প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ৪র্থ সংখ্যা,অক্টোবর ২০১৬, জিলহজ-মুহাররম ১৪৩৭-৩৮ হিজরী,আশ্বিন-কার্তিক ১৪২৩ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

অর্থ: (১৮০) তোমাদের কারও যখন মৃত্যুর সময় উপস্থিত হয়, সে যদি কিছু ধনসম্পদ ত্যাগ করে যায়, তবে তার জন্য ওসীয়ত করা বিধিবন্ধ করা হলো, পিতা-মাতা ও নিকটাত্মীয়দের জন্য ইনসাফের সাথে। পরহেযগারদের জন্য এ নির্দেশ জরুরী। (১৮১) যদি কেউ ওসীয়ত শোনার পর তাকে কোনো রকম পরিবর্তন সাধন করে, তবে যারা পরিবর্তন করে তাদের উপর এর গুনাহ পতিত হবে। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা সবকিছু শোনেন ও জানেন। (১৮২) যদি কেউ ওসীয়তকারীর পক্ষ থেকে আশঙ্কা করে পক্ষপাতিত্বের অথবা কোনো অপরাধমূলক সিদ্ধান্তের এবং তাদের মধ্যে মীমাংসা করে দেয়, তবে তার কোনো গুনাহ হবে না। নিশ্চয় আল্লাহ তাআলা ক্ষমাশীল, অতি দয়ালু।

সংক্ষিপ্ত তাফসীর

ওসীয়ত শাব্দিক অর্থে যে কোনো কাজ করার নির্দেশ প্রদানকে ওসীয়ত বলা হয়। পরিভাষায়, ব্যক্তি-বিশেষের মৃত্যুর পরে সম্পাদন করার জন্য মৃত্যুকালে যে নির্দেশ দেওয়া হয়, তাকেই ওসীয়ত বলা হয়।
খায়ের শব্দের অনেকগুলো অর্থের মধ্যে এক অর্থ ধনসম্পদ। যেমন কুরআনে উল্লেখিত হয়েছে: ……………………।।

এখানে মুফাসসিরগণের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী খায়ের মানে ধনসম্পদ।

ইসলামের প্রাথমিক যুগে যতদিন ওয়ারিসগণের অংশ কুরআনের আয়াত দ্বারা নির্ধারিত হয়নি, ততদিন পর্যন্ত নিয়ম ছিল মৃত্যুপথযাত্রী তার পরিত্যক্ত সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ পরিমাণ পিতা-মাতা এবং আত্মীয়-স্বজনের জন্য ওসীয়ত করে যেত। অবশি সম্পত্তি সন্তানদের মধ্যে বণ্টিত হতো। সে নির্দেশটিই এ আয়াতে উল্লেখ হয়েছে। যেমনÑ তোমাদের উপর ফযর করা হচ্ছে, যখন কারও (লক্ষণাদির দ্বারা) মৃত্যু নিকটবর্তী বলে মনে হয়, অবশ্য যদি সে কিছু সম্পদ পরিত্যক্ত ন্যায়সঙ্গতভাবে (মোট সম্পদের এক-তৃতীয়াংশের বেশি যেন না হয়) কিছু যেন বলে যায় (এরই নাম ওসীয়ত) যাদের মধ্যে আল্লাহর ভয় রয়েছে তাদের পক্ষে এটা জরুরী (করা হচ্ছে)। অতঃপর (যেসব লোক ওসীয়ত শুনেছে, তাদের মধ্য থেকে) যে কেউ সেটা (ওসীয়তের বিষয়বস্তু) পরিবর্তন করবে (এবং বণ্টনের সময় মিথ্যা যবানবন্দী করে এবং তার সে যবানবন্দী অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করাতে যদি কারও কোনো হক ন হয়) তবে সে (হক বিন হওয়ার) গুনাহ তাদের উপরই মৃত ব্যক্তির কোনো গুনাহ হবে না। কেননা, আল্লাহ তাআলা তো নিশ্চিতই সবকিছু জানেন, শোনেন। (তিনি পরিবর্তনকারীর কারসাজি সম্পর্কেও জানেন, সালিস বিচারকগণ যে নির্দোষ একথাও জানেন) তবে হ্যাঁ, (এক ধরনের পরিবর্তনের অনুমতি রয়েছে তা হচ্ছে) যে ব্যক্তি ওসীয়তকারীর তরফ থেকে (ওসীয়তের ব্যাপারে) কোনো ভুল সিদ্ধান্ত অথবা (ইচ্ছাকৃতভাবে ওসীয়ত সম্পর্কিত কোনো বিধানের খেলাফ) কোনো অপরাধ সম্পর্কে নিশ্চিত হয়, (আর বিধানের খেলাফ করার কারণে যদি ওসীয়তকারীর ওয়ারিসদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদের সৃি হয় কিংবা আশঙ্কা দেখা দেয়। আর সে ব্যক্তি যদি তাদের মধ্যে আপস-নিষ্পত্তি করে দেয়, তবে বাহ্যত তা ওসীয়ত পরিবর্তন বলে মনে হলেও, সে ব্যক্তির উপর কোন গুনাহ হবে না (এবং) সুনিশ্চিতরূপেই আল্লাহ তাআলা ক্ষমাকারী এবং (গুনাহগারদের প্রতিও) অনুগ্রহশীল। (বস্তুত সে ব্যক্তি তো কোনো গুনাহ করেনি। ওসীয়তের পরিবর্তন মীমাংসার উদ্দেশ্যেই করেছে, সুতরাং তার প্রতি অনুগ্রহ কেন হবে না?)
বিস্তারিত জ্ঞাতব্য বিষয়

