প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৬বর্ষ ৯ম সংখ্যা, মার্চ ২০১৭, জমা.আউ-জমা.সানি ১৪৩৮ হিজরী, ফাল্গুন-চৈত্র ১৪২৩বঙ্গাব্দ ‘ সংখ্যায়
(গত সংখ্যার পর)
হাজ্জ্বাজ ধারণা করেছিলেন, আনাস রাজনৈতিক বাতাস বুঝে কাজ করতেন। তাই আনাসকে দেখেই তিনি বলে উঠেন: ওহে খবীস এটা একটা চালবাজি। আপনি মুখতার আস-সাকাফীর সাথেও থাকেন, আবার কখনও থাকেন ইবনুল আশয়াসের সাথে। আমি আপনার জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করে রেখেছি। এমন কঠিন মুহূর্তেও আনাস নিজেকে আয়ত্বে রাখেন। শান্তভাবে তিনি বলেনঃ আল্লাহ আমীরকে সাহায্য করুন। আপনার শাস্তি কার জন্য? বললেনঃ আপনার জন্য। হযরত আনাস চুপচাপ বাড়ী ফিরে এলেন এবং খলীফা আবদুল মালিকের নিকট হাজ্জাজের আচরণের বিবরণ দিয়ে একটি চিঠি দিলেন। চিঠি পড়ে আবদুল মালিক রাগে ফেটে পড়লেন। সাথে সাথে তিনি হাজ্জাজকে লিখলেন, তুমি খুব তাড়াতাড়ি আনাসের বাড়ীতে গিয়ে ক্ষমা চাও, নইলে তোমার সাথে খুব খারাপ আচরণ করা হবে। খলীফার চিঠি পেয়ে হাজ্জ্বাজ তাঁর পরিষদবর্গসহ আনাসের খিদমতে হাজির হয়ে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তিনি আনাসের নিকট আরও আবেদন জানান, তিনি যে হাজ্জাজকে ক্ষমা করেছেন, সেই কথা যেন খলীফাকে একটু জানিয়ে দেন। আনাস তাঁর আবেদন মঞ্জুর করেন এবং সেই মর্মে একটি চিঠি দিমাশক পাঠিয়ে দেন। মুলতঃ ফিতনা ও বিশৃঙ্খলার ভয়ে আনাস এমন কঠিন ধৈর্য অবলম্বন করেন। (তারিখে ইবন আসাকির -৩/১৪৮) আল ফাতাহুর রাব্বানী মায়া বুলুগিল আমানী-২২/২০৫, হায়াতুস সাহাবা-২/৬৪৭,৬৪৭)
হযরত আবদুল্লাহ ইবন যুবাইর (রা) কর্তৃত্বের সময় হযরত আনাস কিছুদিনের জন্য বসরায় ছিলেন। খলীফা ওয়ালীদ ইবন আবাদিল মালিকের সময় তিনি একবার দিমাশকে যান। (তারিখে ইবন আসাকির-৩/১৩৯) তবে অন্য একটি বর্ণনা মতে তিনি প্রথমে দিমাশকে যান এবং সেখানে থেকে বসরায় পৌছেন। (আল- আলাম-১/৩৬৫)
হযরত আনাসের মৃত্যু সন ও মৃত্যুর সময় বয়স সম্পর্কে প্রচুর মতভেদ আছে। সর্বাধিক প্রসিদ্ধ মতে হিজরী ৯৩ সনে মৃত্যুবরণ করেন এবং তখন তার বয়স হয়েছিল একশো বছরের উর্ধ্বে। কারণ, হিজরাতের পূর্বে তার বয়স ছিল দশ বছর। (তাহাজীবুল আসমা-১/১২৮, আল- আলাম-১/৩৬৫, তাজকিরাতুল হুফফাজ-১/৪৫, উসুদুল গাবা-১/১২৮)
মৃত্যুর পূর্বে তিনি কয়েক মাস অসুস্থ অবস্থায় শয্যাশীয় ছিলেন। দেখার জন্য ভক্ত- অনুরক্তদের ভীড় লেগেই থাকতো। দূর থেকে দলে দলে মানুষ তাঁকে এক নজর দেখার জন্য আসতো। মৃত্যুর সময় ঘনিয়ে এলে তাঁর একান্ত শাগরিদ সাবিত নাবানীকে বলেন, আমার জিহবার নীচে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি পবিত্র চুল রেখে দাও। পবিত্র চুল রাখা হলো। এ অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন এবং সেই অবস্থায় দাফন করা হয়। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের একটি লাঠি ছিল তাঁর কাছে। মৃত্যুর পূর্বে লাঠিটি কবরে তাঁর সাথে দাফনের নির্দেশ দিয়ে যান। সে নির্দেশ পালন করা হয়। (উসদুল গাবা- ১/১২৮, আল-ইসাবা-১/৭১, আল-ইসতীয়ারব-১/৭৩) ইবন কুতায়বা আল-মায়ারিফ গ্রন্থে বলেন, বসরার তিন ব্যক্তির প্রত্যেকেই এক শো বছর জীবন পেয়েছিলেন। তাঁরা হলেনঃ আনাস ইবন মালিক, আবু বারাকাহ ও খলীফা ইবন বদর (রা)। (তাহজীবুল আসমা ওয়াল লুগাত-১/১২৮)
