প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ- ৪র্থ সংখ্যা,অক্টোবর ২০১৬, জিলহজ-মুহাররম ১৪৩৭-৩৮ হিজরী,আশ্বিন-কার্তিক ১৪২৩ বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়
৪১.যে দিন আমি নতুন কিছু শিখি না সে দিন বরকতহীন
প্রচলিত একটি বাতিল কথা যা হাদীস নামে প্রচলিত : যদি আমার জীবনে এমন একটি দিন আসে যে দিনে আমি আল্লাহর নৈকট্য প্রদানকারী কোনো ইলম বৃদ্ধি করতে পারি নি, সে দিনের সূর্যোদয়ে আমার জন্য কোনো বরকত না হোক।
হাদীসটি আবূ নুআইম ইসপাহানী ও অন্যান্য মুহাদ্দিস হাকাম ইবনু আব্দুল্লাহ নামক দ্বিতীয় শতকের এক ব্যক্তির সূত্রে বর্ণনা করেছেন। হাকাম বলেন ইবনু শিহাব যুহরী তাকে এ হাদীসটি বলেছেন, সাঈদ ইবনুল মুসাইয়িব থেকে আয়েশা থেকে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে। আবু নুআইম বলেন: এ হাদীসটি একমাত্র হাকাম ছাড়া কেউ বর্ণনা করে নি। (আবূ নুআইম, হিলইয়াতুল আউলিয়া ৮/১৮৮)
হাকাম নামক এ ব্যক্তি সম্পর্কে মুহাদ্দিসগণ একমত যে, লোকটি একজন জালিয়াত ও জঘন্য মিথ্যাবাদী ছিল। ইমাম আবূ হাতিম রাযী বলেন, লোকটি জঘন্য মিথ্যাবাদী ছিল। ইমাম দারাকুতনী, ইবনু আদী প্রমুখ মুহাদ্দিস বলেন, এ লোকটি কঠিন জালিয়াত ছিল। সে একটি জাল পাণ্ডুলিপি বানিয়ে তাতে ৫০টিরও অধিক জাল হাদীস লিখে সেগুলো ইমাম যুহরীর নামে সাঈদ ইবনু মুসাইয়িবের সূত্রে প্রচার করে। এগুলো সবই জাল ও ভিত্তিহীন। এছাড়া আরো অনেক জাল সনদ তৈরি করে সে অনেক জাল হাদীস প্রচার করেছে। সকল মুহাদ্দিস একমত যে লোকটি পরিত্যাক্ত, মিথ্যাবাদী ও জালিয়াতে। (নাসাঈ, আদ-দুআফা, পৃ. ২৯; ইবনু আদী, আল-কামিল ২/৭৯, ২০২-২১৪; ইবনুল জাওযী , আদ-দুআফা, ১/২২৭; যাহাবী, মীযানুল ইতিদাল ২/৩৩৭; ইবনু হাজার, লিসানুল মীযান ২/৩৩২-৩৩৩)
হাকামের বানানো এ জাল হাদীসটির আরেকটি বর্ণনা :
যদি আমার জীবনে এমন একটি দিন আসে যে দিনে আমি আল্লাহর নিকটবর্তী করার মত কোনো একটি ভাল কর্ম বৃদ্ধি করতে পারি নি, সে দিনে আমার জন্য কোনো বরকত না হোক। (ইবনু আদী, আল-কামিল ২/৭৯, ৩/২৯৪; ইবনু জাওযী, মাউযূআত ১/১৬৯; যাহাবী, তারতীব, পৃ. ৫৯; ইবনু র্আরাক, তানযীহ ১/২৫৬, ২/২৮৯; শাওকানী, আল-ফাওয়াইদ ২/৩৫৫; যারকানী, মুখতাসারুল মাকাসিদ, পৃ. ১৫২; আলবানী, যায়ীফাহ ১/৫৫৭-৫৫৯)
৪২.কুরআন দিয়ে হাদীস বিচার
