প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৫বর্ষ- ৯ম সংখ্যা, মার্চ ২০১৬, জমা.আউ-জমা.সানী ১৪৩৭ হিজরী, ফাল্গুন-চৈত্র ১৪২২ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়

জীবিকার ব্যবস্থাপনা আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়ে থাকে

রাসুলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: যাকে কোন কিছুতে জীবিকা দান করা হলো, সে যেন সেটিকে ধরে রাখে। যার মাঝে যার জীবনোপকরণ রাখা হয়েছে, সে যেন নিজ থেকে পরিবর্তিত না হওয়া পর্যন্ত সেটি পরিবর্তন না করে। (কাশফুল খাফা : খণ্ড-২, পৃ. ১৩৭৩/১৫৭৮, হাদীস নং ২৫৮১; ফায়যুল কাদীর: খণ্ড-৬, পৃ. ১৩৭, হাদীস নং ৮০৭২; আল-জামিউস সাগীর ওয়া যিয়াদাতুহু: খণ্ড-১, পৃ. ১২৩৮, হাদীস নং ১২৩৭৩; শুআবুল ঈমান: খণ্ড-২, পৃ. ৮৯, হাদীস নং ১২৪১; কানযুল উম্মাল: হাদীস নং ২৯৮৬; ইত্তিহাফুস সাদাতিল মুত্তাকীন: খণ্ড-৪, পৃ. ২৭৮)

এক ব্যক্তির জন্য আল্লাহ তায়ালা জীবিকা উপার্জনের একটি মাধ্যম ঠিক করে দিলেন। লোকটি সেই কাজে লেগে আছে এবং সেপথে তার জীবিকা আসছে। এমতাবস্থায় বিনা কারণে তার পক্ষে উপার্জনের এই অবলম্বনটি পরিত্যাগ করা ঠিক হবে না। তাকে বরং ওই কাজে লেগে থাকতে হবে যতক্ষণ না ওই মাধ্যমটি আপনা থেকে হাতছাড়া হয় কিংবা সেটি বাদ দেয়ার মত পরিস্থিতি তৈরি হয়। কারণ আল্লাহ যখন আপনার জীবিকাকে একটি উপকরণের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে দিলেন, তখন বুঝতে হবে, এটি আপনার জন্য আল্লাহ তায়ালার একটি দান এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে আপনাকে এ কাজে লাগিয়ে দেয়া হয়েছে। কারণ জীবিকা উপার্জনের হাজারো পথ ও পন্থা আছে। এমতাবস্থায় সেসবের মধ্য থেকে যখন বিশেষ একটি পন্থাকে আপনার জীবিকা উপার্জনের মাধ্যম বানিয়ে দেয়া হলো, তখন এটি আল্লাহর পক্ষ থেকেই এসেছে। কাজেই আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা পদ্ধতিকে নিজের পক্ষ থেকে বিনা কারণে ছেড়ে দেয়া ঠিক হবে না।

উপার্জন ও জীবনধারণের খোদায়ী ব্যবস্থাপনা

দেখুন! আল্লাহ তায়ালা এই জগতে জীবিকা উপার্জন ও জীবনধারণের চমৎকার একটি ব্যবস্থাপনা তৈরি করে দিয়েছেন। এমন একটি ব্যবস্থাপনা ঠিক করে নেয়া মানুষের মাথায় ধরত না। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন: পার্থিব জীবনে আমিই তাদের মাঝে জীবিকা বণ্টন করে দিয়েছি। (সূরা যুখরূফ, আয়াত-৩২)

