প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ৯ম সংখ্যা, মার্চ ২০১৬, জমা.আউ-জমা.সানী ১৪৩৭ হিজরী, ফাল্গুন-চৈত্র ১৪২২ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়
মধ্যবয়সী যুবকদের মাঝে পাশা খেলা, দাবা খেলা, কবুতর বাজী, মোরগের লড়াই, ষাড়ের লড়াই, ঘুড়ি উড়ানো ইত্যাদি আরো কত রকমের কুপ্রথা প্রচলিত আছে। মধ্যপান ও জুয়া খেলা নিষিদ্ধকরণের কারণ বর্ণনা প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেছেন, শয়তান তোমাদের মাঝে শত্রতা ও বিদ্বেষভাব সৃষ্টি করতে এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণ ও নামায থেকে বিরত রাখতে চায়। এ আয়াত থেকে স্বতঃসিদ্ধভাবে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় যে, আল্লাহ তাআলা মদ ও জুয়া হারাম হওয়ার যে কারণ নির্দেশ করেছেন, তা যে বস্তুতেই পাওয়া যাবে তাকেই হারামের পর্যায়ভুক্ত করা হবে। খেলোয়াড়গণ যে কি পরিমাণ মদমত্ত হয়ে এসব খেলায় মগ্ন থাকে তা না দেখলে উপলব্ধি করা মুশকিল। নামায তো অনেক পরের কথা, খাওয়া-দাওয়া পেশাব-পায়খানা ইত্যাদি প্রাকৃতিক প্রয়োজনের দিকেও তাদের খুব একটা খেয়াল থাকে না এ সময়। প্রতিপক্ষকে গালমন্দ করা তো এসব খেলার স্বাভাবিক গতিধারা বলে ধরে নেয়া যায়, এমনকি সময় সময় তা হাতাহাতির রূপ পরিগ্রহ করে। এতসব মন্দ পরিণতির প্রকট আশংকার পরিপ্রেক্ষিতে উপরোক্ত খেলাগুলোর হারাম হওয়ার ব্যাপারে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই।
দাবা ও অন্যান্য খেলা
যেসব খেলা গুটির সাহায্যে খেলতে হয় সেগুলির বহুবিধ অপকারিতা রয়েছে। মুসনাদে আহমদ, সুনানে ইবনে মাজাহ, মুআত্তা ইমাম মালিক প্রভৃতি হাদীস গ্রন্থে বর্ণিত এক হাদীসে আছে যে গুটি দিয়ে খেলা করে সে আল্লাহ ও রসূলের অবাধ্যতা করে। মুসনাদে আহমদে বর্ণিত অপর এক হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- যে ব্যক্তি গুটি দিয়ে খেলা করার পর উঠে নামায আদায় করলো, সে যেন পুঁজ বা শুকরের রক্ত দিয়ে অযু করে নামায পড়লো। হযরত আলী (রা.) বলেন- দাবা অনারবদের জুয়া খেলা। হযরত আবু মুসা আশআরী (রা.) বলেন- পাপীরাই দাবা খেলে থাকে অর্থাৎ, এ খেলাতে শুধুই পাপ। জনৈক প্রশ্নকারী হযরত আবু মুসা আশাআরীর কাছে দাবা খেলা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি জবাবে বললেন, এটা অত্যন্ত গর্হিত কাজ, আর আল্লাহ গর্হিত কাজকে পছন্দ করেন না। বায়হাকীর শোআবুল ঈমানে উপরোক্ত তিনটি হাদীসই উদ্ধৃত হয়েছে। এ ছাড়াও হেদায়া, দুররে মুখতার প্রভৃতি ফিকাহের কিতাবে দাবা খেলাকে সম্পূর্ণ হারাম বলা হয়েছে, চাই তা বাজি ধরেই খেলা হোক আর না ধরেই হোক।