ইসলামী ইলম-এর মূল উৎস দুটি: কুরআন ও হাদীস। আমরা দেখেছি যে, হাদীসের জ্ঞান কুরআনের জ্ঞানের অতিরিক্ত। তা কুরআনের ব্যাখ্যা হতে পারে বা কুরআনের সংযোজন হতে পারে। প্রথম পর্বের আলোচনায় আমরা দেখেছি যে, এ মূলনীতির ভিত্তিতেই সাহাবীগণের যুগ থেকে সকল যুগে মুসলিম উম্মাহর আলিমগণ হাদীসের বিশুদ্ধতা, সূত্র, উৎস, অর্থ ইত্যাদি বিচার করেছেন। এক্ষেত্রেও জালিয়াতগণ বিভিন্ন রকমের জালিয়াতি করেছে। এ সকল জালিয়াতির উদ্দেশ্য হলো, ডকুমেন্টারী- নিরীক্ষা না করে ইচ্ছামাফিক- অর্থ- বিচার করে হাদীস গ্রহণ- বা বর্জন করা। কেউ কুরআন দিয়ে হাদীস বিচার- করার পক্ষে জাল হাদীস বানিয়েছে। কেউ ভাল-মন্দ- অর্থ দেখে হাদীস বিচারের জন্য জাল হাদীস বানিয়েছে। কেউ নির্বিচারে ভক্তিভরে- হাদীস গ্রহণ করার জন্য জাল হাদীস বানিয়েছে। এ জাতীয় একটি হাদীসে বলা হয়েছে :
যখন তোমাদেরকে আমার থেকে কোনো হাদীস বলা হবে, তখন তোমরা তা আল্লাহর কিতাবের উপরে পেশ করবে (কুরআনের সাথে মিলিয়ে দেখবে।) যদি তা আল্লাহর কিতাবের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় তবে তা গ্রহণ করবে। আর যদি তা তার বিরোধী হয় তবে তা প্রত্যাখ্যান করবে।
এ হাদীসটি- এবং এ অর্থে বর্ণিত বিভিন্ন বাক্য- সবই ভিত্তিহীন। এ অর্থের অধিকাংশ বক্তব্যই সনদবিহীন মিথ্যা কথা। দু একটি বাক্য এ অর্থে সনদসহও বর্ণিত হয়েছে, যেগুলোর সনদে মাতরূক, মুনকার বা পরিত্যক্ত- ও মিথ্যায় অভিযুক্ত রাবি বিদ্যমান। মুহাদ্দিসগণ উল্লেখ করেছেন যে ইসলামের গোপন শত্র যিনদীকগণ এ সকল হাদীস তৈরি করে প্রচার করে।
স্বভাবতই কোনো হাদীসই কুরআন বিরোধী- হয় না। তবে ডকুমেন্টারী- প্রমাণ ছাড়া যদি কুরআন- দিয়ে হাদীস বিচার করা হয় তবে প্রত্যেকেই তার নিজ মর্জি- দিয়ে হাদীস বিচার করবে। একজন সহজেই বলতে পারবে যে, কুরআনে পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের কথা নেই অতএব পাঁচ ওয়াক্ত সালাতের হাদীসগুলো কুরআন বিরোধী, কাজেই তা প্রত্যাখ্যান করতে হবে। অন্য ব্যক্তি বলবে, বৎসরপূর্তির পরে যাকাত- প্রদানের বিধান কুরআন বিরোধী। আরেকজন সহজেই বলতে পারবে, উকাশার প্রতিশোধ গ্রহণের কাহিনী- কুরআনের ইনসাফ প্রতিার নির্দেশের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, কাজেই তা সহীহ। অথবা কুরআনে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে রাহমাতুল্লিল আলামীন- বলা হয়েছে, কাজেই আপনি না হলে বিশ্ব সৃি করতাম না- হাদীসটি সহীহ। অথবা কুরআনে সাহাবীদের প্রশংসা করা হয়েছে, কাজেই আমার সাহাবীগণ নক্ষত্রতুল্য- হাদীসটি সহীহ। এভাবে প্রত্যেকেই নিজের মর্জি মত দাবি দাওয়া করতে থাকত এবং মুসলিম উম্মাহ অন্তহীন বিভ্রান্তির আবর্তে পড়তেন। এ উদ্দেশ্যেই যিনদীকগণ এ হাদীসগুলো বানিয়েছিল। তবে মুহাদ্দিসগণের সনদ নিরীক্ষার ফলে তাদের জালিয়াতি ধরা পড়েছে। (সাগানী, আল-মাউদূআত, পৃ. ৭৬; ইবনু তাইমিয়া, আহাদীসুল কুস্সাস, পৃ ৮১; হাইসামী, মাজমাউয যাওয়াইদ ১/১৭০; তাহির পাটনী, তাযকিরা, পৃ. ২৮; আজলূনী, কাশফুল খাফা ১/৮৯; শাওকানী, আল-ফাওয়াইদ ২/৩৭৪)
