প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ ৯ম সংখ্যা, মার্চ ২০১৭, জমা.আউ-জমা.সানি ১৪৩৮ হিজরী, ফাল্গুন-চৈত্র ১৪২৩বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়
১. মুসলিমের দ্বীন নিয়ে, তার দ্বীনদারী ও দ্বীনি আকৃতি এবং পরিচ্ছদ নিয়ে উপহাস করা বৃহত্তর সর্বনাশ। যে বিষয় নিয়ে বিদ্রূপ করা হয় তা দ্বীন জেনে এবং তা দ্বীনের এক আমল, ইবাদত বা প্রতীক জেনেও ব্যঙ্গ করা কুফর। এ ধরনের বিদ্রূপকারী ইসলাম থেকে বহির্ভূত হয়ে যায়।
২. এক ব্যক্তি তবুকের যুদ্ধ-সফরে এক বৈঠকে রাসূল ও তার সাহাবাগণের সমালোচনা করে বলল, ‘আমাদের ঐ ক্বারীদের মত অধিক পেটুক, মিথ্যুক এবং কাপুরুষ আর কাউকে দেখিনি।’ এ কথা শুনে ঐ বৈঠকের এক ব্যক্তি বলল, ‘তুমি মিথ্যা বলছ, বরং তুমি মুনাফিক। আমি এ বিষয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবশ্যই খবর দেব।’ মুনাফিকরা আরো ভয় করল যে, হয়তোবা কুরআন অবতীর্ণ হয়ে তাদের এ বিষয়ের বাস্তবতা প্রকাশ হয়ে যাবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর নিকট খবর পৌঁছলে তারা তাঁর কাছে ওযর ও অজুহাত পেশ করতে লাগল, বলল, ‘আমরা এমনিই মজাক ছলে বলাবলি করছিলাম!’ কিন্তু কুরআন তার স্পষ্টতা বর্ণনা করে ঘোষণা করল :
يَحْذَرُ الْمُنَافِقُونَ أَنْ تُنَزَّلَ عَلَيْهِمْ سُورَةٌ تُنَبِّئُهُمْ بِمَا فِي قُلُوبِهِمْ ۚ قُلِ اسْتَهْزِئُوا إِنَّ اللَّهَ مُخْرِجٌ مَا تَحْذَرُونَ
وَلَئِنْ سَأَلْتَهُمْ لَيَقُولُنَّ إِنَّمَا كُنَّا نَخُوضُ وَنَلْعَبُ ۚ قُلْ أَبِاللَّهِ وَآيَاتِهِ وَرَسُولِهِ كُنْتُمْ تَسْتَهْزِئُونَ
لَا تَعْتَذِرُوا قَدْ كَفَرْتُمْ بَعْدَ إِيمَانِكُمْ ۚ إِنْ نَعْفُ عَنْ طَائِفَةٍ مِنْكُمْ نُعَذِّبْ طَائِفَةً بِأَنَّهُمْ كَانُوا مُجْرِمِينَ
অর্থঃ মুনাফিকরা ভয় করে যাতে এমন এক সূরা অবতীর্ণ না হয়, যা ওদের অন্তরের কথা ব্যক্ত করে দেবে। বল, ‘বিদ্রূপ করতে থাক, তোমরা যা ভয় কর আল্লাহ তা প্রকাশ করে দেবেন।’ আর তুমি ওদের প্রশ্ন করলে ওরা নিশ্চয়ই বলবে ‘আমরা তো আলাপ-আলোচনা ও ক্রীড়া-কৌতুক করছিলাম।’ বল, ‘তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর নির্দেশ ও রাসূলকে নিয়ে বিদ্রূপ করছিলে?’ দোষ স্খলনের চেষ্টা করো না, তোমরা ঈমান আনার পর কাফের হয়ে গেছ। তোমাদের মধ্যে কোন দলকে ক্ষমা করলেও অন্য দলকে শাস্তি দেব; কারণ তারা অপরাধী।” (সূরা তাওবা, ৬৪-৬৬ আয়াত)