এই বণ্টন আল্লাহ পাক এভাবে করেছেন যে, একজনের অন্তরে প্রয়োজন জাগিয়ে দিয়েছেন। আবার একজনের মনে সেই প্রয়োজন পূরণ করার পন্থা ঢেলে দিয়েছেন। একটু চিন্তা করে দেখুন! মানুষের কত রকমের প্রয়োজন আছে; তার রুটির প্রয়োজন, কাপড়ের প্রয়োজন, ঘরের প্রয়োজন, আসবাবপত্রের প্রয়োজন। জীবনধারণের জন্য মানুষের বহু কিছুর প্রয়োজন পড়ে। প্রশ্ন হলো, পৃথিবীর সব মানুষ মিলে কি কোন কনফারেন্স করেছিল? সেই কনফারেন্সে সবাই মিলে মানবজীবনের প্রয়োজনীয় যাবতীয় বস্তুর তালিকা তৈরি করে নিয়েছিল? তারপর আপসে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল যে, অমুক লোক কাপড় তৈরি করবে, অমুক থালা-বাসন বানাবে, অমুক জুতার কারখানা দেবে, অমুক চাল উৎপাদন করবে ইত্যাদি?
এ প্রশ্নের উত্তর হলো না, এমনটি হয়নি। তাবৎ পৃথিবীর সব মানুষ একত্র হয়ে যদি এমন কিছু করার চেষ্টা করত, তাহলে তা সম্ভব হত না। এ তো হলো আল্লাহ পাকের ঠিক করে দেয়া ব্যবস্থাপনা যে, তিনি একজনের অন্তরে ঢেলে দিয়েছেন, তুমি গম উৎপাদন কর। আরেকজনের অন্তরে ইচ্ছা জাগিয়ে দিয়েছেন, তুমি আটা তৈরির কল বসাও। আরেকজনের ভাবনা ঢুকিয়ে দিয়েছেন, তুমি চাল উৎপাদন কর। একজনের মনে চিন্তা ঢুকিয়ে দিয়েছেন, তুমি ঘিয়ের দোকান দাও। এভাবে আল্লাহ তায়ালা প্রতিটি মানুষের অন্তরে সেসব প্রয়োজনের কথা ঢেলে দিয়েছেন, যেগুলো প্রত্যেক মানুষের জীবনধারণের জন্য নিত্যদিনের আবশ্যক। ফলে আপনার যখন কোন বস্তুর প্রয়োজন দেখা দেবে আর আপনার পকেটে অর্থ থাকবে, তখন বাজারে গেলেই ইনশাআল্লাহ আপনার প্রয়োজন পূরণ হয়ে যাবে।

জীবিকা বণ্টনের বিস্ময়কর একটি ঘটনা

আমার বড় ভাই জনাব যাকী কাইফী (রহ.)। হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.)-এর এমন এমন চিত্র দেখান যে, মানুষ মহান আল্লাহর রুবুবিয়াত (রব হওয়া) ও রায্যাকিয়াত (রিযিকদাতা হওয়া)-এর সম্মুখে সিজদাবনত না হয়ে পারে না। লাহোরে ইদারায়ে ইসলামিয়াত নামে তার ধর্মীয় কিতাবাদির একটি দোকান ছিল। তিনি যথারীতি দোকানে বসতেন। বললেন, একদিন আমি সকালবেলা দোকানে যাওয়ার ইচ্ছা করলাম। এমন সময় প্রবল বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। আমি ভাবলাম, এই মুষলধারে বৃষ্টির মধ্যে দোকানে গিয়ে কী করব? এর মধ্যে কে আসবে কিতাব কিনতে?

কারণ এমন পরিস্থিতিতে একে তো মানুষ ঘর থেকে বেরই হয় না। দু-একজন হয়ও যদি, হয় একান্ত প্রয়োজনে। বই-কিতাব, বিশেষ করে দ্বীনি কিতাব এমন একটি পণ্য, যা দ্বারা না মানুষের ক্ষুধা নিবারণ হয়, না অন্য কোন প্রয়োজন পূরণ হয়। মানুষের যখন জগতের সব প্রয়োজন পূরণ হয়ে যায়, তখন গিয়ে বইয়ের কথা মনে পড়ে। কাজেই এই প্রতিকূল আবহাওয়ায়, এই ঝড়-বৃষ্টির মধ্যে অন্তত ইসলামী কিতাব ক্রয় করতে কেউ বাজারে আসবে না। আমি দোকানে গিয়ে কী করব?

কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে মনে এই চিন্তাও এল যে, আমি তো জীবিকার জন্য একটি পন্থা অবলম্বন করেছি। আল্লাহ তায়ালা এই পন্থাটিকে আমার জীবিকা উপার্জনের একটি উপায় বানিয়েছেন। কাজেই আমার কাজ হলো, আমি গিয়ে দোকান খুলে বসে পড়ব। চাই ক্রেতা আসুক কিংবা না আসুক।

ব্যস, আমি ছাতাটা মাথায় দিয়ে দোকানের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। বাজারে গিয়ে দোকান খুললাম এবং কুরআন তেলাওয়াত শুরু করলাম। দোকান খুলে বসা আবশ্যক ছিল; তাই বসলাম। কিছুক্ষণ পর দেখলাম, ছাতা মাথায় দিয়ে দলে দলে মানুষ আসছে। এসে তারা আমার দোকান থেকে কিতাব কিনতে শুরু করল। এমন এমন কিতাব ক্রয় করতে শুরু করল, বাহ্যিক বিবেচনায় সেগুলো এ সময় কারও ক্রয় করবার কথা নয়। অন্যান্য দিন সাধারণত যে পরিমাণ বিক্রি হয়ে থাকে, এই ঝড়ের মধ্যে আজও প্রায় সেই পরিমাণই বিক্রি হলো।

আমি ভাবতে লাগলাম, এমনটি কীভাবে ঘটল! এই প্রবল ঝড় আর মুষলধারা বৃষ্টির মধ্যে কিতাব ক্রয়ের জন্য অভাবনীয়ভাবে এই ক্রেতারা কোথা থেকে এল? উত্তর পেলাম, এদেরকে আমার রিযিকদাতা আল্লাহ তায়ালা পাঠিয়েছেন। মহান আল্লাহ এদের অন্তরে একথা ঢেলে দিয়েছেন, তোমরা গিয়ে কিতাব ক্রয় কর। আর আমার অন্তরে এই ভাবনার উদ্রেক করেছেন যে, তুমি গিয়ে দোকান খুলে বস। আমার অর্থের প্রয়োজন ছিল আর তাদের কিতাবের দরকার ছিল। উভয়কে দোকানে একত্রিত করে দিলেন। তারা কিতাব পেয়ে গেল আর আমার রিযিকের ব্যবস্থা হয়ে গেল।

এই ব্যবস্থাপনা একমাত্র মহান আল্লাহই তৈরি করতে পারেন। কোন ব্যক্তি যদি ইচ্ছা করে, আমি পরিকল্পনার মাধ্যমে এবং কনফারেন্স ডেকে এই ব্যবস্থাপনা ঠিক করব, পারস্পরিক পরিকল্পনা ও সমঝোতার মাধ্যমে আমি এই ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করব, তাহলে তার জীবন শেষ হয়ে যাবে কিন্তু এই কাজটি সে করতে সক্ষম হবে না।

রাতে ঘুমোনো ও দিনে কাজ করার স্বভাবজাত ব্যবস্থাপনা

আমার আব্বাজান মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.) বলতেন, একটু ভেবে দেখুন, জগতের সব মানুষ রাতে ঘুমায় আর দিনে কাজ করে। রাতের বেলা চোখে ঘুম আসে দিনে আসে না। পৃথিবীর সব মানুষ ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্স করেছিল যে, তাতে সবাই একমত হয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছিল, আমরা রাতে ঘুমাব আর দিনে কাজ করব? জানা কথা, এমন কোন ঘটনা ঘটেনি। বরং মহান আল্লাহ প্রতিটি মানুষের অন্তরে একথা ঢেলে দিয়েছেন যে, তুমি রাতে ঘুমাও আর দিনে কাজ কর। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন : আমি রাতকে আবরণ বানিয়েছি আর দিনকে বানিয়েছি জীবিকা উপার্জনের সময়। (সূরা নাবা : আয়াত-১০-১১)
এ বিষয়টিকে যদি মানুষের অধিকারে দিয়ে দেয়া হত যে, যখন ইচ্ছা কাজ কর, যখন খুশি ঘুমাও, তাহলে এর ফলে মানুষের জীবন লণ্ডভণ্ড হয়ে যেত। একজন বলত, আমি দিনে ঘুমাব, রাতে কাজ করব। কেউ বলত, আমি রাতে ঘুমাব, দিনে কাজ করব। আরেকজন বলত, আমি সন্ধ্যায় ঘুমাব, সকালে কাজ করব। অপরজন বলত, আমি সন্ধ্যায় কাজ করব, সকালে ঘুমাব। এই বিরোধ ও বৈপরিত্বের ফলাফল এই দাঁড়াত যে, একজন ঘুমাত আর ঠিক সেই সময় আরেকজন খটখট করত। ফলে একজনের কাজের কারণে আরেকজনের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটত। এভাবে পৃথিবীর নিয়ম-শৃঙ্খলা ও জীবনের ব্যবস্থাপনা ধবংস হয়ে যেত। মহান আল্লাহর অপার অনুগ্রহ যে, তিনি প্রতিটি মানুষের অন্তরে এই বুঝ ঢেলে দিয়েছেন, তুমি দিনের বেলা কাজ কর আর রাতের বেলা আরাম কর। এ নিয়মটিকে তিনি মানুষের একটি সৃষ্টিগত চাহিদায় পরিণত করে দিয়েছেন।

