প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ১২ম সংখ্যা, জুন ২০১৬, শাবান-রমাদান ১৪৩৭ হিজরী, জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় ১৪২৩ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়

ফুরফুরার মরহুম পীর সাহেব (রহ.) এর অন্যতম খলীফা ও জামাতা
ড.খোন্দকার আ,ন,ম আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহ.) এর ইন্তেকাল
ভেঙে গেল তলোয়ার

ফুরফুরার মরহুম পীর আবুল আনসার মো: আব্দুল কাহ্হার সিদ্দিকী (রহ.) এর অন্যতম খলিফা ও সেঝ জামাতা, কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের আল হাদীস ও ইসলামি স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক, বহু গ্রন্থ প্রণেতা, ঝিনাইদহ কেন্দ্রিয় জামে মসজিদের খতিব, আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন ইসলামী বক্তা, আমাদের উস্তাদ ড, খোন্দকার আ. ন. ম. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহ.) গত ১১ মে বুধবার আনুমাণিক সকাল আটটায় এক সড়ক দুর্ঘটনায় ইন্তেকাল করেছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।

১১ মে সকালে ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর হুজুর তার সফরসঙ্গী আসাদ ও বাহাউদ্দিন ভাইকে নিয়ে নিজের প্রাইভেট কারে করে ঝিনাইদহ থেকে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেন। গাড়ী চালাচ্ছিল ড্রাইভার সেন্টু মল্লিক। ড্রাইভারের পাশের সিটে ছিলেন হুজুর। আর পেছনের সিটে বসেছিলেন আসাদ ও বাহাউদ্দিন ভাই। মাগুরা সদর উপজেলার পারনান্দুয়াল এলাকায় (পল্লীবিদ্যুৎ অফিসের নিকটে বাস টার্মিনালের কাছে) ঢাকা সড়কের তিন নং ব্রিজ নামক স্থানে বিপরীত দিক থেকে আসা রাইফ কার্গো সার্ভিস এর কাভার্ডভ্যানের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে গাড়ীর ড্রাইভার ঘটনাস্থলেই এবং ড. সাহেব হুজুর মাগুরা হাসপাতালে নেয়ার পথে ইন্তেকাল করেন। হুজুরের অপর দুই সফর সঙ্গী বর্তমানে চিকিৎসাধীন আছেন।

১২ মে বাদ মাগরিব ঝিনাইদহ গভর্মেন্ট বয়েজ স্কুল মাঠে নামাজে জানাজা শেষে তাঁর প্রতিতি আস-সুন্নাহ্ ট্রাস্ট মসজিদের নিকটে পিতার কবরের পাশে তাঁকে দাফন করা হয়।

ড. সাহেব হুজুর (রহ.) ১৯৬১ সালের ১ ফেব্রয়ারি ঝিনাইদহের ধোপাঘাট গোবিন্দপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা খোন্দকার আনওয়ারুজ্জামান ও মা বেগম লুৎফুন্নাহার। তিনি ঢাকা সরকারি আলিয়া মাদ্রাসা থেকে ১৯৭৩ সালে দাখিল, ১৯৭৫ সালে আলিম এবং ১৯৭৭ সালে ফাজিল ও ১৯৭৯ সালে হাদীস বিভাগ থেকে কামিল পাস করেন। তার বিশেষ শিক্ষকদের মধ্যে ছিলেন মিয়া মুহাম্মাদ কাসিম ও বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের সাবেক খতিব উবায়দুল হক (রহ:)। এরপর তিনি সৌদি আরবের রিয়াদের বিশ্ববিখ্যাত ইসলামি বিদ্যাপীঠ ইমাম মুহাম্মাদ বিন সাউদ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮৬ সালে অনার্স, ১৯৯২ সালে মাস্টার্স ও ১৯৯৮ সালে পি.এইচ.ডি ডিগ্রি অর্জন করেন। এ সময় তিনি বর্তমান সৌদি বাদশাহ ও তৎকালীন রিয়াদের গভর্ণর সালমানের হাত থেকে দুইবার সেরা ছাত্রের পুরুস্কার গ্রহণ করেন। সৌদিতে তিনি শায়খ বিন বাজ, বিন উসায়মীন, আল জিবরিন ও আল ফাউজানসহ বিশ্ববরেণ্য স্কলারদের কাছ থেকে বিশেষ শিক্ষা অর্জন করেন। বর্তমান সৌদি আরবের অনেক বড় আলেম ও ইসলামি স্কলার তার সহপাঠী ছিলেন। তিনি ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশ থেকে বিভিন্ন ইসলামি বিষয়ে উচ্চতর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। মালয়েশিয়া, লিবিয়াসহ বহু দেশ তিনি সফর করেন। জীবনে প্রায় ২৫ বার তিনি হজ্জ করেন।