হযরত আনাস ছিলেন দুনিয়া থেকে বিদায় গ্রহণকারী বসরার শেষ সাহাবী। সম্ভবত : একমাত্র আবুত তুফাইল (রা) ছাড়া তখন পৃথিবীতে দ্বিতীয় কোন সাহাবী জীবিত ছিলেন না। (আল-ইসাবা-১/৭১, আল-আলাম-১/৩৬৫, আল-ইসরতয়িাব ঃ আল -ইসাবা-১/৭৩) অবশ্য আল্লামা জাহাবী তাজকিরাতুল হুফফাজ গ্রন্থে বলেন : কানা (আনাস) আখিরাস সাহাবাতি মাওতান- আনাস মৃত্যুবরণকারী সর্বশেষ সাহাবী। সাহাবীদের মধ্যে দুনিয়া থেকে তিনিই সর্বশেষ বিদায় নেন। (তাজাকিরাতুল হুফফাজ গ্রন্থে বলেন ঃ হযরত আনাস নিজেও শেষ জীবনে বলতন ঃ কিবলাতাইন বা দুই কিবলার দিকে মুখ করে নামায আদায় করেছেন, এমন ব্যক্তিদের মধ্যে একমাত্র আমি ছাড়া এখন আর কেউ বেঁচে নেই। (তারীখে ইবন আসাকির- ৩/১৪৫)
পরিবারের সদস্য, ছাত্র ও ভক্তদের ছাড়াও আশ-পাশের লোকেরা তাঁর জানাযায় শরীক হন। কুতন ইবন মদরিক আল- কিলাবী জানাযার নামায পড়ান। বসরার উপকণ্ঠে তিফ নামক স্থানে তাঁর বাসস্থানের পাশেই কবর দেওয়া হয়। (উসদুল গাবা-১/১২৯)
হযরত আনাসের মৃত্যুতে গোটা মুসলিম উম্মাহ দারুণ শোকাভিভূত হয়ে পড়েছিল। বাস্তবেও তেমন হওয়ার কথা। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবীরা এক এক করে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়ে চলে গিয়েছিলেন। মাত্র দুই ব্যক্তি যাদেরকে দেখে মানুষ প্রশান্তি লাভ করতো, তাঁদের একজন চলে গেলেন।
হযরত আনাসের ইনতিকালের পর মাওরিক নামক এক তাবেঈ ব্যক্তি আফসোস করে বলেনঃ আল -ইয়াম জাহাবা নিসফুল ইলম- আজ অর্ধেক ইলম (জ্ঞান) চলে গেল। লোকেরা প্রশ্ন করলোঃ তা কেমন করে? বললেনঃ আমার কাছে একজন প্রবৃত্তির অনুসারী লোক আসতেন। সে যখন হাদীসের বিরোধীতা করতো, আমি তাঁকে আনাসের নিকট নিয়ে যেতাম। আনাস তাঁকে হাদীস শুনিয়ে নিশ্চিন্ত করতেন। এখন কার কাছে যাব? (তাহাজীবুল আসমা ওয়ালা লুগাত-১/১২৮, তারীখে ইবন আসাকির-৩/১৪১)
আনসার সম্প্রদায়ের মধ্যে হযরত আনাসের সন্তান সন্তুতির সংখ্যা ছিল সব চেয়ে বেশী। আর এটা হয়েছিল হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দু’আর বরকতে। এ সম্পর্কে আনাস বলেনঃ একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উম্মু সুলাইমের (আনাসের মা) বাড়ীতে এলেন। উম্মু সুলাইম খুরমা ও ঘি খেতে দিলেন। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেদিন সাওম পালন করেছিলেন। তিনি বললেনঃ এগুলি নিয়ে যাও এবং খুরমার পাত্রে খুরমা ও ঘিয়ের পাতে ঘি রেখে দাও। তারপর তিনি উঠে ঘরের এক কোণে গিয়ে দুই রাকায়াত নামায আদায় করেন। আমরাও তার সাথে নামায আদায় করলাম। তারপর উম্মু সুলাইম ও তার পরিবারের কল্যাণ কামনা করে দু’আ করলেন। উম্মু সুলাইম আরজ করলেনঃ ইয়া রাসূলুল্লাহ আমার কিছু বিশেষ নিবেদন আছে। তিনি জানতে চাইলেন: কী? বললেন ঃ এই আপনার খাদিম আনাস। আনাস বলেন ঃ তারপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার জন্য এমন দু‘আ করলেন যে, দুনিয়া ও আখিরাতের কোন কল্যাণই বাদ দিলেন না। শেষের দিকে তিনি বলেন ঃ ‘হে আল্লাহ আনাসের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্তুতিতে সমৃদ্ধি দান কর এবং তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করাও।’ আনাস বলতেন ঃ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে তিনটি জিনিসের জন্য দু‘আ করেছিলেন, তার দুটি আমি পেয়ে গেছি এবং বাকী একটির (জান্নাত) অপেক্ষায় আছি। আনাস আরও বলতেন ঃ ‘আজ আনসারদের মধ্যে আমার চেয়ে বেশি সম্পদশালী আর কেউ নেই।’ ঐতিহাসিকরা বলছেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই দু‘আর পূর্বে একটি মাত্র আংটি ছাড়া তিনি কোন সোনা বা রূপোর মালিক ছিলেন না। এভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আনাস ও তাঁর পরিবারের কল্যাণ চেয়ে বহুবার দু‘আ করেছেন। (আল ফাতহুর রাব্বানী-মা’য়া বুলুগিল আমানী-২২/২০৩, আল-ইসাবা-১/৭২, তারীখে ইবন ‘আসাকির-৩/১৪২, ১৪৩)
মৃত্যুকালে হযরত আনাস মোট ৮২ (বিরাশি) জন ছেলে মেয়ে রেখে যান। তাদের মধ্যে ৮০ (আশি) জন ছেলে এবং হাফসা ও উম্মু’আমর নামে দুই মেয়ে। তাছাড়া নাতি-নাতনীর সংখ্যা ছিল আরও অনেক। (উসূদুল গাবা-১/১২৮) খলীফা ইবন খাইয়্যাত বলেন ঃ আনাস যখন মারা যান তখন তাঁর চারটি বাড়ি। একটি বসরায় জামে মসজিদের সামনে, একটি ইসতাফানুস গলিতে এবং একটি বসরা থেকে দুই ফারসাখ দূরে। তাছাড়া আরও একটি বাড়ি ছিল। (তারীখে ইবন ‘আসাফির-৩/১৪১)
সন্তানদের প্রতি ছিল হযরত আনাসের দারুণ স্নেহ-মমতা। সব সময় যে তিনি বাড়িতে থাকতেন- এই স্নেহ-মমতার প্রাবল্যও তার একটি কারণ। ছেলে-মেয়েদের নিজেই শিক্ষা দিতেন। মেয়েদেরও হালকায়ে দারসে বসার অনুমতি ছিল। তাঁর কয়েকটি ছেলে হাদীস শাস্ত্রের শায়খ ও ইমামরূপে স্বীকৃত হন। তাবেঈদের তাবকায় (শ্রেণী) তাদেরকে সম্মানের দৃষ্টিতে দেখা হয়। হযরত আনাসই তাদেরকে গড়ে তোলেন।
হযরত আনাস ছিলেন একজন দক্ষ তীরন্দাজ। সন্তানদের এর অনুশীলন করাতেন। ছেলেরা প্রথমে নিশানা ঠিক করে তীর ছুড়তো। তারা লক্ষ্যভ্রষ্ট হলে তিনি ছুড়তেন এবং সঠিকভাবে তা লক্ষ্যভেদ করতো। তীর ছোড়ার অনুশীলনী সেই প্রাচীন জাহিলিয়্যাতের সময় থেকে আনসারদের মধ্যে প্রচলিত ছিল। একথা তাবারী উল্লেখ করেছেন। (উসূদুল গাবা-১/১২৮)
হযরত আনাসের পরিপূর্ণ হুলিয়া বা অবয়ব জানা যায় না। এতটুকু জানা যায় যে, তিনি মধ্যম আকৃতির সুদর্শন ব্যক্তি ছিলেন। চুল-দাড়িতে মেহেদীর খিযাব লাগাতেন। হাতে সব সময় বলুদ বর্ণের ‘খালুক’ নামক এক রকম সুগন্ধি ব্যবহার করতেন। ‘উসূদুল গাবা’ গ্রন্থকার বলেন ঃ সিংহের ছবি অঙ্কিত একটি আংটি হাতে পরতেন। বার্দ্ধক্যে সোনা দিয়ে দাঁত বেঁধেছিলেন। সুন্দর মিহি কাপড়ের পোশাক পরতেন। ছোট বেলায় মাথায় একটি জটা ছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মাথায় হাত দিতেন, সেই জটা স্পর্শ করতেন। পরে সেটি কেটে ফেলার ইচ্ছা করলে মা বললেন ঃ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটি স্পর্শ করেছেন, সুতরাং কেটো না। (উসূদুল গাবা-১/১২৭-১২৮) মাথায় পাগড়ী বাঁধতেন।
তিনি ছিলেন দারুণ সৌখিন ও পরিচ্ছন্ন প্রকৃতির একজন মার্জিত রুচির মানুষ। দুনিয়ার বিত্ত-বৈভবও তাঁর অনুকূলে সাড়া দেয়। এ কারণে তাঁর জীবন ছিল অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ব। অতি যতেœ একটি উদ্যান তৈরি করেছিলেন, তাতে বছরে দুইবার ফল আসতো। সেখানে একটি ফুল ছিল যা মিশকের মত সুগন্ধি ছড়াতো। (আল-ইসাবা-১/৭১)