অনেকে দাবী করেন যে, দাবা খেলা বুদ্ধির উৎকর্ষ সাধনে ও যুদ্ধ-বিদ্যায় দক্ষতা অর্জনে সহায়ক হয়ে থাকে। বুদ্ধি বিকশিত হওয়ার এ দাবী সম্পূর্ণ অমূলক। এ খেলায় অত্যাধিক মনোযোগ দিলে বুদ্ধি বাড়ার তো কোন কথাই নয় বরং উল্টো আরো বুদ্ধি লোপ পাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। প্রতিনিয়ত খেলায় মগ্ন থাকার ফলে দাবার অনেক চাল মুখস্থ হয়ে যাওয়াও বিস্ময়কর ব্যাপার নয়। আর ঐসব মুখস্থ চালে গুটি পরিচালনা করলে তা থেকে বুদ্ধির উৎকর্ষ সাধন বা অন্য কোন ধরনের উপকার লাভের আশা করা দুরাশা মাত্র। তেমনি যুদ্ধবিদ্যার সাথেও এ খেলার কোন মিল নেই। খেলার নির্ধারিত নিয়ম পদ্ধতি রয়েছে- রাজা-মন্ত্রী, হাতী-ঘোড়া, নৌকা-সৈন্য কোনটা কোন দিকে চালতে হবে তার একটা বাধা ধরা নিয়ম রয়েছে, যার ব্যতিক্রম হলে তা আর খেলাই থাকবে না। অপর পক্ষে যুদ্ধের ময়দানে শত্রর বিরুদ্ধে সৈন্য পরিচালনার বেলায় এমন অলঙ্ঘনীয় নীতিমালার বালাই নেই। সেখানে প্রধান সেনাপতির তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত বলে বিবেচিত হয়ে থাকে। উদাহরণতঃ সমর ক্ষেত্রে হাতীকে অনেক সময় সোজাসুজি অগ্রসর হতে হয়, অথচ দাবার বোর্ডে তা কেবল কৌনিক চালেই চলে থাকে। একথা বিস্মৃত হলে চলবে না যে, সমরক্ষেত্র ও দাবার দানের পৃথক পৃথক আইন-কানুন রয়েছে, একটির আইন অন্যটিতে হুবহু প্রযোজ্য নয়, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে এ ধরনের পদক্ষেপের পরিণাম ভয়াবহ হতে বাধ্য। মোটকথা, দাবা বুদ্ধির বিকাশে ও যুদ্ধবিদ্যায় দক্ষতা অর্জনে সহায়ক – এ দাবী সর্বৈব অযৌক্তিক ও অবাস্তব। আর এ দাবী কখনো স্বীকার করে নিলেও একথা অস্বীকার করার জো নেই যে, শরীয়তের সুস্পষ্ট প্রমাণাদি ও বিধি-বিধানকে উপেক্ষা করে মুক্ত চিন্তায় ঘোড়ায় চড়ে যথেচ্ছ বিচরণ করা অত্যন্ত নিন্দনীয় ও ঘোরতর অপরাধ।
অনেকে আত্মরক্ষার্থে বলে থাকেন, ইমাম শাফেরীয় মতানুযায়ী তো দাবা খেলা নিষিদ্ধ নয়, আমরা না হয় এক্ষেত্রে তার মতামতকেই মেনে নিলাম, তাতে দোষের কি? এ প্রশ্নের জবাবে সর্বপ্রথমেই বলতে হয়, কোরআন-হাদীসের সাথে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া সত্ত্বেও জরুরী প্রয়োজন ছাড়াই কেবল কিছু কিছু ক্ষেত্রে অন্য মাযহাবের অনুসরণ করা বৈধ নয়। এ ধরণের ক্রিয়া-কর্মকে প্রশ্রয় দেওয়া হলে ধর্মকে তামাশার বস্তুতে পরিণত করার বিস্তর সুযোগ সৃষ্টি হয়ে যাবে। প্রতিটি ব্যাপারেই কোন না কোন মাযহাবে আত্মতুষ্টি-মূলক বিধান তো পাওয়া যাবেই। তাই বলে, নিজের সুবিধামত মাযহাবের অনুসরণ কি প্রবৃত্তি পূজার সমার্থক হবে না?
