প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ ৯ম সংখ্যা, মার্চ ২০১৭, জমা.আউ-জমা.সানি ১৪৩৮ হিজরী, ফাল্গুন-চৈত্র ১৪২৩বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়
প্রশ্ন-৭৫ : আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কী কী ধরনের খাদ্য একই সময়ে একই দস্তরখানে বসে খেতেন? অথবা তিনি কী কী খাদ্য অধিক পছন্দ করতেন?
উত্তর : আব্দুল্লাহ ইবনে জাফর ইবনে আবু তালিব রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘আমি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে পাকা খেজুর ও শসা একত্রে খেতে দেখেছি।’ (সহীহ আল বুখারী ও আত-তিরমিযী)
আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। একদা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি শুকনো খেজুর রুটির উপর রেখে বললেন, ‘এটি ঐটির তরকারি স্বরূপ।’ ‘This is a condiment of that.’ অর্থাৎ এই খেজুরটি রুটিটির তরকারি স্বরূপ।’ (আবু দাউদ)
সিরকা সম্পর্কে বেশ কয়েকটি হাদীস আছে। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হাদীসটি বর্ণনা করেন হযরত জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু। তিনি বলেন,
‘একদা রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার হাত ধরে তার গৃহে নিয়ে গেলেন। এক টুকরা রুটি তার সামনে পেশ করা হলে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, কোনো তরকারি (condiment, sauce) নেই কি? গৃহের লোকেরা বললেন, না; তবে সামান্য সিরকা বা ভিনেগার আছে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘সিরকা তো খুবই উত্তম তরকারি।’ জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি রসুল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখে এ কথা শোনার পর থেকে সিরকা পছন্দ করে থাকি। তালহা বলেন, আমিও জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহুর নিকট এ কথা শোনার পর থেকে সিরকা পছন্দ করতে শুরু করেছি।’ (সহীহ মুসলিম)
টমেটো ও আপেল থেকে তৈরি ভিনেগার
সিরকা (Vinegar) হচ্ছে এক প্রকার টক ও ঝাঁজযুক্ত পানীয় যার ভিতর অল্প পরিমাণ (৬% এর নিচে) এসিটিক এসিড রয়েছে। এটি ভুট্টা, টমেটো ও আপেল থেকে তৈরি হয়ে থাকে। আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন, ‘আল্লাহর রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তরমুজ ও খেজুর একত্রে খেতেন আর বলতেন, তরমুজ খেজুরের গরম দূর করে, আর খেজুর তরমুজের ঠাণ্ডা দূর করে দেয়।’ (আবু দাউদ ও আত-তিরমিযী)
পাকা তরমুজ (Ripe watermelon)
আব্দুল্লাহ ইবনে জাফর রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন যে ‘নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাজা খেজুরের সাথে একত্রে শসা খেতেন।’ (আবু দাউদ ও আত-তিরমিযী)
‘নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাজা খেজুর ও মাখন খুবই পছন্দ করতেন।’ (আবু দাউদ)
এটি বুসর সুলামী রাদিয়াল্লাহু আনহুর পুত্র আতিয়া ও আব্দুল্লাহ রদিয়াল্লাহু আনহুমার বর্ণিত হাদীস , যা আবু দাউদ ও তিরমিযী শরীফে উল্লেখ আছে। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম গোশত খুবই পছন্দ করতেন এবং এর প্রশংসা করতেন। গোশত সম্পর্কে দুটো হাদীস রয়েছে। প্রথমটি বর্ণনা করেন হযরত আবুদ দারদা রাদিয়াল্লাহু আনহু। আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘দুনিয়াবাসী ও জান্নাতবাসীদের প্রধান খাদ্য হলো গোশত।’ (ইবনে মাজাহ)
আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, ‘নবী করীম সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পছন্দের খাবার হচ্ছে সারিদ।’ (আবু দাউদ)
সারিদ হচ্ছে এক প্রকার স্যুপ জাতীয় খাবার এটা গোশতের ঝোলে ভেজানো রুটির টুকরো বিশেষ। তবে কোনো কোনো সময় এতে খেজুর, পনির, ঘি বা মাখন এবং ময়দাও দেয়া হতো।
আনাস ইবনে মালিক রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন যে নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘নারী সমাজের ওপর আয়েশার এমন মর্যাদা রয়েছে যেমন অন্যান্য সকল প্রকার খাদ্যের ওপর রয়েছে সারিদের প্রাধান্য।’ (ইবনে মাজাহ)
হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বর্ণনা করেন, ‘নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মধু ও মিষ্টি খেতে পছন্দ করতেন।’ (সহীহ আল বুখারী)
