প্রকাশিত হয়েছে: ‘৭৭বর্ষ- ৫ম সংখ্যা, নভেম্বর ২০১৭, মুহাররম-সফর ১৪৩৯ হিজরী, কার্তিক-অগ্রহায়ন ১৪২৪ বঙ্গাব্দ’ সংখ্যায়
মক্কার অদূরে ‘তানঈম’ এর খোলা প্রান্তর। যেখানে আজ কুরাইশ নেতারদের আহ্বানে সমবেত হচ্ছে হাজার হাজার মানুষ। মক্কার তরুণ সাঈদ ইবনে আমেরও অন্যদের মতো তানঈমের উদ্দেশ্যে বেরিয়েছে। তানঈমের এই খোলা ময়দানে আজ প্রকাশ্যে হত্যা করা হবে মুহাম্মাদের এক সহচর খুবাইব ইবনে আদিকে। যাকে ধোঁকা দিয়ে বন্দী করে আনা হয়েছে মক্কায়।
টগবগে যুবক সাঈদ ইবনে আমের সমবেত জনতার ভিড় ঠেলে ঠেলে পৌঁছে গেল একেবারে সন্মুখসারিতে। এমনকি এই আনন্দ মিছিলের নেতৃত্ব দানকারী কুরাইশের বর্ষীয়ান নেতৃবৃন্দ- আবু সুফিয়ান ইবনে হারব এবং সফওয়ান ইবনে উমাইয়া প্রমুখের পাশাপাশি গিয়ে তিনি দাঁড়িয়ে গেলেন।
এতে তিনি খুব কাছ থেকে দেখতে পেলে কুরাইশের শৃঙ্খলিত বন্দীকে। যাঁকে বহু মানুষের ঠেলা আর ধাক্কা খেয়ে পায়ে পায়ে এগিয়ে যেতে হচ্ছে চূড়ান্ত মৃত্যুর দিকে। যাঁকে হত্যা করে শাস্তি দেওয়া হবে মুহাম্মাদকে। যাঁকে হত্যার মাধ্যমে বদরযুদ্ধে নিহত আত্মীয়দের কিছুটা প্রতিশোধ নেওয়া যাবে।
********
জনতার এই বিশাল ভিড় বন্দীকে ঠেলে নিয়ে যখন উপনীত হলো প্রস্তুতকৃত বধ্যভূমিতে, দীর্ঘদেহী তরুণ সাঈদ ইবনে আমের আল-জুমাহী দাঁড়িয়ে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে থাকলেন খুবাইবকে। তাঁকে নেওয়া হচ্ছিল মূলমঞ্চের দিকে। নারী-পুরুষ ও শিশুর উৎকট চেঁচামেচির মধ্যেও তিনি শুনলেন খুবাইবের দৃঢ়, অকম্পিত শান্ত কণ্ঠস্বর… তিনি বলছেন-
‘তোমরা যদি হত্যার পূর্বে আমাকে দু’রাকাত নামাযের সুযোগ দিতে চাও, তাহলে দাও…’
এরপর খুবাইবকে দেখলেন কাবার দিকে ফিরে দাঁড়াতে, দু’রাকাত নামায পড়তে। আহা! সে যে কী চমৎকার নামায। দু’রাকাত নামাযের সে যে কী পরিপূর্ণতা! নামায শেষে তিনি নেতৃবৃন্দের কাছে এগিয়ে গিয়ে বললেন,
‘আল্লাহর কসম! আমি মৃত্যুর ভয়ে দীর্ঘ নামাযের মাধ্যমে কালক্ষেপন করছি- তোমাদের এই ধারণার ভয়টা যদি আমার না হতো, তাহলে আরও বেশি দীর্ঘ নামায পড়তাম।’
এরপর সাঈদ ইবনে আমের স্বচক্ষে তাঁর কওমের নির্মম নিষ্ঠুরতা দেখলেন। দেখলেন জীবন্ত খুবাইবের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ একটি একটি করে কেটে ফেলা হচ্ছে। এরই মধ্যে কুরাইশ নেতারা জিজ্ঞাসা করল খুবাইবকে,
‘তুমি কি নিজের শাস্তি মুহাম্মাদের ওপর চাপিয়ে দিয়ে নিজেকে মুক্ত করতে চাও?’