তিনি বসরার দুই ফারসাখ (মাইল) দূরে ‘তিফ’ নামক স্থানে একটি বাড়ী বানিয়ে বসবাস করতেন। এতে বুঝা যায়, নগর জীবনের চেয়ে পল্লীতে বাস করা বেশি পছন্দ করতেন। ভালো খাবার খেতেন। খাবার তালিকায় সব সময় রুটি ও শুরবা থাকতো। তিনি উদার প্রকৃতির ছিলেন। আহারের সময় ছাত্র বা অন্য কেউ কাছে থাকলে, আহারে শরীক করাতেন। সকালে নাশতা করতেন এবং তিন অথবা পাঁচটি খেজুর খেতেন। কথা খুব কম বলতেন। প্রয়োজন হলে কথা তিনবার করে বলতেন। কারও বাড়িতে ঢুকবার আগে তিনবার অনুমতি চাইতেন। (মুসনাদ- ৩/১২৮, ১৮০, ২২১, ২৩২)
আত্মীয়-বন্ধুদের কেউ সাক্ষাৎ করতে এলে কিছু না কিছু খাবার তাদের সামনে উপস্থিত করতেন। একবার তিনি অসুস্থ হয়ে পড়লে কিছু লোক তাঁকে দেখতে আসে। তিনি দাসীকে ডেকে বললেন : রুটির সামান্য একটি টুকরো হলেও আমার বন্ধুদের জন্য নিয়ে এসো। কারণ, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি : উত্তম নৈতিকতা জান্নাতের কাজ। (হায়াতুস সাহাবা-২/১৮২)
তিনি অত্যন্ত বিনয়ী ও নম্র প্রকৃতির ছিলেন। মানুষের সাথে উদারভাবে মিশতেন। ছাত্রদের সাথেও ছিলেন ভীষণ আন্তরিক। প্রায়ই বলতেন- রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সময় আমরা বসা থাকতাম, তিনি আসতেন, কিন্তু তাঁর সম্মানে আমরা কেউই উঠে দাঁড়াতাম না। অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম চেয়ে অধিকতর প্রিয় আমাদের আর কে হতে পারে? এর কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সব কৃত্রিমতা একটুও পছন্দ করতেন না।
সবরের গুণটি তাঁর মধ্যে পূর্ণমাত্রায় বিকশিত হয়েছিল। তিনি যে পর্যায়ের লোক ছিলেন, মুসলমানদের অন্তরে তার প্রতি যে ভক্তি ও শ্রদ্ধা ছিল, হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর যে মর্যাদার কথা বলেছেন এবং খোদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যে নৈকট্য তিনি লাভ করেছিলেন তাতে প্রতিটি মানুষ তাঁকে সম্মান, শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার দৃষ্টিতে দেখতো। তাঁর ছাত্র প্রখ্যাত তাবেঈ সাবিত নাবানী ও শ্রদ্ধার আতিশয্যে হযরত আনাসের দুই চোখের মাঝখানে চুমু দিতেন। একবার আনাস আবুল ‘আলিয়্যাকে একটি সেব দিলেন। সেবটি হাতে নিয়ে তিনি শুকতে, চুমু খেতে ও মুখে ঘষতে লাগলেন। তারপর বললেন- এই সেবে এমন হাতের স্পর্শ লেগেছে যে হাত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পবিত্র হাত স্পর্শ করেছে।
(তারীখে আসাকির- ৩/১৪৪) কিন্তু এতকিছু সত্ত্বেও উমাইয়্যা শাসকদের অনেকের কাছে এর কোন গুরুত্বই ছিল না। এসব স্বেচ্ছাচারী দুষ্টমতিদের নেতা ছিলেন হাজ্জাজ ইবন ইউসুফ। তাঁর উদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের কথা পূর্বেই বলা হয়েছে। হযরত আনাস তখন চরম ধৈর্য অবলম্বন করেন। তিনি ছাড়া অন্য কারও সাথে এমন আচরণ করা হলে বসরায় আগুন জ্বলে যেত। তিনি কোন নীতি অবলম্বন করে এত ধৈর্য ধারণ করতেন? এর একটা ইঙ্গিত পাওয়া যায় তাঁর নিজের কথার মধ্যে। তিনি বলতেন- মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিশিষ্ট সাহাবীরা আমাদেরকে বলেছেন- তোমরা তোমাদের আমীরদেরকে গালাগালি করবেনা, তাঁদেরকে ধোকা দেবে না এবং তাঁদের অবাধ্য হবে না। আল্লাহকে ভয় করবে ও ধৈর্য ধারণ করবে। (হায়াতুস সাহাবা – ২/৭২)