অন্যত্র হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, ‘নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হালুয়া, মিষ্টি ও মধু পছন্দ করতেন।’ (আত-তিরমিযী)
হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, ‘নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা যায়তুন (জলপাই)-এর তেল খাও এবং তা শরীরে ব্যবহার করো। কেননা এটি একটি বরকতময় ও প্রাচুর্যময় বৃক্ষের ফল থেকে উৎপন্ন হয়।’ (আত-তিরমিযী)
আবু উসাইদ আনসারী রাদিয়াল্লাহু আনহু ও উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহুর অনুরূপ হাদীস বর্ণনা করেছেন। (আত-তিরমিযী)
যায়তুন (জলপাই ফল) (Olive fruit)
আধুনিক বিজ্ঞান বলে যে যায়তুন (জলপাই) এর তেল নাশপাতি ও খাঁটি ঘি অপেক্ষা উত্তম। যায়তুন (জলপাই) হৃৎপিণ্ড, মস্তিষ্ক ও গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গসমূহের শক্তিবর্ধক। আরবদেশে যায়তুন (জলপাই) এর তেল ঘি-এর পরিবর্তে ব্যবহৃত হয়।
হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘এক দর্জি রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে দাওয়াত করলো। ঐ দাওয়াতে আমিও শরীক হলাম। খাবারে লাউসহ তরকারি পরিবেশন করা হলো। রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম লাউ বেছে বেছে খেতে লাগলেন, যা তার নিকট পছন্দনীয় তরকারি ছিলো। আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি নিজে লাউ না খেয়ে তা রসূল সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে এগিয়ে দিতে লাগলাম। আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু আরো বলেন, এরপর থেকেই আমার নিকট লাউ বা কদু তরকারি পছন্দনীয়। (সহীহ আল বুখারী ও মুসলিম)
হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহা বলেন, ‘নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সামনে খাবার আসলে তিনি সেই খাদ্যদ্রব্যের ভেতর যেটি অধিকতর সহজ ও সাধারণ (simple & ordinary) সেটিই বেছে নিতেন।’ (সহীহ আল বুখারী)
এটি শুধু খাবারের ক্ষেত্রেই নয়, বরং সকল ক্ষেত্রেই তিনি সহজ-সরল পদ্ধতি পছন্দ করতেন। কঠিন বিষয় তিনি কখনো গ্রহণ করতেন না।
প্রশ্ন-৭৬ : খাদ্যদ্রব্য তৈরি করতে ভুল-ত্রুটি হলে নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কী করেছেন?
উত্তর : হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, ‘নবী করীম রসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো খাদ্যদ্রব্যে ত্রুটি ধরতেন না বা ধরেননি। মনে চাইলে খেতেন আর মনে না চাইলে বা পছন্দ না হলে খেতেন না। অথবা চুপ থাকতেন।’ (সহীহআল বুখারী, মুসলিম ও ইবনে মাজাহা)
জনৈক বুযুর্গ ইন্তিকাল করলে তাকে কেউ স্বপ্নে দেখে জিজ্ঞেস করলো, ‘কেমন আছেন?’ তিনি উত্তরে বললেন, ‘হিসাব-নিকাশের ঝামেলা সহজেই মিটে গেছে।’ প্রশ্নকারী পুনরায় বললো, ‘কোন নেক কাজটি কাজে এসেছে? বুযুর্গ জবাবে বললেন, ‘আমার স্ত্রী একদিন খিচুড়ি পাকাতে গিয়ে ভুলে অতিরিক্ত লবণ দিয়ে ফেলে। আমি খিচুড়ির লোকমা মুখে দিতেই মনে হলো মুখে বিষ পুরে দিয়েছি। তখন অনিচ্ছায় লোকমা মুখ থেকে ফেলে দিতে ইচ্ছা করলো। কিন্তু হঠাৎ খেয়াল হলো, এটি তো আল্লাহর নিয়ামত। বিবির সামনে অসন্তোষের একটি কথাও উচ্চারণ না করে খিচড়িটা পেটভরে খেয়ে নিই। এ আমলটি আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতা’য়ালার নিকট পছন্দ হয় এবং আমার ক্ষমার নির্দেশ মিলে।’ (নযর আহমদ)
সুপ্রিয় পাঠক! এবার দেখুন আমাদের দেশে এমন ঘটনা আছে যে অনেকেই রাগের বশবর্তী হয়ে স্ত্রীকে মারধর পর্যন্ত করে থাকে, যা সত্যি অন্যায়। কারণ তরকারিতে কেউ তো ইচ্ছে করে লবণ বেশি দেয় না। যিনি রান্না করেন তিনিও তো সেই তরকারি একত্রে খাবেন। হঠাৎ কোনোদিন যদি এ ধরনের ভুল হয়ে যায়, তবে খাদ্য দ্রব্যকে আল্লাহর নিয়ামত মনে করে ফেলে না দিয়ে খেয়ে নেয়াই উত্তম। আর স্ত্রীকে বা যিনি রান্না করেন তাকে ক্ষমা করাই উচিত। কারণ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার খাদেমকে দিনে ৭০ বার ক্ষমা করতেন। রমাদান মাসে এই ধরনের ভুল বেশি হয়ে থাকে। কারণ রোযা রেখে তরকারির স্বাদ গ্রহণ করা যায় না।