খুবাইব কর্তিত দেহে রক্তরঞ্জিত হয়েও চিৎকার করে জবাব দিলেন, ‘অসম্ভব! আমার শাস্তি আমার প্রাণের চেয়ে প্রিয় নবীর ওপর চাপিয়ে দিয়ে নিজেকে মুক্ত করার তো প্রশ্নই ওঠে না। তাঁর শরীরে একটু কাঁটার আঁচর লাগাতে চাইলেও আমি আমার নিজের ও পরিবারের সকলের জীবন দিয়ে হলেও সেটা প্রতিরোধ করব।’
মৃত্যুর মুখে দাঁিড়য়ে নিজের নবী ও বিশ্বাসের জন্য এত পাগল ও প্রেমিক সূলভ দৃঢ় জবাব শুনে কাফেরদের মাথা খারাপ হয়ে গেল। তারা হৈচৈ করে বলতে থাকল, ‘ মেরে ফেলো… ওকে হত্যা করো…’
এবার সাঈদ ইবনে আমের দেখলেন মূলমঞ্চের ওপর থেকে খুবাইব আকাশের দিকে চোখ তুলে তাকিয়ে বলছেন- ‘হে আল্লাহ! এদের একটি একটি করে গুনে রাখো। এদের প্রত্যেককে তাড়িয়ে তাড়িয়ে হত্যা করো, এদের কেউই যেন ছাড়া না পায়।’
অগণিত তরবারি আর বল্লমের আঘাতে ঝাঁঝরা দেহে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন।
********
কুরাইশের লোকেরা ফিরে এল মক্কায়, আর ভুলে গেল বড় বড় ঘটনা- দুর্ঘটনার ভিড়ে খুবাইব ও তাঁর মৃত্যুকে। কিন্তু খুবাইবের বিষয়টি তাজাপ্রাণ তরুণ সাঈদ ইবনে আমের আল-জুমাহীর স্মৃতি থেকে এক মুহূর্তের জন্যও আড়াল হলো না।
ঘুমালে দেখতে পেতেন তাঁকে স্বপ্নে। জাগ্রত অবস্থায় দেখতেন তাঁকে কল্পনায়। তার স্মৃতিতে ভেসে উঠত মূলদণ্ডের সম্মুখে তাঁর ধীর ও প্রশান্ত দু’রাকাত নামায পড়ার সেই অদ্ভুত দৃশ্য। তার দু’কানে বারবার ঝঙ্কার তুলত সেই বদদুআর ধ্বনি- যা তিনি উচ্চারণ করেছিলেন কুরাইশের বিরুদ্ধে। ফলে তার আশঙ্কা হতে থাকত, এই বুঝি আকাশ থেকে বিশাল কোনো পাথর তার ওপর নিক্ষিপ্ত হবে অথবা কোনো বজ্রের আঘাত তার জীবনের অবসান ঘটাবে।
খুবাইব এমন শিক্ষা দিয়ে গেলেন সাঈদকে যা তিনি আগে জানতেন না…
তিনি শিখিয়ে গেলেন- জীবনের আসল অর্থ হলো একটি আকীদা ও বিশ্বাস আর মৃত্যু পর্যন্ত সেই আকীদা-বিশ্বাসের জন্য সংগ্রাম-সাধনা চালিয়ে যাওয়া।
আরও শিখিয়ে গেছেন যে, সুদৃঢ় ঈমান সৃষ্টি করে অনেক বিষ্ময়, তৈরি করে প্রচুর অলৌকিকতা।
আরও একটি বিশেষ বিষয় শিখিয়ে গেছেন, সেটি হলো যে নবীকে তাঁর সঙ্গী-সাথীরা এইভাবে জীবনের চেয়ে বেশী ভালোবাসে সন্দেহ নেই যে, তিনি আসমান থেকে সাহায্যপ্রাপ্ত সত্য নবী।
সেই মুহূর্তে আল্লাহ তাআলা সাঈদ ইবনে আমেরের হৃদয়ের রুদ্ধ দুয়ার খুলে দিলেন ইসলামের জন্য। একদল মানুষের মাঝে তিনি দাঁড়ালেন আর স্পষ্টভাষায় কুরাইশের পাপ-পঙ্কিলতার সংশ্রব ত্যাগের ঘোষণা দিলেন। ঘোষণা দিলেন দেব-দেবীর পূজা অর্চনা বর্জন করার এবং আল্লাহর দীন ইসলাম কবুল করার।
********
সাঈদ ইবনে আমের রাযিয়াল্লাহু আনহু হিজরত করে চলে গেলেন মদীনায়। আঁকড়ে ধরে থাকলেন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সংসর্গ। তাঁর সঙ্গে হাজির থাকলেন ‘খাইবার’ যুদ্ধে এবং পরবর্তী সকল রণাঙ্গনে।
তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট থেকে প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যখন ইন্তেকাল হয়ে গেল, তিনি পরিণত হলেন পরবর্তী দুই খলীফা আবু বকর ও উমরের খোলা তরবারিতে। জীবন-যাপন করলেন একজন মুমিনের এমনই বিরল দৃষ্টান্তরূপে, যিনি আখেরাত ক্রয় করেছেন দুনিয়া দিয়ে আর অগ্রগণ্য করেছেন আল্লাহর মর্জি ও সাওয়াবকে দেহের সকল আরাম ও নফসের সকল আকাক্সক্ষার ওপর।
********
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উক্ত দুই খলীফাই ভালোভাবে জানতেন সাঈদ ইবনে আমেরের সততা ও তাকওয়ার কথা। তাঁরা শুনতেন তাঁর নসিহত, গভীর মনোযোগ দিয়ে কান লাগিয়ে থাকতেন তাঁর উপদেশবাণীর প্রতি।
তিনি একবার সাক্ষাৎ করতে গেলেন খলীফা উমরের সঙ্গে, তাঁর শাসন আমলের সূচনার কোনো একদিনে। তিনি বললেন,
‘উমর! আমি আপনাকে উপদেশ দিচ্ছি, মানুষের সেবা করার সময় আল্লাহকে ভয় করুন, কিন্তু আল্লাহর হুকুম পালনের সময় মানুষের পরোয়া করবেন না। আপনার কথা যেন কখনোই কাজের বিপরীত না হয়। মনে রাখবেন সর্বশ্রেষ্ঠ কথা সেটাই যার বাস্তবায়ন ঘটে কর্মে।
হে উমর! কাছের ও দূরের মুসলিমদের ব্যাপারে সজাগ থাকুন, যাদের জন্য আল্লাহ আপনাকে শাসক বানিয়েছে। তাদের জন্য তাই পছন্দ করুন যা করেন নিজের ও পরিবারের জন্য, সত্যের জন্য সব কষ্ট স্বীকার করে নিন। আল্লাহর হুকুমের সামনে কোনো তিরস্কারের পরোয়া করবেন না।’
উমর জিজ্ঞাসা করলেন, এমন করতে কে সক্ষম হে সাঈদ!
তিনি জবাব দিলেন :
‘এটা আপনার মতো সেই ব্যক্তিই করতে সক্ষম, যাকে আল্লাহ উম্মতে মুহাম্মাদির শাসক বানাবেন এবং যার মাঝে ও আল্লাহর মাঝে কোনো আড়াল থাকবে না অর্থাৎ আল্লাহর সঙ্গে যার গভীর সম্পর্ক থাকবে।’
********
সে সময় উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু সাঈদ ইবনে আমেরের কাছে সহযোগিতা চেয়ে বললেন,
‘ হে সাঈদ! আমি আপনাকে হিমস নগরীর গভর্নর নিযুক্ত করছি।’
তিনি ব্যাকুল হয়ে বললেন,
‘উমর! আল্লাহর দোহাই দিয়ে আপনাকে বলছি, আমাকে এই বিপদে ফেলবেন না, দয়া করে আমাকে দুনিয়ার ঝামেলায় জড়াবেন না।’
উমর তাতে ক্রুদ্ধ হয়ে বললেন :
‘কী আশ্চর্য ব্যাপার, আমার ঘারে খেলাফতের গুরুদায়িত্ব চাপিয়ে আপনারা আমার পেছন থেকে সরে দাঁড়াতে চান!
আল্লাহর কসম! আমি আপনাকে ছাড়ব না।’
এরপর তার ওপর ‘হিমস’ নগরীর দায়িত্ব অর্পণ করে বললেন:
‘আপনার জন্য ভাতা নির্ধারণ করব কি?’
তিনি এর জবাবে বললেন :
‘আমীরুল মুমিনীন! ( প্রজা হিসাবে) বাইতুল মাল থেকে প্রাপ্ত ভাতাই হয়ে যায় আমার প্রয়োজনের অতিরিক্ত। তাহলে গভর্নর হিসাবে পাওনা ভাতা দিয়ে আমি কী করব?’