প্রথম নির্দেশ

ওসীয়তের অংশসমূহ
এ আয়াত মৃত্যুপথযাত্রীর প্রতি (যদি সে কিছু ধনসম্পদ রেখে যায়,) যে ওসীয়ত ফরয করা হয়েছে, সে নির্দেশের তিনটি অংশ রয়েছে :

(১) মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তির পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে সন্তান-সন্ততি ছাড়া অন্যান্য নিকটাত্মীয়দের কোনো অংশ যেহেতু নির্ধারিত নেই, সুতরাং তাদের হক মৃত ব্যক্তির ওসীয়তের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।

(২) এ ধরনের নিকটাত্মীয়দের জন্য ওসীয়ত করা মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তির উপর ফরয।

(৩) এক-তৃতীয়াংশ সম্পত্তির বেশি ওসীয়ত করা জায়েয নয়।

উপরোক্ত তিনটি নির্দেশের মধ্যে প্রথম নির্দেশটি অধিকাংশ সাহাবী ও তাবেয়ীগণের মতে মীরাস’-এর আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর মানসূখ’ বা রহিত হয়ে গেছে। ইবনে কাসীর ও হাকেম প্রমুখ সহীহ্ সনদের সাথে বর্ণনা করেন যে, হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর মতে ওসীয়ত সম্পর্কিত এ নির্দেশটি মীরাস-এর আয়াত দ্বারা রহিত করে দেওয়া হয়েছে। মীরাস সম্পর্কিত আয়াতটি হচ্ছে :

পিতা-মাতা এবং আত্মীয়-স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে পুরুষের অংশ আছে এবং পিতা-মাতা এবং আত্মীয়-স্বজনের পরিত্যক্ত সম্পত্তিতে নারীরও অংশ আছে, তা অল্পই হোক অথবা বেশিই হোক, এক নির্ধারিত অংশ।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) এর অন্য এক বর্ণনায় বলা হয়েছে যে, মীরাসের আয়াত সে সমস্ত আত্মীয়দের জন্য ওসীয়ত করা রহিত করে দিয়েছে, যাদের মীরাস নির্ধারিত হয়েছে। এছাড়া অন্য যেসব আত্মীয়ের অংশ মীরাসের আয়াতে নির্ধারণ করা হয়নি, তাদের জন্য ওসীয়ত করার হুকুম এখনো অবশি রয়েছে। (জাসসাস, কুরতুবী)

তবে আলিমগণের সর্বসম্মত অভিমত হচ্ছে, যেসব আত্মীয়ের জন্য মীরাসের আয়াতে কোনো অংশ নির্ধারণ করা হয়নি, তাদের জন্য ওসীয়ত করা মৃত্যুপথযাত্রীর জন্য ফরয বা জরুরী নয়। সে ফরয রহিত হয়ে গেছে। এখন প্রয়োজন বিশেষে এটা মুস্তাহাবে পরিণত হয়েছে। (জাসসাস, কুরতুবী)

দ্বিতীয় নির্দেশ

ওসীয়ত ফরয হওয়া প্রসঙ্গে
ওসীয়ত সম্পর্কিত এ আয়াতের নির্দেশ একাধারে যেমন কুরআনের মীরাস সম্পর্কিত আয়াত দ্বারা রহিত করা হয়েছে, তেমনি বিদায় হজ্বের সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কর্তৃক ঘোষিত নির্দেশের মাধ্যমেও হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.)-এর বর্ণিত হাদীসটি রহিত হয়ে গেছে। বিদায় হজ্বের বিখ্যাত খুতবায় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছিলেন :

অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক হকদারের হক নির্ধারণ করে দিয়েছেন। সুতরাং এখন থেকে কোনো ওয়ারিসের পক্ষে ওসীয়ত করা জায়েয নয়। (তিরমিযী)

একই হাদীসে হযরত ইবনে আব্বাসের বর্ণনায় এ কথাও যুক্ত হয়েছে :