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, মনে করুন, জনৈক অযুবিশিষ্ট ভদ্রলোকের শরীর থেকে রক্ত নির্গত হলে তাকে বলা হলো- আমাদের মাযহাব মতে তো আপনার অযু নষ্ট হয়ে গেছে আবার অযু করে আসুন। ভদ্রলোকটি জবাবে বললেন, এ ক্ষেত্রে আমি শাফেয়ীর (রহ.) মাযহাব অনুসরণ করবো, অতএব আর অযু করার প্রয়োজন নেই। অল্পক্ষণ পরে ঐ ভদ্রলোকটিই সাবেগে কোন মহিলার গা স্পর্শ করলে তাকে বলা হলো, এবার তো শাফেয়ী মাযহাব অনুযায়ীই আপনার অযু ফাসিদ হয়ে গেছে, কাজেই অযু শোধরানোর দরকার হবে না। বড়ই পরিতাপের বিষয়, একই অযুর পরে শরীর থেকে রক্ত নির্গত হওয়া ও সাবেগে নারী স্পর্শ করা-এ উভয় কারণ মিলিত হওয়ার দরুণ সকল মাযহাব অনুসারেই ভদ্রলোক অযু করে অপবিত্র অবস্থায় নামায আদায় করে আত্মতৃপ্তি লাভের চেষ্টা করছে। ভিন্ন ভিন্ন ক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন মাযহাবের অনুসরণ ধর্মকর্মে এমনি ধরণের হাজারো দুষ্কৃতির উদ্ভব ঘটাবে সন্দেহ নেই। এসব বিবেচনা করেই ফেকাহ্বিদগণ যে কোন একটা নির্দিষ্ট মাযহাব অনুসরণ করা ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে ঐক্যমত পোষণ করেছেন। ধর্মপালনে যাতে করে অসৎ উদ্দেশ্যের অনুপ্রবেশ ঘটতে না পারে এবং ধার্মিকগণ যাতে প্রবৃত্তির দাসে পরিণত না হন- তারই প্রতিকার বিধান করা হয়েছে এর মাধ্যমে।
দ্বিতীয়তঃ ইমাম শাফেয়ী (রহ.) কতিপয় শর্তসাপেক্ষে দাবা খেলার বৈধতার পক্ষে মতপ্রকাশ করেছিলেন। যেমন, বেশি করে বা বেশি সময় ধরে না খেলা এবং খেলায় এত বেশি মগ্ন না হওয়া যদ্দরুন নামাযের সময়ের প্রতি কোন খেয়াল থাকে না। লক্ষণীয় যে, এসব শর্ত বজায় রেখে দাবা খেলা অত্যন্ত দুরূহ।
তৃতীয়তঃ নেসাবুল ইহতিসাব গ্রন্থে পরবর্তীতে ইমাম শাফেয়ীর উক্ত মতামত পরিবর্তনের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে, এখন তার ইমাম শাফেয়ীর মতানুসরণের অজুহাত দেখিয়ে দাবা খেলার সুযোগ নেই। এ খেলায় নেশাগ্রস্ত হয়ে পড়া যে কত বড় আশংকাজনক ব্যাপার জওয়াবে কাফী নামক পুস্তকে বর্ণিত দাবাডুর কাহিনী থেকে তা আঁচ করা যেতে পারে।
বর্ণিত আছে, মৃত্যুর ঠিক পূর্ব মুহূর্তে জনৈক দাবাডুকে কালিমা পড়তে বলা হলে কালিমার পরিবর্তে তার মুখ থেকে বেরিয়ে এল- তোমার রাজা চেক পড়েছে। এই কথা উচ্চারণ করার সাথে সাথে তার প্রাণ বায়ু ইহধাম ত্যাগ করলো। আসল ব্যাপার হচ্ছে, কোন কিছু মনের গভীরে গেঁথে গেলে- আপাদমস্তক গিলে ফেললে, মৃত্যুর সময়ও তার কথাই স্মরণ হবে, এই চিন্তা নিয়েই মৃত্যুবরণ করবে – এটাই স্বাভাবিক।