তিনি চলে গেলেন ‘হিমস’ নগরীতে।
********
এর অল্পকাল পরেই ‘হিমস’ থেকে আমীরুল মুমিনীনের নিকট এল তাঁর নির্ভরযোগ্য একটি প্রতিনিধি দল। তিনি তাদের নির্দেশ দিলেন, তোমাদের এলাকার দরিদ্র-ফকিরদের একটি তালিকা তৈরি করে দাও, যেন তাদের কিছু সাহায্য করতে পারি। নির্দেশমতো তারা একটি তালিকা পেশ করলেন। দেখা গেল সেখানে রয়েছে অমুক, অমুক এবং সাঈদ ইবনে আমেরও।
খলীফা জিজ্ঞাসা করলেন,
‘এই ‘সাঈদ ইবনে আমর’টা কে?’
তারা জবাব দিলেন,
‘আমাদের আমীর ও গভর্নর।’
তিনি বিস্মিত হয়ে আবার জিজ্ঞাসা করলেন,
‘ তোমাদের আমীরও কি ফকির?’
তারা বললেন,
‘হ্যাঁ হ্যাঁ, আল্লাহর কসম! দিনের পর দিন পেরিয়ে যায় তার বাড়িতে চুলা জ্বলে না।’
একথা শুনে উমর এত কাঁদলেন যে তাঁর দাড়ি একদম ভিজে গেল, এরপর এক হাজার দিনার ভরা একটি থলে তাদের হাতে দিয়ে বললেন,
‘তাকে আমার সালাম দিয়ে বলবে, আমীরুল মুমিনীন এই অর্থ আপনার জন্য পাঠিয়েছেন, এগুলো দিয়ে আপনার প্রয়োজন মেটাবেন।’
********
প্রতিনিধি দল থলেটি সাঈদ ইবনে আমেরের নিকট এলো। তিনি সেটা দেখেই বুঝলেন তাতে অনেক দিনার রয়েছে, সঙ্গে সঙ্গে তিনি ‘ইন্না-লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ বলে সেটাকে দূরে সরাতে থাকলেন- যেন তার ওপর কোনো বিপদ নেমে এসেছে অথবা তার এই আঙ্গিনায় কোনো ভয়ঙ্কর দুর্ঘটনা ঘটে গেছে। তার স্ত্রী ভয়ে ছুটতে ছুটতে এসে আড়াল থেকে জিজ্ঞাসা করলেন,
‘কী ব্যাপার সাঈদ! আমীরুল মুমিনীনের কি ইন্তেকাল হয়ে গেল?’
‘ব্যাপার এরচেয়েও বেদানাদায়ক।’
‘তাহলে কি মুসলিমবাহিনী কোনো রণাঙ্গণে হেরে গেছে?’
‘ব্যাপারটি তার চেয়েও অধিক হতাশাজনক।’
‘এগুলোর চেয়েও বেদনাদায়ক, হতাশাজনক- তাহলে কী বিষয় সেটা?’
‘আমার আখেরাত বরবাদ করতে আমার ঘরে দুনিয়ার ফেতনা ঢুকেছে।’
‘সেটা থেকে নিজেকে মুক্ত করে দিন।’ (দীনারের ব্যাপারে কিছুই না জেনে স্ত্রী বললেন।)
‘তুমি কি এ ব্যাপারে আমাকে সহযোগিতা করবে?’
‘কেন করব না, অবশ্যই করব।’
এই কথাবার্তা শেষ হলে তিনি সেই দীনারগুলো ছোট ছোট অনেক থলের মধ্যে ভাগ করে রাখলেন এবং পরে সেগুলো মুসলিম-দরিদ্রদের মাঝে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করলেন।
*******
এরপর খুব বেশি দিন অতিক্রম করেনি, উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু এলেন সিরিয়াতে- সেখানের সার্বিক খোঁজ-খবর নিতে। ‘হিমস’ নগরীতে যখন যাত্রা বিরতি করলেন, সে সময় এ অঞ্চলটিকে ‘কুফা’ নামের সঙ্গে মিলিয়ে বলা হতো ‘কুওয়াইফা’ মানে ছোট কুফা। কারণ এখানের লোকেরা কুফার লোকদের মতোই বেশি বেশি শাসক ও গভর্নরদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করত। লোকেরা হযরত উমরকে সালাম জানাতে ও তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে সমবেত হলো। তিনি এসব মানুষকে কাছে পেয়ে জিজ্ঞাসা করলেন :
‘ তোমাদের গভর্নর কেমন?’
