব যখন তার ওপর অর্পিত হলো তিনি অতি দক্ষতার সাথে তা পালন করলেন। শামের ফাহল নামক স্থানে যুদ্ধ প্রস্তুতি চলছিল, এমন সময় প্রতিপক্ষ রোমান বাহিনী সন্ধির প্রস্তাব দিল। সেনাপতি আবু উবাইদা আলোচনার জন্য মুয়াজকে নির্বাচন করলেন। মুয়াজ চললেন রোমান সেনা ছাউনীতে। সেখানে পৌঁছে তিনি দেখলেন, দরবার অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে সাজানো হয়েছে। একটি তাঁবু খাটানো হয়েছে যার অভ্যন্তরে সোনালী কারুকাজ করা গালিচা বিছানো। হযরত মুয়াজ ভিতরে না ঢুকে থমকে বাইরে দাঁড়িয়ে গেলেন। একজন খ্রিস্টান সৈনিক এগিয়ে এসে বললোঃ আমি ঘোড়াটি ধরছি, আপনি ভিতরে যান। মুয়াজ বললেনঃ আমি এমন শয্যায় বসিনা যা দরিদ্র লোকদের বঞ্চিত করে তৈরি করা হয়েছে। একথা বলে তিনি মাটির ওপর বসে পড়লেন। খ্রিস্টানরা দুঃখ প্রকাশ করে বললোঃ আমরা আপনাকে সম্মান করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু আপনি তা অবহেলা করলেন। হযরত মুয়াজ হাঁটুতে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে বললেনঃ আমার এমন সম্মানের প্রয়োজন নেই। যদি মাটিতে বসা দাসদের অভ্যাস হয় তা হলে আমার চেয়ে আল্লাহর বড় দাস আর কে আছে? রোমানরা হযরত মুয়াজের এমন স্বাধীন ও বেপরোয়া আচরণে হতবাক হয়ে গেল। এমনকি তাদের একজন জিজ্ঞেস করেই বসলো, মুসলমানদের মধ্যে আপনার চেয়েও বড় কেউ কি আছে? তিনি জবাব দিলেনঃ মায়াজ আল্লাহ! (আল্লাহর পানাহ্ চাই) আমি হচ্ছি তাদের এক নিকৃতম ব্যক্তি।- লোকটি চুপ হয়ে গেল।
হযরত মুয়াজ কিছুক্ষণ পর দোভাষীকে বললেন; রোমানদের বল, তারা কোন বিষয়ে আলোচনা করতে চাইলে আমরা বসবো, নইলে চলে যাব। আলোচনা শুরু হলো। রোমানরা বললঃ

আমাদের দেশ আক্রমণ করা হয়েছে কেন? অথচ হাবশা আরবের অতি নিকটে, পারস্যের সম্রাট মারা গেছেন এবং সাম্রাজ্যের কর্তৃত্ব এক মহিলার হাতে। আপনারা এ সকল দেশ ছেড়ে আমাদের দিকে ধাবিত হলেন কেন? অন্যদিকে আমাদের সম্রাট দুনিয়ার সকল সম্রাটদের সম্রাট এবং সংখ্যায় আমরা আসমানের তারকারাজি ও দুনিয়ার বালুকারাশির সমান।

মুয়াজ বললেন আমরা তোমাদেরকে যা বলতে চাই তার সারকথা হলো, তোমরা ইসলাম কবুল করে আমাদের কিবলার দিকে নামায আদায় কর, মদ পান ছেড়ে দাও, শুকরের মাংস পরিহার কর। তোমরা যদি এইসব কাজ কর তাহলে আমরা তোমাদের ভাই। আর যদি একান্তই ইসলাম গ্রহণ করতে না চাও তাহলে জিযিয়া দাও। তাও যদি না মান তাহলে যুদ্ধের ঘোষণা দিচ্ছি। যদি আসমানের তারকারাজি ও যমীনের বালুকারাশির পরিমাণ তোমদের সংখ্যা হয় তাতেও আমাদের বিন্দুমাত্র পরোয়া নেই।
আর হ্যাঁ, তোমাদের এ জন্য গর্ব যে, তোমাদের শাহানশাহ্ তোমাদের জান-মালের মালিক মুখতার। কিন্তু আমরা যাকে বাদশাহ বানিয়েছি কোন ক্ষেত্রেই তিনি নিজেকে আমাদের ওপর প্রাধান্য দিতে পারেন না। তিনি ব্যভিচার করলে তাকে দুররা লাগানো হবে, চুরি করলে হাত কাটা হবে। তিনি গোপনে বসেন না, নিজেকে আমাদের চেয়ে বড় মনে করেন না। ধন-সম্পদেও আমাদের ওপর তার শ্রেষ্ঠত্ব নেই।

রোমানরা মনোযোগ সহকারে তার কথা শুনলো। তার মুখে ইসলামী শিক্ষা ও সাম্যের কথা শুনে তারা হতবাক হয়ে গেল। তারা প্রস্তাব দিলঃ আমরা আপনাদেরকে বালকাএর সম্পূর্ণ এলাকা এবং দুন–এর যে অংশ আপনাদের অঞ্চলের সাথে মিশেছে, ছেড়ে দিচ্ছি। আপনারা আমাদের এই দেশ ছেড়ে পারস্যের দিকে চলে যান।-

এটা কোন কেনা-বেচার বিষয় ছিল না। তাই হযরত মুয়াজ নেতিবাচক জবাব দিয়ে সেখান থেকে উঠে আসেন। (সীয়ারে আনসার-২/১৬৯-১৭১) যুদ্ধ প্রস্তুতি শুরু হলো। এ যুদ্ধে তিনি এক গুরুত্বপূর্ণ পদ লাভ করেন। হযরত আবু উবাইদা তাকে মায়মানা- (দক্ষিণ ভাগ)-এর কমান্ডিং অফিসার নিয়োগ করেন।

হিজরী ১৫ সনে ইয়ারমুকের যুদ্ধ হয়। খুবই ভয়াবহ যুদ্ধ। এ যুদ্ধেও তাকে মায়মানার দায়িত্ব দেওয়া হয়। শত্রুপক্ষের আক্রমণ এত তীব্র ছিল যে মুসলমানদের মায়মানা মূল বাহিনী থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এ অবস্থায় হযরত মুয়াজ অত্যন্ত দৃঢ়তা ও স্থির চিত্ততার পরিচয় দেন। তিনি ঘোড়ার পিঠ থেকে লাফিয়ে পড়ে হুংকার দিয়ে বলেনঃ আমি পায়ে হেঁটে লড়বো। কোন সাহসী বীর যদি ঘোড়ার হক আদায় করতে পারে, সে এই ঘোড়া নিতে পারে। রণক্ষেত্রে তার পুত্রও ছিলেন। তিনি চিৎকার করে বলে ওঠেন, আমিই এ ঘোড়ার হক আদায় করবো। তারপর বাপবেটা দুজন রোমান বাহিনীর ব্যুহ ভেদ করে ভিতরে ঢুকে যান এবং এমন সাহসকিতার সাথে যুদ্ধ করেন যে, বিক্ষিপ্ত মুসলিম বাহিনী আবার দৃঢ় অবস্থান ফিরে পায়।