কোনো ওয়ারিসের জন্য সে পর্যন্ত ওসীয়ত জায়েজ হবে না, যে পর্যন্ত অন্য ওয়ারিসগণ অনুমতি না দেয়।’ (জাসসাস)
হাদীসের মূল বক্তব্য হচ্ছে এই যে, আল্লাহ তাআলাই যেহেতু প্রত্যেক ওয়ারিসের হিসসা নির্ধারণ করে দিয়েছেন, সুতরাং এখন আর ওসীয়ত করার অনুমতি নেই। তবে যদি অন্য ওয়ারিসগণ ওসীয়ত করার অনুমতি দেন, তবে যে কোনো ওয়ারিসের জন্য বিশেষভাবে কোনো ওসীয়ত করা জায়েয হবে।

ইমাম জাসসাস বলেন : এ হাদীসটি বহুসংখ্যক সাহাবী কর্তৃক বর্ণিত এবং উম্মতের ফকীহগণ সর্বসম্মতিক্রমে এটি গ্রহণ করেছেন। ফলে এটি মুতাওয়াতির’ বা বহুল বর্ণিত হাদীসের পর্যায়ভুক্ত, যে হাদীস দ্বারা কুরআনের আয়াতের হুকুম রহিত করাও জায়েয।

ইমাম কুবতুবী বলেন : উম্মতের আলিমগণের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত এই যে, সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদীস, যথা : মুতাওয়াতের ও মশহুর বর্ণনা কুরআনেরই সমপর্যায়ের। কেননা, সেটিও আল্লাহ তাআলারই ফরমান। এ ধরনের হাদীস দ্বারা কুরআনের কোনো নির্দেশ রহিত হওয়াতে কোনো দ্বিধা-সংশয়ের অবকাশ নেই।

অতঃপর বলেন : সংশ্লি হাদীস যদি আমাদের নিকট খবরে ওয়াহেদ’ বা এক ব্যক্তির বর্ণনার মাধ্যমেও পৌঁছে, তবু তাতে সংশয়ের কারণ নেই। পক্ষান্তরে বিদায় হজ্বের বিরাট সমাবেশে এক লাখেরও বেশি সাহাবীর উপস্থিতিতে সে সম্পর্কে হুযুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘোষণা প্রদানের ফলে স্প হয়ে গেছে যে, হাদীসে বর্ণিত বিষয়টি সম্পর্কে সাহাবী এবং পরবর্তী পর্যায়ে উম্মতের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তে এ হাদীস তাদের নিকট অকাট্য দলিল হিসাবে গৃহীত বলে প্রমাণিত হয়েছে। অন্যথায় কুরআনের আয়াতের মোকাবিলায় এ সম্পর্কে তাঁদের পক্ষে ঐকমত্যে পৌঁছা সম্ভবপর হতো না।

তৃতীয় নির্দেশ

এক-তৃতীয়াংশ সম্পদের ওসীয়ত সম্পর্কে
আলেমগণের সর্বসম্মত অভিমত অনুযায়ী মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তির জন্য এখনো তার মোট সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ পরিমাণ ওসীয়ত করা জায়েয। এমনকি উত্তরাধিকারীগণের অনুমতিক্রমে সমগ্র সম্পত্তিও ওসীয়ত করা জায়েয এবং গ্রহণযোগ্য।
মাসআলা : উপরোক্ত বর্ণনার ভিত্তিতে সাব্যস্ত হচ্ছে যে, যেসব আত্মীয়ের হিস্সা কুরআনে কারীম নির্ধারণ করে দিয়েছে, তাদের জন্য ওসীয়ত করা ওয়াজিব নয়। এমনকি ওয়ারিসগণের অনুমতি ব্যতীত ওসীয়ত করা জায়েযও নয়। তবে যেসব আত্মীয়ের হিসসা কুরআন নির্ধারণ করেনি, তাদের জন্য মোট সম্পত্তির এক-তৃতীয়াংশ পরিমাণের মধ্যে ওসীয়ত করার অনুমতি রয়েছে।
মাসআলা : আলোচ্য আয়াতে মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তির পক্ষে সাধারণভাবে তার সম্পত্তির ব্যাপারে ওসীয়ত করার বিষয় আলোচিত হয়েছে। কিন্তু যদি কোনো ব্যক্তির উপর অন্যের ঋণ বা আমানত থাকে এবং তা পরিশোধ করার জন্য তার সমগ্র সম্পত্তিও ওসীয়ত করতে হয়, তবুও তার পক্ষে তা করতে হবে এবং সমস্ত সম্পত্তির ওসীয়তই বৈধ হবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেনÑ কারও উপর অন্যের হক থাকলে তার পক্ষে সে সম্পর্কে লিখিত ওসীয়ত করা ব্যতীত তিনটি রাতও কাটানো উচিত নয়।

মাসআলা : এক-তৃতীয়াংশ সম্পত্তিতে ওসীয়ত করার যে অধিকার দেওয়া হয়েছে, সেরূপ ওসীয়ত করার পর জীবিতাবস্থায় তা পরিবর্তন কিংবা বাতিল করে দেওয়ারও অধিকার রয়েছে। (জাসসাস)
[সূত্র : তাফসীরে মাআরেফুল কুরআন, ১ম খণ্ড, পৃা ৪৩৭-৪৪১]