রিযিকের দ্বার রুদ্ধ করবে না

ঠিক তদ্রƒপ আল্লাহ তায়ালা মানুষের জীবনধারণের ব্যবস্থাপনাটিকেও নিজে ঠিক করে দিয়েছেন এবং প্রতিটি মানুষের অন্তরে এই বুঝ ঢেলে দিয়েছেন যে, তুমি এই কাজ কর, তুমি এই কাজ কর। কাজেই তোমাকে যখন একটি কাজে লাগিয়ে দেয়া হয়েছে এবং তোমার জীবিকাকে একটি কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে দেয়া হয়েছে, তখন তোমাকে বুঝে নিতে হবে, এই কাজটি আপনা আপনি হয়ে যায়নি। বরং কোন এক কারিগর কাজটি সম্পাদন করেছেন এবং কোন এক স্বার্থের ভিত্তিতে করেছেন। কাজেই এখন তুমি উপযুক্ত কোন কারণ ছাড়া জীবিকার এই হালাল উপায়টিকে বাদ দিয়ে অন্য কোন উপায় অবলম্বন করার চিন্তা করবে না। বলা তো যায় না যে, জীবিকার এই উপায়টিতে আল্লাহ পাক তোমার জন্য বিশেষ কোন কল্যাণ ও স্বার্থ রেখেছেন এবং তোমার এই কাজে জড়িত থাকার কারণে বহু মানুষ উপকৃত হচ্ছে আর তুমি পৃথিবীর গোটা অর্থব্যবস্থাপনার একটি অংশ হয়ে আছ।
তাই নিজের পক্ষ থেকে জীবিকার এই অবলম্বনটিকে পরিত্যাগ করবে না। অবশ্য যদি কোন কারণে চাকরিটা আপনা থেকে ছুটে যায় কিংবা ব্যবসায় এমন কোন সমস্যা তৈরি হয়ে যায় যে, সেটি আর ধরে রাখা সম্ভব হচ্ছে না কিংবা ব্যবসায় অনবরত লোকসান যাচ্ছে, তাহলে এই পরিস্থিতিতে চলমান উপায়টিকে পরিত্যাগ করে অন্য উপায় অবলম্বন করার ক্ষেত্রে কোন দোষ নেই। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত এরূপ কোন পরিস্থিতি তৈরি না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত নিজ থেকে জীবিকার দরজা বন্ধ করবে না।

এটি খোদাপ্রদত্ত দান

আমাদের শায়খ ডা. আবদুল হাই (রহ.) দুটি চরণ আবৃত্তি করতেন :
যখন চাওয়া ছাড়া আল্লাহর পক্ষ থেকে কোন বস্তু এসে পড়ে, তখন তাকে আল্লাহর দান মনে করে প্রত্যাখ্যান করা থেকে বিরত থাক। কারণ এটি তোমার প্রতি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত নেয়ামত।
মোটকথা আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যে উপায়টির সঙ্গে তোমার জীবিকাকে সম্পৃক্ত করে দিয়েছেন, তুমি তাতে জড়িয়ে থাক; যতক্ষণ না আপনা আপনি অবস্থার পরিবর্তন ঘটে।