হযরত ফারুকে আজমের খিলাফতকালে সিরিয়ায় যুদ্ধরত গোটা মুসলিম বাহিনীর অধিনায়ক ছিলেন হযরত আবু উবাইদা। হিজরী ১৮ সনে সিরিয়ায় মহামারি আকারে প্লেগ বা তাউন দেখা দেয়। ইতিহাসে এই মহামারি আমওয়াসের তাউন নামে প্রসিদ্ধ। আমওয়াস হচ্ছে রামলা ও বাইতুল মাকদাসের মধ্যবর্তী একটি গ্রামের নাম। সেনাপতি হযরত আবু উবাইদা সহ বহু মুসলিম সৈনিক এই মহামারিতে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। হযরত আবু -উবাইদার মৃত্যুর পূর্বে হযরত মুয়াজকে নিজের স্থলাভিষিক্ত করে যান। হযরত মুয়াজ আবু উবাইদার জানাযার নামায পড়ান এবং অন্যদের সাথে কবরে নেমে তাকে কবরে শায়িত করেন। এ সময় তিনি সকলের উদ্দেশ্যে এক হৃদয়গ্রাহী ভাষণ দেন। আবু উবাইদার ইনতিকালের পর তিনি কিছু দিনের জন্য সেনাপতির দায়িত্ব পালন করেন। (হায়াতুস সাহাবা-১/৪৮, আল-ইসতীয়াব; আল ইসাবা-৪/৩৫৭, ৩৫৯)

মহামারি মারাত্মক আকারে ছড়িয়ে পড়লে মানুষ ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। হযরত আমর ইবনুল আস বললেন আমাদের উচিত এ স্থান ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যাওয়া। এ রোগ নয়, এ যেন আগুন। তার এ কথায় হযরত মুয়াজ দারুণ অসুন্তুষ্ট হলেন। তিনি সকলকে সম্বোধন করে একটি ভাষণ দেন। ভাষণের মধ্যে তিনি আমরের নিন্দাও করেন। তারপর বলেন, এই মহামারি আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন বালা-মুসীবত নয়; বরং তার রহমত ও নবীর দুআ। আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছিলাম, মুসলমানরা শামে হিজরাত করবে। শাম ইসলামী পতাকাতলে আসবে। সেখানে একটি রোগ দেখা দেবে যা ফোঁড়ার মত হয়ে শরীরে ক্ষতের সৃষ্টি করবে। কেউ তাতে মারা গেলে শহীদ হবে। তার সকল-আমল পাক হয়ে যাবে। হে আল্লাহ, যদি আমি একথা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখ থেকে শুনে থাকি তাহলে এই রহমত আমার ঘরেও পাঠাও এবং আমাকেও তার যথেষ্ট অংশ দান কর।- (উসুদুল গাবা-৪/৩৭৭, হায়াতুস সাহাবা-২/৫৮১, ৫৮২)

ভাষণ শেষ করে তিনি পুত্র আবদুর রহমানের নিকট গেলেন। তখন তার দুআ কবুল হয়ে গেছে। দেখেন, পুত্র রোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েছে। পুত্র পিতাকে দেখে কুরআনের এ আয়াতটি তিলাওয়াত করলেনঃ আল-হাক্কু মির রাব্বিকা ফালা তাকুনান্না মিনাল মুমতারীন- এই মৃত্যু যা সত্য, আল্লাহর পক্ষ থেকেই আসে। সুতরাং কক্ষণও আপনি সন্দেহ পোষণকারীদের মধ্যে হবে না। যেমন পুত্র তেমনই পিতা। পিতা জবাব দিলেনঃ সাতাজিদুনী ইনশা আল্লাহু মিনাস সাবিরীন– ইনশাআল্লাহ তুমি আমাকে ধৈর্যশীলদের মধ্যেই পাবে। হযরত আবদুর রহমান মারা গেলেন। পুত্রের মৃত্যুর পূর্বেই তার দুই স্ত্রীও একই রোগে মারা যান। এখন হযরত মুয়াজ একাকী। নির্দিষ্ট সময়ে তিনিও আল্লাহর এই রহমাতের অংশীদার হন। তার ডান হাতের শাহাদাত আংগুলে একটি ফোঁড়া বের হয়। তিন অত্যন্ত খুশী ছিলেন। বলছিলেন, দুনিয়ার সকল সম্পদ এবং তুলনায় মূল্যহীন। প্রচণ্ড ব্যথায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলছিলেন। যখনই চেতনা ফিরে পাচ্ছিলেন, বলছিলেন, হে আল্লাহ! তুমি আমাকে আমার ব্যথায় ব্যথিত কর। আমি যে তোমাকে কত ভালোবাসি তা তুমি ভালোই জান।

হযরত মুয়াজ যে রাতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন খুব অস্থিরভাবে সেই রাতটি কাটান। বার বার শুধু জিজ্ঞেস করেনঃ দেখতো সকাল হলো কিনা ? লোকেরা জবাব দেনঃ এখনও হয়নি। যখন বলা হলো, হ্যাঁ, সকাল হয়েছে, তিনি বললেনঃ এমন রাত থেকে আল্লাহর পানাহ চাই যার প্রভাত জাহান্নামের দিকে নিয়ে যায়। স্বাগতম মৃত্যু, স্বাগতম! তুমি সেই বন্ধুর কাছে এসেছ যে একেবারে রিক্ত ও নিঃস্ব। ইয়া ইলাহী, আমি তোমাকে কতটুকু ভালোবাসি তা তুমি জান। আজ তোমার কাছে আমার বড় আশা। আমি কখনও দুনিয়া এবং দীর্ঘ জীবন এই জন্য কামনা করিনি যে তা বৃক্ষ রোপণ ও নদী খননে ব্যয় করবো; বরং যদি কামনা করে থাকি তবে তা এ জন্য যাতে প্রচণ্ড গরমে মানুষের তৃষ্ণা নিবারণ করতে পারি, উদারতা ও দানশীলতার প্রসার ঘটাতে এবং জিকিরের মজলিসসমূহে আলেমদের সাথে বসতে পারি। (হায়াতুস সাহাবা-৩/১৬২, তাহজীব আল আসমা-১/৩০) শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের পূর্বে তিনি কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। লোকেরা সান্ত্বনা দিয়ে বলেঃ আপনি রাসূলূল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবী, উঁচু মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ব্যক্তি, আপনি কাঁদছেন কেন? তিনি বললেনঃ আমার না আছে মরণ ভয়, আর না আছে দুনিয়া ছেড়ে যাওয়ার দুঃখ। তবে তাঁর দুইটি মুষ্টি আছে আমার জানা নেই আমি তাঁর কোন মুষ্টি থাকবো। এই ভয়েই আমি কাঁদছি। এই অবস্থায় তার পবিত্র রূহ দেহ থেকে বেরিয়ে যায়। (উসুদুল গাবা-৪/৩৭৮, সীয়ারে আনসার-২/১৭৪, ১৭৫)

