প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ ৯ম সংখ্যা, মার্চ ২০১৭, জমা.আউ-জমা.সানি ১৪৩৮ হিজরী, ফাল্গুন-চৈত্র ১৪২৩বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়

১০৩. ঘন ঘন ভূমিকম্প

১. ঘন ঘন ভূমিকম্প কিয়ামাতের আরেকটি আলামত। আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেনঃ কিয়ামাত কায়িম হবে না যতক্ষণ না ধর্মীয় জ্ঞান উঠিয়ে নেয়া হবে এবং ভূমিকম্প বেড়ে যাবে। ( বুখারী ৭১২১)

২. ইতিপূর্বে অনেক ভূমিকম্প দেখা দিয়েছে। তবে কিয়ামাত যতই ঘনিয়ে আসবে ততই ভূমিকম্প আরো ব্যাপক এবং আরো দীর্ঘস্থায়ী হবে। আব্দুল্লাহ বিন্ হওয়ালাহ্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, একদা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজের হাত খানা আমার মাথায় রেখে বললেনঃ
হে ইবনু হাওয়ালাহ্! যখন তুমি দেখবে বাইতুল মাক্বদিসে খিলাফত প্রথা চালু হয়েছে তখন মনে করবে, ভূমিকম্প, বিপদাপদ এবং বড়ো বড়ো অঘটনসমূহ অতি সন্নিকটে।তখন কিয়ামাত এতো অতি সন্নিকটে যেমন আমার হাত তোমার মাথার সন্নিকটে। ( আহ্মাদ্ ৫/২৮৮)

৩. এসব ভূমিকম্প হয়ত অপরাধ প্রবনতা বেড়ে যাওয়ার শাস্তিস্বরূপ হবে; অথবা আল্লাহর পক্ষ থেকে পাপ মার্জনা ও রহমতস্বরূপত্ত হতে পারে।

৪. আবূ মুছা আশআরী (রাঃ) বর্ণিত, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- “আমার উম্মাত অনুগ্রহপ্রাপ্ত। আখেরাতে তাদের কোন শাস্তি নেই। ব্যাপক হত্যাকাণ্ড, অধিক ভূ-কম্পন ও ফিতনাসমূহের মাধ্যমে শাস্তির পালা তাদের দুনিয়াতে-ই শেষ।” (মুসনাদে আহমদ, মুস্তাদরাকে হাকিম)

১০৪. ভূমিধ্বস, ১০৫ রূপবিকৃতি, ১০৬ পাথর বর্ষণের শাস্তি

১. ভূমিধ্বস, রূপবিকৃতি ও পাথর বর্ষণের শাস্তি অবতীর্ণ হওয়া কিয়ামাতের আরেকটি আলামত। সৎ কাজের আদেশ এবং অসৎ কাজের নিষেধ হ্রাস পাওয়ার ফলে মাত্রাতিরিক্ত হারে অপরাধ-বিস্তার ঘটবে। আর তখনই উল্লেখিত শাস্তিগুলো ঘটতে থাকবে।

২. আয়িশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেনঃ এ উম্মতের শেষ দিকে দেখা দিবে ভূমিধ্বস, রূপবিকৃতি ও পাথর বর্ষণের শাস্তি। হযরত আয়িশা (রাঃ) বলেন, আমি বললামঃ হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি তখন ধ্বংস হয়ে যাবো; অথচ তখনো আমাদের মধ্যে থাকবে সৎকর্মশীল ব্যক্তিগণ। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- হ্যাঁ, তাই হবে যখন অপকর্ম সর্বস্তরে বিস্তার লাভ করবে। (তিরমিযী ৬৮৪১৮ স’হীহুল জামি‘ হাদীস ৮০১২)

৩. আব্দুল্লাহ বিন্ মাস‘উদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেনঃ কিয়ামাতের পূর্বে রূপ বিকৃতি, ভূমিধ্বস ও পাথর বর্ষনের শাস্তি দেখা দিবে। (ইব্নু মাজাহ্ ২৮১৩৪৯)

৪. তকদীর অবিশ্বাসী একদল নাস্তিক এবং কুসংস্কারী কিছু যিন্দীক-এর উপরও উপরোক্ত তিন ধরনের শাস্তি আবর্তিত হবে বলে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ভবিষ্যৎদ্বাণী করে গেছেন।