সব বিষয়ে আল্লাহর পক্ষ থেকেই ফায়সালা হয়ে থাকে

এই হাদীসের আলোকে হাকীমূল উম্মত মাওলানা আশরাফ আলী খানভী (রহ.) বলেছেন : তরিকতপন্থীগণ এরই উপর সমস্ত বিষয়কে যেগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার সঙ্গে ঘটে থাকেÑ অনুমান করেছেন। বাস্তবতার সঙ্গে যাদের পরিচয় ঘটে যায়, তারা নিজ থেকে সেগুলোতে কোন পরিবর্তন ঘটান না। তরিকতপন্থীদের মতে বিষয়টি স্পষ্ট বিষয়াবলির মত। বরং এটি স্পর্শ দ্বারা অনুভূত বিষয়ের অনুরূপ। নিজেদের অবস্থাদির ক্ষেত্রে এ বিষয়টির প্রতি তারা সজাগ দৃষ্টি রাখেন।
এই বক্তব্যের মর্ম হলো, আলোচ্য হাদীসে যে কথাটি বলা হয়েছে, সেটি যদিও সরাসরি জীবিকার সঙ্গে সম্পৃক্ত, তবু সুফীয়ায়ে কেরাম এ হাদীস দ্বারা এই মাসআলাটি উদ্ভাবন করেন যে, আল্লাহ তায়ালা যে কোন বান্দার সঙ্গে যাই আচরণ করেন, যেমন বিদ্যায়, সৃষ্টির সঙ্গে সম্পর্ক কিংবা অন্য কোন বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা যে ব্যবস্থাপনা করে রেখেছেন, সেই ব্যক্তি যেন তাকে নিজের পক্ষ থেকে পরিবর্তন না করে। বরং তার উপর বহাল থাকে।

হযরত উসমান (রা.) খেলাফতের দায়িত্ব কেন ছাড়লেন না?

হযরত উসমান (রা.)-এর খেলাফত আমলের শেষ সময়ে তার বিরুদ্ধে একটি ঝড় ওঠেছিল। তিনি নিজেই তার কারণও বর্ণনা করেছেন যে, আল্লাহর রাসূল আমাকে বলেছিলেন, আল্লাহ তোমাকে একটি পোশাক পরাবেন; তুমি নিজ ইচ্ছায় সেটি খুলবে না। কাজেই এই খেলাফত, যা আল্লাহ আমাকে দান করেছেন, এটিই সেই পোশাক। আমি নিজ ইচ্ছায় এটি খুলব না। (সুনানে তিরমিযী : হাদীস নং ৩৬৩৮; সুনানে ইবনে মাজাহ: হাদীস নং ১০৯; মুসনাদে আহমদ : হাদীস নং ২৩৩২৬)

শেষ পর্যন্ত ঘটেছেও তাই। তিনি না খেলাফত ত্যাগ করেছেন, না বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণ করেছেন, না তাদেরকে দমন করার আদেশ প্রদান করেছেন। অথচ তিনি তৎকালীন আমিরুল মুমিনীন ও খলীফা ছিলেন। তার সেনাবাহিনী ছিল। তিনি চাইলে বিদ্রোহীদের মোকাবেলা করতে পারতেন। কিন্তু তিনি বললেন, যেহেতু বিদ্রোহীরা, আমার বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণকারীরা মুসলমান আর আমি চাই না, মুসলমানদের বিরুদ্ধে তরবারি উত্তোলনকারী প্রথম লোকটি আমি হই।

সে অনুযায়ী তিনি না খেলাফত ত্যাগ করেছেন, না বিদ্রোহীদের মোকাবেলা করেছেন। বরং নিজ বাসগৃহেই অবরুদ্ধ অবস্থায় বসে ছিলেন। এমনকি নিজের জীবন কুরবান করে দিলেন এবং শাহাদাতের পেয়ালা পান করলেন। তিনি শহীদ হওয়াকে বরণ করে নিলেন; তবু খেলাফত ছাড়লেন না। এটিই সেই বিষয়, হযরত মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) যার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন যে, যদি তোমাদের দায়িত্বে কোন কাজ সোপর্দ করা হয়, তাহলে তাতে লেগে থাকবে; নিজের পক্ষ থেকে সেটি ত্যাগ করবে না।