কবুতর বাজীর অবৈধতা সম্পর্কেও কারো কোন দ্বিমত নেই। একবার এক ব্যক্তিকে কবুতরের পশ্চাদ্ধাবন করতে দেখে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মন্তব্য করেছিলেন, এক শয়তান আরেক শয়তানের পিছু ধরেছে। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) কর্তৃক রেওয়ায়েতকৃত এ হাদীসটি ইমাম আহমদ, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ ও বায়হাকী (রহ.) আপন আপন কিতাবে উদ্ধৃত করেছেন। অনেক কবুতরবাজদের অন্যের কবুতর আটক করার অভ্যাস রয়েছে। এ কাজ সুস্পষ্ট লুণ্ঠন এবং পরধন আত্মসাতের এক ভাল মানুষী নমুনা ছাড়া কিছুই নয়।
এ প্রসঙ্গে হাদীসে এসেছে- কেউ কারো কিছুতে অনাধিকার চর্চা করে থাকলে কিয়ামতের দিন ঐ যালেমের পুণ্য মযলুমকে দিয়ে দেওয়া হবে আর মযলুমের পাপ যালিমকে দেওয়া হবে; অতঃপর যালেমকে দোযখে নিক্ষেপ করা হবে। কোন কোন কবুতরবাজ হয়তো এ অজুহাত পেশ করবেন যে অন্যান্যরাও তো আমাদের কবুতর ধরে ফেলে, এমতাবস্থায় আমরা অন্যদের কবুতর ধরলে দোষ কি তাদের জ্ঞাতার্থে বলছি, উভয় পক্ষের পূর্ণ সম্মতি এবং প্রচলিত রীতি অনুযায়ী ব্যবসা সিদ্ধ হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় যাবতীয় শর্তাবলী বর্তমান থাকলে তবেই নিজের কবুতরের পরিবর্তে অন্যের কবুতর আটকানো শরীয়তমত বৈধ হবে। এতদ্ভিন্ন প্রাণপণ চেষ্টা করে কবুতর ধরলেও তা অন্যায়ই হবে। এ পদ্ধতিতে সবসময়ই কোন না কোন পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অধিকন্তু যে পক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয় তার প্রতিপক্ষকে ঠকাবার একটা মনোবৃত্তি থাকে। সুযোগের অভাবে প্রতিশোধ গ্রহণে অসমর্থ হলেও প্রতিপক্ষকে অধিক ক্ষতিগ্রস্ত করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেই গোনাহ হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, দুই মুসলমান পরস্পর সংঘর্ষে লিপ্ত হয়ে একজন অপরজনকে হত্যা করলে, নিহত ও হন্তা উভয়ই দোযখে নিক্ষিপ্ত হবে। জনৈক সাহাবী আরজ করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! হন্তার দোযখে যাওয়ার কারণ তো বুঝলাম, তবে নিহত ব্যক্তির দোযখী হওয়ার হেতু কি? জবাবে রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তার অন্তরেও প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার প্রবল ইচ্ছা ছিল।
কেউ হয়তো দাবী করতে পারেন, কবুতরবাজগণ এ ধরণের অদল-বদলে সর্বদাই সম্মত- যে-ই ধরতে পারে সে-ই কবুতরের মালিক হবে। এ দাবীর অসারতার প্রমাণস্বরূপ বলবো, এ ধরণের সম্মতি তো জুয়া খেলায়ও থাকে। সম্মতি থাকার কারণে জুয়াকে তো কেউ হালাল বলতে পারবে না। কোরআন মজীদের অদ্ব্যর্থ আয়াত দ্বারা একে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, এখন কোনক্রমেই এর বৈধতা প্রমাণ করা সম্ভব নয়। উপরন্তু কবুতরবাজীর নেশা কাউকে পেয়ে বসলে তার না নামাযের খেয়াল থাকে, না পরিবার-পরিজনের ভরণ-পোষণ ও দেখাশুনার প্রতি তার কোন লক্ষ্য থাকে। কবুতরবাজী হারাম হওয়ার এটাও একটা কারণ। কেননা, ইবাদত আর উক্ত অধিকারপ্রসূত দায়িত্বসমূহ আঞ্জাম দেওয়া ওয়াজিব, আর ওয়াজিব আদায় না করা হারাম। ওয়াজিব আদায়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে বলেই কবুতরবাজী হারাম। অতএব, এ সম্পর্কে আমাদের বক্তব্য সম্পূর্ণ পরিষ্কার।