হযরত মুয়াজের মৃত্যুসন এবং মৃত্যুর সময় বয়স সম্পর্কে বিস্তর মতভেদ আছে। তবে সর্বাধিক প্রসিদ্ধ মতে হিজরী ১৮ অথবা ১৯ সনে ৩৯ বছর বয়সে বাইতুল মাকদাস ও দিমাশকের মধ্যবর্তী এবং জর্দান নদীর তীরবর্তী বীসান- নামক স্থানে মারা যান। এরই নিকটবর্তী একটি স্থান যেখান থেকে আল্লাহ তাআলা হযরত ঈসাকে (আ.) আসমানে উঠিয়ে নেন, সেখানেই তাকে দাফন করা হয়। (আল-আ-লাম-৮/১৬৬, উসুদুল গাবা-৪/৩৭৮, তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ-১)

হযরত মুয়াজের গায়ের রং ছিল সাদা, চেহারা উজ্জ্বল, দৈহিক কাঠামো দীর্ঘাকৃতির, চোখ কালো ওবড়, চুল খুব ঘন এবং সামনের দাঁত ধবধবে সাদা। কথা বলার সময় যেন মুক্তা ঝরতো। কণ্ঠস্বর ছিল খুবই মিষ্টি মধুর। দৈহিক সৌন্দর্যের দিক দিয়ে ছিলেন সাহাবা সমাজের মধ্যমণি। জাবির ইবন আবদিল্লাহ (রা.) বলেন মুয়াজ ছিলেন সবার চেয়ে সুন্দর সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী এবং সর্বাধিক দানশীল ব্যক্তি। আবু নুঈম বলেনঃ বিচক্ষণতা, লজ্জাশীলতা, ও বদান্যতার দিক দিয়ে তিনি ছিলেন আনসারদের সর্বোত্তম যুবক। ওয়াকিদী বলেনঃ তিনি ছিলেন সুন্দরতম পুরুষ। (আল-ইসাবা-৪/৪২৭, তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৯, উসুদুল গাবা-৪/৩৭৭)

হযরত মুয়াজ ৩৮ বছর বয়সে মারা যান। আল-মাদায়িনী, ওয়াকিদী প্রমুখ ঐতিহাসিক বলেছেন, তার কোন সন্তানাদি হয়নি। তবে বিশ্বস্ত বর্ণনা সমূহে জানা যায় তার এক পুত্র, মতান্তরে দুই পুত্র ছিল। তাদের একজনের নাম আবদুর রহমান এবং অন্যজনের নাম জানা যায় না। এই আবদুর রহমান ইয়ারমুক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন এবং হিজরী ১৮ সনে আমওয়াসের- মহামারিতে পিতার আগে মারা যান। (আল-ইসতী-যাব; আল-ইসাবা-৪/৩৫৬)

কুরআন, হাদীস ও ফিকাহ শাস্ত্রে হযরত মুয়াজ ছিলেন একজন বিশেষজ্ঞ। আবদুল্লাহ ইবন আমর ইনুল আস থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে জানা যায়, সাহাবাদের মধ্যে যে চারজনের নিকট থেকে কুরআন গ্রহণের জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ দিয়েছেন, মুয়াজ তাদের অন্যতম। আবদুল্লাহ ইবন উমার থেকেও এ ধরনের একটি বর্ণনা আছে। এর কারণ হলো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় তিনি কুরআন হিফজ করেছিলেন। খাযরাজীরা বলতোঃ আমাদের চার ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে কুরআন সংগ্রহ করেছে যা অন্যরা করেনি। তাদের একজন মুয়াজ। (আনসাবুল আশরাফ-১/২৬৪, হায়াতুল সাহাবা-১/৩৯৫)

হাদীস বর্ণনার ব্যাপরে তিনি ছিলেন খুবই সতর্ক। তাছাড়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগ থেকে আমরণ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বসমূহ পালনের জন্য সব সময় মদীনা থেকে দূরে ছিলেন। এ কারণে তার বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। তবে জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হাদীস বর্ণনার ধারাবাহিকতা তিনি চালু রাখেন। প্লেগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু শয্যায়ও এ মহান দায়িত্ব পালন করে গেছেন। (মুসনাদ-৫/২৩৩)

শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের পূর্বে জাবির ইবন -আবদিল্লাহ (রা.) ও আরও কিছু লোক তার পাশে ছিলেন। অন্তিম সময় ঘনিয়ে এলে তিনি বললেন, আমি এমন একটি হাদীস বর্ণনা করবো যা আজ পর্যন্ত এই জন্য গোপন রেখেছিলাম যে তা শুনলে মানুষ হয়তো -আমল ছেড়ে দিবে। তারপর তিনি হাদীসটি বর্ণনা করেন। (মুসনাদ-৫/৩৩৬)

হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবীদের মধ্যে হযরত মুয়াজের নামটি তৃতীয় তবকায় গণনা করা হয়। তাঁর বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা ১৫৭টি। তার মধ্যে দুইটি মুত্তাফাক আলাইহি, তিনটি বুখারী ও একটি মুসলিম এককভাবে বর্ণনা করেছেন। (আল-আ-লাম-৮/১৬৬, তাহজীবুল আসমা-২/৯৮)

হাদীস শাস্ত্রে তার ছাত্রদের সংখ্যা অনেক। উঁচু মর্যাদার সাহাবীদের বড় একটি দল তার সূত্রে হাদীস বর্ণনা করেছেন। যেমনঃ -উমার, আবু কাতাদাহ আল-আনসারী, আবু মূসা আল-আশয়ারী, জাবির ইবন আবদিল্লাহ, আবদুল্লাহ ইবন আব্বাস, আবদুল্লাহ ইবন -উমার, আবদুল্লাহ ইবন -আমর ইবনুল -আস, আনাস ইবন মালিক, আবু উমামা আল-বাহিনী, আবু লায়লা আল-আনসারী, আবু তুফাইল ও আরও অনেকে। (আল-ইসাবা-৪/৪২৭, তাহজীবুল আসমা-২/৯৮)

বিশি তাবেঈ ছাত্রদের মধ্যে ইবন -আলী, ইবন আবী-আউফা আল-আশয়ারী, আবদুর রহমান ইবন সুমরা লা-বাসী, জাবির ইবন আনাস, আবু সা-লাবা খুশানী, জাবির ইবন সুমরা, মালিক ইবন নীহামীর, আবদুর রহমান ইবন গানাম, আবু মুসলিম খাওলানী, আবদুল্লাহ ইবন সানাবিহী, আবু ওয়ায়িল, মানরূক, জুনাদাহ ইবন আবী উমাইয়্যা, আবু ইদরীস খাওয়ানী, আসলাম মাওলা -উমার, আসওয়াদ ইবন হিলাল, আসওয়াদ ইবন ইয়াযীদ প্রমুখ সর্বাধিক খ্যাতি সম্পন্ন। (উসুদুল গাবা-৪/৩৭৮, তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৯)