সৃষ্টির সেবা আল্লাহ প্রদত্ত দায়িত্ব

মোটকথা মহান আল্লাহ যখন তোমার জন্য দ্বীনের খেদমতের কোন পথ নির্বাচন করে দিলেন এবং তুমি সেটি চাওয়া ছাড়াই পেয়ে গেলে; এমতাবস্থায় সঙ্গত কোন কারণ ছাড়া তুমি সেটি পরিত্যাগ করবে না। তোমার জন্য এরই মাঝে নূর ও বরকত রয়েছে। অনুরূপ তরিকতের পথিকদের সঙ্গে আল্লাহ তায়ালার যত অবস্থা ও কারবার হয়ে থাকে, তাদের উচিত সেগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়েছে ধরে নিয়ে বরণ করে নেয়া।

অনুরূপভাবে কোন কোন ব্যক্তির সঙ্গে আল্লাহ তায়ালার বিশেষ কারবার ঘটে থাকে। যেমন সাহায্য-সহযোগিতার জন্য মানুষ এক ব্যক্তির শরণাপন্ন হয়ে থাকে কিংবা দ্বীনের নানা বিষয়ে তার কাছে যায়। প্রকৃতপক্ষে এটি একটি পদমর্যাদা, যেটি আল্লাহ তাকে দান করেছেন। সেজন্য আল্লাহই মানুষের অন্তরে একথা ঢেলে দিয়েছেন যে, পারস্পরিক লেনদেন ও কারবারে অমুক ব্যক্তির সঙ্গে পরামর্শ কর, প্রয়োজনের ক্ষেত্রে অমুক থেকে সাহায্য নাও, বিবাদ-বিসংবাদে অমুক ব্যক্তির কাছে গিয়ে মীমাংসা নাও। মানুষের অন্তরে এ বিষয়টি আপনা থেকে জন্ম নেয়নি। বরং আল্লাহ মানুষের অন্তরে বিষয়টি ঢেলে দিয়েছেন।

সুতরাং এই পদমর্যাদা সে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত হয়েছে। কাজেই বিধান হলো, একে যেন নিজের পক্ষ থেকে নষ্ট না করে। কারণ এটি আল্লাহর দরবার থেকে আসা দায়িত্ব। এই চিন্তাটি মাথায় রেখেই মানুষের সেবা করে যেতে হবে। যেমন অনেক সময় আল্লাহ পাক বংশের কোন এক ব্যক্তিকে এই সম্মান ও পদমর্যাদা দান করে থাকেন যে, গোটা বংশের মধ্যে যেখানেই কোন সমস্যা দেখা দিল, বিবাদ হলো কিংবা গুরুত্বপূর্ণ কোন কাজ আঞ্জাম দেয়ার প্রয়োজন দেখা দিল, তাহলে সবাই সঙ্গে সঙ্গে তার কাছে ছুটে যায় এবং তার থেকে পরামর্শ গ্রহণ করে। অনেক সময় এমন ব্যক্তিরা এই ভেবে ঘাবড়ে যায় যে, জগতের সব ঝামেলা আমার মাথার উপর চাপানো হচ্ছে! আসলে এতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। কেননা মানুষ আপনার শরণাপন্ন হওয়া প্রমাণ করে, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে মানুষের অন্তরে ঢেলে দেয়া হয়েছে যে, তোমরা অমুকের শরণাপন্ন হও। এই পদমর্যাদা আল্লাহর দান।
কাজেই, এই পদমর্যাদাকে উপেক্ষা করবে না। বরং একে খুশিমনে বরণ করে নাও যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাকে এই সেবার দায়িত্বটি অর্পণ করা হয়েছে।