ছেলেবেলা থেকেই তিনি ছিলেন ভয়-ডর শূন্য দুঃসাহসী। খুব দৌঁড়াতে পারতেন। একবার ‘মাররুজ জাহরান’ নামক স্থানে একটি খরগোশ তাড়া করে ধরে ফেলেন। অথচ তাঁর সমবয়সী ছেলেরা খরগোশটির পিছনে ধাওয়া করে ফিরে আসে। বড় হয়ে নিপুণ অশ্বারোহী ও দক্ষ তীরন্দাজ হন।
হাদীস বর্ণনাকারী সাহাবীদের সংখ্যা বিপুল। তাঁদের মধ্যে আবার এমন একদল আছেন যাঁরা বর্ণনার ক্ষেত্রে মূল ভিত্তি বলে বিবেচিত। আনাস ছিলেন এই দলেরই একজন। তাঁর বর্ণনাসমূহ বিশ্লেষণ করলে নিচের মূলনীতিগুলো পাওয়া যায় :
১. হাদীস বর্ণনার ক্ষেত্রে দারুণ সতর্কতা অবলম্বন। মুসনাদে আহমাদ গ্রন্থে এসেছে : ‘আনাস ইবন মালিক হাদীস বর্ণনার সময় ভীত হয়ে পড়তেন। বর্ণনার শেষে বলতেন : এই রকম অথবা এই যেমনটি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন’ মুহাদ্দিসগণ হাদীস বর্ণনার শেষে যে বলে থাকেন- ‘আও কামা কালা- অথবা যেমন তিনি বলেছেন’ এবং আজকের যুগ পর্যন্ত যে ধারাটি অব্যাহত রয়েছে, তাঁর প্রচলন হযরত আনাস থেকে। (তারীখে ইবন ‘আসাকির-৩/১৪৮)
২. যে হাদীস বুঝতে ভুল হওয়ার সম্ভাবনা থাকতো, তিনি তা বর্ণনা করেননি।
৩. যে সকল হাদীস তিনি সাহাবীদের নিকট থেকে এবং যেগুলি খোদ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মুখ থেকে শুনেছিলেন এই দুই প্রকারের মধ্যে পার্থক্য করেছিলেন।
প্রকৃতপক্ষে কোন জ্ঞানের সেবা বা খিদমাত হলো সেই জ্ঞানের প্রচার ও প্রসার ঘটানো, হযরত আনাস এ থেকে কোন সাহাবী থেকে পিছিয়ে ছিলেন না। সারাটি জীবন তিনি অভিনিবেশ সহকারে ইলমে হাদীসের প্রচার-প্রসারে অতিবাহিত করেন। তিনি হাদীস শিক্ষা দানের আওতা থেকে কক্ষণও বাইরে যাননি। যে যুগে তাঁর সমসাময়িক সাহাবা যুদ্ধ-বিগ্রহে ব্যস্ত ছিলেন তখনও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এই খাদিম দুনিয়া থেকে সম্পূর্ণ পৃথক হয়ে বসরার জামে মসজিদে বসে মানুষকে হাদীস শোনাতেন।
তাঁর জ্ঞানের প্রসারতা তাঁর শাগরিদদের সংখ্যা দ্বারাই অনুমান করা যায়। তাঁর হালকায়ে দারসে মক্কা, মদীনা, কুফা, বসরা, সিরিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলের ছাত্রের সমাবেশ ঘটতো। তাঁর সন্তান সংখ্যার মতো ছাত্র সংখ্যাও অগণিত। হযরত আনাস হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে এবং বিশিষ্ট সাহাবীদের নিকট থেকেও এবং বিশিষ্ট সাহাবীদের নিকট থেকেও হাদীস বর্ণনা করেছেন। প্রায় এক শো রাবী তাঁর থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাঁর বর্ণিত হাদীসের সংখ্যা মোট ২২৮৬ (দুই হাজার দুই শো ছিয়াশি)। মুত্তাফাক আলাইহি- ১৮০, বুখারী এককভাবে ৮০ এবং মুসলিম এককভাবে ৭০টি হাদীস বর্ণনা করেছেন। তাঁর ছেলে এবং নাতীদের থেকেও বহু হাদীস বর্ণিত হয়েছে। বসরার বিখ্যাত মুহাদ্দিস আবু ‘উমাইর ’আবদুল কাবীর ইবন মুহাম্মাদ ইবন আবদুল্লাহ ইবন হাফস ইবন হিশাম (২৯১ হি.) তাঁরই বংশধর। (দায়িরা-ই-মা’য়ারিফ ইসলামিয়া-৩/৪০১) অবশ্য তাঁর বর্ণিত মুত্তাফাক আলাইহি হাদীসের ব্যাপারে মতভেদ আছে। কেউ বলেছেন-১৬৮, কেউ বলেছেন-১২৮। (তাজকিরাতুল হুফফাজ-১/৪৫, তাহজীবুল আসমা-১/১২৭)