রাসূলুল্লাহর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবন কালেই হযরত মুয়াজ শ্রেষ্ঠ ফকীহদের মধ্যে পরিগণিত হন। খোদ রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ফকীহ হওয়ার সাক্ষ্য দিয়েছেন, এর চেয়ে বড় সম্মান আর কী হতে পারে? তিনি বলেছেনঃ আ-সলামুহুম বিল হালালি ওয়াল হারামি মুয়াজ ইবন জাবাল তাদের মধ্যে মুয়াজ ইবন জাবাল হালাল ও হারামের সবচেয়ে বড় আলিম। (তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৯) কা-ব ইবন মালিক বলেনঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও আবু বকরের (রা.) যুগে তিনি মদীনায় ফাতওয়া দিতেন। (হায়তুস সাহাবা-১/৪৫২) ইবনুল আসীর বলেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবদ্দশায় মুহাজিরদের মধ্যে -উমার, উসমান, আলী এবং আনসারদের মধ্যে মুয়াজ, উবাই ইবন কাব ও যায়িদ ইবন সাবিত ফাতওয়া দিতেন। (উসুদুলগাবা-৪/৩৭৭, তাবাকাত-২/৩৫০)

হযরত উমার (রা.) একবার মুয়াজ সম্পর্কে বলেনঃ লাওলা মুয়াজ লাহালাকা উমার-মুয়াজ না থাকলে উমার বিনাশ হতো।- এই মন্তব্য দ্বারা তার ইজতিহাদী যোগ্যতা ও গবেষণা শক্তি সম্পর্কে ধারণা লাভ করা যায়। এছাড়া বিভিন্ন সময় হযরত -উমার তার ফকীহ ও মুজহাদি হওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি জাবিয়ায় প্রদত্ত খুতবায় বলেনঃ কেউ ফিকাহ শিখতে চাইলে সে যেন মুয়াজের কাছে যায়। (তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/২০)

প্রশ্ন হতে পারে এই বিশাল জ্ঞান তিনি কিভাবে অর্জন করলেন? উত্তরে বলা যায় তার স্বভাবগত আগ্রহ ও তীক্ষè মেধার বলে তিনি এ যোগ্যতা অর্জন করেন। তাছাড়া এমন প্রতিভাবান ছাত্রের প্রতি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিশেষ যত্নে ও মনোযোগ দানও এর কারণ। হযরত মুয়াজ অধিকাংশ সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আশেপাশে হাজির থাকতেন। তাছাড়া রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রত্যেকটি মজলিস ছিল শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের এক একটি বৈঠক। তিনি সব সময় এই মজলিসের সুযোগ গ্রহণ করতেন।

হযরত মুয়াজ সুযোগ পেলেই রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে একাকী থাকতেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই একাকীত্বের সুযোগে তাকে বিভিন্ন বিষয় শিক্ষা দিতেন। কখনও কোন মাসয়ালা জানার প্রয়োজন হলে তখনই তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খিদমতে হাজির হতেন। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে না পেলে বহু দূর পর্যন্ত খোঁজাখুঁজি করতেন। একবার তিনি গেলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গৃহে। যেয়ে শুনলেন তিনি কোথাও বেরিয়ে গেছেন। তিনি মানুষের কাছে কথা জিজ্ঞেস করতে করতে এগুতে লাগলেন। এক সময় দেখলেন তিনি নামাযে দাঁড়িয়ে আছেন। মুয়াজও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পিছনে দাঁড়িয়ে গেলেন। দীর্ঘ নামায আদায় করলেন। নামায শেষে মুয়াজ বললেনঃ আপনি আজ দীর্ঘ নামায আদায় করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ এটা ছিল আশা ও ভীতির নামায। আমি আল্লাহর কাছে তিনটি জিনিস চেয়েছিলাম। দুইটি দেওয়া হয়েছে এবং একটি দেওয়া হয়নি। তারপর তিনি সেই তিনটি প্রার্থনার কথা মুয়াজকে বলেন। (মুসনাদ-৫/২৪০)

হযরত মুয়াজ সব সময় সুযোগের সন্ধানে থাকতেন। সুযোগ পেলেই তিনি জানার জন্য রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট প্রশ্ন করতেন। তবে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মেযাজ ও মর্জির প্রতি সর্বদা সতর্ক দৃষ্টি রাখতেন। তাবুক যুদ্ধের পূর্বে লোকেরা সূর্যোদয়ের সময় বাহনের পিঠে ঘুমাচ্ছিল এবং উটগুলো এদিক সেদিক চরছিল। হযরত মু-যাজ এমন একটি সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইলেন না। তিনি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট গেলেন। তিনি তখন ঘুমিয়ে এবং উটটিও চরছে। মুয়াজের উটটি হোঁচট খেলো এবং তিনি লাগাম ধরে টান দিলেন। উটটি আরও ক্ষেপে গিয়ে লাফালাফি করতে লাগলো। ঘুম ভেঙ্গে গেল। তিনি পিছনের দিকে তাকিয়ে মুয়াজকে দেখে ডাক দিলেনঃ মুয়াজ! মুয়াজ সাড়া দিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ কাছে এস। মুয়াজ এত নিকটে গেলেন যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তার উট একদম পাশাপাশি এসে গেল। তিনি বললেন, দেখ তো মানুষ কত দূরে? মুয়াজ বললেনঃ সবাই ঘুমিয়ে আছে আর পশুগুলো চরছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আমিও ঘুমাচ্ছিলাম। মুয়াজ বললেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ! অনুমতি দিলে আমি আপনাকে এমন একটি বিষয়ে জিজ্ঞেস করতাম যা আমাকে ভীষণ চিন্তিত ও পীড়িত করে তুলেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তোমার যা ইচ্ছা প্রশ্ন করতে পার।

হযরত মু-য়াজের স্বভাবেই ছিল জানার আগ্রহ। একবার এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট একটি বিশেষ মাসয়ালা জিজ্ঞেস করলো। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে জবাব দিলেন তা একজন সাধারণ লোকের জন্য যথেষ্ট ছিল। কিন্তু হযরত মুয়াজ ততটুকু যথে মনে করতে পারলেন না। তিনি বললেন ইয়া রাসূলুল্লাহ! এই হুকুম কি বিশেষ এই ব্যক্তির জন্য, না সাধারণভাবে সকল মুসলমানের জন্য? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, না এটা একটি সাধারণ হুকুম। (মুসনাস-৫/২৪৪)