এ ছাড়াও কবুতরবাজদের যত্রতত্র বিচরণ, বে-পরাওয়াভাবে বাড়ী-ঘরের চালায়-ছাদে আরোহণ করে পর্দনশীন মহিলাদের পর্দাভঙ্গ করা, কবুতরের উদ্দেশ্যে এলোপাথাড়ি ঢিল ছুঁড়ে পাড়া-প্রতিবেশীকে উৎপাত করা ইত্যাকার আচরণ অত্যন্ত মামুলী ব্যাপার মনে হলেও মূলতঃ চরম ধৃষ্টতা ছাড়া কিছুই নয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে দুররে মুখতার কিতাবে বলা হয়েছে, নিষেধ করার পরও যদি কেউ এ অপকর্ম থেকে বিরত না হয়, তাহলে নিষেধকারী ঐ কবুতর জবেই করে নিতে পারে। সর্বশেষে বলতে চাই, যাতে এতসব দোষত্রটির সমাহার ঘটে তা কোনক্রমেই বৈধ হতে পারে না।
ঘুড়ি উড়ানো
ঘুড়ি উড়ানোর মতো নিন্দনীয় প্রথাও আমাদের সমাজের অন্যতম বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে। কবুতর বাজীতে যে সমস্ত ক্ষতিকারক দিক রয়েছে তার প্রায় সবগুলোই ঘুড়ি উড়ানোর শখেও পাওয়া যায়। যেমন
প্রথমতঃ ঘুড়ির পেছনে পেছনে ছুটা। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবুতরের পশ্চাদ্ধাবনকারীকে যে কারণে শয়তান বলে অভিহিত করেছেন, সেই একই কারণে ঘুড়ির পশ্চাদ্ধাবনকারীকেও এর পর্যায়ভুক্ত করা যায়।
দ্বিতীয়তঃ ঘুড়ি লুণ্ঠন করার অভ্যাস। এ সম্পর্কে হাদীসে স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা ঘোষিত হয়েছে। বুখারী ও মুসলিমের বর্ণনায় আছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, লোকে যার প্রতি দৃষ্টি উঁচু করে তাকায় তাকে লুটে নেওয়া মুমিনের কাজ নয়। অর্থাৎ, এ ধরণের কর্ম ঈমানের পরিপন্থী। এ হাদীসের মর্মার্থ যাই হোক না কেন, বাহ্যতঃ লুটেরাদেরকে ঈমানের গণ্ডী বহির্ভূত বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। কেউ হয়তো দাবী করতে পারেন, এ ক্ষেত্রে তো সত্বাধিকারীর পরোক্ষ অনুমতি বিদ্যমান, কাজেই এখানে এ হাদীস প্রযোজ্য নয়। জবাবে বলবো, মালিকের পরোক্ষ অনুমতি থাকার এ দাবী সম্পূর্ণ অবাস্তব। আসলে ঘুড়ি লুটের রেওয়াজটা সাধারণ্যে ব্যাপকভাবে প্রচলিত হওয়ার দরুন মালিক নিজের ঘুড়ি দাবী করা থেকে বিরত থাকতে বাধ্য হয়-আন্তরিক সন্তুষ্টি বা সম্মতি এখানে অনুপস্থিত। মালিক তার দাবী উপেক্ষিত হবে না বলে জানলে তো অন্যকে তার ঘুড়ি নিতে দিতে কখনও রাজী হতো না। এ কারণেই ঘুড়ির সূতা কেটে মালিক অতি সত্বর দৌড়ে গিয়ে তা কুড়িয়ে আনত সর্বাত্মক চেষ্টা করে। অবশেষে হয়তো দুর্ভাগ্যবশতঃ ঘুড়িটা হাতছাড়া হয়ে যায়। তবে সে যে চেষ্টা করলো, তা কি তার অসম্মতির প্রমাণ নয়।