হযরত আনাস প্রথমতঃ রাসূলে পাক সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহচার্যে থেকে ইলম হাসিল করেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওফাতের পর যে সকল সাহাবীর নিকট থেকে হাদীস শোনেন তারা হলেন- উবাই ইবন কা’ব, ‘আবদুর রহমান ইবন ‘আউফ, আবদুল্লাহ ইবন মাস’উদ, আবু জার, আবু তালহা, মু’য়াজ ইবন জাবাল, ‘উবাদাহ্ ইবনুস সামিত, আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা, সাবিত ইবন কায়েস, মালিক ইবন সা’সা, উম্মু সুলাইম (তাঁর মা), উম্মু হারাম (তাঁর খালা), উম্মুল ফাদল (হযরত আব্বাসের স্ত্রী), আবু বকর, উমার, উসমান (রা.) প্রমুখ। (তাজাকিরাতুল হুফফাজ-১/৪৪)
হযরত আনাসের ছাত্র ও শাগরিদদের নামের তালিকা অনেক দীর্ঘ। তাঁর মধ্যে হাদীস শাস্ত্রে যাঁরা বিশ্বজোড়া খ্যাতি অর্জন করেছেন এখানে তাঁদের কয়েকজনের নাম উল্লেখ করা গেল : হাসান বসরী, ইবন শিহাব যুহরী, সুলাইমান তায়মী, আবু কিলাবা, ইসহাক ইবন আবী তালতা, আবু বকর ইবন ‘আবদিল্লাহ মুযানী, কাতাদাহ, সাবিত নাবানী, হুমাইদ আতত্বাবীল, সুমামাহ্ ইবন আবদিল্লাহ, (আনাসের পৌত্র) জা’দ, আবু উসমান, মুহাম্মাদ ইবন সীরীন সা’ঈদ ইবন জুবাইর এবং সুলাইমান ওয়ারদান রাহিমাহুমুল্লাহ। (তাজাকিরাতুল হুফফাজ-১/৪৫)
ইলমে হাদীসের মতো ফিকাহ শাস্ত্রেও হযরত আনাসের পাণ্ডিত্য ছিল। ফকীহ সাহাবীদেরকে তিনটি তাবকা বা স্তরে ভাগ করা হয়। আনাসের স্থান দ্বিতীয় স্তরে। তাঁর ইজতিহাদ ও ফাতওয়াসমূহ সংকলিত হলে একটি স্বতন্ত্র পুস্তকের রূপ লাভ করতে পারে। হযরত ‘উমার (রা.) ফকীহ সাহাবীদের একটি দলের সাথে তাঁকে বসরায় পাঠান। ফিকাহ শাস্ত্রে তাঁর বিশেষজ্ঞ হওয়ার জন্য এর চেয়ে বড় প্রমাণ আর কি হতে পারে?
সাহাবীদের যুগে শিক্ষাদান সাধারণত হালকা-ই-দারসের মধ্যেই সীমিত ছিল। হযরত আনাসও এই হালকার পদ্ধতিতেই দারস দিতেন। কোন ছাত্র প্রশ্ন করলে তিনি জবাব দিতেন। তাঁর দারসের এ ধরনের সাওয়াল-জাওয়াবের একটি সংকলন আছে। এখানে কয়েকটি মাসয়ালা উদ্ধৃত হলো যার মাধ্যমে তাঁর ইজতিহাদ পদ্ধতি, সূক্ষ্মদৃষ্টি, স্বচ্ছ বোধশক্তি, সঠিক সিদ্ধান্ত ইত্যাদির একটি ধারণা লাভ করা যেতে পারে।
বিশেষ কয়েকটি বরতনে নাবীজ (আংগুর বা খেজুরের রস) পান করা মাকরূহ। এ ব্যাপারে সাহাবায়ে কেরাম একমত। হযরত আনাস স্পষ্ট করে তার কারণগুলির প্রতি ইঙ্গিত করেছেন।
একবার কাতাদাহ জিজ্ঞেস করলেন, ঘড়া বা কলসে কি নাবীজ বানানো যায়? আনাস বললেন : যদিও রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সম্পর্কে কোন মত প্রকাশ করে যাননি, তবুও আমি মাকরূহ মনে করি। কারণ, যে জিনিসের হারাম বা হালাল হওয়া সম্পর্কে সন্দেহ আছে, তাতে হারাম হওয়ার দিকটিই প্রাধান্য পাবে।