জ্ঞান ও বিভিন্ন বিষয়ে ইজতিহাদ ও গবেষণার যোগ্যতা অর্জন করে তিনি ফকীহ, মুজাহিদ ও মুয়াল্লিমের আসনে সমাসীন হন। রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনেই তিনি শিক্ষকের পদে নিযুক্তি লাভ করেন। হিজরী অম সনে মক্কা বিজয়ের পর মক্কাবাসীদের ফিকাহ ও সুরাতের তালীম দানের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সেখানে রেখে আসেন। (আনসাবুল আশরাফ-১/৩৬৫, সীরাতু ইবন হিশাম-২/৫০০, তাবাকাত-১/০০) তাছাড়া-হিজরী নবম সনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ইয়ামনে পাঠান। ইয়ামনের অন্যান্য দায়িত্বের সাথে সেখানকার লোকদের শিক্ষার দায়িত্বও তার ওপর অর্পণ করেন।

মু-য়াজ যখন ফিলিস্তিনে তখন তার শিক্ষাদানের গন্ডি ফিলিস্তিনের বাইরেও বিস্তৃত ছিল। দিমাশক, হিমস প্রভৃতি স্থানেও তার হালকা-ই-দারস ছিল। এ সকল স্থানে তিনি ঘুরে ঘুরে দারস দিতেন। তার দারসের পদ্ধতি ছিল, একটি বৈঠকে কিছু সাহাবী কোন একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করতেন, আর হযরত মুয়াজ চুপ করে বসে শুনতেন। আলোচকরা কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হতে না পারলে তিনি সিদ্ধান্ত ব্যক্ত করতেন।

আবু ইদরীস আল-খাওলানী একবার জামে- দিমাশ্ক-এ গিয়ে দেখলেন, এক সুদর্শন যুবককে ঘিরে লোকেরা গোল হয়ে বসে আছে। কোন বিষয়ে তাদের মতভেদ হলে সেই যুবকের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হচ্ছে আর তিনি সন্তোষজনক জবাব দিচ্ছেন। তিনি যখন জিজ্ঞেস করলেন, যুবকটি কে? বলা হলো মুয়াজ ইবন জাবাল।

আবু মুসলিম আল-খাওলানী একবার জামে হিম্স-এ গিয়ে দেখলেন, বত্রিশ জন প্রবীণ সাহাবী গোল হয়ে বসে আছেন। তাদের প্রত্যেকেই বার্ধক্যে পৌঁছে গেছেন। তাদের মধ্যে একজন যুবকও আছেন। কোন মাসয়ালায় তাদের মধ্যে মতবিরোধ সৃি হলে এই যুবক মিমাংসা করে সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন। পরে তিনি জানতে পারেন এই যুবক মুয়াজ ইবন জাবাল। (তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/২; হায়াতুস সাহাবা-২/৬৩১, ৬৩৮) শাহর ইবন হাওশাব থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীরা যখন কোন বিষয়ে আলোচনা করতেন, তাদের মধ্যে মু-য়াজ ইবন জাবাল উপস্থিত থাকলে সকলে তার প্রতি সম্ভ্রমের দৃষ্টিতে তাকাতেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবন মাসউদ (রা.) বলতেন, দুনিয়ায় আলিম মাত্র তিনজন। তাদের একজন শামে বসবাসরত। একথা দ্বারা তিনি মুয়াজের দিকেই ইঙ্গিত করতেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবন উমার (রা.) মানুষের কাছে জিজ্ঞেস করতেন, তোমরা কি জান -আলিম মতান্তরে -আকিল কারা? লোকেরা অজ্ঞতা প্রকাশ করলে বলতেন,আলিম হলেন মুশয়াজ ইবন জাবাল ও আবু দারদা (তাবাকাত-২/৩৫০)

একজন মুজতাহিদের সবচেয়ে বড় গুণ সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া। হযরত মু-য়াজ এমন সঠিক সিদ্ধান্তের অধিকারী ছিলেন যে খোদ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন কোন ক্ষেত্রে তার সিদ্ধান্তের জন্য সন্তুি ব্যক্ত করেছেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ইয়ামনে পাঠানোর পূর্বে যে পরীক্ষা গ্রহণ করেন সে সময় তিনি যে জবাব দেন তাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দারুণ সন্তষ্টি প্রকাশ করেন। মূলতঃ তার এই জবাবের মাধ্যমে প্রতিতি হয় যে, ইসলামী শরীয়াতের মৌলিক উৎস তিনটিঃ ১. কিতাবুল্লাহ, ২. সুন্নাহ ও ৩. কিয়াস।

ইসলামের প্রথম যুগে যারা একটু দেরীতে নামাযের জামায়াতে হাজির হতো এবং দুই এক রাকায়াত ছুটে যেত (তারা নামাযে দাঁড়ানো লোকদের কাছে ইশারায় জিজ্ঞেস করে জেনে নিত কত রাকায়াত হয়েছে। নামাযীরাও ইশারায় তা জানিয়ে দিত। দেরিতে আসা লোকটি প্রথমে তার ছুটে যাওয়া নামায আদায় করে জামায়াতে শরীক হতো। এভাবে একদিন নামায হচ্ছে এবং প্রথম বৈঠক চলছে, এমন সময় মুয়াজ আসলেন এবং প্রচলিত নিয়মের খিলাফ প্রথমে জামায়াতে শরীক হয়ে গেলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সালাম ফিরানোর পর মুয়াজ উঠে ছুটে যাওয়া রাকায়াতগুলো আদায় করলেন। তার এ কাজ দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ কাদ সান্না রাকুম ফা হাকাজা ফাসনা-য়-মু-য়াজ তোমাদের জন্য একটি নতুন পদ্ধতি বের করেছে, তোমরাও এমনটি করবে। (মুসনাদ-৫/২৩৩, ২৪৬) হযরত মুয়াজের জন্য এটা অতি সম্মান ও গৌরবের বিষয় যে, তারই একটা -আমল গোটা মুসলিম জাতির জন্য ওয়াজিব করে দেওয়া হয়েছে এবং কিয়ামত পর্যন্ত তা জারী থাকবে।
একবার এক গর্ভবতী মহিলার স্বামী দুই বছর নিরুদ্দেশ থাকে। এর মধ্যে মহিলা গর্ভবতী হয়, মানুষের মনে সন্দেহ হলে তারা বিষয়টি খলিফা উমারের নিকট উত্থাপন করে। উমার (রা.) মহিলাকে রজম করার (যিনার শাস্তি) নির্দেশ দেন। মুয়াজ বললেনঃ মহিলাকে রজম করার অধিকার আপনার আছে। কিন্তু পেটের সন্তানের রজম করার অধিকার আপনাকে কে দিয়েছে? উমার মহিলাকে তখনকার মত ছেড়ে দিয়ে সন্তান প্রসবের পর রজমের নির্দেশ দেন।

মহিলা একটি পুত্র সন্তান প্রসব করে। সন্তানটি ছিল অবিকল তার পিতার -আদলের। তখন পিতা সন্তান দেখে শপথ করে দাবি করে এ তো আমারই সন্তান। এ কথা শুনে উমার (রা.) মন্তব্য করেনঃ মুয়াজের মত সন্তান মহিলারা আর জন্ম দিতে পারবে না। মুয়াজ না থাকলে উমার ধ্বংস হয়ে যেত। তিনি আরও বলতেন: মুয়াজের মত সন্তান জন্ম দিতে মহিলারা অক্ষম হয়ে গেছে।- সাহাবী সমাজের মধ্যে তার বিশাল মর্যাদা সম্পর্কে এমনই একটা ধারণা বিদ্যমান ছিল।