তৃতীয়তঃ ঘুড়ির সূতা লুট করা ঘুড়ি লুটের চেয়েও মারাত্মক অপরাধ। কেননা, ঘুড়ি তো একজনই লুট করে থাকে আর তাকে এক ব্যক্তিরই পাপ হয়, পক্ষান্তরে সূতা লুটে অনেক লোক পাপী হয়ে থাকে। এতসব লোকের পাপের জন্য কার্যতঃ যে ব্যক্তি ঘুড়ি উড়ায়, সেই দায়ী। তাউ উপরোক্ত প্রতিজ্ঞানুসারে সে সকলের পাপের সমভাগী হয়।
চতুর্থতঃ প্রত্যেক ঘুড়ি উড্ডয়নকারীরই অপরজনের ঘুড়ির সূতা কাটার ইচ্ছা থাকে। অথচ কোন মুসলমানের ক্ষতি করা যে হারাম তা সবারই জানা। এ হারাম কাজের নিয়ত করার কারণে উভয়ই গোনাহগার হয়ে থাকে।
পঞ্চমতঃ ঘুড়ি উড়ানো নেশায় পরিণত হলে নামাযের প্রতি কোন খেয়াল থাকে না। আগেই বলেছি, কোরআন মজীদে নামাযে অমনোযোগিতাকে মদ ও জুয়া হারাম হওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ষষ্ঠতঃ ছাদের উপর উঠে ঘুড়ি উড়াতে গিয়ে অলক্ষ্যে পিছন দিকে সরতে সরতে নীচে পড়ে আহত-নিহত হওয়ার খবর আজকাল সংবাদ পত্রের পাতা উল্টালে প্রায়ই নজরে পড়ে। এ ধরণের আত্মসংহারী কাজ কোরআনের স্পষ্ট আয়াত দ্বারা নিষিদ্ধ করা হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রেলিংবিহীন ছাদে শয়ন করতে নিষেধ করেছেন। অসতর্কতাবস্থায় নীচে পড়ে যাওয়ার আশংকা থেকে মুক্ত থাকার জন্যই এ নিষেধাজ্ঞা। সামান্য ভুলের দরূন কত বিরাট দুর্ঘটনা ঘটতে পারে, তা-ও আমাদের প্রিয় রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলে গেছেন। অথচ আমরা তাঁর আনীত বিধানাবলীর প্রতি কত যে অবজ্ঞা প্রদর্শন করি! আফ্সোস, আমাদের এ আচরনের জন্য?
সপ্তমতঃ ঘুড়ি তৈরি করে বিদ্যাশিক্ষার প্রধান উপকরণ কাগজ আর বিশ্বে অধিকাংশ মানুষের অন্যতম খাদ্য আটার মর্যাদা ক্ষুন্ন করা হয়। হযরত রসূলে করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত আয়েশাকে রুটির কদর করতে আদেশ করেছেন। এ থেকে বুঝা যায়, খাদ্য-দ্রব্যের অসম্মান ও অপব্যবহার নিষিদ্ধ। তেমনিভাবে, লেখাপড়ার উপকরণাদির যথাযথ কদর করা যে জরুরী তাও সবারই জানা। ঘুড়ি তৈরি করা কাগজ ও আটা উভয় বস্তুর জন্যই অবমাননাকর।
অষ্টমতঃ ঘুড়ি উড়ানোর জন্যে বেহিসাব অর্থ-কড়ি খরচ করা হয়। অথচ কোরআন মজীদে অপব্যয়কারীকে শয়তানের ভাই বলা হয়েছে।
বোবা প্রাণীর লড়াই
মোরগ, ষাড় ইত্যাদির লড়াই প্রসঙ্গে হাদীসে আছে, রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন- জন্তু-জানোয়ারদের মধ্যে লড়াই বাঁদানো নিষেধ। মোরগ, ষাড়, তিতির, ভেড়া ইত্যাদি সব প্রাণীই এর অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে। অযথা কোন প্রয়োজন ও লাভ ছাড়াই বোবা জন্তুদেরকে কষ্ট দেওয়া তো বিবেকের পরিপন্থী, এমনকি অনেক সময় তা জুয়া খেলায় রূপান্তরিত হতে দেখা যায়। জুয়া খেলা তো কবীরা গোনাহ। এ ছাড়াও অনেক সময় জরুরী কর্তব্য পালনে অবহেলা করেও বিরাট পাপ হয়। অধিকন্তু, সকল দর্শকমণ্ডলীর পাপের সমান বোঝা একা আয়োজনকারীই বহন করবে।