একবার মুখতার ইবন ফিলফিল জানতে চাইলেন, কোন্ কোন্ পাত্রে নাবীজ পান করা উচিত নয়? তিনি বললেন, যাতে নেশা হয় তা সবই হারাম। মুখতার বললেন, কাঁচ অথবা আলকাতরার পাত্রে কি পান করা যায়? তিনি বললেন, হ্যাঁ, আবার প্রশ্ন করা হলো : মানুষ যে মাকরূহ মনে করে? তিনি বললেন, যাতে সন্দেহ হয় তা পরিহার কর। তারপর একটা গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন করা হলো : নেশা হয় এমন জিনিস তো হারাম; কিন্তু এক দুই ঢোক পানে আপত্তি কি? আনাস বললেন, যে জিনিসের বেশি পরিমাণ নেশা সৃষ্টি করে তার অল্প পরিমাণও হারাম। দেখ-আংগুর, খুরমা, গম, যব ইত্যাদি থেকে মদ তৈরি হয়। তার মধ্যে যে জিনিসে নেশা সৃষ্টি হয় তা মদ হয়ে যায়।
হযরত আনাস যদিও সুন্দরভাবে এই মাসআলাটি বর্ণনা করেছেন, তবুও এর আরও একটু ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
হযরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পান ও পানীয় সম্পর্কে যে বিধি-বিধান দান করেছেন সংক্ষেপে তা নিম্নরূপ :
১. প্রত্যেক শরাব বা পানীয় যা নেশা সৃষ্টি করে তা হারাম। সাহীহাইনে হযরত আয়িশা (রা.) থেকে এ হাদীস বর্ণিত হয়েছে।
২. প্রত্যেক নেশা সৃষ্টিকারী বস্তুই খমর এবং প্রত্যেক খমর (মদ) হারাম। ইবন ‘উমার (রা.) থেকে সাহীহ মুসলিমে হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে।
৩. ‘যে সব জিনিসের বেশি পান করলে নেশা হয় তার অল্প একটুও হারাম।’ (সুনানু ইবন ’উমার)। এর মধ্যে প্রথম হাদীসটির মর্ম হলো, যে সকল পানীয়ের মধ্যে নেশা বা মাদকতা এসে যায় তা হারাম। দ্বিতীয়টির অর্থ হলো, প্রত্যেক নেশা সৃষ্টিকারী বস্তুই খমর, আর প্রত্যেক খমরই হারাম। সুতরাং সিদ্ধান্ত এই দাঁড়ায়; প্রত্যেক নেশা সৃষ্টিকারী বস্তুই হারাম। তৃতীয়টির অর্থ হলো : যে সব জিনিসের বেশি পান করলে নেশা হয় তার অল্প একটুও হারাম। হযরত আনাস (রা.) তাঁর উপরোক্ত জবাবে এই কথাটিই বলেছেন।
এখন প্রশ্ন হলো বিশেষ কয়েকটি পাত্রে নাবীজ পান করতে নিষেধ করা হয়েছে কেন? এর প্রকৃত রহস্য এই যে, আধুনিক বিশ্ব মদ তৈরি ও সংরক্ষণের জন্য সুন্দর কাঁচের যে সব পাত্র আবিষ্কার করেছে, তৎকালীন আরবে তা ছিল না। সেখানে সাধারণভাবে লাউ-এর খোল ও সুরাহী বোতলের কাজ দিত। অথবা এ জাতীয় আরও কয়েকটি পাত্র ছিল যা প্রাকৃতিক ফল শুকিয়ে ও সাফ করে মদের কাজে ব্যবহার করা হতো। ঐ সব পাত্রে মদ রাখলে স্বাভাবিকভাবেই তাতে মদের ক্রিয়া পড়তো, আর তা ধোয়ার পরেও দূর হতো না। ইসলামের প্রথম যুগে যখন মদ হারাম হয় তখন এইসব পাত্রের ব্যবহার হারাম হওয়ার প্রকৃত রহস্য এটাই। অবশ্য পরবর্তীকালে এ জাতীয় পাত্র যাতে মদ রাখা হয়নি, তার ব্যবহার জায়েয হতে পারে। কিন্তু হিজরী প্রথম শতকের ঈমানী চেতনায় উজ্জীবিত মুসলমানরা ধারণা করে যে, ঐ সব পাত্র ব্যবহার করলে শরাব পানের কথা নতুন করে মানুষের স্মরণ হতে পারে।
একবার এক ব্যক্তি হযরত আনাসকে প্রশ্ন করলো : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কি জুতো পরে নামায আদায় করতেন? বললেন : হ্যাঁ, জুতো পরে নামায আদায় করা যায়। তবে শর্ত হলো, পাক হতে হবে, নাজাসাত থেকে পরিষ্কার হতে হবে। কেউ নতুন জুতো পরে নামায পড়লে ক্ষতি নেই।
একবার ইয়াহইয়া ইবন ইয়াযীদ হান্নায়ী প্রশ্ন করলেন : নামাযে কখন কসর করা উচিত? তিনি বললেন : আমি যখন কুফা যেতাম, তখন কসর করতাম। আর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিন মাইল বা তিন ফারসাখ পথ চলার পর কসর করেছিলেন। হযরত আনাসের কথার অর্থ এই নয় যে, তিন মাইল সফর করলেই কসর করতে হবে। বরং প্রকৃত ঘটনা হলো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কার উদ্দেশ্যে বের হয়ে পথে সর্বপ্রথম জুলহুলায়ফা নামক স্থানে যাত্রা বিরতি করেন। সাহীহ বর্ণনা মতে, তা মদীনা থেকে তিন মাইল দূরে অবস্থিত। আর এ জন্যই তিনি সেখানে কসর আদায় করেন।