৫. নাফে থেকে বর্ণিত তিনি বলেন- একদা আমরা আব্দুল্লাহ বিন উমর (রাঃ) এর কাছে বসা ছিলাম। এক ব্যক্তি এসে বলল- অমুক (শামের একজন ব্যক্তি) আপনাকে সালাম জানিয়েছে। আব্দুল্লাহ বিন উমর বললেন- শুনেছি, সে নতুন কোন কুসংস্কার আবিস্কার করেছে। যদি তাই হয়, তবে তাকে গিয়ে আমার সালাম বলবে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আমি বলতে শুনেছি- “কুসংস্কার যিন্দীক এবং তকদীরে অবিশ্বাসী ব্যক্তিদের উপর ভূমিধ্বস এবং পাথর বর্ষণের শাস্তি আবর্তিত হবে।” (মুসনাদে আহমদ ৯/৭৩-৭৪)

৬. যখন গান- বাদ্য ও মদপান বেড়ে যাবে, তখনই এ ধরনের শাস্তি অবতীর্ন হবে।
ইমরান বিন্ হুসাইন (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন ঃ রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরশাদ করেন ঃ এ উম্মতের মাঝে ভূধ্বস, রূপ বিকৃতি ও পাথর বর্ষণ দেখা দেবে। জনৈক সাহাবী বললেন ঃ হে আল্লাহর রাসূল! তা কখন হবে? তিনি বললেন ঃ যখন গায়ক-গায়িকা ও হরেক রকমের বাদ্যযন্ত্র বিস্তার লাভ করবে এবং মদ্য পান করা হবে। (তিরমিযী, হাদীস ৪৫৮স‘হীহুল্ জামি‘, হাদীস ৪১১৯)

৭. আবু মালেক আশ্‘আরী (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেনঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন ঃ অচিরেই আমার কিছু উম্মত মদ্য-পান করবে পরিচিত নাম ভিন্ন অন্য নামে। তাদের সামনেই বাদ্যযন্ত্র বাজানো হবে। আল্লাহ তা‘আলা তাদেরকে ভূমিধ্বসে আক্রান্ত করবেন এবং তাদের কেউ কেউকে শূকর ও বানরে পরিণত করবেন। ( ইব্নু মাজাহ্, হাদীস ৪৫৮ স‘হীহুল্ জামি‘, ৪১১৯)

৮. রূপবিকৃতি প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য উভয়ভাবেই হতে পারে। তবে যদি তা অপ্রকাশ্যভাবেই ধরা হয় তা হলে তা এখনই পাওয়া যাচ্ছে। কারণ, যারা বর্তমানে গুনাহ্’র কর্মকান্ডকে স্বাভাবিক বা হালাল মনে করেছে তাদের অন্তরের বিপুল পরিবর্তন ঘটেছে। তারা হালাল- হারাম, বৈধাবৈধের মাঝে কোন পার্থক্যই করে না। এ দিকে প্রকাশ্য বিকৃত তো তাদের জন্য বরাদ্দ থাকছেই।

৯. কিয়ামাতের পূর্বে আরবই বিশেষভাবে ভূমিধ্বসের স্বীকার হবে। আব্দুর রহ্মান তাঁর পিতা থেকে বর্ণনা করেনঃ তাঁর পিতা বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন ঃ কিয়ামাত কায়িম হবে না যতক্ষণ না কয়েকটি আরব বংশ ভূমিধ্বসে আক্রান্ত হয়। তখন জিজ্ঞাসা করা হবে ঃ অমুক বংশের আর কে বেঁচে আছে? বর্ণনাকারী সাহাবী বলেনঃ “ক্বাবায়িল” শব্দ শুনতেই আমার মনে হলো, এরা আরব। কারণ, অনারবদেরকে এলাকার প্রতি সম্পৃক্ত করেই তাদের পরিচয় দেয়া হবে। যেমন- বলা হতো রোমান, পারস্যবাসী ইত্যাদি। ( আহ্মাদ্ ৪/৪৮৩ মাজ্মা‘উয্ যাওয়ায়িদ ৮/৯)
কারো কারো মতে উক্ত হাদীসটি দুর্বল। তবে ইমাম হাইসামী হাদীসটিকে বিশুদ্ধ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

১০. অপর হাদীসে-কাবা শরীফে আশ্রিত (ইমাম মাহদী)র বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে আসা বিশাল নামধারী মুসলিম বাহিনীকে-ও পুরোপুরি মাটির নিচে ধ্বসে দেয়া হবে।
বুকাইরা থেকে বর্ণিত তিনি বলেন- আমি নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে মিম্বারে দাড়িয়ে বলতে শুনেছি- “বিশাল বাহিনী আশপাশ কোথাও ধ্বসে গেছে বলে যখন সংবাদ পাবে, (মনে রেখো) তখন কিয়ামাত সন্নিকটে এসে গেছে।” (মুসানাদে আহমদ ৬/৩৭৮-৩৭৯)
অর্থাৎ মদিনা-র সন্নিকটেই ভূমিধ্বসের ঘটনা ঘটবে। উক্ত বাহিনীর আলোচনা সামনে আসবে ইনশা-আল্লাহ।