তারা খলীফার নিকট তুলে ধরল গভর্নরের বিরুদ্ধে চারটি গুরুতর অভিযোগ, যার প্রতিটিই অন্যটির চাইতে মারাত্মক।
হযরত উমর বলেন, আমি বাদি-বিবাদি উভয়কেই একত্র করলাম। আল্লাহকে ডাকতে থাকলাম যেন তার ব্যাপারে আমার সুধারণা নষ্ট না হয়। কারণ তার প্রতি ছিল আমার গভীর আস্থা ও বিশ্বাস …
তারা ও তাদের গভর্নর যখন আমার কাছে সমবেত হলো, তখন আমি অভিযোগকারীদের বললাম:
‘বলো…, গভর্নরের বিরুদ্ধে তোমাদের কী অভিযোগ?’
‘বেলা অনেকটা পার হওয়ার আগে তিনি ঘর থেকে বের হন না, কেন এই বিলম্ব?’
আমি বললাম :
‘এ অভিযোগ সম্পর্কে আপনার কী বক্তব্য হে সাঈদ?’
কিছু সময় তিনি নীরব হয়ে থাকলেন। তারপর বললেন;
‘আল্লাহর কসম! আমি বিব্রতবোধ করছি কথাটি বলতে, কিন্তু কী করা যাবে! এখন তো না বলে কোনো উপায়ই নেই…। আমার কোনো খাদেম-চাকর-চাকরানী নেই, ফলে প্রতিদিন সকালে ঘরের জরুরি কাজের দায়িত্ব আমাকেই পালন করতে হয়। আমিই আটা গোলাই, আমিই খামির বানাই, রুটি তৈরী করি। এসব শেষ হলে অযূ করে তবেই জনগণের খেদমতে বের হই। কিছুটা বিলম্ব এ কারণেই হয়ে যায়।’
হযরত উমর বলেন:
‘আমি আবার জিজ্ঞাসা করলাম তোমাদের আর কী অভিযোগ তার বিরুদ্ধে?’
তারা বলল, ‘রাতের বেলা তিনি কারও ডাকেই সাড়া দেন না কেন?’
আমি জানতে চাইলাম:
‘হে সাঈদ! এ বিষয়ে আপনার জবাব কী?’
তিনি বললেন,
‘আল্লাহর কসম! এর কারণ প্রকাশ করাটা আমার জন্য খুবই অপ্রীতিকর। কিন্তু বাধ্য হয়েই বলতে হচ্ছে যে, দিন ও রাতকে আমি ভাগ করেছি ¯্রষ্টা ও সৃষ্টির মাঝে। দিনে ব্যস্ত থাকি সৃষ্টির খেদমতে আর রাতে মহান ¯্রষ্টার ইবাদতে।’
আমি বললাম :
‘তোমাদের আর কী অভিযোগ তার ব্যাপারে?’
তারা বলল, ‘মাসে একদিন তিনি বাড়ি থেকেই বের হন না।’
আমি প্রশ্ন করলাম :
‘হে সাঈদ! এটা কেন করেন?’
তিনি বললেন :
‘আমীরুল মুমিনীন! আমার কোনো গোলাম নেই এবং আমার দ্বিতীয় কোনো পোশাকও নেই এটা ছাড়া, যা এখন পরে আছি। মাসে একবার মাত্র এটা ধুয়ে পরিষ্কার করি, ভেজা পোশাক না শুকানো পর্যন্ত অপেক্ষা ছাড়া আমার কিছুই করার থাকে না। অবশ্য দিনের শেষে জনগণের উদ্দেশ্যে বের হয়ে যাই।’
আমি তাদের বললাম :
‘আর কী অভিযোগ তোমাদের?’
তারা বলল, ‘হঠাৎ হঠাৎ তিনি মূর্ছিত ও সজ্ঞাহারা হয়ে যান। তখন তিনি নিজের মজলিসের ব্যাপারেও বে-খবর হয়ে পড়েন।’
আমি জিজ্ঞাসা করলাম তাকে,
‘এর কারণ কী হে সাঈদ!’