কর্মজীবনে তিনি প্রথম সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের উত্তর রিয়াদ শাখায় অনারবদের জন্য আরবী ভাষার শিক্ষক এবং শিক্ষা ও অনুবাদ বিভাগের প্রধান হিসেবে ১৫.১০.১৯৯৩ হতে ৩১.১০.১৯৯৭ পর্যন্ত চার বছর কর্মরত ছিলেন। একই অফিসে তিনি একজন ইসলাম প্রচারক দাঈ হিসেবেও কাজ করতেন এবং ইসলাম ও তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে বাংলা, ইংরেজি ও আরবী ভাষায় বক্তৃতা ও শিক্ষা দিতেন। এ সময়ে বিভিন্ন দেশের বেশ কিছু অমুসলিম তাঁর হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন।

ডক্টর আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহ.) সৌদি আরবে শিক্ষা শেষে অনেক বড় বড় পদে চাকরির প্রস্তাব উপেক্ষা করে ইসলাম প্রচার ও সমাজ সংস্কারের উদ্দেশ্যে ফিরে আসেন নিজ দেশে। ১৯৯৮ সনে তিনি কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে আল হাদীস ও ইসলামী স্টাডিজ বিভাগে লেকচারার হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৯৯ সনে তিনি সহকারী অধ্যাপক, ২০০৪ সনে সহযোগী অধ্যাপক ও ২০০৯ সনে অধ্যাপক পদে পদোন্নতি লাভ করেন। এছাড়া একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আল ফিক্হ বিভাগে খন্ডকালীন শিক্ষক হিসেবেও তিনি কর্মরত ছিলেন। এছাড়া ইন্তেকালের পূর্ব পর্যন্ত তিনি ঝিনাইদহ কেন্দ্রিয় মসজিদের খতিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ডক্টর খোন্দকার আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহ.) দেশে এসে ইসলাম প্রচারসহ নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডে আত্মনিয়োগ করেন। এ লক্ষ্যে তিনি আসসুন্নাহ ট্রাস্ট প্রতিা করেন। এ ট্রাস্টের মাধ্যমে ইসলাম প্রচারে তিনি বহুমুখি কর্মসূচী গ্রহণ করেন।

তিনি ছিলেন ওয়াজ মাহফিলের অত্যন্ত জনপ্রিয় একজন আলোচক। বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে সফর করে তিনি মানুষকে শোনাতেন শাশ্বত ইসলামের বিশুদ্ধ বাণী। বেসরকারি চ্যানেল ইসলামী টিভি, দিগন্ত টিভি, পিস টিভি, এটিএন বাংলা ও এনটিভির শীর্ষ জনপ্রিয় ইসলামি অনুানের তিনি আলোচক ছিলেন। বাংলা, ইংরেজি ও আরবি ভাষায় সমাজসংস্কার, গবেষণা ও শিক্ষামূলক ৫০ -এর অধিক গ্রন্থের সফল রচয়িতা ছিলেন তিনি। মরহুম আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহ.) ব্যক্তি জীবনে অত্যন্ত সদালাপী, বিনয়ী, উম্মাহর জন্য দরদি, মুখলিস, পরমত সম্মানকারী, যুগসচেতন, ভারসাম্যপূর্ণ, উম্মাহর ঐক্য ভাবনায় বিভোর, প্রাজ্ঞ ও পণ্ডিত হিসেবে সব মহলে সমাদৃত ছিলেন দেশজুড়ে তার হাজার হাজার গুণগ্রাহী ও ভক্ত রয়েছেন।

সংসার জীবনে তিনি বিয়ে করেছিলেন ফুরফুরার মরহুম পীর হযরত আবুল আনসার মুহাম্মদ আব্দুল কাহ্হার সিদ্দিকী (রহ.) এর সেঝ মেয়ে ফাতেমা আফসানাকে (ফাতেমা আবুল আনসার নামে পরিচিত)। তাঁদের সংসারে তিন মেয়ে ও এক ছেলের জন্ম হয়। দুমেয়ে বিবাহিত ও ছোট মেয়ে এখনো পড়াশোনা করছেন। তাঁর একমাত্র ছেলে উসামা খোন্দকার সৌদি আরবের রিয়াদে আল ইমাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করছেন।

ড. সাহেব হুজুর (রহ.) তাঁর বক্তৃতায় ও লেখনিতে সব সময় তাঁর শ্বশুর ফুরফুরার মরহুম পীর সাহেব হুজুর (রহ.) কে স্মরণ করতেন আর বলতেন, আমাকে ইসলামের দাঈ ও লেখকরূপে গড়ে তোলার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করেছেন আমার শ্বশুর। আর মরহুম পীর সাহেব (রহ.) ও তাঁর এই জামাতার ভূয়ষী প্রশংসা করতেন আর বলতেন আমার সবচেয়ে মূল্যবান জামাতা। তিনি অনেক মাহফিলে বলেছেন, আমি আপনাদের জন্যে দুটো তলোয়ার রেখে যাচ্ছি। আমার বড় ছেলে মিশকাত আর আমার সেঝ জামাতা ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর। ড. আব্দুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রহ.) এর ইন্তেকালের মাধ্যমে মরহুম হুজুর (রহ.) এর একটি তলোয়ার ভেঙে গেল।