১১. পাপিষ্ঠ এবং নীরবতা অবলম্বনকারীদের উপরই এ ধরনের শাস্তি আপতিত হবে। সকল মুসলমানকে এ ব্যাপারে সতর্ক থাকা আবশ্যক।
ইতিপূর্বে যে ভূমিধ্বসগুলো প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে দেখা দিয়েছে তা গুনাহ্গারদের প্রতি সংকেত মাত্র। যাতে তারা পুনরায় সঠিক পথে ফিরে আসে।

১০৭. পর্বতমালার স্থানচ্যুতি

১. পৃথিবীকে প্রতিনিয়ত বসবাস উপযোগী রাখতে আল্লাহ পাক স্থানে স্থানে পর্বতমালা স্থাপন করেছেন। কিয়ামাতের পূর্বমুহূর্তে পাহাড়-পর্বত স্থানচ্যূত হয়ে পড়বে।
* অধিক হারে বজ্র এবং ভূমিধ্বসের ফলে বাস্তবই হয়ত এমন ঘটবে।
* পাহাড় কেটে ঘরবাড়ী এবং বড় বড় ফ্যাক্টরি নির্মাণের দরুন পর্বতের স্থানচ্যুতি ঘটবে। পর্বত- বহুল দেশগুলোতে বর্তমানে এমনটি-ই ঘটছে।
* অথবা প্রস্তর-খন্ডকারে ভাঙতে ভাঙতে এক সময় পর্বত বিলীন হয়ে যাবে।

২. সামুরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন- “কিয়ামাত সংঘটিত হবে না, যতক্ষণ না পর্বমালার স্থানচ্যুতি ঘটে তোমরা স্বচক্ষেই দেখতে পাবে।” (তাবারানী)

১০৮. নতুন চাঁদ বড় আকারে দেখা দেয়া

১. নতুন চাঁদ বড় আকারে দেখা দেয়া কিয়ামাতের আরেকটি আলামত। স্বভাবত আরবী মাসের প্রথম দিনে চন্দ্রের জন্ম হয়। অতঃপর আস্তে আস্তে বড় হয় অর্ধমাসে গিয়ে পূর্ণিমার আকার ধারণ কর। আবার কমতে কমতে মাসের শেষ দিকে এসে নিঃশেষ হয়ে যায়।
কিয়ামাত ঘনিয়ে আসার অন্যতম নিদর্শন হল- চন্দ্র স্ফীত হয়ে যাবে। নব উদিত প্রথম দিনের চাঁদ দেখে মানুষ বলতে থাকবে- “আরে এতো দুই দিনের চাঁদ মনে হচ্ছে।”

২. আব্দুল্লাহ্ বিন্ মাস‘উদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন ঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেনঃ কিয়ামাত সন্নিকটে আসার আলামত এও যে, নতুন চাঁদ তখন বড় আকারে দেখা দিবে। (স‘হী’হুল্ জামি’, হাদীস ৫৭৭৪)

৩. আবূ হুরাইরা (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেনঃ কিয়ামাত সন্নিকটে আসার আলামত এও যে, নতুন চাঁদ তখন বড় আকারে দেখা দিবে। এক রাত্রির চাঁদ দেখে বলা হবেঃ এ তো দু’ রাত্রির চাঁদ। (মায্মা‘উয্যাওয়ায়িদ্ ৬/১৪৬)

৪. আনাস্ (রাঃ) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেনঃ কিয়ামাত সন্নিকটে আসার আলামত এটিও যে, তখন এক রাত্রির চাঁদ দেখে বলা হবেঃ এ তো দু‘ রাত্রির চাঁদ। (স‘হী’হুল্ জামি‘, হাদীস ৫৭৭৪)

৫. রামাদান ও ঈদের চাঁদ দেখা নিয়ে আমাদের দেশে বেশ কয়েকবার মতোবিরোধ দেখা দেয় । কেউ বলেছে আজ এক দিনের চাঁদ, আবার কেউ বলেছে দু’দিনের। এমনকি এর উপর ভিত্তি করে এক দিন আগে পরে রোযা রেখেছে ও ঈদ করেছে। চন্দ্র-স্ফীতির জন্যই সম্ভবত এমনটি হয়েছে বলে আমাদের মনে হয়।