মুখতার ইবন ফিলফিল একবার প্রশ্ন করলেন : অসুস্থ ব্যক্তি কিভাবে নামায আদায় করবে? আনাস বললেন : বসে বসে।
‘আবদুল রহমান ইবন দারদান এবং তাঁর সাথে আরও কিছু লোক মদীনায় আনাসের কাছে আসলেন। আনাস জিজ্ঞেস করলেন : তোমরা কি আসরের নামায আদায় করেছ? তাঁরা বললেন : হ্যাঁ। তাঁরা পাল্টা প্রশ্ন করলো : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আসরের নামায পড়তেন কোন সময়? বললেন : সূর্য তখনও উজ্জ্বল ও উপরে থাকতো।
একবার তিনি একটি জানাযার নামায পড়ালেন। জানাযাটি ছিল পুরুষের। এজন্য মাইয়্যেতের মাথা বরাবর দাঁড়ালেন। একবার এক মহিলার জানাযা আনা হলো। এবার তিনি কোমর সোজা দাঁড়ালেন। ‘আলা ইবন যিয়াদ আদাদীও সেই নামাযে উপস্থিত ছিলেন। তিনি দুইটি জানাযায় দুই রকম দাঁড়ানোর কারণ জানতে চাইলেন। আনাস বললেন : রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এমনটিই করতেন। ‘আলা’ সমবেত লোকদের বললেন : ওহে, তোমরা কথাটি মনে রেখ।
একবার এক ব্যক্তি প্রশ্ন করলো : হযরত উমার (রা.) রুকু’র পরে কুনুত পড়েছিলেন? বললেন : হ্যাঁ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও পড়েছিলেন। তবে এটা হযরত আনাসের নিজস্ব মতামত। কারণ, সহীহ হাদীস দ্বারা একথা প্রমাণিত যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাধারণভাবে প্রায় সকল সাহাবা ‘বিতর’ নামাযে রুকু’র পূর্বে কুনুত পড়তেন। এই মাসয়ালার ইমাম শাফে’ঈ হযরত আনাসের অনুসারী। তিনি নিজের মতের স্বপক্ষে প্রমাণ হিসেবে একটি হাদীস গ্রহণ করেছেন। হাদীসটি হলো, হযরত ‘আলীও রুকু’র পরে কুনুত পড়তেন। কিন্তু হাদীসটি মুনকাতা’ ও দুর্বল সনদ বিশিষ্ট।
তাছাড়া ইবন মুনজির ‘আল-আশরাফ’ গ্রন্থে লিখেছেন, আনাস এবং অমুক অমুক সাহাবী থেকে বর্ণিত যে সকল হাদীস আমার কাছে পৌঁছেছে, তার প্রত্যেকটিতে রুকু’র পূর্বে কুনুত রিওয়ায়াত এসেছে তাতে এই মাসয়ালার স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। ‘আসিম হযরত আনাসকে জিজ্ঞেস করলেন : কুনুত রুকু’র পূর্বে না পরে পড়া উচিত? বললেন : রুকু’র পূর্বে। ‘আসিম বললেন : মানুষের তো ধারণা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রুকু’র পরে পড়তেন। আনাস বললেন : সে একটা সাময়িক ঘটনা। কয়েকটি গোত্র মুরতাদ হয়ে যায় এবং বেশ কিছু সাহাবাকে হত্যা করে। এজন্য হযরত রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একমাস রুকু’র পরে কুনুত পড়ে তাদের ওপর বদ দু’আ করেছিলেন। (মুসনাদে আহমাদ- ৩/১০০, ১১২, ১১৮, ১২৬, ১২৯, ২০৪, ২০৯)
উল্লেখিত আলোচনা থেকে আমরা দেখতে পেলাম হযরত আনাস কেমন সঠিক সিদ্ধান্তের অধিকারী ছিলেন। তাঁর ইজতিহাদী মাসয়ালার বিশেষ বৈশিষ্ট্য এই যে, তা অন্যান্য সাহাবার ইজতিহাদের সাথে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সামঞ্জস্যপূর্ণ। এজন্য তা সঠিক। (দ্রঃ সীয়ারে আনসার-১/১৩৭-১৪২)