৪৩. ভাল- অর্থ দেখে হাদীস বিচার
দ্বিতীয় পর্যায়ের হাদীসগুলোর মধ্যে রয়েছে :
আমার পক্ষ থেকে কোনো কল্যাণ- বা ভালো- তোমাদের কাছে পৌঁছালে আমি বলি অথবা না-ই বলি, আমি তা বলি (তোমরা তা গ্রহণ করবে)। আর তোমাদের কাছে কোনো খারাপ- বা অকল্যাণ- পৌঁছালে (তা গ্রহণ করবে না); কারণ আমি খারাপ- বলি না।
এ অর্থের অন্য একটি জাল হাদীস নিম্নরূপ :
যখন আমার পক্ষ থেকে কোনো হাদীস তোমাদেরকে বলা হবে যা হক্ক- বা সত্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তখন তোমরা তা গ্রহণ করবে- আমি তা বলি অথবা নাই বলি।
এরূপ ভালমন্দ- অর্থ বিচার করে হাদীস গ্রহণের বিষয়ে আরো কয়েকটি হাদীস- বর্ণিত হয়েছে। এ অর্থে বর্ণিত কিছু হাদীস সন্দেহাতীতভাবে জাল ও মিথ্যা বলে প্রমাণিত। এগুলোর সনদে সুপরিচিত মিথ্যাবাদী রাবী বিদ্যমান। আর কিছু হাদীস অত্যন্ত দুর্বল সনদে বর্নিত, যেগুলোকে কেউ যয়ীফ- বলেছেন এবং কেউ মাউযূ- বলেছেন।
আমরা দেখেছি যে, সাহাবীগণের যুগ থেকেই হাদীস যাচাইয়ের ক্ষেত্রে অর্থ- বিচার করা হয়। তবে যে কোনো হাদীসের ক্ষেত্রে সর্ব-প্রথম বিচার্য হলো, কথাটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন বলে প্রমাণিত কিনা। তিনি বলুন অথবা না বলুন, হক্ক, সত্য বা ভালর সাথে মিল হলেই তা নির্বিচারে- হাদীস- বলে গ্রহণ করার অর্থই হলো তিনি যা বলেন নি তা তাঁর নামে বলার পথ প্রশস্ত করা। আর অগণিত হাদীসে তা নিষেধ করা হয়েছে। এজন্য মুহাদ্দিসগণ এ বিষয়ক দুর্বল- হাদীসগুলোকেও অর্থগতভাবে বাতিল বলে গণ্য করেছেন। অনেক দুর্বল রাবী ভুল বশত এক হাদীসের সনদ অন্য হাদীসে জুড়ে দেন, মতন পাল্টে ফেলেন। এজন্য কখনো কখনো দুর্বল বা অজ্ঞাত পরিচয় রাবীর হাদীসও অর্থ বিচারে মাউযূ বা বাতিল বলে গণ্য করা হয়। (আহমাদ, আল-মুসনাদ ২/৩৬৭, ৪৮৩; ইবনু মাজাহ, আস-সুনান ১/৯; ইবনুল জাওযী, আল-মাউদূআত ১/১৮৭-১৮৮; হাইসামী, মাজমাউয যাওয়াইদ ১/১৫৪; ইবনু হাজার, আল-কাউলুল মুসাদ্দাদ, পৃ. ৮৭-৮৯; সুয়ূতী, আল-লাআলী ১/২১৩-২১৪; ইবনু র্আরাক, তানযীহ ১/২৬৪; তাহির পাটনী, তাযকিরা, পৃ. ২৭-২৮; শাওকানী, আল-ফাওয়াইদ ২/৩৫৯-৩৬৩; আলবানী, যায়ীফাহ ৩/২০৩-২১১)
৪৪. ভক্তিতেই মুক্তি !