খলিফা উমারের অন্তিম সময় ঘনিয়ে এলে লোকেরা তার নিকট পরবর্তী খলিফা মনোনয়নের জন্য -আরজ করলো। তখন তিনি একটি সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন। তার মধ্যে এ কথাটিও বলেন যে, আজ মুয়াজ ইবন জাবাল বেঁচে থাকলে তাকেই খলিফা বানিয়ে যেতাম। আল্লাহ আমাকে জিজ্ঞেস করলে বলতাম, আমি এমন এক ব্যক্তিকে বানিয়ে এসেছি যার সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কিয়ামতের দিন মুয়াজ সব আলিমদের থেকে এক অথবা দুই তীর নিক্ষেপের দূরত্ব আগে থাকবে। (উসুদুল গাবা-৪/৩৭৮, তাজকিরাতুল হুফ্ফাজ-১/১৯)

খলিফা হযরত আবু বকর (রা.) ইয়াযীদ ইবন আবী সুফইয়ানকে একবার অসীয়াত করেনঃ মু-য়াজ ইবন জাবালের প্রতি লক্ষ্য রাখবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথে আমি তার সকল অভিযান প্রত্যক্ষ করেছি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন তার সম্পর্কে বলেছিলেনঃ কিয়ামতের দিন মু-য়াজ -আলিমদের থেকে এক তীর নিক্ষেপের দূরত্ব আগে থাকবে। সে এবং আবু উবাইদার সাথে পরামর্শ ছাড়া কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে না। তাতে তোমার মঙ্গল হবে না। (হাতয়াতুস সাহাবা-২/১১৮) অপর একটি বর্ণনায় এসেছে কিয়ামতের দিন সকল আলিম মুয়াজের পতাকাতলে উঠবে। (শাজারাত-১/৩০)
একবার খলিফা হযরত -উমার (রা.) মুয়াজকে পাঠালেন বনু কিলাব গোত্রে যাকাত আদায় করে গরীবদের মধ্যে বণ্টনের জন্য। মুয়াজ সেখানে গিয়ে দায়িত্ব পালন করে স্ত্রীর নিকট ফিরে আসলেন। যাওয়ার সময় হাতে করে যে জিনিসগুলো নিয়ে গিয়েছিলেন ফেরার সময় শুধু সেইগুলোই হাতে করে ফিরলেন। স্ত্রী কাছে এসে বললেনঃ অন্যান্য শাসকরা ঘরে ফেরার সময় তাদের পরিবারের লোকদের জন্য নানা রকম উপঢৌকন নিয়ে আসে, দেখি তুমি আমার জন্য কি নিয়ে এসেছ? মু-য়াজ বললেন আমার সাথে সবসময় একজন পাহারাদার ছিল। সে সতর্কভাবে আমাকে পাহারা দিয়েছে। স্ত্রী বললেনঃ তুমি ছিলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ও আবু বকরের পরম বিশ্বাসভাজন ব্যক্তি। আর -উমার কিনা তোমার পিছনে পাহারাদার নিয়োগ করেছে?
স্বামী-স্ত্রীর এ আলোচনা উমারের (রা.) মেয়ে মহলের মাধ্যমে তার কানে গেল। তিনি মু-য়াজকে ডেকে জিজ্ঞেস করলেন আমি তোমার পিছনে পাহারাদার নিয়োগ করেছি? মু-য়াজ বললেন না, আপনি তা করবেন কেন? তবে আমার স্ত্রীকে বুঝ দেওয়ার জন্য এমন কথা না বলে উপায় ছিল না। উমার একটু হেসে দিলেন। তারপর মুয়াজের হাতে কিছু অর্থ দিয়ে বলেন, যাও এগুলো দিয়ে তোমার স্ত্রীকে খুশী কর। (সুওয়ারুম মিন্ হায়াতিস সাহাবা-৭/১৩১-১৩২)

তিনি ছিলেন অত্যন্ত দানশীল। একারণে তার সকল বিষয়-সম্পত্তি একবার নিলামে উঠে বিক্রি হয়েছিল তার এই দানশীলতায় ইসলামের যথে কল্যাণ সাধিত হয়েছে।

খলিফা উমার (রা.) একদিন সঙ্গিদের বললেনঃ আচ্ছা বলতো তোমরা কে কি নেক আশা কর। একজন বললো, আমার বাসনা হলো, আমি যদি এই ঘর ভর্তি দিরহাম পেতাম এবং সবই আল্লাহর রাস্তায় খরচ করতে পারতাম। আরেকজন বললোঃ আমি যদি এই ঘর ভর্তি সোনাদানা পেতাম এবং আল্লাহর রাস্তায় বিলিয়ে দিতে পারতাম। এভাবে একেক জন একেক রকম সৎ বাসনা প্রকাশ করলো। সবশেষে উমার (রা.) বললেনঃ আমার বাসনা কি জান ? আমি যদি এই ঘর বর্তি পরিমাণ আবু উবাইদা ইবনুল জাররাহ, মু-য়াজ ইবন জাবাল ও হুজায়ফা ইবনুল ইয়ামানের মত লোক পেতাম এবং তাদের সকলকে আল্লাহর আনুগত্যের কাজে লাগাতে পারতাম। তারপর তিনি বলেন, এখনই আমি পরীক্ষা করে প্রমাণ করে দিচ্ছি।