৩. বর্তমান সমাজেও ব্যঙ্গকারীর অভাব নেই। বিজাতির পক্ষ হতে বিদ্রূপাত্মক কথা তো স্বভাবতই শ্রুত, কিন্তু মুসলিম সমাজেও এমন অনেক নামধারী মুসলিম আছে, যারা দ্বীন ও দ্বীনের বহু বিষয় নিয়ে প্রহসন করে থাকে। কেউ তো লেখার মাধ্যমে, কেউ তো ভ্রকুটি হেনে, কেউ বা মুখ ভেংচিয়ে বা ঠোঁট লম্বা করে অথবা জিব বের করে দ্বীনের বড় বড় প্রতীক ও ওলামাদের প্রতি বিদ্রূপ করে থাকে। ধর্মপ্রাণ মুসলিমকে ‘ মোল্লা, মোল্লাজী, প্রাচীন-পন্থী, মৌলবাদী, গোঁড়া, ধর্ম্যান্ধ, প্রতিক্রিয়াশীল’ ইত্যাদি বলতে দ্বিধা করে না। পার্থিব জীবনের ক্ষনসুখ-সমৃদ্ধির বাহ্যিক জ্ঞান নিয়ে ইহ-পরকালের চিরসুখের জ্ঞানীদের সম্পর্কে ওরা বলে ‘মোল্লার দৌড় মসজিদ পর্যন্ত।’ ‘এদের বিদ্যা ফকীরী বা ভিখিরী বিদ্যা।’ শ্রদ্ধাপূর্ণ পোশাক বোরকার জন্য বলে, ‘ভূতের লেবাস।’ বেপর্দা পরিবেশে কেউ পর্দা করলে আত্মীয়রাও ইঙ্গিতে, ইশারায় ও হাসিতে ব্যঙ্গ করে থাকে।
৪. এ সব উপহাস শুনে মুমিনের হৃদয় দগ্ধীভূত হয়। তাই মুমিনদের জন্য রয়েছে আল্লাহর আশ্বাস বাণী। তিনি বলেন :
إِنَّ الَّذِينَ أَجْرَمُوا كَانُوا مِنَ الَّذِينَ آمَنُوا يَضْحَكُونَ
وَإِذَا مَرُّوا بِهِمْ يَتَغَامَزُونَ
وَإِذَا انْقَلَبُوا إِلَىٰ أَهْلِهِمُ انْقَلَبُوا فَكِهِينَ
وَإِذَا رَأَوْهُمْ قَالُوا إِنَّ هَٰؤُلَاءِ لَضَالُّونَ
وَمَا أُرْسِلُوا عَلَيْهِمْ حَافِظِينَ
فَالْيَوْمَ الَّذِينَ آمَنُوا مِنَ الْكُفَّارِ يَضْحَكُونَ
عَلَى الْأَرَائِكِ يَنْظُرُونَ
هَلْ ثُوِّبَ الْكُفَّارُ مَا كَانُوا يَفْعَلُونَ
অর্থঃ দুষ্কৃতিকারীরা মুমিনদের নিয়ে উপহাস করত এবং যখন তাদের নিকট দিয়ে যেত, তখন বক্রদৃষ্টিতে ইশারা করত। ওরা যখন ওদের আপনজনের নিকট ফিরে আসত, তখন উৎফুল্ল হয়ে ফিরত এবং যখন ওদেরকে দেখত তখন বলত, ‘অবশ্যই ওরা পথভ্রষ্ট।’ ওদেরকে তো তাদের তত্ত্বাবধায়ক করে পাঠানো হয়নি। আজ মুমিনগণ কাফেরদের নিয়ে উপহাস করছে; সুসজ্জিত আসন হতে ওদেরকে অবলোকন করে। কাফেরদল ওদের কৃতকর্মের প্রতিফল পেল তো?” (সূরা তাত্বফীফ, ২৯-২৬ আয়াত)
৫. কাফেরদেরকে পরকালে আল্লাহ তাআলা বলবেন : “তোরা হীন অবস্থায় এখানেই (জাহান্নামে) থাক এবং আমাকে কোন কথা বলিস্ না। আমার বান্দাদের মধ্যে একদল ছিল যারা বলত, ‘হে আমাদের প্রতিপালক। আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি, তুমি আমাদেরকে ক্ষমা কর, তুমি তো শ্রেষ্ঠ দয়ালু।’ কিন্তু তাদের নিয়ে তোরা হাসি-ঠাট্টা করতে এত বিভোর ছিলিস্ যে, তা তোদেরকে আমার কথা ভুলিয়ে দিয়েছিল। তোরা তাদের নিয়ে হাসতিস। আমি আজ তাদের ধৈর্যের কারণে তাদেরকে এমনভাবে পুরস্কৃত করলাম যে, তারাই হল সফলকাম।” (সূরা মমিনুন : ১০৮ – ১১১ আয়াত)