তিনি বললেন :
‘মুশরিক অবস্থায় আমি খুবাইব ইবনে আদিকে শূলীতে চড়াতে দেখেছি…., দেখেছি কুরাইশের লোকেরা জীবিত খুবাইবের শরীরের বিভিন্ন অংশ নিষ্ঠুরতম উপায়ে কেটে টুকরো টুকরো করেছে আর তাঁকে বলেছে, তুমি কি চাও তোমার পরিবর্তে এই শাস্তি মুহাম্মাদকে দেওয়া হোক?’
জবাবে অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে তিনি বলেছিলেন, আল্লাহর কসম! এই শাস্তি তো দূরের কথা, আমি আমার নিজের জীবন, আমার পরিবারের সকলের জীবন বিসর্জন দিতে রাজি কিন্তু আমার প্রাণের চেয়ে প্রিয় নবী মুহাম্মাদের পায়ের তলায় একটি ছোট কাঁটা ফুটতে দিতে রাজি নই। সেদিনের সেই ভয়াবহ স্মৃতি যখনই আমার মনে পড়ে এবং তাঁকে কোনো সাহায্য না করে নিষ্ক্রীয় থাকার অপরাধবোধ যখনই আমার মাঝে জাগে, তখনই আমার মনে হয় যে আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করবেন না… ব্যাস, আমি সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ি।’
এইসব অভিযোগ ও জবাব শোনার পর হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন,
‘সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর জন্য যিনি আমার সুধারণাকে মিথ্যা হতে দেননি।’
পরে খলীফা এসময় এক হাজার দিনার তাকে দিলেন প্রয়োজনে কাজে লাগানোর জন্য।
তার স্ত্রী সেগুলো দেখে বললেন :
‘আল্লাহর জন্যই সকল প্রশংসা, যিনি আমাদের আপনার খেদমত নেওয়ার দায় থেকে মুক্ত করে দিলেন। এবার যান আমাদের জন্য কিছু খাদ্যসামগ্রী কিনে আনুন আর একটি খাদেম ঠিক করুন।’
তিনি বললেন তাকে :
‘এরচেয়েও উত্তম কিছু কি তুমি চাও না?’
‘কী সেটা?’ স্ত্রী জানতে চাইলেন।
‘এইগুলো আমরা এমন একজনকে দিয়ে দেই যিনি আজকের চেয়েও বেশি অভাবের সময় আমাদের বহুগুণ বাড়িয়ে ফেরৎ দেবেন!’
‘কীভাবে হবে সেটা?’
‘যদি আমরা আল্লাহ তাআলার জন্য দান করে দেই।’
‘ঠিক আছে, তাই করুন, আপনার মঙ্গল হোক।’
তিনি সেই হাজার দিনার ভাগ করে বিভিন্ন থলেতে রাখলেন। পরিবারের একজনকে নির্দেশ দিয়ে বললেন,
‘এটা অমুকের বিধবার কাছে পৌঁছে দাও। এটা অমুকের এতীম সন্তানদের, এটা অমুক বংশের অসহায় মানুষদের আর এটা অমুক পরিবারের দরিদ্রদের কাছে পৌঁছে দাও।’
*******
আল্লাহ তায়ালা সাঈদ ইবনে আমের আল-জুমাহীর প্রতি আপন সন্তুষ্টি দান করুন। তিনি ছিলেন সেই সব বিরল ও মহান মানুষের দলভুক্ত যাঁরা নিজেদের অভাব সত্ত্বেও অন্যের প্রয়োজনকে অগ্রগণ্য করেন।
তথ্যসূত্র : ————————
১. তাহযীবুত তাহযীব, ৪র্থ খণ্ড, ৫১ পৃষ্ঠা।
২. ইবনে আসাকির, ৬ষ্ঠ খণ্ড, ১৪৫-১৪৭ পৃষ্ঠা।
৩. সিফাতুস সফওয়াহ, ১ম খণ্ড, ২৭৩ পৃষ্ঠা।
৪. হুলইয়অতুল আউলিয়া, ১ম খণ্ড, ২৪৪ পৃষ্ঠা।
৫. তারীখুল ইসলাম, ২য় খণ্ড, ৩৫ পৃষ্ঠা।
৬. আল-ইসাবা, ২য় খণ্ড, ৪৮ পৃষ্ঠা, অথবা আত্তারজামা, ৩২৭০।
৭. নাসাবু কুরাইশ, ৩৯৯ পৃষ্ঠা।