হযরত আইয়ুব (আ)-এর ঘটনা

হযরত আইয়ুব (আ) একদিন গোসল করছিলেন। সেই অবস্থায় তার উপর সোনার প্রজাপতি পড়তে শুরু করল। তিনি গোসল করা ছেড়ে দিয়ে সেগুলো কুড়াতে শুরু করলেন। আল্লাহ তায়ালা জিজ্ঞেস করলেন, আইয়ুব, আমি কি তোমাকে বিত্তশালী বানাইনি? আমি কি তোমাকে মাল-দৌলত দেইনি? তারপরও তুমি এই সোনাগুলো কুড়াতে ছুটে বেড়াচ্ছ কেন? উত্তরে হযরত আইয়ুব (আ) বললেন, হে আল্লাহ! একথা ঠিক যে, আপনি আমাকে এতে দৌলত দান করেছেন যে, আমি তার শোকরও আদায় করতে পারব না। কিন্তু যে দৌলত আপনি এই মুহূর্তে আমার চাওয়া ছাড়াই আমাকে দান করেছেন, তার প্রতি আমি অমুখাপেক্ষীতা প্রকাশ করতে পারি না। আপনি আমার উপর সোনার বৃষ্টি বর্ষণ করছেন আর আমি বলে দেব, এগুলো আমার প্রয়োজন নেই, এটা হতে পারে না। আপনি যখন দিচ্ছেন, তখন আমার কর্তব্য হলো, আমি মুখাপেক্ষীর মত সেদিকে এগিয়ে যাব এবং সেগুলো সংগ্রহ করব। (সহীস বুখারী: হাদীস নং ২৭০; সুনানে নাসায়ী: হাদীস নং ৪০৬; মুসনাদে আহমদ : হাদীস নং ৭৮১২)

ব্যাপার আসলে এই যে, হযরত আইয়ুব (আ)-এর দৃষ্টিতে সোনার প্রজাপতি উদ্দেশ্য ছিল না; বরং তাঁর দৃষ্টি ছিল সেই সত্ত্বার উপর, যিনি সেগুলো দান করেছিলেন যে, এই দৌলত আমি কোন হাত থেকে গ্রহণ করছি! দাতার হাত যখন এত বিরাট হয়, তখন মানুষকে এগিয়ে গিয়ে এবং মুখাপেক্ষী হয়ে দান গ্রহণ করতে হয়। অন্যথায় সোনা সংগ্রহ করা হযরত আইয়ুব (আ)-এর উদ্দেশ্য ছিল না।

ঈদ বোনাস বেশি দাবি করার ঘটনা

আমি এর একটি দৃষ্টান্ত দিয়ে থাকি এই আমার আব্বাজান মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.) প্রতি ঈদে আমাদেরকে ঈদবোনাস দিতেন। আমরা প্রতি বছর ঈদের সময় তার কাছে দাবি জানাতাম, গত বছর বিশ টাকা দিয়েছিলেন। এখন জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেছে; তাই এ বছর পঁচিশ টাকা দেবেন। সুতরাং আমরা প্রতি বছরই বাড়িয়ে চাইতাম যে, এ বছর বিশের জায়গায় পঁচিশ দিন, এ বছর পঁচিশের জায়গায় ত্রিশ দিন, এ বছর ত্রিশের জায়গায় পঁয়ত্রিশ দিন। উত্তরে আব্বাজান বলতেন, তোমরা মানুষগুলো আসলে চোর-ডাকাত; প্রতি বছরই বাড়িয়ে চাচ্ছ।

দেখুন! সে সময় আমরা সব কজন ভাইই কর্মজীবি ছিলাম। প্রত্যেকে হাজার হাজার টাকা উপার্জন করতাম। কারুরই কোন অভাব ছিল না। কিন্তু যখন পিতার কাছে যেতাম, তখন আগ্রহ প্রকাশ করে তার কাছে চাইতাম কেন? ব্যাপারটা হলো, আমাদের দৃষ্টি সেই অর্থের প্রতি ছিল না, যেগুলো আমরা বিশ-পঁচিশ, ত্রিশ-পঁয়ত্রিশ টাকার আদলে লাভ করতাম। বরং আমাদের দৃষ্টি ছিল, দাতার হাতের প্রতি যে, ওই হাত থেকে কিছু পাব। তার মধ্যে যে নূর ও বরকত থাকবে, হাজার টাকা-লাখ টাকার মধ্যেও সেই নূর, সেই বরকত পাওয়া যাবে না।