তিনি চাকরকে ডেকে চারশত দীনার ভর্তি একটি থলি তার হাতে দিয়ে বলেন, এগুলো আবু উবাইদাকে দিয়ে তার ব্যক্তিগত প্রয়োজনে খরচ করতে বলে এস। আবু উবাইদা থলিটি হাতে নিয়ে খলিফার চাকর স্থান ত্যাগের পূর্বেই দীনারগুলো বিভিন্ন থলিতে ভরলেন এবং অভাবীদের মধ্যে বণ্টন করে দিলেন। অনুরূপভাবে খলিফা আর একটি দীনার ভর্তি থলি পাঠালেন মু-য়াজ ইবন জাবালের কাছে। মু-য়াজও তক্ষুণি দাসীকে ডেকে দীনারগুলো বিভিন্ন লোকের মধ্যে বণ্টন শুরু করলেন। থলিতে যখন মাত্র দুইটি দীনার বাকী তখন তার স্ত্রী খবর পেলেন এবং দৌড়ে এসে বললেন, আমিও তো একজন মিসকীন, আমাকেও কিছু দাওনা। মুয়াজ দীনার দুইটি সহ থলিটি স্ত্রীর দিকে ছুড়ে মেরে বলেনঃ এই নাও। খলিফা চাকরের মুখে আবু উবাইদা ও মুয়াজের এই আচরণের কথা শুনে দারুণ পুলকিত হন এবং মন্তব্য করেনঃ তারা প্রত্যেকেই পরস্পরের ভাই। (হায়াতুস সাহাবা-২/২৩১-২৩৩)
আল্লাহর প্রতি গভীর মুহাব্বত ও ভালোবাসা, তার ইতা-য়াত ও আনুগত্য, ইবাদাত ও বন্দেগী এবং তার ওপর তাওয়াককুল ও নির্ভরতা হচ্ছে একজন মুমিনের অন্যতম বৈশ্যি ও পরিচয়। হযরত মুয়াজের মধ্যে এসব বৈশিষ্ট পূর্ন লাভ করে। গভীর রাতে তিনি আল্লাহর ইবাদাতে মশগুল হয়ে যেতেন। কাঁদতে কাঁদতে আল্লাহর দরবারে হাত উঠিয়ে দু-আ করতেনঃ -হে আল্লাহ! এখন সকল চক্ষু নিদ্রিত। কিন্তু তুমি চিরজাগ্রত, চিরঞ্জীব। হে আল্লাহ! জান্নাতের দিকে আমার যাত্রা বড় মন্থর এবং জাহান্নাম থেকে পলায়ন বড় দুর্বল। তুমি আমার জন্য তোমার কাছে একটি হিদায়াত নির্দি রাখ যা কিয়ামতের দিন আমি লাভ করতে পারি।- (উসুদুল গাবা-৪/৩৭৭) তিনি যে কত বড় আল্লাহ নির্ভর লোক ছিলেন তার প্রমাণ পাওয়া যায় আমওয়াসের মহামারির সময়। হযরত -আমার ইবনুল -আস যখন সৈন্যদের স্থান ত্যাগের পরামর্শ দেন তখন তার পরামর্শকে তাওয়াক্কুলের পরিপন্থী মনে করে তিনি ভীষণ ক্ষেপে যান। শেষ পর্যন্ত তাওয়াক্কুলের ওপর অটল থেকেই সেই মহামারিতে মৃত্যুবরণ করেন।
একদিন হযরত উমার (রা.) দেখলেন, মুয়াজ কাঁদছেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন! তুমি কাঁদছো কেন ? মুয়াজ বলেনঃ আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছিঃ বিন্দুমাত্র রিয়াও এক ধরনের শিরক। আর আত্মগোপনকারী-মুত্তাকীরাই হচ্ছে আল্লাহর সর্বাধিক প্রিয় বান্দা। তারা অদৃশ্য হলে হারায় না এবং দৃশ্যমান হলে চেনা যায় না। তারাই হলেন হিদায়াতের ইমাম ও ইলমের মশাল বা প্রদীপ। (হায়াতুস সাহাবা-২/৬২৪)

তাউস থেকে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, একবার মুয়াজ ইবন জাবাল আমাদের অঞ্চলে আসেন। আমাদের নেতারা বললোঃ আপনার অনুমতি পেলে আমরা পাথর ও ইট দিয়ে আপনার জন্য একটি মসজিদ বানিয়ে দিতাম। মু-য়াজ বলেন । কিয়ামতের দিন এই মসজিদ আমার পিঠে বহন করতে বলা হয় কিনা সে ব্যাপারে আমি শঙ্কিত। (হায়াতুস সাহাবা-২/৬২১)

ইসলামী সাম্য ও ন্যায়বিচারে তিনি ছিলেন এক বাস্তব নমুনা। ছোট খাট ব্যাপারেও তিনি ইনসাফ থেকে বিচ্যুত হতেন না। ইয়াহইয়া ইবন সা-ঈদ থেকে বর্ণিত হয়েছে। মু-য়াজের দুই স্ত্রী ছিল। তিনি তাদের মধ্যে সমতা বিধানের প্রতি ছিলেন দারুণ সতর্ক। যেদিন তিনি এক স্ত্রীর ঘরে অবস্থান করতেন সেদিন অন্যের ঘরে অজু করা বা এক গ্লাস পানিও পান করতেন না। দুই স্ত্রীই -আমওয়াসের মহামারিতে এক সাথে মারা যান। দুইজনকে একই কবরে দাফন করা হয়। কবর খোড়া হলে কাকে আগে কবরে রাখা হবে সে ব্যাপারেও লটারী করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। (তায়াতুস সাহাবা-২/৬১২)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি মু-য়াজের যে কত গভীর ভালাবাসা চিল তার কিছু পরিচয় পূর্ববর্তী আলাচনায় পরিস্ফুট হয়েছে। কখনও তাকে না পেলে তিনি অস্থির হয়ে তার খোঁজে বেরিয়ে পড়তেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিয়ম ছিল সফরে রাত্রি যাপনের সময় মুহাজির সঙ্গীদের নিজের কাছেই রাখা। একবার তিনি কোন এক সফরে গেলেন। সাহাবীরাও সঙ্গে ছিলেন। এক স্থানে রাত্রি যাপনের জন্য থামলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুয়াজ সহ কতিপয় সাহাবীর একটি বৈঠক থেকে কিছু না বলে কোথাও চলে গেলেন। মু-য়াজ অস্থির হয়ে পড়লেন। সন্ধ্যা পর্যন্ত অপেক্ষা করলেন। তারপর আবু মূসাকে সঙ্গে করে খোঁজে বেরিয় পড়লেন। পথে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কণ্ঠস্বর শুনে এগিয়ে গেলন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের ডেকে প্রশ্ন করেনঃ তোমাদের কি অবস্থা? তারা বললেনঃ আপনাকে না পেয়ে আমরা শঙ্কিত হয়ে পড়লাম। তাই খুঁজতে বেরিয়েছি। (মুসনাদ-৫/২৩২)

হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি ছিল তার সীমাহীন ভক্তি ও শ্রদ্ধা। একবার তিনি সফর থেকে ফিরে এসে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বললেনঃ আমরা ইয়ামানে একজন অন্যজনকে সিজদাহ করতে দেখেছি। আমরা কি আপনাকে সিজদাহ্ করতে পারিনে ? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন আমি যদি কোন মানুষের জন্য সিজদাহর বিধানই রাখতাম তাহলে মহিলাদেরকে বলতাম তাদের নিজ নিজ স্বামীদেরকে সিজদাহ করতে। (মুসনাদ-৫/২২৭)