সাধারণ মানুষ যাতে নির্বিচারে- জাল হাদীসগুলো গ্রহণ করে, এজন্য জালিয়াতগণ ভক্তিতেই মুক্তি- মর্মে অনেক হাদীস বানিয়েছে। যেমন:
যদি কারো কাছে কোনো ফযীলতের- বা সাওয়াবের কথা পৌঁছে এবং সে তা বিশ্বাস করে এবং সাওয়াবের আশায় তা গ্রহণ করে, তবে আল্লাহ তাকে সে সাওয়াব দান করবেন; যদিও প্রকৃত পক্ষে তা সঠিক না হয়। অথবা তাকে যে কথাটি বলেছে সে যদি মিথ্যাবাদীও হয়।
অনুরূপ আরেকটি মিথ্যা ও বানোয়াট হাদীস :
যদি কারো কাছে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো ফযীলত বা সাওয়াবের কথা পৌঁছে, কিন্তু সে তা সত্য বলে মেনে না নেয়, তবে সে ব্যক্তি সেই ফযীলতটি লাভ করবে না।
দাজ্জালদের বানানো আরেকটি বানোয়াট কথা :
যদি তোমাদের কেউ কোনো পাথরের ব্যাপারেও ভাল ধারণা পোষণ করে, তবে সে পাথর দ্বারাও আল্লাহ তার উপকার করবেন।
এ কথাগুলো এবং এ অর্থে বর্ণিত সকল কথাই জঘন্য মিথ্যা, যা মিথ্যাবাদী দাজ্জালগণ বানিয়েছে এবং এগুলোর জন্য সনদও বানিয়েছে। তবে সাহাবীগণ হাদীস বর্ণনার জন্য সনদ বলার অপরিহার্যতার রীতি প্রচলনের ফলে মুসলিম উম্মাহ এদের জালিয়াতি থেকে আত্মরক্ষার পথ পেয়েছেন। মুহাদ্দিসগণ দেখেছেন যে, এ সকল হাদীসের প্রত্যেকটির সনদেই মিথ্যাবাদী ও জালিয়াত বিদ্যমান। এজন্য তাঁরা এ সকল হাদীস জাল বলে চিহ্নিত করেছেন। আর একাধিক সনদের কারণে কোনো কোনো মুহাদ্দিস এগুলোকে অত্যন্ত দুর্বল- বলে উল্লেখ করে এগুলোর সহীহ হাদীস সম্মত ব্যাখ্যা করার চো করেছেন। (দাইলামী, আল-ফিরদাউস ৩/৫৫৯-৫৬০; ইবনুল জাওযী, আল-মাউদূআত ১/১৮৮; সাখাবী, আল-মাকাসিদ, পৃ. ৩৪৪, ৪০২-৪০৩; সুয়ূতী, আল-লাআলী ১/২১৪; ইবনু র্আরাক, তানযীহ ১/২৬৫; তাহির পাটনী, তাযকিরাহ, পৃ. ২৮; মোল্লা কারী, আল-আসরার, পৃ. ১৮৯-১০৯০, ২২৪-২২৫; আলবানী, যায়ীফাহ ১/৬৪৭-৬৫৪)
৪৫.কিছু সময় চিন্তা-ফিকর হাজার বৎসর ইবাদত থেকে উত্তম
ইলমের ফযীলতে বানানো আরেকটি জাল হাদীস :
এক মুহূর্ত বা কিছু সময় চিন্তা-ফিক্র করা এক বছর ইবাদত করা থেকে উত্তম। কেউ বলেছেন: ৭০ বছরের ইবাদত থেকে উত্তম। আর কেউ আরেকটু বাড়িয়ে বলেছেন: হাজার বৎসরের ইবাদত থেকে উত্তম।
মুহাদ্দিসগণ হাদীসটি জাল বলে উল্লেখ করেছেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কথা হিসাবে তা মিথ্যা। কথাটি পূর্ববর্তী কোনো আলিমের উক্তি মাত্র। (মোল্লা কারী, আল-আসরার, ৯৭ পৃ,আলবানী, যায়ীফুল জামিয় ৫৮১ পৃ।)