দুনিয়ার সাধারণ সম্পর্কের ক্ষেত্রে যখন মানুষের অবস্থা এই হতে পারে, তাহলে এমতাবস্থায় আল্লাহ তায়ালার সঙ্গে যিনি সব শাসকের বড় শাসক বান্দার যে সম্পর্ক, তার কী অবস্থা হবে? কাজেই যখন আল্লাহর কাছে চাইব, মুখাপেক্ষী হয়ে চাইব। আবার আল্লাহ যখন দান করবেন, তখন মুখাপেক্ষী হয়ে গ্রহণ করব। তখন অমুখাপেক্ষীতার ভাব অবলম্বন করা যাবে না। কবি বলেন :
তিনি যখন কামনা করেন, আমি তাঁর সম্মুখে লোভ প্রকাশ করব, তখন তুষ্টতার মাথার উপর ছাই মারি। তখন তো তাতেই স্বাদ থাকবে যে, মানুষ লোভী হয়ে আল্লাহর সম্মুখে উপস্থিত হয়ে হাত পাতবে এবং যা মিলবে, গ্রহণ করে নেবে।

কাজেই আল্লাহ পাক যাকে যে কাজে লাগিয়ে দিয়েছেন কিংবা যে পদমর্যাদায় অধিতি করেছেন, মনে করতে হবে এটি আল্লাহ পাকের দান। কাজেই তাকে নিজের পক্ষ থেকে পরিত্যাগ কর না। হ্যাঁ, যদি এমন কোন পরিস্থিতি তৈরি হয়ে যায়, যার ফলে মানুষ সেসব ছাড়তে বাধ্য হয়ে পড়ে কিংবা বড় কেউ ছাড়তে পরামর্শ প্রদান করেন, তাহলে তখন ছেড়ে দেবে।

সারকথা

এতক্ষণ যা আলোচনা করলাম, তার সারকথা হলো, নিজের বিশেষ চাওয়া ছাড়া যা কিছু হস্তগত হবে, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে বলে বিশ্বাস করতে হবে এবং তাকে মূল্যায়ন করতে হবে।

হালাল উপার্জন পরিত্যাগ করবে না

তাকে প্রত্যাখ্যান কিংবা অবমূল্যায়ন করা থেকে বিরত থাকতে হবে। এ জাতীয় নেয়ামতের অবমূল্যায়ন অনেক সময় অশুভ পরিণতি ডেকে আনে। তার জন্য আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে বিপদ নেমে আসে। কাজেই অপ্রত্যাশিতভাবে যা আল্লাহর পক্ষ থেকে এসে পড়ে, বিষয়টি যদি হালাল হয়, তাহলে তাকে আল্লাহর খেদমতে জুড়িয়ে দিয়েছেন, তাকে সেই খেদমতে লেগে থাকা উচিত। নিজ ইচ্ছায় সেই খেদমত থেকে হাত গুটিয়ে নেয়ার চেষ্টা করবে না। কারণ এ কাজে তোমাকে আল্লাহ পাক জড়িত করে দিয়েছেন এবং তোমার থেকে খেদমতটা তিনি নিচ্ছেন।

অনুরূপভাবে আল্লাহ পাক যদি কাউকে তার চাওয়া ছাড়া কোন ক্ষমতা বা পদমর্যাদা দান করেন, তাহলে তাকেও অবমূল্যায়ন করবে না। যেমন আল্লাহ তোমাকে নেতা বানিয়ে দিলেন এবং মানুষ তোমাকে তাদের কর্তা মনে করছে, তাহলে বুঝে নাও, এটি তোমার প্রতি আল্লাহ পাকের দান। আল্লাহই তোমার উপর এই সেবার দায়িত্ব অর্পণ করেছেন। কাজেই তোমাকে এর হক আদায় করতে হবে।

আল্লাহ পাক আমাদের প্রত্যেককে দ্বীনের সঠিক বুঝ দান করুন এবং এই কথাগুলোর উপর আমল করার তাওফীক দিন। আমিন॥