একবার মুনাফিক কায়েস ইবন মুতাতিয়্যা একটি মজলিসে উপস্থিত হলো। সেই মজলিসে হযরত সালমান আল-ফারেসী, সুহাইব আর রূমী ও বিলাল আল-হাবশী উপস্থিত ছিলেন। তাদের প্রতি ইঙ্গিত করে কায়েস বললো, এই আউস ও খাযরাজ না হয় এই ব্যক্তিকে (রাসূলুল্লাহকে) সাহায্য করলো; কিন্তু এই সব লোক সাহায্য করছে কেন? একথা বলার সাথে সাথে মুয়াজ ইবন জাবাল লাফ দিয়ে উঠে তার বুকের ও গলার কাপড় মুট করে ধরে টানতে টানতে সোজা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট নিয়ে গেলেন। এ অবস্থা দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রাগে ফেটে পড়লেন। তিনি লোকদের মসজিদে সমবেত হওয়ার আহ্বান জানাতে বললেন। জনগণ মসজিদে সমবেত হলে তিনি ঐক্য ও সংহতির ওপর এক ভাষণ দান করেন। ভাষণ শেষ হলে মুয়াজ বলেন, কিন্তু এই মুনাফিকের ব্যাপারে আপনি কি বলেন? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাব দিলেনঃ তাকে জাহান্নামের জন্য ছেড়ে দাও। মুয়াজ ছেড়ে দিলেন। পরবর্তীকালে এই কায়েস মুরতাদ হয়ে ইসলামী খিলাফতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয় এবং এ অবস্থায় মুসলিম মুজাহিদদের হাতে নিহত হয়। (হায়াতুস সাহাবা-২/৪৭৬, ৪৭৭)

একবার হযরত মুয়াজ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সঙ্গে ছিলেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার একখানি হাত ধরে বললেনঃ মু-য়াজ, তোমার প্রতি আমার গভীর ভালোবাসা। উত্তরে মু-য়াজ বললেনঃ আমার মা-বাবা আপনার প্রতি কুরবান হোক। আমিও অন্তর দিয়ে আপনাকে ভালোবাসি। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ আমি তোমাকে আরেকটি উপদেশ দিচ্ছি কক্ষণও তা অবহেলা করবে না। তারপর তাকে একটি দু-আ শিখিয়ে দিলেন। হযরত মু-য়াজ আমরণ সেই দু-আটি পাঠ করতেন। (মুসনাদ-৫/২৪৫)

হিজরী ১৬ সনে খলিফা হযরত উমার যখন বাইতুল মাকদাস সফর করেন তখন সেখানে হযরত বিলাল ও মু-য়াজও ছিলেন। উমার আযান দেওয়ার জন্য বিলালকে অনুরোধ করলেন। বিলাল বললেনঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের পর আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম আর কারও অনুরোধে কক্ষণও আযান দেব না। কিন্তু আজ আপনার অনুরোধ রক্ষা করবো। তিনি আযান দিতে শুরু করলেন। আযানের ধ্বনিতে সাহাবীদের মনে রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনকালের স্মৃতি ভেসে ওঠে। তাদের মধ্যে ভাবান্তর সৃি হয়। হযরত মুয়াজ তো কাঁদতে কাঁদতে অস্থির হয়ে পড়লেন।

হযরত মু-য়াবিয়া (রা.) যখন শামের গভর্নর তখন মু-য়াজ একবার সেখানে গিয়ে দেখলেন, লোকেরা বিতর- নামায আদায় করে না। তিনি মুয়াবিয়ার কাছে এর কারণ জানতে চাইলেন। বিষয়টি তারও জানা ছিল না। তাই তিনি পাল্টা প্রশ্ন করলেনঃ বিতর কি ওয়াজিব? তিনি বললেনঃ হ্যাঁ এভাবে আমার বিল মা-রূপের ব্যাপারে তিনি কারও পরোয়া করতেন না। (মুসনাদ-৫/২৪২)
তিনি ছিলেন সত্যবাদী। খোদ তার সত্যবাদিতার সাক্ষ্য দিয়েছেন। একবার হযরত মুয়াজ হযরত আনাসের নিকট একটি হাদীস বর্ণনা করলেন। তারপর আনাস রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কি মুয়াজকে একথা বলেছেন? জবাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিনবার বললেনঃ মুয়াজ সত্য বলেছে। (উসুদুল গাবা-৪/৩৭৭)
তার মরণ-সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে লোকেরা এই বলে বিলাপ শুরু করে দিল যে, ইলম উঠে যাচ্ছে। তারা মুয়াজকে বললো, আপনি আমাদের বলে যান, আপনার মৃত্যুর পর আমরা কার নিকট যাব। তিনি বললেনঃ আমাকে একটু উঠিয়ে বসাও। বসানো হলে বললেনঃ শোন, ইলম ও ঈমান-এ দুইটি উঠার জিনিস নয়। যারা তালাশ করবে তারা লাভ করবে। কথাটি তিনবার বললেন। তারপর বললেনঃ তোমরা আবুদ দারদা, সালমান আল-ফারেসী, ইবন মাস-উদ ও আবদুল্লাহ ইবন সালাম-এই চার জনের নিকট থেকে ইলম হাসিল করবে। (মুসনাদ-৫/২৪৩)

সীরাত গ্রন্থসমূহে দেখা যায় পবিত্র কুরআনের বেশ কয়েকটি আয়াত নাযিলের ঘটনার সাথে হযরত মু-য়াজও প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। একবার হযরত মু-য়াজ ইবন জাবালসহ আউস ও খাযরাজ গোত্রের কয়েকজন বিশি ব্যক্তি ইহুদীদের কয়েকজন আহবারের নিকট তাওরাতের কয়েকটি বিষয় সম্পর্কে জানার জন্য প্রশ্ন করেন। কিন্তু তারা সত্যকে গোপন করার উদ্দেশ্যে তা জানাতে অস্বীকার করে। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ পাক সূরা বাকারায় ১৫৯ নং আয়াতটি নাযিল করেন। (সীরাতু ইবন হিশাম-১/৫৫১)

হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনার ইহুদীদেরকে ইসলাম গ্রহণের জন্য উৎসাহিত করেন। আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরীক করার পরিণতি সম্পর্কে তাদেরকে সতর্ক করে দেন। তা সত্ত্বেও তারা তার কথা মানতে অস্বীকার করতে থাকে। তাদের এ অবস্থা দেখে হযরত মু-য়াজ সহ কতিপয় সাহাবী ইহুদীদেরকে বললেন ইহুদী সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহকে ভয় কর। আল্লাহর কসম! তোমরা অবশ্যই জান যে তিনি আল্লাহর রাসূল। আর একথা তো তোমরা তার নবুওয়াত লাভের পূর্বেই আমাদেরকে বলতে এবং তার পরিচয়ও আমাদের কাছে তুলে ধরতে। একথার উত্তরে রাফে ইবন হুরায়মালা ও ওয়াহাব ইবন ইহুজা বললোঃ না, আমরা কক্ষণও তোমাদেরকে এমন কথা বলিনি। মুসার কিতাবের পর আর কোন কিতাব আল্লাহ নাযিল করেননি এবং আর কোন সুসংবাদ দানকারী ও ভীতি প্রদর্শনকারীও আল্লাহ পাঠাননি। তখন আল্লাহ পাক সূরা আল-মায়িদার ১৯ নং আয়াতটি নাযিল করে ইহুদীদের কথার প্রতিবাদ করেন। (সীরাতু ইবন হিশাম-১/৫৬৪)

হাদীস ও সীরাত গ্রন্থসমূহে হযরত মুয়াজ ইবন জাবাল সম্পর্কে এ ধরনের বহু খণ্ড খণ্ড তথ্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে যা মুসলিম সমাজ চেতনায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।